পাঁচ বন্ধুর অভিযান
উপন্যাস জাফর তালুকদার মার্চ ২০২৬
জায়গাটা ভারি মনে ধরল সবার। ওরা এসেছে খুলনা থেকে। বাহার, ইনু, পলাশ, আবু আর কিসলু। বলতে গেলে আবুই ফুসলে এনেছে ওদের।
সুন্দরবন মানেই তো বাঘ আর হরিণের হাতছানি।
আবুরা খুলনা জিলা স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে বিজ্ঞান গ্রুপে।
পলাশ থাকে নিরালায়। বাহার বসুপাড়া। ইনু রূপসা। আবু হোস্টেলে। কিসলু থাকে একটু দূরে। খালিশপুর।
ওরা শুধু একই ক্লাশে পড়ে তা নয়। কোচিংও করেছে একসঙ্গে। এখন অবশ্য সে-চাপ নেই। অফুরন্ত সময় হাতে। সুযোগ মতো দেখা সাক্ষাৎ ঘটে।
ক্রিকেট নিয়ে একটু পাগলামি আছে বাহারের। ইনু গিটার শিখতে যায় সুর নিলয়ে।
আবুর বাড়ি বাগেরহাট। সে দুই দফা ঘুরে এসেছে সেখান থেকে।
পলাশের ঝোঁক বই পড়া। এতদিন পরীক্ষার চাপে মেলা থেকে কেনা বইগুলো পড়ার সুযোগ পায়নি। এখন সুদে-আসলে উসুল করে নিচ্ছে।
কিসলুর স্বভাব ঘুরে বেড়ানো। কিন্তু মন্দ কপাল। তার কথায় সায় দেয় না কেউ।
সেদিন ভৈরব নদীতে নৌকায় ঘুরতে গিয়ে সুন্দরবন যাওয়ার কথাটা তুলল কিসলু, ‘যাবি নাকি কয়রা?’
আবু একবার সুন্দরবন বেড়ানোর কথা বললেও সেদিন আমলে আনেনি সবাই। তারা বরং মত দিয়েছিল ষাটগম্বুজ দেখার পক্ষে। কিন্তু ইনুটা হঠাৎ জ্বরে পড়ায় সে-প্রস্তাব ভন্ডুল হয়ে যায়।
সুন্দরবনের কথায় নেচে উঠল পলাশ, ‘মন্দ কী, চল যাই।’
বাহার খুকখুকিয়ে কেশে উঠল, ‘বললেই হলো! আমি ওই বাঘ-ভালুকের মধ্যে নেই।’
কিসলু হেসে ফেলল বাহারের কথায়, ‘তুই একটা ভিতুর ডিম। আমরা যাব কয়রার ফুফু বাড়ি। পাশে নদী। ওপারে সুন্দরবন। চাইলে ঘরে শুয়ে বাঘের ডাক শুনতে পাবি। কপাল ভালো হলে, ওনাদের দেখা-সাক্ষাৎও মিলতে পারে । তাতে ভয়ের কী আছে!’
‘ইস, বললেই হলো! ওই মানুষখেকো নদীর ওপার থেকে সাঁতরে এপার আসতে কতক্ষণ?’
‘তা আসুক না দেখি কত বুকের পাটা! ফুফার দোনলা বন্দুক আছে না! ওটা দিয়ে ফুটুস করে দেবো ব্যাটাকে। ব্যাস, খেল খতম।’
কিসলু হাত নাচিয়ে এমন নাটুকে গলায় কথাটা বলল যা শুনে সবাই হেসে উঠল
হো হো করে।
আবু একটু উদাস হয়ে ভৈরবে সূর্যাস্ত দেখছিল।
লাল বলের মতো সূর্যটা জ্বলছিল গাছপালা আর বাড়িঘরের ফাঁকফোঁকরের মধ্যিখানে।
নৌকাটা চলছে শহরের ওপারে পাড় ছুঁয়ে ছুঁয়ে। নদীর কিনার ঘেঁষে ঘরগেরস্তি। মহিলারা গালগল্প করছেন উঠোনে। দুষ্টু ছেলের দল লোফালুফি করছে ছোট একটা লাল বল নিয়ে। দুটো অলস কুকুর নদীপানে তাকিয়ে আছে গম্ভীর মুখে। একটা হেলেপড়া বাবলা গাছে একগুচ্ছ কাক কী এক জটিল বিষয় নিয়ে বচশায় মক্ত। একটু পরই পাশের মসজিদ থেকে ভেসে এলো মাগরিবের আজান।
নৌকাটা প্রায় চলে এসেছে বড় বাঁকের কাছে। একটা কার্গো লঞ্চ মোলায়েম ঢেউ তুলে সাঁতরে গেল নির্বিকার ভঙ্গিতে।
ছুটির দিন বলেই বহু মানুষ বেড়াতে এসেছেন ইঞ্জিন-নৌকায়। নৌকাগুলো একটু রংচঙা বাহারি টাইপের। কোনোটায় সামিয়ানা টাঙানো। চেয়ার পেতে বসাটা একটু আবার আরামদায়ক করে দিয়েছে কেউ কেউ। তবে বেশির ভাগই তক্তাপেটানো হেলানো বেঞ্চ। এটা বিষয় নয়। দুদণ্ডের ফুর্তিটাই আসল। আজকাল খুব চল হয়েছে দলবেঁধে নৌকায় বেড়ানোর। শান্ত নদে খানাপিনা, গানবাজনারও কমতি নেই। ছবি তোলার খিদেটাও ভয়াবহ। বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে এমন ঝুঁকিতে পোজ দিচ্ছেন যা দেখে শিউরে উঠতে হয়।
এ সময় একটু চা-টা হলে মন্দ হতো না। কিন্তু এখন আর সেটা সম্ভব নয় বলেই আবু আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলল বিশাল-বাহার যেটা বলেছে তা কিন্তু একেবারে মিথ্যা বলেনি। আমি যখন সেভেনে পড়ি, দিলু মামাদের সঙ্গে লঞ্চে গিয়েছিলাম সুন্দরবন বেড়াতে। দলে অনেক লোক ছিল। নীল কমল, টাইগার পয়েন্ট, দুবলার চর ঘুরে দেখেছি বিস্তর। একদিন বিকেলবেলা লঞ্চে বসে ঝাঁপিয়ে খাল পার হতে দেখেছিলাম একটা বাঘকে। কী ভয়ানক ব্যাপার ভাবা যায়! আমার তো বাপু বাঘ দেখে আক্কেলগুড়–ম! ওদিকে মামা লুকিয়ে লুকিয়ে দিব্যি ভিডিও করে ফেললেন পুরো দৃশ্যটা।’
বাহারের মুখে এতক্ষণে কথা ফুটল, ‘কী, আমার কথা সত্য হলো তো? বলেছিলাম না বাঘ সাঁতার কেটে নদী পার হয়।’
কিসলু নাক কুঁচকে বলল, ‘এ আর নতুন কী! বাঁশখালিতে ওরকম বাঘ প্রায়ই আসে। খিদের চাপে পড়লেই নদী সাঁতরে চলে যায় মানালে। হরিণ-শুয়োর-বানর তো আর সব সময় বনে মেলে না। বাধ্য হয়ে রাতবিরেতে গেরস্তবাড়ির গরু-ছাগল মেরে লুকিয়ে বনে ফিরে যায় নদী সাঁতরে। মানুষখেকো হলে তো কথাই নেই। তখন শিকারি না ডেকে উপায় থাকে না।’
পলাশ মাথা দুলিয়ে বলল, ‘ঠিক, শিকারি পচাব্দী গাজী এমনটা লিখেছেন তার বইতে।
উনি মানুষখেকো বাঘের মেজাজ-মর্জি নিয়ে অনেক কথা লিখেছেন। দারুণ শিকারি ছিলেন পচাব্দী। অনেক মানুষখেকো মেরছেন নিজের হাতে। নাম-সুনামের কমতি ছিল না। পুরস্কারও পেয়েছেন বহু। অথচ এখন আর কেউ চেনে না এই সাহসী মানুষটাকে!’
বনে ঘোরাঘুরির অভিজ্ঞতা আবুর একটু বেশি। সে কথাটা লুফে নিয়ে বলল, ‘তা চিনবে না কেন! দাদুর মুখে অনেক শুনেছি তাঁর গল্প। পচাব্দীর বাবাও ছিলেন বড় শিকারি। আমাদের দাদুও কম যান না। উনি প্রতি বছর ফরেস্ট অফিস থেকে টিকেট কেটে দলবল নিয়ে যেতেন হরিণ শিকারে। একবার মস্ত দুটো হরিণ মেরে লঞ্চের ছাদে করে নিয়ে এসেছিলেন নদীর ঘাটে। একেবারে হই হই ব্যাপার। গ্রামের লোকজন হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল হরিণ দেখতে। এমন দৃশ্য এখন কল্পনাও করা যাবে না। তবে দাদু বাঘ শিকার করেননি কখনো। ইচ্ছে করলে নিশ্চয় পারতেন। সবাই তো আর পচাব্দী নয়।’
দাদুর গর্বে আবুর বুকের পাটা অজান্তে ফুলে উঠল।
বইপোকা পলাশের মাথায় বইটই পড়ে বহু পোকা ঢুকেছে শিকার নিয়ে। সে জিম করবেটের লেখার মস্ত ভক্ত। শিকারটা তার স্বপ্নে ঢুকে গেছে।
কুমায়ূনের মানুষখেকো আর রুদ্রপ্রয়াগের মানুষখেকো চিতাবাঘ যতবার পড়েছে প্রতিবার শিহরিত হয়েছে অজানা ভয় আর বিপুল উত্তেজনায়।
পচাব্দীর বাঘ-শিকারের গল্পে সেই উত্তেজনার তাপে একটু যেন শিহরিত হলো পুনরায়-রুদ্রপ্রয়াগের চিতাটাও কম হিং¯্র আর চতুর ছিল না। পচাব্দীর মানুষখেকো ওর কাছে নস্যি।’
কারো কানে কথাটা গেল বলে মনে হলো না। বেশ একটু বাতাস উঠেছে হঠাৎ। নৌকাটা মৃদু দুলে দুলে এগিয়ে চলছে জেটির দিকে। আগে স্টিমার ঘাটটা ছিল ভারি সরগরম। ঢাকা থেকে গাজী, মাসুদ, অস্ট্রিস, লেপচা নামের কমলা রঙের প্যাডেল-স্টিমারগুলো নিয়মিত চলাচল করত এই পথে। ব্রিটিশ আমলের এইসব স্টিমারের আলাদা একটা আভিজাত্য ছিল। খাবারের মান ছিল ভালো। ওদের ইলিশ রান্নার তারিফ করত সবাই।
মুকুল ভাই বিদেশ থেকে আসার সময় আবু আব্বার সঙ্গে ঢাকায় গিয়েছিল তাকে রিসিভ করতে। ফেরার সময় গাজী স্টিমারে চড়ে আনন্দ হয়েছিল খুব। একজন বিদেশি সাহেবের সঙ্গে ছাদে বসে পুটুর পুটুর ইংরেজিতে গল্প করেছিলেন মুকুল ভাই। পাশের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল উড়িয়ে নিয়ে যাবে বুঝি বাতাসে। ঘাটে ভেড়ানো আর ছাড়ার আগে মস্ত হুইশেলে কানে তালা লেগে যেত। নদী আর খাল দিয়ে যাবার সময় গ্রামের ছেলেমেয়েরা হেসে হেসে হাত নাড়ত কেবল। তাকে রেলিংয়ের কাছে দাঁড়ানো দেখে ক্রাচে ভর দিয়ে একটা ছেলে কাশফুল দেখিয়ে হাত নেড়েছিল খুব। ছবিটা আড়ালে চলে যেতেই কী এক গভীর কষ্টে ভরে গিয়েছিল বুকটা।
পথের ছবিটা এখনও লেগে আছে চোখে। চাঁদপুর, বরিশাল, হুলারহাট, মোরেলগঞ্জ হয়ে মোংলা-ঘষিয়াখালি কাটা-খাল দিয়ে স্টিমার এসে ভিড়েছিল মোংলা বন্দরে। ওখান থেকে পশুর-রূপসা ধরে সোজা ভৈরব নদের খুলনার জাহাজঘাটায় এসে শেষ হয়েছিল রাতদিনের দীর্ঘ যাত্রা।
আবু বড় হাই তুলে চিন্তাটা গুটিয়ে আনল। নদী পাড়ের আলো বাহারি রং ধরে সাঁতার কাটছে পানিতে। সামান্য ঘোলাটে আকাশ। দু-একটা তারা মিটমিট করছে এলোপাতাড়ি। দুপুরে বৃষ্টি এসেছিল ঝাঁপিয়ে। বাতাসে সেই জলজ গন্ধটা একটু একটু ফিরে এসেছে আবার। হয়তো সব তারা নিভে বৃষ্টিটা ফিরে আসবে যেকোনো মুহূর্তে। আসুক, কদিনের ভ্যাপসা গরমে প্রাণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
কিসলু হঠাৎ হাত নাচিয়ে বলল, ‘শেষ পর্যন্ত আমাদের কয়রা যাবার কী হলো? তোমরা কেউ কিছু বলছ না! কিরে বাহার, তুই কী আমাদের সঙ্গে যাবি, নাকি বাঘের ভয়ে লেজ গুটিয়ে বসে থাকবি ঘরে?’
ওর কথা শুনে সবাই চাপা হাসাহাসি করল খানিকটা। বাহারও মৃদু হেসে সরাসরি এড়িয়ে গেল উত্তরটা।
পলাশের একটু ঠাণ্ডা লেগেছে বোধ হয়। রুমাল দিয়ে ফরসা নাকের ডগাটা বারবার ঘষে বলল, ‘কয়রা উপজেলা আদালত ভবনের পুকুরে নাকি প্রচুর লাল শাপলা ফুটেছে? আমি কিন্তু ওখানে ফুলের একটা ভিডিও করব আগেই বলে দিলাম।’
বাহার ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল, ‘শুধু ভিডিও কেন, একটা শাপলা ফুলের মালা গেঁথে সঙ্গে নিয়ো বাঘ মামার জন্য। ভাগ্নেরা খালি হাতে গেলে মামার মান থাকবে!’
এবার মৃদু কেশে মুখ খুলল কিসলু, ‘আরে শাপলা তো সবখানেই পাবে। কিন্তু কেওড়া ফল পাবে কোথায়? এখন হলো কেওড়ার মৌসুম। ওটা বাঁশখালি, মহেশ্বরীপুর, পাথরখালি গেলেই দেখতে পাবে। নদীর ওপারে সুন্দরবন। এপারে ছবির মতো গজিয়ে উঠেছে কেওড়া গাছের সারি। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। এই কেওড়া হলো হরিণ আর বানরের প্রিয় ফল। মানুষও দেদার খায়। তবে খেতে একটু টক এই যা। তেঁতুল, লবণ আর হলুদ মেখে কাঁচা খাওয়ার চল আছে। টক রেধেও খাওয়া যায়। তরকারিতেও দেয় কেউ কেউ। তা তোমরা কে কে খেয়েছ শুনি?’
কথার পিঠে কথা। হাসাহাসির ভেতর এতক্ষণে মেতে উঠল আড্ডা।
পলাশ অবজ্ঞার গলায় বলল, ‘ওসব হাবিজাবি মানুষ খাবে কেন! বুঝেছি, হরিণ কেওড়া ফল খায় বলেই ওর মাংস টক।’
‘হরিণের মাংস টক কী করে বুঝলে তুমি! টেস্ট করেছ নাকি?’
‘তা করিনি। লোকের মুখে শুনেছি।’
‘ঠিকই শুনেছ। তবে টক-ঝাল এখন আর কিছুই মানছে না মানুষ। মাংসের লোভে হরিণ মেরে সাফ করে দিচ্ছে। এই তো সেদিন আন্ধারমানিক ফরেস্টে চোরের কাছ থেকে দেড়শ কেজি হরিণের মাংস উদ্ধার করেছে কোস্ট গার্ড। প্রতিদিন এ রকম কত চুরি হচ্ছে কিন্তু ধরা পড়ছে কটা?’
বাহার অবাক হয়ে বলল, ‘বনে এত বাঘ-ভালুক, তারপরও হরিণ শিকার বন্ধ হয়নি এটা কেমন কথা!’
কিসলু এ কথার উত্তর না দিয়ে বিড় বিড় করল খানিক। তারপর কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে উদাস গলায় বলল, ‘এটাই হলো আসল ট্র্যাজেডি। যাকে বলে জলে কুমির। ডাঙায় বাঘ। মানুষের হাতে যেমন নিস্তার নেই। বাঘও তেমনি সুযোগ পেলেই ছিঁড়ে খায় ওদের। এ রকম হলে কোথায় যাবে ওরা?’
ইনু বিড়বিড়িয়ে উঠল এতক্ষণে, ‘সব দোষ শুধু বাঘের, মানুষ বুঝি খুব সাধু! এই যে সুন্দরবনে খালের পানিতে বিষ মিশিয়ে চিংড়ি মাছ মেরে শুঁটকি করছে তার কী হবে? গভীর বনে গোলপাতার বাসা বানিয়ে আগুনের ধোঁয়ায় সেই বিষ-মাছ শুটকি করছে দেদারসে। সেটা তৈরি হলে প্যাকেটে করে চড়া দামে গোপনে পাঠিয়ে দিচ্ছে দেশের আনাচে-কানাচে। অথচ বন বিভাগের লোকজন দেখেও না দেখার ভান করছে। কী আশ্চর্য ব্যাপার বলতে পারো?’
বাঘের কথায় একটু বুঝি আনমনা হয়ে পড়ছিল আবু।
মামার সঙ্গে সুন্দরবন যাবার সময়ও এই বাঘ নিয়ে কাই হয়েছিল উত্তেজনায়।
সে কথার রেশ ধরে বলল, ‘অনেক হয়েছে। এবার দয়া করে একটু থামো। বাঘ নিয়ে যখন এত দুশ্চিন্তা, তোমরা বরং সুন্দরবনের করমজল চলো। ওটাও কয়রার কাছে চাঁদপাই রেঞ্জে। মোংলা থেকে মাত্র আট মাইল দূরে। আর খুলনা থেকে ষাট মাইল। দিনে দিনে ঘুরে আসা যাবে। হরিণ, বানর, কুমির, কচ্ছপ, ডলফিন, পাখি-পুরোটাই দেখা যাবে ঘুরে ঘুরে। কী বলো তোমরা, রাজি?’
কিসলু বলল, ‘আমার আপত্তি নেই। মনে হয় এটা সব দিক থেকে ভালো হবে। বাসা থেকেও আপত্তি করবে না।’
পলাশ, বাহার, ইনুও সায় দিলো মাথা নেড়ে-‘ওকে, আমরাও রাজি। কাল সকাল সাতটার ভেতর ডিলাক্স হোটেলে চলে এসো। ওখান থেকে নাশতা করে সবাই রওনা দেবো। চলো, ঘাট এসে গেছে। নেমে পড়ি। পথে যেতে যেতে বাকি কথা সেরে নেব। আকাশের অবস্থা ভালো না।’
পরদিন সকালে সবাই বাসে চড়ে বসল মোংলা পোর্টের পথে।
এমন আহামরি দূর নয়। রূপসা ব্রিজ পেরিয়ে চমৎকার রাস্তা। এখানে জমাটি সাইকেল রেস হয় মাঝেমধ্যে। বটতলার মোড়ে গিয়ে রাস্তাটা ডানে বেঁকে গেছে কাটাখালির দিকে।
তিনমাথার মোড়ে বড় বাসস্ট্যান্ড। নানাদিকের বাস এসে এখানে দাঁড়ায় কয়েক মুহূর্ত। মোড় থেকে পুবের সোজা রাস্তাটা চলে গেছে বাগেরহাট। অপরটি ডানের পথে মোংলা।
রাস্তাটি মন্দ নয়। বন্দরের পথ বলেই গাড়ির আনাগোনা বেশি। কিছুদূর গিয়েই চন্দ্রমহল। ফুলফলারি, গাছপালা, বাগান, পুকুর, জাদুঘর মিলে চমৎকার একটা রিসোর্ট। মিলু খালাদের সঙ্গে গাড়ি নিয়ে একবার এসেছিল ঈদের ছুটিতে। রিন্টু, পিন্টু আর পালকি আপুরা মিলে দারুণ একটা দিন পিকনিক মেজাজে কেটেছিল আবুর। পথেই চোখে পড়ে বিমানবন্দরের জন্য অযতেœ পড়ে থাকা পানি টইটম্বুর বিল। বিমান না উড়লেও শোল, টাকির বেশুমার লাফালাফিতে মুখর হয়ে আছে জলমগ্ন বিমানবন্দরের কল্পিত রানওয়ে।
কপাল মন্দ হলে যা হয়। আজকের গাড়িটা ভারি রদ্দি। হেঁচেকেশে পৌঁছতে পৌঁছতে বেলা চড়ে সেই দশটা।
ঘাটে ভিড়ে আছে নানা রংবেরঙের ইঞ্জিন নৌকা। এগুলোকে ট্রলারও বলে কেউ কেউ। সব যাবে করমজল। খেয়া নৌকা আর ফেরি যাত্রী নিয়ে পার হয় এপার-ওপার। ওপারেই মোংলা। একটা বন্দর নগরীর যে-জৌলুশ থাকে সেটা অতটা নেই এখানে। এটা ¯্রফে একটা উপজেলা টাউন। কিছু সরকারি অফিস আদালত আছে। দোকানপাটের কমতি নেই। সেগুলো চোরাপথে আসা রকমারি মালজিনিসে ঠাসা। খাবার দোকানের জৌলুশ বেড়েছে অনেকটা। কিছু কারখানা এলোপাতাড়ি গজিয়ে উঠেছে নদী তীর ঘেঁষে। হোটেল, রেস্টহাউসের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। ঘরবাড়িগুলো বেশির ভাগই নতুন গড়ে ওঠা। দু-একটা স্কুল আছে। আছে কলেজও। তবে এখানে নেই কোনো বড় মাপের অবকাঠামো। যা কিছু চেকনাই সব বন্দোবস্তই নদীর ওপারে।
মোংলা বন্দরকে ঘিরে তৈরি হয়েছে জেটি, ক্রেন, ওয়্যার হাউস, অফিস, ইপিজেড, বিশেষ শিল্পাঞ্চল, পাওয়ার প্লান্ট, নৌবাহিনীর দপ্তরসহ বড় বড় কোম্পানির মিলকারখানা, ডিপো, রিফাইনারি ইত্যাদি মিলিয়ে আলাদা এক জগৎ! একটু দূরেই বহু আলোচিত রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। পর্যটন করপোরেশনের একটি মোটেল আজও এখানে টিকে আছে পুরোনো আভিজাত্যের মুকুট পরে।
ঘাটের নৌকার লোকজন তাদের দেখেই হাঁকডাক শুরু করে দিলো।
এলাকাটা কমবেশি আবুর চেনা। সে এগিয়ে গিয়ে কথা বলল কয়েকজন লোকের সঙ্গে।
একে একে পরখ করে দেখল তাদের নৌকা। একটার ধরনধারণ দেখে পছন্দ হলো সবার। শেষে দামদর করে উঠে পড়ল সিন্দাবাদ নামের একটি বাহারি ইঞ্জিন-নৌকায়।
সিন্দাবাদ নৌকার মানুষটি মন্দ নয়। নামটিও অদ্ভুত। রতন পাইলট। হ্যাঁ, পাইলটই বটে। বেজায় চটপটে, আমুদে আর হাসিখুশি। কথাবার্তায় তুখোড়। আবুদের চেয়ে বছর কয়েকের বড়। লেখাপড়া জানা। বিএ পাশ করে চাকরিতে না ঢুকে পর্যটন ব্যবসায় হাত পাকাচ্ছেন। কাছেই বানিশান্তা গ্রামে বাড়ি। বলতে গেলে সুন্দরবনের পেটেই বাস করছেন দুই পুরুষ ধরে। করমজলের সব হাঁড়ির খবর তার মুখস্থ। আবুরা চাইলে ওখানের সবটা ঘুরিয়ে দেখাতে পারবেন। কোনো এক্সট্রা সার্ভিস চার্জ দিতে হবে না গাইড ফি বাবদ। স্টুডেন্টের জন্য এটা বিশেষ ছাড়। তবে ফরেনার হলে অন্য কথা। মাথাপিছু দশ ডলার গুনতে হবে নগদ নগদ।
ইনু তার হাইওয়ান গিটারটা সঙ্গে নিয়ে এসেছে গলায় ঝুলিয়ে।
মোহনায় পশুর নদীর অফুরন্ত হাওয়া আর মৃদ্যু ঢেউয়ের দুলুনি পেয়ে সে একটু গুনগুনিয়ে উঠছে দেখে পলাশ নেচে উঠে বলল, ‘দারুণ, দারুণ, একটু জোর গলায় গাও দোস্ত, আমরা তাল মেলাই।’
তাল ভালোই মিলল। ইনুর সঙ্গে গলা মিলিয়ে গান ধরল সবাই। ‘আমরা নূতন যৌবনেরই দূত...আমরা চঞ্চল... আমরা অদ্ভুত... আ..ম..রা....’
গানের সঙ্গে সুর মেলাতে মেলাতে আবু যেন অকারণই একটু চঞ্চল হয়ে উঠল।
জোয়ার পেয়ে সিন্দাবাদ চলছে তিরবেগে। তার পাশাপাশি এগিয়ে আসছে আরও কিছু ট্রলার। ছুটির দিন বলেই সবাই চুটিয়ে বেড়াতে চলেছে করমজল। এখানে যেতে বন বিভাগের অনুমতি লাগে না। অথচ সুন্দরবন দেখার পুুরো সাধ মিটবে করমজলে। বড় কথা বাঘের ভয় নেই। হরিণ, বানর, কুমির, কচ্ছপ, পাখি দেখা যাবে মহানন্দে। বাহার সেই গল্পটাই জুড়ে দিয়েছে পাইলটের সঙ্গে।
কিছুদূর যাওয়ার পর সুন্দরবনের চেহারাটা ফুটে উঠল ধীরে ধীরে। ছবির মতো চোখকাড়া দৃশ্য। আবুর মনে পড়ে গেল মামার সঙ্গে সুন্দরবনে বেড়াতে গিয়ে জোছনা রাতে হিরণ পয়েন্টে ঘটে যাওয়া সেই ভয়ংকর দৃশ্য।
শীতের রাত। সবাই মিলে ঠিক হলো, রাতে নদীর চরে হরিণের পানি খাওয়া দেখবেন লঞ্চ থেকে। সার্চ লাইট মেরে সেভাবে ধীরে ধীরে নিঃশব্দে এগিয়ে চলছে ডেকান কুইন নামের দোতলা লঞ্চখানা।
বড়রা ঠাণ্ডায় ছাদে এসে বসেছেন গুটিশুটি মেরে। মামা ক্যামেরা নিয়ে একটু সরে দাঁড়িয়েছেন রেলিং ঘেঁষে। দুরবিনে চোখ রেখে খুব নজর করে তাকিয়ে আছেন চরের দিকে। একটা হরিণ পালের ছবি যে করে হোক তুলতে হবে তাকে। এখনই শট নেবার মোক্ষম সময়।
ততক্ষণে বাতাস দিয়েছে হিম হিম। কুয়াশার ফোঁটা কাটছে টুপটাপ-টুপটাপ। লঞ্চের ছাদ ঘন কুয়াশায় পিছল হয়ে গেছে। আলোছায়ার ভেতর ঘোরাঘুরির ফাঁকে হঠাৎ কী করে যেন আবু সড়াত খেয়ে টুপুস করে ছিটকে পড়ল নদীর শীতল পানিতে। জোয়ারের স্রােতের তোড়ে মনে হলো ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে বুঝি। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। হাবুডুবু খেতে খেতে হিমে জমে অসাড় হয়ে গেল তালপাতা-শরীরের হাড়গোড়।
লঞ্চটা চলছিল পাড় ছুঁয়ে ছুঁয়ে। তার ওপর সার্চ লাইটের ঝলকানি। সারেংয়ের নজরে এলো ব্যাপারটা। মামাও টের পেয়ে চিৎকার শুরু করেছেন। একজন খালাসি মোটা দড়ি নিয়ে দ্রুত লাফিয়ে পড়ল পানিতে। সে এক হুলুস্থুল কাণ্ড। দলার মতো কুঁচকানো শরীরখানা টেনে ধরে লোকটা দড়ি বেয়ে উঠে এলো লঞ্চে। ভাগ্যিস, হাঙর, কুমিরের নজরে আসেনি। তবে সর্দিকাশির একটা ঝড়ো তাণ্ডব বেশ ঝাঁকিয়ে চেপে ধরেছিল সেবার। ওদিকে এই মজারু কাহিনিটা মামা নানা রংচঙের প্রলেপ দিয়ে হাজির করতেন যখন যেমন খুশি।
করমজলে এসে ভিড়ল সিন্দাবাদ।
সুন্দরবনের সেলা নদী আর গুটাবাড়িয়া খালের মোহনায় গড়ে ওঠা সেই বিখ্যাত করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্র।
ঘাটের ভিড়ে দাঁড়িয়ে আছে অনেক রংবেরঙের নৌকা। ট্রলার। স্পিড বোট। দুখানা পর্যটন-লঞ্চ দাঁড়িয়ে আছে মাঝ নদীতে। নদীটা শান্ত। চমৎকার আবহাওয়া। ঝকঝকে আকাশে মুখ টিপে দাঁড়িয়ে আছে একখামছা রহস্যময় মেঘ। নরম রোদ আর বুনো বাতাসের গন্ধে ভরে আছে জায়গাটা।
পাইলট আবুদের অনারারি গাইড। আসা-যাওয়ার চুক্তিতে এলেও সে যেচে সবার সঙ্গে সময় কাটাতে রাজি। পলাশেরও খুব মনে ধরেছে লোকটাকে। অল্প সময়ের মধ্যে কেমন বন্ধু হয়ে গেছে। এলাকাটা যেহেতু তার চেনা, একটু না হয় ঘুরে দেখাক তাদের।
টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকল সবাই। জনপ্রতি ২০ টাকা। এটা ছাত্রদের জন্য বিশেষ ছাড়। রতন নিজের পকেট থেকে টাকাটা দিলো।
না-না করে এগিয়ে গেল কিসলু। সে দলের ক্যাশিয়ার।
‘না ভাই, এটা করবেন না প্লিজ। আপনি এক অর্থে আমাদের গেস্ট। এটা তো আমাদের দায়িত্ব।’
অন্যরাও সায় দিলো মাথা নেড়ে।
রতন হাসল, ‘ঠিক আছে, এ আর এমন কী! চলেন, আপনাদের বরং শুরুতে জায়গাটা নিয়ে একটু কথা বলি।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাই বলেন।’ বইপোকা পলাশের তর সইছে না।
ছুটির কারণে ভিড়টা আজ একটু বেশি। দলে দলে লোক ঢুকছে ভেতরে। রোদও চড়ে উঠেছে কিছুটা। বাতাস মরে গেছে। সামান্য গুমোট। এনিয়ে ভাবান্তর নেই কারো। সামনে হরিণের মেলা দেখে উত্তেজনায় ছটফটিয়ে উঠল সবাই।
রতন মৃদু হেসে বলল, ‘আমরা হরিণ, বানর, কুমির সব দেখব। অস্থির হওয়ার কিছু নেই। চলেন, ওই ছায়ায় দাঁড়িয়ে একটু গল্প করি।
‘করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রটি আগে ছিল স্রেফ একটি টহল ফাঁড়ি। এটা ১৯৮৮ সালের কথা। বনের চুরিডাকাতি ঠেকানো ছিল এই ফাঁড়ির আসল কাজ।
‘মজার ব্যাপার হলো, বনের কাছে থাকত রোকেয়া বেগম নামের এক বুড়ি। পশুপাখির জন্য ভারি দরদ ছিল তার। সে অসুস্থ কুমির আর বানর ছানা চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসত ফাঁড়িতে। ১৯৮৭ সালে বুড়ি একটা আধমরা কুমির নিয়ে এলে সেটা পুকুরে রেখে পরিচর্যা করে সেরে তুলেছিলেন বনকর্মীরা। এরপরও আরও অনেক কুমির উদ্ধার করে সে পৌঁছে দেয় ফাঁড়ির লোকজনের কাছে। সেই থেকে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে কুমির-বুড়ি হিসেবে।
ইনু সচরাচর কম কথার ছেলে। গানবাজনায় ডুবে থাকে বলেই তার ধরনটা হয়তো একটু অন্যরকম। সে হঠাৎ কৌতূহলে ফেটে পড়ে বলল, ‘আমি কুমির-বুড়ি দেখব। আর কিছু দেখা লাগবে না আমার।’
সবাই হো হো করে হেসে উঠলেও রতন গলা নিচু করে বলল, ‘অবশ্যই দেখব। তার আগে করমজলের গল্পটা একটু শেষ করে নিই।’
বাহার এতক্ষণে কথার খেই পেয়ে স্বভাবত একটু উত্তেজিত, ‘সে কী, কুমির-বুড়ি কী একটাও বাঘছানা কুড়িয়ে পায়নি!’
কিসলু ফুড়ন কেটে বলল, ‘তা পাবে না কেন? তোর জন্য পুষে মানুষখেকো বানিয়ে রেখেছে বুড়ি। যা দেখা করে আয়।’
হাসিটা জমতে না দিয়ে রতন ফিরে গেল পুরোনো গল্পে, ‘সে যাহোক, কুমির-বুড়ির কারণে হয়তো ১৯৮৫-তেই টহল ফাঁড়িটা বদলে যায় বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রে। মোট ৩০ হেক্টর জমির ওপর গড়ে উঠেছে পুরো এলাকা। কুমির নিয়ে তাদের ভাবনাটা আগেই ছিল। ২০০৫ সালে শুরু হয় হারিয়ে যাওয়া নোনা পানির কুমির প্রজননের মাধ্যমে সংরক্ষণের ব্যবস্থা। কুমির-বুড়ির যে-অসুস্থ কুমিরটা এতদিন বড় হচ্ছিল পুকুরে, ওটা ততদিনে বেশ তাগড়া হয়ে উঠেছে। বন বিভাগ থেকে ১৯৯৭ সালে ওর নাম দেওয়া হয় জুলিয়েট। পরে সাথী হিসেবে ওর জন্য যে-পুরুষ কুমিরটি জোগাড় হয়েছিল তার নাম রাখা হয় রোমিও। পরে পিলপিল নামের আর একটি কুমির জোগাড় হয়েছিল জেলেদের কাছ থেকে। এরাই ডিমটিম পেড়ে ভরিয়ে দেয় কুমির প্রজনন কেন্দ্রের চৌবাচ্চাগুলো। তবে আইলায় পানির তোড়ে বেরিয়ে যায় বহু কুমির। এখন অবশিষ্ট আছে মাত্র ২৬৭টি। দেশের সাফারি পার্ক আর চিড়িয়াখানাগুলোতে নিয়মিত কুমির পাঠানো হয় এখান থেকে। কুমিরের পাশাপাশি বাটাগুর কচ্ছপের জন্য রয়েছে আলাদা প্রজননের ব্যবস্থা। ডলফিনের অভয়াশ্রম করা হয়েছে ঢাংমারিতে। সুযোগ পেলে সবটাই ঘুরে দেখব আমরা।’
হরিণের খামারের কাছে এসে চোখ জুড়িয়ে গেল। একেবারে কাছ থেকে দেখার সুযোগ। হরিণগুলো ভারি বোকা বোকা।
ঘেরাটোপের ভেতর অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে অসংখ্য চিত্রল হরিণ। ভারি আদুরে আদুরে চেহারা। একদম ভয়ডর নেই। হাতে বাদাম নিয়ে কাছে ডাকলেই মুখ বাড়িয়ে খুটে খায় টুক টুক করে।
পলাশ ঘুরে ঘুরে কয়েকটি হরিণকে বাদাম খেতে দিলো। একটা হরিণের সঙ্গে তার ভাব হলো একটু। বারবার বাদাম নিতে এসে তার দিকে তাকাচ্ছিল ছল ছল চোখে। মনে হয় কিছু একটা বলার জন্য আঁকুপাঁকু করছে। পলাশ একটু আলোড়িত হলো মনে মনে। সম্মোহিতের মতো সে ফিসফিস করল আবুর কানে, ‘আমি যদি ওকে নিতে চাই দেবে?’
আবু অবাক হয়ে মৃদু হাসল, ‘কী করে নেবে?’
‘কেন, কিনে নেব।’ সোজাসাপ্টা জবাব পলাশের।
‘এটা কী ঝালমুড়ি পেয়েছ নাকি! মনে চাইল অমনি কিনে নিলাম একঠোঙা।’
সেই একটুকু বয়স থেকে বাড়ির বারান্দায় একটা হরিণের শিং ঝুলতে দেখেছে আবু। বাবার বসার বড় চেয়ারটা মোড়া ছিল আলগা হরিণের চামড়ায়। এটা দেখে কেমন অস্বস্তি হলেও মুখ ফুটে কিছু বলার সাহস হয়নি। বাবা রাগী মানুষ। এটা তাঁর যৌবনের দাপট। কিন্তু পলাশের ইচ্ছেটা কী!
কুমিরগুলো একেবারে অলস। ছানাপোনা নিয়ে রোদ পোহায় নির্বিকার। কোনো হেলদোল নেই। এখানে বাচ্চা ফোটানোর শেড আছে অনেকগুলো। যত্নআত্তির ভেতর বড় হচ্ছে তারা।
বানরের জন্য আলাদা ব্যবস্থা। বেজায় দুষ্টু বানরগুলো। একটুও সুস্থির নেই। যে যা ছুঁড়ে দিচ্ছে খেয়ে নিচ্ছে চটপট। ছোটাছুটি, লম্ফঝম্প, ঝগড়া সমানে চলছে দাঁত খিঁচিয়ে।
কচ্ছপগুলো পড়ে আছে নির্বিকার। বেঁচে আছে নাকি মরে আছে ঠাহর হয় না!
ওখান থেকে ফিরে ওরা গেল প্রদর্শনী কেন্দ্র দেখতে। এখানে রয়েছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ওপর নানারকম তথ্যচিত্র আর প্রদর্শনী। বাঘের কঙ্কালটি ভয়ংকর। কংক্রিটের বিশাল মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া যাবে সুন্দরবনের তাবৎ খোঁজখবরের আদ্যোপান্ত। ডলফিন মিউজিয়াম, ওয়াচ টাওয়ারের আকর্ষণও কম নয়। এই ম্যানগ্রোভ ফরেস্টে রয়েছে বিরল চিত্রল হরিণ, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, রেসাস বানর, বন্য শূকরসহ ২৮৯ প্রজাতির জীবজন্তু, ২১৯ রকম জলজ প্রাণী, কুমিরের পরিমাণ কম করে হলেও ২০০, পাখি রয়েছে ৩২০ রকমের, ১২০ প্রজাতির মাছ আর সাপকোপ, ২৪ ধরনের চিংড়ি, ১৪ প্রজাতির কাঁকড়া, উভচর প্রাণী রয়েছে ৮ রকমের। রয়েছে বিভিন্ন জাতের অসংখ্য পোকামাকড়। বাইড়া পোকার কামড়ে বনে হাঁটাচলাই মুশকিল।
অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি হলো সুন্দরবন ভ্রমণের আদর্শ সময়।
এইটুকু ঘোরাঘুরির পর সবাই অস্থির হয়ে পড়ল বনে ঢোকার জন্য।
রতন হেসে বলল, ‘করমজল তো সুন্দরবনের ভেতরেই। তবে আসল বন দেখতে গাছপালার ভেতর কাঠের ব্রিজ ওয়াকওয়ে দিয়ে আমরা হেঁটে যাব ১ দশমিক ৪২ কিলোমিটার পথ। যেটাকে এখানে বলে মাংকি ট্রেইল।’
‘তাই চলেন। ওয়াকওয়ে থেকে মাংকি দেখতে পাব তো?’ পলাশ তড়বড়িয়ে কথাটা বলে বিষম খেল একটু।
কিসলু হেসে বলল, ‘দেখে আর কী করবি? একটা ধরে নিয়ে যাস তোর ব্যাকপ্যাকের ভেতর। কেউ টের পাবে না।’
‘রয়েল বেঙ্গল যদি লাফিয়ে ওয়াকওয়েতে উঠে পড়ে তখন কী হবে? ওরা তো গাছ বাইতে পারে।’ বাহারের চোখমুখ উদ্বেগে রক্তশূন্য হয়ে গেল।
কিসলু গম্ভীর গলায় বলল, ‘মামা যদি ভাগ্নেকে আদর করে নিয়ে যায়, তা নিয়ে দুশ্চিন্তার কী আছে! চল ব্যাটা, আগে তো জায়গা মতো যাই। তখন দেখা যাবে।’
ওরা পুকুর পাড়ে এসে থমকে দাঁড়াল। কুমির রোমিও আর জুলিয়েট গা মেলে শুয়ে আরাম করছে রোদে।
ইনু যেন হঠাৎ আগুনের স্যাঁকা খেয়েছে
এমন তড়াক করে লাফিয়ে উঠল, ‘বিশাল কু..কু..কু...!’
‘কুমির...। এখন গিটার নিয়ে গানটা ধরো...আমরা বীর, আমরা কুমির, আ..ম..রা...।’ আবু হেসে উঠল দাঁত কেলিয়ে।
ওয়াকওয়েতে উঠে উত্তেজনায় কাই হয়ে গেল সবাই। দীর্ঘ ঝুলন্ত কাঠের ব্রিজ। নিঝুম বনের ভেতর ঝুলন্ত কাঠের সরু রাস্তা ধরে যাওয়ার সময় সেই বাঘের ভয়টা তুমুলভাবে পেয়ে বসল আবার। একটা বনমোরগ হঠাৎ কু কু করে ছড়বড়িয়ে দৌড়ে পালাল পাশের ডালে। গাছে বানরের লাফালাফি দেখে ভয় তাড়িয়ে ওরাও লাফিয়ে উঠল। আসলে বানরগুলো চায় ওদের দিকে কলা-চিপস-বাদাম কেউ কিছু ছুঁড়ে দিক। রতন হাত উঁচিয়ে সবাইকে বারণ করে দিলো এটা না করতে। ওরা যেমন আছে তেমনি থাক। বিরক্ত করার প্রয়োজন নেই।
আবু মাঝে মাঝেই পিছিয়ে পড়ছিল দল থেকে। তার খুব ইচ্ছে হলো মাটিতে নেমে বনের গাছগুলো একটু ছুঁয়ে পরখ করে দেখে। সুন্দরী গাছের কথা কত শুনেছে। গাছের ভেতরটা লালচে। তাদের বাড়িতেও আছে একটা। বলতে গেলে গোটা বনেই ছড়িয়ে আছে অজ¯্র সুন্দরী গাছ। এর গোড়ায় পেরেকের মতো অসংখ্য শিকড়ের মূল। কেওড়া, গরান, গেওয়া, পশুর, বাইন, ধুন্দল, গোলপাতা ছাড়াও নানা পদের গাছ ছড়িয়ে আছে পুরো বনে।
কেওড়া ফল হরিণ আর বানরের ভারি প্রিয় খাবার। বানর-হরিণের অদ্ভুত দোস্তি আছে এই খানাখাদ্য নিয়ে। বানর কেওড়াফল নিচে ফেলে আওয়াজ করে সংকেত পাঠায় হরিণকে। অনেক সময় শিকারি আর বাঘ এই সুযোগ কাজে লাগায়। ফাঁদ পেতেও ধরা হয় প্রচুর হরিণ।
বনে কাঁটাঝোপ, লতাপাতাও কম নেই। এ কারণে সোজা পথ ধরে বনে হাঁটাহাঁটি সহজ নয়। পোকাদের উৎপাত তো আছেই। জোয়ারে পানি ওঠে বলেই মাটি স্যাঁতসেঁতে। গাছপালার ঘন বুনোটের কারণে সূর্যের আলো পৌঁছতে পারে না ঠিকমতো। একটানা বাতাসে কেমন একটা গোমড়ানো কান্নার রেশ ছড়িয়ে পড়ে সব সময়।
ওয়াকওয়ে থেকে নেমে ওরা একটা ছাউনির নিচে বসল। কিছু ছেলেমেয়ে ওখানে বসে গালগল্প করছিল এতক্ষণ। ওদের দেখে উঠে মিশে গেল পাশের
দলের সঙ্গে।
কিসলু ব্যস্ত হয়ে ব্যাগ খুলে বলল, ‘এই তোমরা তাড়াতাড়ি স্যান্ডউইচ, ডিম আর আপেলগুলো খেয়ে নাও। আসেন রতন ভাই। অনেক বেলা হয়ে গেছে। ফিরতে হবে আবার।’
খেতে খেতে গুনগুনিয়ে গান ধরল ইনু। অন্যদের চেঁচাতে বারণ করল রতন। বন নীরব থাকতে পছন্দ করে। কোলাহল নয়।
আর দেরি নয়। ওরা ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে গিয়ে ওয়াচ টাওয়ারে উঠল।
যত ওপরে উঠছে সবুজের এক বিশাল অদ্ভুত জগৎ ছড়িয়ে পড়ল চোখের সামনে। গাছগুলো মনে হলো শিল্পীর নিপুণ হাতে আঁকা চমৎকার এক ছবির ক্যানভাস। সামনেই চোখ জুড়ানো নদী। নৌকা, লঞ্চ, কার্গো, জাহাজ দেখা যাচ্ছে সুস্পষ্ট।
আগে পশুর যখন গভীর ছিল বিদেশি বড় জাহাজগুলো সোজা চলে আসত মোংলা পোর্টের কাছে। দশগ্রাম দূর থেকে রাতে দেখা যেত জাহাজের আলোর ঝলকানি। ভোঁয়ের শব্দ শোনা যেত নিখুঁত। তখন একের পর এক জাহাজ সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকত মাঝ নদীতে। রাতের মোংলা ঝলমলিয়ে উঠত আলোর মালায়। নানা দেশের নাবিক ঘুরে বেড়াত যত্রতত্র। রাজ্যের শ্রমিক আর নাবিকে গমগম করত ছোট্ট শহর। এখন সেই জৌলুস হয়তো অতটা নেই। তবে এখন জাহাজের আনাগোনা সামান্য বেড়েছে বৈকি। কিন্তু মানুষের আকর্ষণ আর জাহাজ দেখায় নেই। সেটা দখল করেছে সুন্দরবন।
দুটো চিল পাক খেয়ে খেয়ে উড়ছিল শূন্যে। আশপাশ থেকে ভেসে আসছিল পাখিদের কলকাকলি। বাঘের সাড়া পেলে পাখি আর বানর ডাকাডাকি করে খুব। ইনু দুরবিন তাক করে কিছু খুঁজছে দেখে রতন মুচকি হেসে বলল, ‘বাঘের চেয়ে বড় বাঘ এখন ফিরে এসেছে সুন্দরবনে। এটা না ঠেকানো গেলে সেই আগের মতো ভয়ের ত্রাস শুরু হয়ে যাবে।’
‘সেটা আবার কী রকম!’ পলাশের গলা গম্ভীর শোনাল।
‘বর্তমানে সুন্দরবনে অস্বাভাবিক ডাকাতি বেড়ে গেছে। কোনো বাছবিচার নেই। যে যেখানে সুযোগ পাচ্ছে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। রক্তারক্তিও হচ্ছে প্রচুর। আগামীতে হয়তো সুন্দরবন ছেড়ে চলে যেতে হবে আমাদের।’ রতন হাহাকারের গলায় কথাটা বলল।
কিসলু অবাক হলো রতনের কথায়, ‘কেন, পুলিশ নেই! তারা কী করছেন?’
‘তা থাকবে না কেন! কোস্ট গার্ড নিয়মিত ঠহল দিচ্ছেন। কিন্তু এত বড় বন-ফাঁকফোকর তো থাকবেই। যে কারণে চুরিচামারি, ডাকাতি, ছিনতাই, লুটপাট নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে গেছে। কাঠ, মধু, গোলপাতা, বাঘ, হরিণ, মাছ, কাঁকড়া, পাখি কিছুই আর নিরাপদ নয়। দিনদিন নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে আমাদের প্রাণের সুন্দরবন।’ কথাটা বলে মুহূর্ত থামল রতন। একটু বক্তৃতা ধাঁচের কথাবার্তায় লজ্জিত হলো সামান্য। ‘স্যরি, আমরা এখন ফিরে যাব। ৫টায় বন্ধ হয়ে যাবে রিসোর্ট। বেলাবেলি না ফিরতে পারলে দেরি হয়ে যাবে। আচ্ছা, আমরা চলি তাহলে কেমন!’
বইপোকা পলাশের সবকিছুতে নাটক। সে এতক্ষণ ছবি তুলছিল নানা ভঙ্গিতে। হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে গদগদ গলায় বলল, ‘যাচ্ছি, ঠিক আছে। কিন্তু আবার আসব। আসতেই হবে আমাকে।’
রতন পাইলট মোলায়েম হেসে বলল, ‘অবশ্যই আসবেন। আমিও আসব। আপনাদের নিয়ে সুন্দরবন ঘুরে ঘুরে মানুষ-বাঘগুলোকে খুঁজে বের করব। কী পারব না?’
সবাই তাকাল পরস্পরের মুখের দিকে। সেখানে শেষ বিকেলের সোনা রোদের আলো চিক চিক করছে ভয়ংকর এক দীপ্ত শপথে-আমরা চঞ্চল, আমরা অদ্ভুত, আ..ম..রা নতুন যৌবনেরই দূত...।
সিন্দাবাদ ফিরে যাচ্ছে। কিন্তু চঞ্চল গানের রেশটুকু অদ্ভুত দ্যোতনায় ছড়িয়ে পড়ল সুন্দরবনজুড়ে।
আরও পড়ুন...