অবিস্মরণীয় জুলাই
জুলাই-নিবন্ধ মাহবুবুল হক জুলাই ২০২৬
কী যেন একটা জিনিস হারিয়েছি এমন একটা ভাব মনের মধ্যে উদয় হচ্ছে। ভাবটা বিষণ্ণ। হারানোর দুঃখ, কষ্ট ও বেদনার। ভাবলাম কয়েকদিন পূর্বে কানাডায় ছোট চাচি মারা গেছেন সে কারণে হয়তো মনটা আমার মুষড়ে পড়েছে। কিন্তু মন থেকেই আবার জবাবটা পাই। এই তো কিছু দিন আগে তিনি চাচা ও এক বোনসহ ঢাকায় এসেছিলেন। এখানকার সহায়-সম্পত্তি সব বিক্রি করেছেন। চাচা-চাচি ঢাকায় আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের দাওয়াত করে দেখাশোনার একটা আয়োজন করেছিলেন। সেখানে আমাদের এই মুরুব্বি দুজন আমাদের কাছে চিরদিনের জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন। বলেছিলেন, আর হয়তো তোমাদের সাথে দেখা নাও হতে পারে। তোমাদের জন্য তেমন কিছু করতে পারিনি। আমাদের তোমরা ক্ষমা করে দিয়ো।
আমরা সবাই তাদের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছি। তারাও আমাদের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন। তাদের শরীরটা খারাপই ছিল। খুব কাহিল ছিলেন তারা। ঢাকা থেকে কানাডায় ফিরে যাওয়ার মাত্র কয়েকদিন পর চাচিমা আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে ওপারে চলে গেলেন। সুতরাং ওই বিষয়টি নিয়ে আমার এখনও মন এত খারাপ হয়ে আছে বলে মনে হয় না। আমরা বয়স্ক মানুষ। আমরা বুঝি, আল্লাহর ইচ্ছাই বড়। আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন।
এরমধ্যে আমাদের ছোট মামিও ইন্তেকাল করলেন। বেশ কষ্ট হচ্ছিল। কয়দিন খুব ভেবেছি। আহা! কত খালা ছিল, কত খালু ছিল, ফুপু ছিল, ফুপা ছিল। মামা ছিল, মামি ছিল। চাচা ছিল, চাচি ছিল। প্রায় সবাই তো চলে গেলেন। রইলেন মাত্র একজন খালা আর একজন চাচি। কয়েকদিন খুব শূন্যতা অনুভব করেছি।
গ্রামের বাড়িতে অনেক আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে আমার স্থান এখন তৃতীয়জন। আমারও তো বয়স আশি ছুঁইছুঁই। ৪-৫ দিনের মধ্যে এইসব উৎকণ্ঠা-উদ্বিগ্নতা আল্লাহর তরফ থেকে আস্তে আস্তে চলে গেল।
তাহলে এখন কীসের পেরেশানি? অস্থিরতা কাটছে না। বিভিন্ন ছোটখাটো কাজ করে মনের অশান্তি দূর করার চেষ্টা করছি। মনের মধ্যে স্বস্তি আনার চেষ্টা করছি। হচ্ছে না। হঠাৎ ফেসবুকে একটা হাসপাতালের ছবি দেখলাম। তোমাদের মতো এবং তোমাদের চেয়ে একটু বয়স্ক অনেক রোগগ্রস্ত তরুণকে দেখলাম। হাসপাতালটা ছিল ঢাকার পঙ্গু হাসপাতাল। এই দেখো এখন ভালোভাবে মনে পড়ছে। নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের আহত ও পঙ্গুদের দেখতে গিয়েছিলেন। তিনি সেখানে অনেকক্ষণ ছিলেন। আহতদের খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। তাঁর সাথে সাংবাদিকরাও ছিল। রোগীদের সাথে, ডাক্তারদের সাথে, সাংবাদিকদের সাথে তিনি খোলামেলা আলাপ-আলোচনা করছিলেন। পরবর্তী সময় বের হয়ে আসার পূর্বে গণ-অভ্যুত্থানের আহত-নিহতদের ওপর অনেক করুণ কাহিনি বলছিলেন। সে সময় কোনো একজন সাংবাদিক মন্ত্রীকে বলেছিলেন, সেই অভ্যুত্থান বা বিপ্লব তো হারিয়ে গেছে। মন্ত্রী কী বলেছিলেন, আমার মনে নেই। রাতে টেলিভিশন দেখার সময় ঐ খবরটি আবার দেখলাম। আহা! কত ছেলের হাত নেই, পা নেই। তোমাদের কাছে সেসব করুণ কাহিনি বলা ঠিক হবে না। তোমরা নরম হৃদয়ের ছোট্ট মানুষ। তোমাদের বন্ধুসম ছেলেমেয়েরাই দু-বছর পরেও এখনও হাসপাতালে পড়ে আছে। তাদের কৃত্রিম হাত-পা দেখে আমার হৃদয় দীর্ণ-বিদীর্ণ হচ্ছিল। সেখান থেকেই আমার মনের কষ্ট, মনের যন্ত্রণা, মনের দুঃখ শুরু হয়েছিল। বিশেষ করে ওই যে সাংবাদিকটি বেশ করুণভাবে বলছিল, সেই গণ-অভ্যুত্থান ও গণ-বিপ্লব তো স্যার হারিয়ে গেছে।
এই ‘হারিয়ে গেছে’ শব্দটাই আমার বিষণেœর কারণ। দুঃখ-কষ্ট ও বেদনার কারণ। কেন হারিয়ে গেল, কোথায় হারিয়ে গেল? কারা হারিয়ে দিলো?
আসলে হারানোর বিষয়টি আমাকে ক্লান্তিমগ্ন করেছে। তোমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে এবং নিশ্চিতভাবেই জানি যাদের সাথে আমি এখন কথা বলছি-তাদের মধ্যে হয়তো কেউ কেউ আছ ওই পঙ্গু হাসপাতালে। অনেকে হয়তো হাসপাতাল থেকে বের হয়ে গেছ। শরীরে নানা রকম চিকিৎসার চিহ্ন ও ক্ষত নিয়ে। তোমাদের কারো না কারো আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশীদের মধ্যে অনেকে শহীদ হয়েছে। তাদের কথা তো আমরা সেভাবে ভাবছি না। আহতদের কথাও যে খুব একটা ভাবছি, তা-ও তো নয়। ঘটনার এখানেই তো শেষ নয়। এই গণ-অভ্যুত্থানকে আমরা জুলাই বিপ্লব বলছি। যদিও আমরা বিজয় লাভ করেছিলাম আগস্ট মাসের ৫ তারিখে। সে কারণেই তোমরা নাম দিয়েছিলে ৩৬ শে জুলাই। বহুদিন এই নামটা আমাদের সামনে জ¦লজ¦ল করছিল।
আসলে তোমাদের আন্দোলনটা শুরু হয়েছিল আরও আগে। তোমাদের দুজন বন্ধু গাড়ি চাপা পড়ে নিহত হয়েছিল। তার মধ্যে একজন ছিল ছাত্র, অন্যজন ছাত্রী।
ওদের বয়সটা আমার এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। তবে যত দূর মনে পড়ে, ১৩-১৪ বছর বয়সের। এইজন্য অনেকেই বলে বিশেষ করে পাশ্চাত্যে-এই অভ্যুত্থান ছিল শিশুদের। কারণ বিশ^ব্যাপী ১৮ বছর পর্যন্ত ছেলেমেয়েদের শিশু বলেই ধরা হয়। আমাদের দেশে বা আমাদের মধ্যে এ বিষয়ে এখনও কিছুটা মতভেদ আছে। বিশেষ করে আলেমরা বলেন, ছেলেরা ১২ বছর পর্যন্ত শিশু থাকে, আর মেয়েরা শিশু থাকে ১০ বছর পর্যন্ত।
তো দুজন শিক্ষার্থী গাড়ি চাপায় নিহত হওয়ায় তোমরা যে আন্দোলন শুরু করেছিলে, তার নাম ছিল নিরাপদ সড়ক আন্দোলন। তোমরা সারা দেশে সমস্ত রাস্তা-ঘাট বন্ধ করে দিয়েছিলে। যারা নিহত হয়েছে, তাদেরকে তোমরা শহীদ বলেছিলে। তোমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল সারা দেশের মাদরাসার ছাত্ররাও। তোমাদের এই আন্দোলনে আমার যতদূর মনে পড়ে, সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছিলেন চলচ্চিত্র জগতের প্রাণপুরুষ ইলিয়াস কাঞ্চন। এর কারণ ছিল, তা তোমরা ভালো করেই জানো।
বেশ কয়েক বছর পূর্বে সড়ক দুর্ঘটনায় তার স্ত্রী নিহত হন। বিষয়টাকে তিনি অনেক উঁচু স্তরে নিয়ে যান। তিনি প্রমাণ করে দেখান, সড়ক দুর্ঘটনায় আমাদের দেশে গড়ে প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ জন মানুষ নিহত হন। এর অর্থ হলো, প্রতিদিন আমাদের দেশে ২৫-৩০ টি পরিবার ধ্বংসের উপক্রম হয়। একটি পরিবারে বাবা হোক, মা হোক, ছেলে হোক, মেয়ে হোক-যে কেউ নিহত হলেই সেই পরিবারটি নদী ভাঙনের মতো আস্তে আস্তে ভেঙে যায়। সেই পরিবারটি আর উঠে দাঁড়াতে পারে না। সে কারণে তোমরা যখন দেশব্যাপী নিরাপদ সড়ক আন্দোলন শুরু করলে তিনিও বিপুলভাবে উজ্জীবিত হয়েছিলেন। গণ-অভ্যুত্থানের শুরুটা কিন্তু এখান থেকেই।
এই আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে তোমরা প্রমাণ করে দিয়েছিলে, এদেশের গাড়ির ড্রাইভার, অ্যাসিস্ট্যান্ট, হেলপার, গাড়ির মালিক, গ্যারেজ, গাড়ির আমদানিকারক এবং গাড়িসম্পর্কিত সরকারি-বেসরকারি অফিস শুধু ভুয়া নয়-গাড়ি যারা ব্যবহার করে, রাস্তায় যারা গাড়ি চালায়, সে সরকারি মানুষ হোক, বেসরকারি হোক, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর লোক হোক, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক হোক, আইন প্রণয়নকারী হোক, বিচারব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত ব্যক্তি হোক, শতকরা প্রায় ৫০ ভাগ মানুষের নীতি-নৈতিকতার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। যেই মুহূর্তে দেশব্যাপী এই কার্যক্রম তোমরা করছিলে, তখনই তোমরা বারবার উচ্চকণ্ঠে বলছিলে, এই দেশটাই যেন ভুয়া হয়ে গেছে। এদেশের অধিকাংশ মানুষ যেন ভুয়া হয়ে গেছে। এই ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়ে তোমরা নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে গিয়েছিলে। না গিয়ে উপায় ছিল না। কারণ রাষ্ট্রের ভিতকে তোমরা নাড়িয়ে দিয়েছিলে। তোমাদের চিৎকারে দেশের শহর, নগর, বন্দর বেশ কয়েকদিন ভূমিকম্পের মতো কাঁপছিল। দেশে তখন স্বৈরাচারী সরকার। যাকে এখন তোমরা বলছ, ফ্যাসিবাদী সরকার। তারা তোমাদের আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছিল। দেশে রাস্তায় রাস্তায় তোমাদের রক্ত ঝরেছিল।
সরকারবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিশিখা ছড়িয়ে পড়ল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে। একাডেমিক শিক্ষার মাধ্যম থেকে শেষ পর্যায়ে, সবার কানে সব সময় উচ্চারিত হচ্ছিল, তোমাদের দেওয়া শেষ ঐতিহাসিক শব্দটি ‘ভুয়া-ভুয়া’। শুরু হলো চাকরিতে কোটা ব্যবস্থাবিরোধী আন্দোলন। সেখানেও দেখা গেল নীতি-নৈতিকতার শূন্যতা। সব জায়গায় ‘ভুয়া’ ব্যবস্থা। পদ্মা-মেঘনা-যমুনার মতো আন্দোলন গড়ালো বঙ্গোপসাগরের দিকে। পাবলিক বিশ^বিদ্যালয় থেকে আন্দোলন গড়ালো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। দেশের কোনো শিক্ষার্থী আর বাদ পড়ল না। সবার চোখ খুলে গেল। আন্দোলন নতুন নামে উদ্ভাসিত হলো। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন। এরমধ্যে জাতীয় নির্বাচন হয়ে গেল ২৪-এর জানুয়ারিতে। নির্বাচন হলো সম্পূর্ণ ‘ভুয়া’র ভিত্তিতে। দেশের মানুষ ভুয়া নির্বাচন মেনে নিতে পারল না। আন্দোলন গণ-আন্দোলনে রূপ নিল। দেশের অধিকাংশ ঘর-বাড়ি আন্দোলনের দুর্গে পরিণত হলো। শিক্ষার্থীদের সাথে যুক্ত হলো মা-বাবা, ভাই-বোন, সাথে আত্মীয়-স্বজনও। সবাই যুক্ত হওয়ায় গণ-অভ্যুত্থান দুর্দান্ত ঝড়-ঝঞ্ঝায় পরিণত হলো। চোখের পলকেই জুলাই মাস এসে গেল। স্বৈরাচারী সরকারের জুলুম-নির্যাতন, খুন-গুম-হত্যা দিনের পর দিন বাড়তেই লাগল। হত্যার পর হত্যা চলতেই থাকল। কোনোভাবেই সরকার গণ-অভ্যুত্থান থামাতে পারল না। হতাশ হয়ে সরকার বলল, এরা পাকিস্তানি, এরা রাজাকার। আন্দোলনকারীরা সরকারের কটুক্তিকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারল না। সামুদ্রিক টাইফুনের মতো সবকিছু ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। শেখ হাসিনা পালিয়ে গেল। সরকার পতন হলো। শিক্ষার্থী ও জনতা বিজয় লাভ করল। সেই দিনটি ছিল ৩৬ শে জুলাই। অর্র্থাৎ ৫ আগস্ট।
তোমাদের জুলাই সংখ্যায় গণ-অভ্যুত্থানের কিছু কথা বলে ফেললাম। এসবের সাক্ষী তোমরা নিজেই। তোমরাই জীবন দিয়েছ প্রায় ১৫ শত। আহত হয়েছ প্রায় ২০ হাজার। চাট্টিখানি কথা নয়। হাজার হাজার হিমালয়ের মতো উঁচু কথা। বড় কথা। তোমাদের শুরু করা আন্দোলন সারা বিশ^ স্মরণ করছে। অথচ আমরা এখন সবাই ভাবছি, এত বড় অভ্যুত্থান ব্যর্থ হলো কেন?
আরও পড়ুন...