অন্য এক ইয়ামাল
খেলার চমক আবু আবদুল্লাহ সেপ্টেম্বর ২০২৬
লামিন ইয়ামাল যেদিন জীবনে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে মাঠে নামেন, তখন তার বয়স উনিশ বছর হতে এক মাস বাকি (তার মানে আঠারো)। আর যেদিন বিশ্বকাপ জিতে সোনালি সেই ট্রফিতে চুমু খেলেন, সেদিন তার বয়স উনিশ বছর পাঁচ দিন। এই বয়সেই বিশ্বকাপ ও ইউরো’র মতো বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দুটি ট্রফি জিতেছেন স্পেনের হয়ে। বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছেন আঠারো বছরের তরুণেরা আসলেই অদম্য।
শৈশব থেকেই দুর্দান্ত প্রতিভাবান ইয়ামালের জন্ম (১৩ জুলাই, ২০০৭) স্পেনে হলেও তার শেকড় মরক্কোর। উত্তর আফ্রিকার মুসলিমপ্রধান দেশটি থেকে তার বাবা মুনির নাসরাউয়ি স্পেনে অভিবাসী হয়েছিলেন। পেশায় তিনি ছিলেন রং মিস্ত্রি। ইয়ামালের মা শেইলা ইবানা পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ইকুয়েটোরিয়াল গিনি থেকে স্পেনে আসেন। স্পেনের বার্সেলোনা নগরীতে এই দম্পতির সংসারে জন্ম ইয়ামালের। তার বয়স যখন তিন বছর তখন মা-বাবার বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়। বিচ্ছেদের পর ইয়ামাল মায়ের কাছেই বেশি থাকতেন।
শৈশব থেকেই তার ফুটবল প্রতিভার প্রকাশ হতে থাকে। ছয় বছর বয়সের সময় এফসি বার্সেলোনা ক্লাবের স্কাউটদের চোখে পড়েন। ক্লাবের অ্যাকাডেমি ‘লা মাসিয়া’তে ভর্তির প্রস্তাব দেওয়া হয় ইয়ামালকে। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের শিশুদের জন্য এই অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হতে পারাটা স্বপ্নের মতো। কারণ এই অ্যাকাডেমি থেকেই ফুটবলার হিসেবে গড়ে উঠেছেন মেসি, ইনিয়েস্তা, জাভির মতো তারকারা। ইয়ামাল লা মাসিয়ায় বেড়ে ওঠেন এবং অ্যাকাডেমির বয়সভিত্তিক দলে খেলতে থাকেন। এরপর বার্সেলোনার মূল দল হয়ে পা রাখেন স্পেন জাতীয় দলে।
‘এলেন, দেখলেন, জয় করলেন’-এই প্রবাদটা ইয়ামালের ক্ষেত্রে পুরোপুরি মানানসই। বার্সেলোনার এসপ্লুগেস দে লব্রেগাত এলাকার একটি ছোট্ট বাসায় বেড়ে ওঠা অসম্ভব প্রতিভাবান কিশোরটি এই বয়সেই ফুটবলের সর্বোচ্চটা জিতে নিয়েছেন। এখন সময় শুধু এগিয়ে চলার। আগে থেকেই তাকে মেসি-পরবর্তী ফুটবল দুনিয়ার মুকুটহীন সম্রাট হিসেবে দেখা হচ্ছিল। বিশ^কাপ জিতে সেই সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করলেন এই স্প্যানিশ মুসলিম তারকা।
‘আমি মুসলিম’
ইউরোপের পরিবেশে বেড়ে ওঠা-বিশেষ করে তারকা হয়ে উঠলে অনেকে নিজের মুসলিম পরিচয় নিয়ে শঙ্কায় থাকেন। অনেকে তা প্রকাশ করতে চান না। কারণ ইসলামোফোবিয়ার কারণে ইউরোপে মুসলিমরা অনেক রকমের বৈষম্যের স্বীকার হন। তবে ইয়ামাল এসবকে পরোয়া করেন না; বরং মাঠে গোল করার পর প্রায়ই সিজদা করেন, সোশ্যাল মিডিয়ায়ও নিজের ধর্মীয় পরিচয় তুলে ধরে গর্বের সাথে পোস্ট করেন।
বিশ^কাপের আগে স্পেনের বার্সেলোনা নগরীর আরসিডিই স্টেডিয়ামে মিসর ও স্পেনের মধ্যে প্রীতি ম্যাচের সময় একদল স্প্যানিশ সমর্থক মুসলিমবিদ্বেষী স্লোগান দেয়। ইয়ামাল ওই ম্যাচের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় এক পোস্টে লেখেন, ‘আমি মুসলিম, আলহামদুলিল্লাহ’।
তার এই পোস্টের পর অনেকেই সাধুবাদ জানান নিজের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে গর্ব করার জন্য। ইয়ামাল আরও লেখেন, ‘ফুটবল উপভোগ করার জন্য, নিজের দলকে সমর্থন দেওয়ার জন্য। অন্যের পরিচয় বা বিশ^াসকে অসম্মান করার জন্য নয়।’
বিভিন্ন সময় ম্যাচের আগে মাঠেই হাত তুলে মোনাজাত করতে দেখা যায় ইয়ামালকে। রমজান মাসে রোজা ও ইফতারের বিভিন্ন অনুভূতি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেন এই তারকা। গত বছর উয়েফা নেশন্স লিগ চলাকালে ইয়ামালের রোজা রাখা নিয়ে বিশ্বমিডিয়ায় আলোচনা হয়। তখন স্পেন দলের কোচ ডে লা ফুয়েন্তে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘ইয়ামাল তার নীতি ও বিশ্বাস অনুসরণ করবে-সেটাই আমাদের কাছে স্বাভাবিক। দলের চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদেরা তাকে খাবার ও পানীয়ের ব্যাপারে যথাযথ নির্দেশনা দিচ্ছে।’
স্পেনিশ কোচ আরও বলেছিলেন, ‘আমরা সব ধর্মীয় বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করি, (রোজা রাখা সত্ত্বেও) ইয়ামাল খেলার জন্য পুরোপুরি ফিট আছে।’
ফিলিস্তিনিদের প্রতি ভালোবাসা
‘ফাইনালে স্পেনকে সমর্থন করব। তারা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে স্পেন সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান এবং ফুটবলার লামিন ইয়ামালের প্রকাশ্য ফিলিস্তিনপন্থি অবস্থান এই সমর্থনের প্রধান কারণ।’
এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল ফাইনালের আগে আল জাজিরা টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কথাগুলো বলছিলেন ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার ৩৩ বছর বয়সি বাসিন্দা আহমেদ আল-বোজম। গাজা এখন বিধ্বস্ত এক উপত্যকা। ইসরাইলি বিমান ও ট্যাংকের হামলায় পুরো উপত্যকা এখন ধ্বংসস্তূপ। এই যুদ্ধে সরকারি হিসেবেই ৭৩ হাজারের বেশি লোককে হত্যা করেছে দখলদার ইসরাইলিরা। প্রকৃত নিহতের সংখ্যা লক্ষাধিক। এমন অবস্থায় গাজার মানুষ কোনো রকম টিকে আছে; কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে তাদের এই সংকটের মধ্যেও দেখা গেছে স্প্যানিশ কিশোর লামিন ইয়ামালের জন্য উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে।
গাজায় প্রচণ্ড বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যেও তারা চেষ্টা করেছে আয়োজন করে স্পেনের ম্যাচগুলো দেখার এবং সবাই মিলে গলা ফাটিয়েছে লামিন ইয়ামালের জন্য। বিশ্বকাপের সময় গাজার ধ্বংসস্তূপের ওপর এক ফিলিস্তিনি শিল্পীর আঁকা ইয়ামালের একটি ছবি বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পায়। আর ফাইনালের পর ইয়ামাল যখন সোনালি ট্রফি হাতে নিয়েছেন-গাজাসহ পুরো ফিলিস্তিনিরা সেটাকে নিজেদের বিজয় হিসেবে উদ্যাপন করেছে। কারণ ইসরাইলি আগ্রাসনের বিপক্ষে ফিলিস্তিনিদের লড়াই-সংগ্রামের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন ইয়ামাল।
চলতি বছর মে মাসে লা লিগা জয়ে পর ছাদখোলা বাসে বার্সেলোনার শোভাযাত্রায় ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়ান লামিন ইয়ামাল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, সেদিন সাড়ে সাত লাখের বেশি বার্সেলোনা ভক্ত রাস্তায় নেমেছিল শিরোপা উৎসবে। বিশাল এই গণজোয়ারে ইয়ামাল ফিলিস্তিনিদের অধিকারের কথা মনে করিয়ে দেন বিশ্ববাসীকে।
তার এই আচরণে দখলদার ইসরাইলিরা ক্ষেপে যায়, একজন ইসরাইলি মন্ত্রী এর বিরুদ্ধে কড়া বক্তব্য দিলেও ইয়ামাল তার অবস্থান থেকে এতটুকু সরে আসেননি।
আরও পড়ুন...