নতুন দিনের ঠিকানা
গল্প কামাল হোসাইন জানুয়ারি ২০২৬
শামীম আর শাকিল দুজন হাত ধরাধরি করে পাশাপাশি হাঁটতে থাকে। তারা প্রতিদিনই এভাবে হাঁটে। স্কুলে যাচ্ছে ওরা। স্কুল থেকে হাঁটা দূরত্বে ওদের বাড়ি। তবে তাদের সেদিনের হাঁটার ভঙ্গিতে ছিল কেমন যেন এক বাড়তি সতর্কতা-যেন রাস্তার প্রতিটি পদক্ষেপ এখন থেকে অনেক ভেবেচিন্তে ফেলে যেতে হবে। সকালের মিষ্টি আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। সূর্যটা উঠি উঠি করছে। প্রকৃতিতে হালকা মৃদুমন্দ বাতাস শরীর ছুঁয়ে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছিল। সেই বাতাসে কেমন যেন অচেনা এক নতুন গন্ধের আবহ।
পথ চলতে চলতে নীরবতা ভেঙে প্রথমে শামীম বলল, বাতাসটা আজ দারুণ লাগছে না?
শামীমের কথাটা খুব সাধারণ। তবু শাকিলের মনে হলো, এই স্বাভাবিক কথার ভেতরেই অনেক কিছু লুকিয়ে আছে। সে কিছু বলল না। শুধু মনে মনে ভাবল-হ্যাঁ, কথাটার মধ্যে কেমন যেন গভীর ইঙ্গিত রয়েছে।
এই ইঙ্গিত আসলে বিগত চুয়ান্ন বছরের। নানা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর দুঃশাসন, অপশাসন, একতরফা ক্ষমতা আর নিপীড়নের দীর্ঘ বেদনার ইতিহাস এখানে নিহিত। এদেশের মানুষ এতদিন ধরে এক ধরনের অস্বাভাবিক ঘোরের ভেতর দমবন্ধ অবস্থায় বেঁচে ছিল। যেখানে অপহরণ, গুম আর খুন ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। খবরের কাগজে নিয়মিত শিরোনাম হয়ে উঠত এসব সংবাদ। মতের অমিল মানেই কঠিন শাস্তি, হয়রানি, জেল-জুলুম, নির্যাতন-এই ধারণা সমাজের গভীরে এমনভাবে ঢুকে পড়েছিল যে, মানুষ তার ন্যায্য প্রশ্ন করাটাকেই ধীরে ধীরে অপরাধ ভাবতে শুরু করেছিল।
এই সমাজেই বড় হয়েছে শামীম আর শাকিল। তাদের শৈশবের স্মৃতিতে ছড়িয়ে রয়েছে হঠাৎ করে থেমে যাওয়া নির্মল আড্ডা, টিভির ভলিউম ছোট করে দেওয়া, তাড়াহুড়ো করে দরজা বন্ধ করে দেওয়ার দৃশ্য। রাতে-দিনে বিশেষ কোনো নাম উচ্চারণ করা হলেই বড়রা ফিসফিস করে সাবধান করে দিত-এসব কথা খবরদার বাইরে বলতে যেয়ো না!
তখন তারা এসব কথার মানে বুঝতে পারেনি। শুধু একটা অজানা ভয় যে সেখানে মিশে রয়েছে, সেটা বুঝেছিল। এখন তারা বুঝতে শিখেছে-এই ভয়টা আসলে কোথা থেকে এসেছিল।
২০২৪ সাল সেই বোঝাপড়ার মোড় ঘুরিয়ে দেয় পুরোপুরি। ছাত্রদের ন্যায্য দাবির প্রশ্নে রাষ্ট্রযন্ত্র যখন কঠোর হয়ে ওঠে, তখন প্রথমে অনেকেই ভেবেছিল-এটাও আগের সব আন্দোলনের মতোই ভণ্ডুল হয়ে যাবে। অতীতের ইতিহাস তো তাই বলে। কিন্তু ইতিহাস সব সময় নিজের পুরোনো ছক মেনে চলে না। সে তার নিজস্ব নিয়মে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলে।
যৌক্তিক দাবি মানার বদলে রাষ্ট্র শান্তিপ্রিয় ছাত্রদের দমন করতে নেমে পড়ে। আন্দোলনে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, গুলি-সবই ব্যবহার করা হয়। শামীম প্রথম দিন অনেকটা দূরে দাঁড়িয়েই এসব দেখেছিল। তখন তার মনে হয়েছিল, ঘটনাগুলো তার চারপাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ঠিক, কিন্তু তা তাকে ছুঁতে পারছে না। ঘটনার আবহে দ্বিতীয় দিন সে বুঝতে পারল-এই অবস্থার অবসান না হলে কেউই আর এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাবে না। আর এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতেই হবে।
ওই সময়গুলোতে শাকিল রীতিমতো ভয় পেয়ে গিয়েছিল। অবশ্য ভয় পাওয়াটা অস্বাভাবিক ছিল না। শামীমও একইভাবে ভয় পেয়েছিল। কিন্তু ভয়টা যখন সবার মাঝে ভাগাভাগি হয়ে যায়, তখন সেটা আর একার থাকে না। সেই ভাগ করা ভয়ই ধীরে ধীরে মানুষকে নির্ভয় করে তোলে। বুকের মধ্যে সাহস দানা বাঁধে। মানুষ হয়ে ওঠে প্রতিবাদী। তখন চারপাশের পরিস্থিতিও দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে।
ছাত্রদের আন্দোলন খুব দ্রুত তাদের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। তখন তা আর কেবল ছাত্রদের আন্দোলন থাকে না। জনতার ভেতরে জমে থাকা দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বঞ্চনা আর না বলা কথাগুলো হঠাৎ ভাষা পেয়ে যায়। মানুষ মুখ খুলতে শুরু করে। তারা ঘরের ভেতরে লুকিয়ে না থেকে রাস্তায় নেমে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে। কেউ কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে শ্লোগান দেয়, কেউ হাত উঁচু করে দাঁড়িয়ে সেই আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে দেয়, কেউ কেবল নীরবে তাকিয়ে দেখে-তারপরও সেই নীরব দাঁড়িয়ে থাকাটাও হয়ে ওঠে প্রতিবাদের এক অন্য ভাষা।
এই আন্দোলনে বাদ পড়েনি শিশুরাও। ছোট ছোট কোমল হাতে লাল-সবুজের পতাকা, বড়দের দেখাদেখি তাদের চোখেও অদ্ভুত এক দৃঢ়তার ছাপ স্পষ্ট। মনে হচ্ছিল, বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত বদলে গিয়ে আগামীটা যেন নিজেই নিজের দিকে দ্রুতগতিতে হেঁটে আসছে।
১৬ জুলাই আবু সাঈদের পুলিশের বন্দুকের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়ার মুহূর্তটা যেন সময়কে থামিয়ে দিয়েছিল। অনেকেই দৃশ্যটা সরাসরি দেখেনি বটে, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই মুহূর্ত সবার চোখে আটকে গিয়েছিল। রাষ্ট্রের নৃশংসতা সবার চোখ খুলে দেয়। পুলিশের গুলিতে শহিদ হয় আবু সাঈদ। শহিদের সেই রক্তধারায় আন্দোলন নতুন গতি পায়। প্রতিবাদে ফেটে পড়ে আপামর জনতা। মানুষ বুঝে যায়-এখান থেকে আর পেছানোর কোনো সুযোগ নেই।
আর মানুষের ফুঁসে ওঠা দেখে ভীত হয়ে রাষ্ট্র দমন-পীড়ন আরও বাড়িয়ে দেয়। গুণিতক হারে বাড়তে থাকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে লাশের সংখ্যা। পাঁচ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার ছাত্র-জনতা প্রাণ হারায়। এই সংখ্যার ভেতরে ছিল অসংখ্য নাম, অসংখ্য মুখ আর তাদের ভেঙে পড়া পরিবার।
অবশেষে আসে পাঁচ আগস্ট। জনরোষ সামলাতে না পেরে পাশের দেশে হেলিকপ্টারে করে পালিয়ে যায় গণবিরোধী সরকার। পূর্ব কোনো ঘোষণা ছাড়া, কোনো আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ছাড়া-হঠাৎ করেই শূন্যতায় ডুবে যায় দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ক্ষমতার তখতে তাউস। প্রথমে কেউ বিশ্বাস করতে পারেনি ব্যাপারটা। পরে ধীরে ধীরে মানুষ বুঝতে পারে-একটা দুঃশাসনের কালো অধ্যায় শেষ হয়েছে। মাথার ওপর থেকে যেন একটা শকুনি ছায়া সরে গেছে। মানুষ সিজদায় পড়ে মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে।
আকস্মিক এই পরিস্থিতিতে সেদিন সন্ধ্যায় শামীমের বাবা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলেন ঘরের বারান্দায়। তারপর গভীর একটা শ্বাস ছেড়ে বললেন, এত রক্ত, এত প্রাণ না ঝরলে কি মানুষ এভাবে সিসাঢালা প্রাচীরের মতো দাঁড়াতে পারত? সব অসাধ্য সাধন করতে পারে এই মানুষই।
শামীমের বাবার সেই প্রশ্নটারও আসলে কোনো সহজ উত্তর ছিল না।
স্বৈরাচার সরকার চলে যাওয়ার পর দেশটা যেন নতুন করে কথা বলতে শেখে। মানুষ আবার নতুন আশার স্বপ্ন বুনতে শুরু করে। কীভাবে একটা স্থিতিশীল, ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্র গড়ে তোলা যায়-এই আলোচনা হয়ে ওঠে মুখ্য।
সেদিন স্কুলে ঢোকার সময় শাকিল বলল, মনে হচ্ছে এবার দেশটাতে সত্যিই কিছু একটা হবে।
শামীম জানালার বাইরে তাকিয়ে রয়েছে। চারপাশে আলো ঝিলমিল করছে। তারা কদিন আগের আন্দোলন থেকে বুঝে গেছে-নতুন কোনো কিছু একদিনে আসে না। তার জন্য লাগে ত্যাগ, সময় আর দৃঢ়তা। ছাত্র-জনতার সেই সম্মিলিত প্রচেষ্টা মিথ্যে ছিল না কিছুতেই।
ঠিক তখনই তাদের ক্লাসের ঘণ্টা বেজে ওঠে-ঢং ঢং ঢং। আর কিছু না ভেবে দুজন তড়িঘড়ি করে ক্লাসে ঢুকে পড়ে। পেছনে পড়ে থাকে দীর্ঘ অন্ধকারের ইতিহাস। সামনে খোলা জানালার মতো এক অনিশ্চিত, তবু সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ।
শামীম আর শাকিলের মতো তাদের বন্ধুরাও বুঝতে পারে-নতুন দিনের নতুন সময়ের ঠিকানা আর কেবল স্বপ্নের মানচিত্রে সীমাবদ্ধ নেই। এই ঠিকানাটা এখন তাদের হাতের মুঠোয় খেলা করছে। যা তাদের অনবরত হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
আরও পড়ুন...