নজরুলের কবিতা ও গানে জুলাইয়ের গ্রাফিতি
জুলাই-নিবন্ধ মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন আগস্ট ২০২৬
জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা। প্রথমত, একাত্তর সালে বাংলাদেশ একটি পতাকা, মানচিত্র ও সার্বভৌমত্ব পেয়েও পরাধীন ছিল তিপ্পান্ন বছর। এ তিপ্পান্ন বছর ভারতের হাতে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ভাষিক, কৃষি খাতসহ সকল ক্ষেত্রেই জিম্মি ছিল। এমনকি বাক্্স্বাধীনতা একাত্তর-পূর্ববর্তী পাকিস্তানের চেয়েও ভয়াবহ ছিল। তাই জুলাই বিপ্লব এসব শোষণ ও ভারতীয় আধিপত্যসহ সকল বিদেশি শক্তির আধিপত্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। নতুন তথা প্রকৃত স্বাধীন বাংলাদেশ বিনির্মাণে ছাত্র-জনতার এমন আত্মত্যাগ বিরল। দুই, বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্বাধীনতা ঘোষণা ও বাস্তবায়নের জন্য পৃথিবীতে এক বিরল দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছে। কেননা, প্রথম স্বাধীনতা যাদের কাছ থেকে নিতে হয়েছিল তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সাতচল্লিশে স্বাধীনতা এনেছিল। অর্থাৎ নিজ ভাই বা বন্ধুর বিরুদ্ধেই নিজেদের একাত্তরে দাঁড়াতে হয়েছে। ঠিক তেমনি চব্বিশে এসে নিজের ঘরের মানুষের সাথেই লড়াই করতে হয়েছে। কেননা, এই আপনজনেরা সাতচল্লিশ-পূর্ববর্তীদের মতোই নিপীড়নকারী এবং সাতচল্লিশ-পরবর্তী নিজ ভাইদের মতোই জুলুম-অত্যাচার-প্রতারণা-আগ্রাসন করত এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও বেশি জুলুমবাজ ছিল। এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে আর নেই। তৃতীয়ত, পৃথিবীর ইতিহাসে একটি ক্যালেন্ডারকে ভেঙেচুরে নতুন করে দিয়েছে। কেননা পয়লা জুলাই আন্দোলন শুরু করে, যা ধীরে ধীরে বিপ্লবে পরিণত হয় এবং ৩৬ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমেই শেষ হয়। ফলে এটা স্বীকৃত-পৃথিবীতে জুলাই ও আগস্ট বারবার আসবে কিন্তু ৩৬ জুলাই ২০২৪ এসেছিল একবার; আর কখনো আসবে না এবং যন্ত্রণাদায়ক ও ঘৃণিত আগস্টও এত ছোট্ট হয়ে ক্যালেন্ডারে লিখিত থাকবে না। এই বিরল ইতিহাস রচনায় কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ও গান উজ্জীবনী শক্তি হিসেবে বিপ্লবীদের হৃদয়ে রক্ত গরম করা ক্যাটালিস্ট হিসেবে কাজ করেছে। আর নজরুলের এই কবিতা ও গানের মাধ্যমে ইতিহাসের সাক্ষী সৃষ্টির গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে দেশের প্রতিটি দেওয়ালে।
নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা বিপ্লবীদের মনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে আধিপত্যবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে। নজরুলের ‘চির উন্নত মম শির’-শিক্ষার্থীদের বিপ্লবী হয়ে ওঠার মূলমন্ত্র। ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদ তাঁর ফেসবুক প্রোফাইলে ‘চির উন্নত মম শির’ লেখেন এবং সকাল থেকে ফ্যাসিস্ট পুলিশের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যান। রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশ আন্দোলন বন্ধের নির্দেশ দিলে আবু সাঈদ ও তাঁর সহযোদ্ধারা একসাথে নজরুলের মতো বলে উঠল, ‘আমি মানি নাকো তাহার আইন’। ব্রিটিশদের আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছিলেন নজরুল এবং তাকে মেরে ফেলার জন্য কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। তবু তিনি থামেননি। ঠিক তেমনি আবু সাঈদ। বুক পেতে দিলেন, কিন্তু ফ্যাসিস্টের আইন মানেননি। বুকে গুলি নিয়ে শহীদ হলেন। আবু সাঈদ শহীদ হওয়ার পর সেদিন বিকেল থেকে সারা দেশের দেওয়ালে গ্রাফিতি আঁকা হলো আবু সাঈদের দু-হাত প্রশস্ত করে গুলির সামনে অবিচলভাবে দাঁড়িয়ে থাকা এবং পাশে লেখা ‘চির উন্নত মম শির’ ও ‘আমি মানি নাকো তাহার আইন’। শুরু হলো আইন ভাঙার প্রতিযোগিতা এবং এটিই ফ্যাসিস্টদের মনোবলকে প্রথম আঘাত হানে প্রবলভাবে।
যখন সারা দেশে শিক্ষার্থীদের হত্যা, গুম, গ্রেফতার ও মামলা দিয়ে নাস্তানাবুদ করে ফেলা হয়েছে, ঠিক তখন দাবানলের মতো নজরুল এগিয়ে এলেন বিস্মৃতির অন্তরাল থেকে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার পাশাপাশি উজ্জীবন ও মুক্তির নেশায় বিপ্লবীরা সমবেত কণ্ঠে বলে,‘আজিরক্ত-নিশি-ভোরে একি এ শুনি ওরে/মুক্তি-কোলাহল বন্দি-শৃঙ্খলে,/ঐ কাহারা কারাবাসে মুক্তি হাসি হাসে,/ টুটেছে ভয়-বাধা স্বাধীন হিয়া-তলে॥’
১৮ জুলাই সারা দেশে নারকীয় হত্যাযজ্ঞের এবং ওই দিন আসিফ ও মুগ্ধসহ প্রায় অর্ধশত শহীদ হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে ১৯ জুলাই থেকে গানটির ‘ওরা দু-পায়ে দলে গেল মরণ-শঙ্কারে/সবারে ডেকে গেল শিকল ঝঙ্কারে,/ বাজিল নব-তলে স্বাধীন ডঙ্কা রে,/বিজয়-সঙ্গীত বন্দি গেয়ে’ চলে’/ বন্দিশালা মাঝে ঝঞ্ঝা প’শেছে রে উতল কলরোলে॥’-সমবেত কণ্ঠে বেজে উঠল এবং দেওয়ালে দেওয়ালে নতুন গ্রাফিতি আঁকা হলো।
আর তাতে যে ঝড় উঠেছে, তাতে কেমন যেন ‘বহু যুগের ওপার হতে’ শক্তি হয়ে, প্রেরণা হয়ে, বিদ্রোহীর কেতন হয়ে জুড়ে গেলেন নজরুল। গানটি বিপ্লবীদের ধমনিতে বইতে লাগল ক্রোধ আর দুর্দম প্রতিরোধের স্রােত হয়ে। তাই তারা সম্মিলিতভাবে গাইলো, ‘জয় হে বন্ধন-মৃত্যু-ভয় হর! মুক্তি-কামী জয়!/স্বাধীন-চিত্ত জয়! জয় হে! জয় হে! জয় হে!”
ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্বিচারের গুলি, হত্যা, গুম, হামলা ও মামলায় যখন সবাই দিশেহারা এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ়, তখন আবার নজরুল আসলেন বিপ্লবীদের জাগাতে। ‘রৌদ্র-দগ্ধের গান’টি নিয়ে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় সম্মিলিতভাবে গেয়ে উঠল, ‘এবার আমার জ্যোতির্গেহে তিমির প্রদীপ জ্বালো।/আনো অগ্নিবিহীন দীপ্তিশিখার তৃপ্তি অতল কালো।/ তিমির প্রদীপ জ¦ালো।’ এই গানে বিপ্লবীদের রক্তে আগুন লেগেছে। পথে পথে গুলির সামনে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিতে লাগল, ‘রক্তে আগুন লেগেছে।’ তাই তারা রাষ্ট্রীয় সকল অসাংবিধানিক ও অমানবিক আইন লঙ্ঘন করার সিদ্ধান্ত নেয়। মজার বিষয় হলো এক্ষেত্রেও নজরুলের কবিতা ও গানই ভরসা হয়ে দরজায় কড়া নাড়ল। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলল, ‘আমি মানি নাকো তাহার আইন।’ কিন্তু এই আইনের বিরুদ্ধে লড়াই করার অনুপ্রেরণা বা শক্তি দরকার। পুরো দেশটা একটা কারাগারে পরিণত করেছে এবং জাহান্নামের মতো ভয়ানক করে তুলেছে ফ্যাসিস্টরা। এখানেও নজরুল ছাত্রদের বললেন, ‘কারার ঐ লৌহ কপাট/ভেঙে ফেল কর রে লোপাট/ রক্ত-জমাট শিকল পূজার পাষাণ-বেদী/ওরে ও তরুণ ঈশান/বাজা তোর প্রলয় বিষাণ/ধ্বংস নিশান উড়ুক প্রাচীর প্রাচীর ভেদি...’ এ গানটির ওপর ভিত্তি করে রাস্তায় রাস্তায় দেওয়ালে দেওয়ালে গ্রাফিতি এঁকেছে শিক্ষার্থীরা।
ফ্যাসিস্ট পুলিশের আক্রমণে অনেক শিক্ষার্থীর বাবা-মা তাদের আটকাতে চেয়েছিল। কিন্তু এখানেও নজরুল উপস্থিত হলেন এবং শিশুর মুখ দিয়ে বলালেন, ‘আলসে মেয়ে ঘুমিয়ে তুমি থাক,/হয়নি সকাল, তাই বলে কি সকাল হবে না কো!/আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?/তোমার ছেলে উঠলে গো মা রাত পোহাবে তবে!’ এই লাইনগুলো দিয়ে শিক্ষার্থীরা গ্রামে-গঞ্জে, শহরের দেওয়ালে গ্রাফিতি আঁকল এবং সকল বাবা-মা আর বসে থাকেনি। তারাই সন্তানদের মাঠে নিয়ে এসেছে। নিজ হাতে শিক্ষার্থীদের পানি, খাবার খাইয়েছে।
ফলে শুরু হলো ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন। ফ্যাসিস্টের বুকে পদচিহ্ন আঁকার জন্য দেওয়ালে গ্রাফিতি আঁকলেন, ‘শিকল পরা ছল মোদের এই শিকল পরা ছল/শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল।’ তরুণ শিক্ষার্থীরা ফ্যাসিস্টের নানা মায়াবী ছলনার শিকলে দীর্ঘ দিন বন্দি ছিল। আন্দোলন শুরু হলে বাস্তবিক শিকল দিয়েই তাদের আটকানো হলো। কিন্তু অদম্য শিক্ষার্থীরা নজরুলের গান-কবিতায় অনুপ্রাণিত। তাই তাদের শপথ ছিল এই ফ্যাসিস্টদের তাদের শিকলেই বন্দি করতে হবে।
৩৬ জুলাই ২০২৪! শিক্ষার্থীরা বাবা-মায়েদের সাথে নিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করল। বাংলাদেশ স্বাধীন হলো আবার, অর্থাৎ এটি দ্বিতীয় স্বাধীনতা। এই দ্বিতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সকল রসদ জুগিয়েছে কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ও গান। আর সেসব রসদের চিহ্ন দেশের আনাচে-কানাচে দেওয়ালে দেওয়ালে গ্রাফিতির মধ্যে ফুটে উঠেছে। টিকে থাকুক নজরুলের এই অনুপ্রেরণা যেন আর কেউ সাহস করে ফ্যাসিস্ট হতে না পারে। এবং কেউ চেষ্টার আগেই যেন বুঝতে পারে, নজরুল জাগ্রত। তিনি আগামী প্রজন্মকে নিয়ে অনাগত স্বৈরাচারকে ধ্বংস করবেন।
আরও পড়ুন...