অনেক আঁধার পাড়ি দিয়ে
গল্প শাহানারা স্বপ্না এপ্রিল ২০২৬
একসময় আমাদের দেশ শাসন করত ইংরেজরা। প্রায় দুশো বছর ধরে তারা এ দেশের মানুষের ওপর চালিয়েছিল কঠোর শাসন আর নির্মম অত্যাচার। তখন সাধারণ মানুষের কোনো কথা বলার অধিকার ছিল না। কেউ প্রতিবাদ করলেই পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যেত। মানুষ তখন নিজের কথা বলতেও ভয় পেত। সামান্য প্রতিবাদ করলেই ফাঁসি, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, কিংবা গুলির মুখে পড়তে হতো। সে ছিল বড়ই দুঃসহ একসময়। তাই লোকেরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠছিল।
কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম হাইকোর্টের এক বিচারপতির নাম ছিল জন প্যাক্সটন নরম্যান। খুবই নিষ্ঠুর প্রকৃতির। শত শত বিপ্লবী, আলেম ও প্রতিবাদীকে বিচারের নামে খুন ও কারাগারে বন্দি করত। সামান্য অজুহাতে দিত কঠিন সাজা। আবার অনেককে কালাপানির দ্বীপ আন্দামানে পাঠানো হতো নির্বাসনে। আত্মীয় পরিজনহীন সেই ভয়াবহ জঙ্গলে না খেতে পেয়ে তিলে তিলে শেষ হয়ে যেত কয়েদিরা। সে নিত্য-নতুন আইন তৈরি করত মানুষকে কষ্ট দেওয়ার জন্য। তার নাম শুনলেই মানুষের গা শিউরে উঠত। লোকজন বলত, ‘বিচার নয়, ও যেন মৃত্যুর হুকুম লেখে!’
নরম্যান নিজেই একদিন সহকর্মী এক সাহেবকে বলেছিল, ‘এই বাঙালি মুসলমানদের ভয় দেখাতে না পারলে শাসন করা যাবে না। কড়া আইনই একমাত্র পথ।’
এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে বাড়ছিল ক্ষোভ। আর সেই আগুনে পুড়ছিল এক সাহসী তরুণ-আবদুল্লাহ। আবদুল্লাহ ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক যুবক। তাঁর বাড়ি পাঞ্জাবে। আরবি-ফারসি ভাষায় তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল বলে জানা যায়। মানুষের আহাজারি তাকে ভাবিয়ে তোলে।
একদিন বাজারের মোড়ে দুজন মানুষের কথা কানে এলো, ‘শুনেছিস? কাল রাতেই আবার দুজনকে ধরে নিয়ে গেছে,’ একজন চাপা স্বরে বলল।
‘কী অপরাধ?’ অন্যজন ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করল।
‘কিছুই না। শুধু ইংরেজদের বিরুদ্ধে কথা বলেছিল!’
এই কথা শুনে আবদুল্লাহর বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘আর কতদিন চলবে এ অন্যায়?’
দিনের পর দিন ব্রিটিশ সরকারের অন্যায় আর নির্যাতন দেখে তাঁর বুকের ভেতরটা ক্রুদ্ধ বাঘের মতো গর্জে উঠল। আবদুল্লাহ আর চুপ থাকতে পারল না। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল-এই জুলুম আর সহ্য করা হবে না। যে করেই হোক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।
কিন্তু সহজ ছিল না সেই পথ। সে নিজে এক সাধারণ নাগরিক ছাড়া কোনো ক্ষমতা নেই। ইংরেজ সরকার পুলিশকে দিয়েছিল সীমাহীন ক্ষমতা। সন্দেহ হলেই গ্রেপ্তার, ঘরবাড়ি দখল, এমনকি ফাঁসির আয়োজন-সবই চলত নির্দ্বিধায়। কিন্তু তবু আবদুল্লাহ হিম্মত হারাল না। আল্লাহ তো বলেছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা। আবদুল্লাহ নাম লেখাল বিপ্লবীদের দলে। বিপ্লবীদের বাঁচতে হলে নিতে হতো ছদ্মবেশ। তাই আবদুল্লাহও বদলে ফেলে নিজের নাম, পরিচয় ও পোশাক।
বিদায়ের সময় বৃদ্ধা মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘বাবা, তুই আমার একমাত্র অবলম্বন।’
আবদুল্লাহ মায়ের হাত ধরে কাতর কণ্ঠে বলল, ‘মা, আজ পুরো জাতি অসহায়। আমরা যদি জালিমের বিরুদ্ধে না দাঁড়াই, তবে আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করবেন না।’
মা চমকে উঠে বললেন, ‘কী বলছিস বাবা? বাইরে গেলে তোরা সবাই ধরা পড়ে যাবি!’
‘মা,’ আবদুল্লাহ শান্ত কিন্তু দৃঢ়কণ্ঠে বলল, ‘আজ যদি আমরা চুপ থাকি, কাল আমাদের সন্তানরাও দাস হয়ে জন্মাবে।’
মা আঁচলে চোখ মোছেন। আবদুল্লাহ বলল, ‘মা, আল্লাহ যদি চান, আমি ফিরব। আর না ফিরলেও জানবে-আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম। তবে শেষ বিচারের দিনে নিশ্চয় আবার দেখা হবে।’
পরদিন ভোরে সে ঘর ছাড়ল। পেছন থেকে বাবার কণ্ঠ ভেসে এলো, ‘সাবধানে থেকো বাবা। আল্লাহ তোমার সহায় হোন।’
প্রিয় পরিবার ছেড়ে যেতে চোখের পানিতে ভেসে যায় বুক। বাবা, বৃদ্ধা মা, স্ত্রী, সন্তান সবার থেকে বড় হয়ে ওঠে দেশ, দেশের মানুষ।
আল্লাহর ওপর ভরসা করে ঝাঁপিয়ে পড়ে কাজে। পরিবার থেকে বিদায় নিয়ে প্রথমে মুলতান, তারপর দিল্লি হয়ে শাহরানপুর চলে যান আবদুল্লাহ। এরপর স্বাধীনতা সংগ্রামের জনক শাহ্ সৈয়দ আহমদের জন্মস্থান বেরেলীতে যান। তখন মুজাহিদদের শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র ছিল পাটনা। তাই পাটনায় চলে আসেন এবং বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগ দেন। চারদিকে তখন পুলিশ আর গুপ্তচরের ভয়, ধরা পড়লেই সোজা আন্দামান!
ব্রিটিশবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে হাশিমদাদ খাঁ, হাজি দীন মোহাম্মদ, আমির খাঁ, পীর মোহাম্মদ, মোবারক আলি ও আবদুল্লাহসহ অনেকে ধরা পড়ে যান। বহুদিন জেলে থাকার পর ছাড়া পান। এরপর আবদুল্লাহ পাটনা থেকে কলকাতা চলে আসেন।
কলকাতায় তেমন কেউ পরিচিত ছিল না। কলুটোলার একটি মসজিদে এসে ওঠেন। নরম্যানের কীর্তিকলাপ এখন শহরে বসেই শোনা যায়। এ অবিচারের প্রতিকার নিজ হাতেই করার সংকল্প করলেন। সেখানে বসে নামাজ ও কুরআন পাঠেই বেশি সময় চলে যেত। উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে হাইকোর্টে দোভাষীর চাকুরির চেষ্টা করলেন। কিন্তু ইংরেজি জানা না থাকায় ব্যর্থ হন।
১৮৭১ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর। সকালবেলার সূর্য-রশ্মি আজ যেন বেশি আলোকিত। বাংলার আদিগন্ত জুড়ে ভোরের শিশির অশ্রু হয়ে ঝরছে। বাংলার ফোর্ট উইলিয়াম হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি জন প্যাক্সটন নরম্যান ব্রেকফাস্ট সেরে আদালতে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছেন। রাসেল স্ট্রিটের বিশাল বাড়ির দোরগোড়ায় জুড়ি-গাড়ি হাজির। বাঙালি কয়েদিদের শায়েস্তা করতে বেশ কিছু কঠিন আইনের দরকার। গতকাল রাত জেগে সেটাই শেষ করেছেন। তাই ঘুম ভাঙতে একটু দেরি হলো। মি. নরম্যান বেশ খুশিমনে আদালতের কাজে চললেন। তখন সকাল এগারোটা। টাউন হলের সামনে এসে থামল চিফ জাস্টিসের গাড়ি। আরদালি কাগজপত্র গুছিয়ে নিচ্ছিল। তার অপেক্ষা না করেই তিনি নেমে পড়লেন। গম্ভীর মুখে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগলেন। ঘোড়ার সহিসকে একটা কথা বলা দরকার ভেবে মুখ ফিরিয়ে পেছনে তাকালেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার ওপাশে লুকিয়ে থাকা কেউ যেন ছুটে বের হলো। কিছু বোঝার আগেই লোকটি বজ্রপাতের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল নরম্যানের ওপর। কাঁধের কিছুটা নিচে পরপর দুবার ছুরির আঘাত করল। নরম্যান বুকে হাত চেপে ঊর্ধ্বশ্বাসে সিঁড়ির নিচের দিকে দৌড়াতে শুরু করলেন।
নরম্যানকে দৌড়াতে দেখে আক্রমণকারী ভাবল, আঘাতে বোধহয় কাজ হয়নি, তাই সেও পেছনে দৌড়াতে লাগল। লোকজন চিৎকার শুরু করল। নরম্যান সামনে একটা ইট পেয়ে আক্রমণকারীর মাথার দিকে ছুঁড়ে মারেন। আঘাত গিয়ে পড়ল যুবকের মুখে। রক্তাক্ত অবস্থায় সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। মুহূর্তেই পুলিশ আর জনতা তাকে ঘিরে ধরল। মারধর করে থানায় নিয়ে যাওয়া হলো। আঘাতকারী আর কেউ নয়-বিপ্লবী আবদুল্লাহ!
জনতা একজন আরেকজনকে বলাবলি করছিল, ‘এ তো বিপ্লবী!’
‘এমন সাহস আগে দেখিনি!’
থানায় মারধরের মাঝেও আবদুল্লাহ শান্ত গলায় বললেন, ‘তোমরা শরীর মারছ, মন নয়।’
এক পুলিশ রেগে গিয়ে বলল, ‘চুপ কর!’
‘ইতিহাস কখনো চুপ থাকে না,’ আবদুল্লাহ জবাব দিলো।
নরম্যানের জন্য আসে পালকি। তার আঘাত গুরুতর হলেও প্রথমে বোঝা যায়নি। পালকিতে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। নামকরা ইংরেজ ডাক্তাররা চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। তার আয়ু শেষ হয়ে গিয়েছিল।
চিফ জাস্টিসের মৃত্যুতে সারা কলকাতা জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। আবদুল্লাহ একাই অসীম সাহসে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন সাম্রাজ্যবাদীদের ভিত!
সেদিন ইংরেজরা ভয়ে ঘর থেকে বেরোতেই সাহস পেল না।
পুলিশ প্রচুর জেরা করেও আবদুল্লাহর কাছ থেকে কোনো কথা বের করতে পারেনি। বরাবরই তিনি ছিলেন নিশ্চুপ। পালানোর এতটুকু চেষ্টাও করেননি। যেন তাঁর কাজ শেষ হয়েছে, এখন আর কোনো কিছুর পরোয়া নেই। সে সময়ের বাংলার গভর্নর স্যার জর্জ ক্যাম্বেল আবদুল্লাহ সম্পর্কে শ্রদ্ধা ভরে বলেছিলেন, ‘মি. নরম্যানকে হত্যা করার পর আততায়ী পলায়নের কোনো চেষ্টাই করেননি। ফাঁসিমঞ্চে তাঁকে প্রাণ দিতে হয়েছে সত্য কিন্তু এর কারণ তিনি প্রকাশ করেননি। নিজের অবস্থার প্রতি তাঁর আদৌ কোনো লক্ষ্য ছিল না, অন্যের প্রশংসারও তিনি প্রত্যাশী ছিলেন না।’
এই অসীম সাহসিকতা ও দেশপ্রেমের বিনিময়ে পুরস্কার জুটেছিল ফাঁসি। কিন্তু সেখানেও কেউ তাকে হারাতে পারেনি। ফুলের মালার মতোই গলায় পরেছিলেন ফাঁসির রজ্জু। ছিল দেশের জন্য প্রাণ দেওয়ার গৌরবময় হাসি। পঁয়তাল্লিশ বছরের এই দেশপ্রেমিকের জন্য সেদিন উপস্থিত সবার চোখে নেমেছিল অশ্রুর বন্যা।
আবদুল্লাহ ধরা পড়েছিলেন। কিন্তু তিনি প্রমাণ করেছিলেন-অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য চাই সাহস ও বীরত্ব। তাঁর সেই উদ্দেশ্য বৃথা যায়নি। পরবর্তীতে স্বাধীন পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশ এর প্রমাণ। বিপ্লবীর রক্ত কখনো বৃথা যায় না। সে রক্ত রক্তিম সূর্যের মতো আঁধার পাড়ি দিয়ে আলোর দিকে যাত্রা করে।
আরও পড়ুন...