গণঅভ্যুত্থানের ১ বছর শহীদ শিশু-কিশোরদের কথা ভুলব না

জুলাই-নিবন্ধ আসগর মতিন আগস্ট ২০২৫

দেখতে দেখতে এক বছর হয়ে গেল। বলছি ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের কথা। এর বছর পূর্তি ৫ আগস্ট। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানে স্বৈরাচার আওয়ামী শাসনের পতনের পর দেশের মানুষ হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। কচি কিশোররাও এই আন্দোলনে শরিক হয়ে অকাতরে প্রাণ দিয়েছে। তাদের সেই অবদানের কথা স্মরণ করতে হবে জাতিকে। তাদের ঋণ কখনো শোধ হবার নয়। ছোট্ট বন্ধুরা, তোমাদের সে আন্দোলনের কথা, শহীদদের কথা মনে রাখতে হবে। যাদের নেতৃত্বে ১৬ বছর পর সাফল্যের এই গৌরবগাথা রচিত হলো, সেই বীর আন্দোলনকারীদের কথাও মনে রাখতে হবে। তাদের জানাই অভিনন্দন। তাদের সাহসী আন্দোলনের ফলে আজকের বাংলাদেশ, এ কথা সবাইকে স্মরণে রাখতে হবে।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ২০২৪ কেমন করে এলো? সরকারি চাকরিতে প্রবেশের জন্য ৫৬ পারসেন্ট কোটা আর ৪৪ পারসেন্ট মেধাবীদের জন্য বরাদ্দ ছিল বাংলাদেশে। ২০১৮ সালে ছাত্ররা কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করেছিল। আন্দোলনের পর সরকার ছাত্রদের দাবি করা সংস্কার না করে কোটা বাতিল করে দিয়ে পরিপত্র জারি করেছিল। ওই পরিপত্রের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে নবম গ্রেড (পূর্বতন প্রথম শ্রেণি) এবং ১০ম -১৩তম গ্রেডের (পূর্বতন দ্বিতীয় শ্রেণি) পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সকল কোটা বাতিল করা হয়েছিল। এটা কিন্তু ছাত্ররা চায়নি। তারা চেয়েছিল সংস্কার, বাতিল চায়নি। বাতিল করে দিয়ে সংকটের বীজ রেখে দেওয়া হয়েছিল। আর সেটারই প্রকাশ ঘটে ২০২৪ সালের ৫ জুন কোর্টের আদেশের মধ্য দিয়ে। কোটা সংস্কার আন্দোলন একসময়ে সরকার পতনের এক দফায় গড়ায় আর তা হয়ে ওঠে রক্ত¯œাত। এত রক্তপাত নিকট অতীতে দেখেনি বাংলাদেশ। 

গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকার/ক্ষমতাসীন দল স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারে, যেমনটা ঘটেছিল জার্মানিতে নাৎসিদের বেলায়। বাংলাদেশেও তা দেখা গেল। জনগণকে শোষণ-নির্যাতনের কোনো পন্থাই তারা বাদ রাখে না। নির্যাতনমূলক সকল ব্যবস্থা যেমন: গুম, খুন ও গোপন কারাগার আয়নাঘর তার নজির। কিন্তু শেষটা কখনোই ভালো হয় না। 

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান বা জুলাই বিপ্লব কোটা সংস্কার আন্দোলন ২০২৪ ও অসহযোগ আন্দোলন ২০২৪-এর সমন্বিত আন্দোলন। ২০২৪ সালের ৫ জুন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকারের জারি করা পরিপত্রকে অবৈধ ঘোষণার পর কোটা সংস্কার আন্দোলন নতুন করে শুরু হয়, এই আন্দোলনে তৎকালীন শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকার দমন নিপীড়ন শুরু করলে এটি অসহযোগ আন্দোলনে রূপ নেয়। এই গণঅভ্যুত্থানের কারণে স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পলায়ন করতে বাধ্য হলে বাংলাদেশ সাংবিধানিক সংকটে পড়ে এবং এর তিন দিন পরে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়।

কী হয়েছিল ৫ জুন? ২০২৪ সালের ৫ জুন, হাইকোর্টের বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি খিজির হায়াতের বেঞ্চ কোটাব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করে। রায় প্রকাশের পরপরই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা এই রায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। তারা ঝিমিয়ে পড়া অবস্থা থেকে আবার জেগে ওঠে। জুলাই মাসে আন্দোলন আরও তীব্র রূপ নেয়, যেখানে শিক্ষার্থীরা ‘বাংলা ব্লকেড’-সহ অবরোধ কর্মসূচি চালায়। এই সময়ে আন্দোলন দমাতে পুলিশের অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের ফলে সংঘর্ষ ঘটে এবং রংপুরে আবু সাঈদ নামে একজন ভার্সিটি শিক্ষার্থী পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এই ঘটনাটি আন্দোলনকে আরও জোরালো করে এবং দেশজুড়ে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়।

এরপর ঢাকাসহ সারা দেশে আন্দোলন জোরালো হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন জায়গায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সরকারের বিভিন্ন সংগঠনের লোকদের হামলায় অনেক হতাহত হয়। এইসময় সারা দেশে কারফিউ জারি ও ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তীতে আপিল বিভাগের শুনানির তারিখ এগিয়ে নিয়ে আসা হয়। ৪ জুলাই আপিল বিভাগ, ৯ জুন হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের ওপর শুনানি না করে সরকারি চাকরির প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পদ্ধতি বাতিলের সরকারি সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় আপাতত বহাল রাখে। রাষ্ট্রপক্ষকে ‘লিভ টু আপিল’ দায়ের করার কথা বলা হয়। 

পরবর্তীতে ১০ জুলাই আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপক্ষ ও দুই শিক্ষার্থীর করা আবেদনের প্রেক্ষিতে হাই কোর্টের রায়ের ওপর চার সপ্তাহ স্থিতাবস্থা জারির আদেশের পাশাপাশি কিছু পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা জারি করে। এদিন ৭ আগস্ট পরবর্তী শুনানির জন্য নির্ধারণ করা হয়। ১৪ জুলাই হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে রাষ্ট্রপক্ষ ও দুই শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে লিভ টু আপিল দায়ের করা হয়। ১৮ জুলাই অ্যাটর্নি জেনারেলের আবেদনের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার কোর্ট বিচারপতি মামলার শুনানির তারিখ ২১ জুলাই রোববার নির্ধারণ করেন।

২১ জুলাই আপিল বিভাগ কোটা পুনর্বহাল করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বাতিল করে। একই সাথে সরকারের নীতিনির্ধারণী বিষয় হলেও সংবিধান অনুযায়ী সম্পূর্ণ ন্যায়বিচারের স্বার্থে আদালত সরকারি চাকরিতে ৯৩ শতাংশ মেধাভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এইদিন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কারফিউর মধ্যেও সর্বোচ্চ আদালতের কার্যক্রম বসেছিল। 

সরকার ও আদালত এত কিছু করলেও ছাত্র-জনতা তাদের কথায় কান দেয়নি। তারা আন্দোলন অব্যাহত রাখে। প্রতিদিনই বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনরতদের গুলি করে হত্যা করে পুলিশসহ সরকারের পেটোয়া বাহিনী। শেষে আসে এক দফার আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলন। তাতে ভয়ভীতি উপেক্ষা করে যোগ দেন সর্বস্তরের মানুষ। ৪ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এ দিন প্রায় ১০০ জন নিহত হয়। অবশেষে ৫ আগস্ট বা ৩৬ জুলাই ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি চলাকালে কারফিউ ও সকল বাধা-নিষেধ উপেক্ষা করে ছাত্র-জনতা রাজপথ দখলে রাখে। ছাত্ররা জুলাই আন্দোলনকে স্মরণীয় রাখতে ৫ আগস্টকে ৩৬ জুলাই অভিহিত করে। সেদিন দুপুরে আসে বিজয়ের লগ্ন। স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এভাবে বিজয়গাথা রচিত হয় রক্তের পথ বেয়ে। সেই সময় পর্যন্ত ৫ শতাধিক ছাত্র, জনতা, খেটে খাওয়া মানুষ নিহত হয়। অনেক ছিল কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রী। শেষে সারা দেশে শহীদের সংখ্যা দাঁড়ায় দেড় হাজারের বেশি। এত মৃত্যু নিকট অতীতে আর দেখা যায়নি। 

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিহত শিশু-কিশোরের সংখ্যা প্রায় ১০০ জন। তারা তোমাদের মতোই কোমলমতি শিশু-কিশোর। কোনো কোনো সূত্রে ৮৯ জন, কোনো কোনো সূত্রে ১০৫ জনের কথা জানা যায়। নতুন করে যাঁদের মৃত্যুর তথ্য সংযোজন করা হয়েছে, তাঁদের কেউ কেউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। কারও কারও মৃত্যুর খোঁজ পরে পাওয়া গেছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়ে মোট ৭৫৮ জনের মৃত্যু হয় বলে জানা গেছে কোনো কোনো সূত্রে। এর মধ্যে ১৬ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত মারা গেছেন ৩৪১ জন। ৪ থেকে ৬ আগস্টের মধ্যে মারা গেছেন ৪১৭ জন। বিক্ষোভ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ছররা ও প্রাণঘাতী গুলি, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হামলা ও গুলি এবং সরকার পতনের পর হামলা-অগ্নিসংযোগে শিশু-কিশোরের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

নিহত কিশোরদের মধ্যে বেশির ভাগই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল। তারা ছিল তোমাদের মতোই শিশু-কিশোর। তারা অনেকে প্রাণের মায়া ত্যাগ করে রাস্তায় নেমে আসে। তবে শিশু-কিশোরদের কেউ কেউ বাসায় ও বাসার ছাদে খেলতে থাকা অবস্থায়, বাসা থেকে বিক্ষোভ দেখার সময় এবং মা-বাবার সঙ্গে বিজয় মিছিলে যোগ দিতে গিয়ে নিহত হয়েছে।

আনাস পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র। শাহারিয়ার খান আনাস (১৬) ৫ আগস্ট বাড়িতে চিঠি লিখে চলে যায় বিক্ষোভে। চিঠিতে সে লেখে, ‘মা, আমি মিছিলে যাচ্ছি। নিজেকে আর আটকে রাখতে পারলাম না। মৃত্যুর ভয়ে স্বার্থপরের মতো ঘরে বসে না থেকে সংগ্রামে নেমে গুলি খেয়ে বীরের মতো মৃত্যু অধিক শ্রেষ্ঠ।’ ৫ আগস্ট রাজধানীর চানখারপুলে গুলিতে নিহত হয় আনাস। তার লেখা চিঠিটি বিভিন্ন পত্রিকা-বইয়ে প্রকাশিত হয়েছে। হাসপাতালের নথি ও স্বজনদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৭৯ শিশু-কিশোরের শরীরে ছররা ও প্রাণঘাতী গুলির চিহ্ন ছিল। স্থাপনা ও যানবাহনে দেওয়া আগুনে পুড়ে মারা গেছে ৯ শিশু-কিশোর। একটি শিশুর মৃত্যু সাউন্ড গ্রেনেডের সিপ্লন্টারের আঘাতে হয়েছে। নিহত শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে কমবয়সি শিশুটির নাম আব্দুল আহাদ (৪)। সে তখনও স্কুলে যাওয়া শুরু করেনি। ২০ জুলাই রাজধানীর রায়েরবাগে ৮ তলা ভবনের বারান্দা থেকে মা-বাবার সঙ্গে বিক্ষোভ দেখার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় সে। নিহত শিশু-কিশোরদের মধ্যে দুটি মেয়েশিশুও রয়েছে। তারা হলো নারায়ণগঞ্জের রিয়া গোপ (৬) ও উত্তরার নাঈমা সুলতানা (১৫)। রিয়া বাসার ছাদে ও নাইমা বারান্দায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। নাইমা ডাক্তার হতে চেয়েছিল। কিন্তু তার সাধ পূর্ণ হলো না। 

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে গত ১৬ জুলাই। ওই দিন আবু সাঈদসহ ছয়জন নিহত হন। রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদের মৃত্যু পুরো আন্দোলনের ধারা বদলে দেয়। সে বীরের মতো বুক পেতে দাঁড়িয়ে ছিল। পুলিশ কাপুরুষের মতো তাকে কাছে থেকে গুলি করে হত্যা করে। আবু সাঈদ এভাবে এই আন্দোলনের আইকনে পরিণত হয়। 

আরেক শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। সে উত্তরায় আন্দোলনরতদের পানি পান করাতো। ‘পানি লাগবে পানি’ বলে বোতল নিয়ে হাঁটত। সেও আন্দোলনের অন্যতম আইকনে পরিণত হয়েছে। তাদের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। 

আন্দোলনে শিশু-কিশোর মৃত্যুর প্রথম ঘটনা ঘটে ১৮ জুলাই। ওই দিন থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ৫৬ জন শিশু-কিশোর। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। ওই দিন থেকে ১১ আগস্টের মধ্যে কমপক্ষে আরও ৩৩ শিশু-কিশোর নিহত হয় বলে তথ্য পাওয়া যায়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৫৭ শিশু-কিশোর ঢাকায় (সাভার, টঙ্গীসহ) নিহত হয়েছে। ঢাকার বাইরে মারা গেছে ৩২ জন। (সূত্র: প্রথম আলো)

শহীদ শিশু-কিশোরদের মধ্যে আরও রয়েছে : ফারহান ফাইয়াজ (১৭) মোহাম্মদপুর, মো. আহাদুন (১৬) বাড্ডা, রাহাত হোসেন (১৭) টঙ্গী, তাহমিদ ভূঁইয়া (১৫) নরসিংদী, সায়মন (১৭) চট্টগ্রাম, আশিকুল ইসলাম (১৫) বনশ্রী, মাহফুজুর রহমান (১৫) মিরপুর, সামিরুর রহমান (১১) মিরপুর, রাকিব হাসান (১০) মোহাম্মদপুর, হৃদয় হাওলাদার (১৭) যাত্রাবাড়ী, নাঈম হাওলাদার (১৭) যাত্রাবাড়ী।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ