পাক-ভারত ক্রিকেট যুদ্ধ

খেলার চমক আবু আবদুল্লাহ অক্টোবর ২০২৫

খেলাধুলার জগতে দুই পক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা লড়াই কখনো কখনো এতটাই জমজমাট হয়ে ওঠে, যা ইতিহাসে জায়গা করে নেয়। বাংলাদেশের ফুটবলে একসময় চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল আবাহনী ও মোহামেডানের। স্প্যানিশ ফুটবলে এফসি বার্সেলোনা বনাম রিয়াল মাদ্রিদের লড়াই ‘এল ক্লাসিকো’ খ্যাতি পেয়েছে। ক্রিকেটে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার অ্যাশেজ নামক টেস্ট সিরিজও এ ধরনের একটি লড়াই। তবে এর সবকিছুকে ছাড়িয়ে শীর্ষে জায়গা করে নিয়েছে পাকিস্তান ও ভারতের ক্রিকেট যুদ্ধ।

এই লড়াই মানে সারা বিশে^র ক্রিকেটপ্রেমীদের নড়েচড়ে বসা, টিভিতে বিজ্ঞাপনের দর কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়া, টিকিট নিয়ে কাড়াকাড়ি, ক্রীড়া বিশ্লেষক আর সাংবাদিকদের ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়া। বিশে^র যে-কোনো প্রান্তে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে ক্রিকেট ম্যাচ থাকলে গ্যালারিতে উপচে পড়া ভিড় হয়। টিভিতে চোখ রাখে কোটি কোটি দর্শক। এই ম্যাচকে বলা হয় ‘গুলিবিহীন যুদ্ধ’। ঐতিহ্যগতভাবে পাকিস্তান বোলিংয়ে শক্তিশালী। দলটিতে ইমরান খান, আবদুল কাদির, ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনুস, শোয়েব আক্তার, মোহাম্মাদ আমির কিংবা শাহিন আফ্রিদির মতো বোলার ছিল যুগে যুগে। অন্যদিকে ভারত বরাবরই ব্যাটিংয়ে শক্তিশালী। সুনীল গাভাস্কার, মোহাম্মাদ আজাহারউদ্দিন, শচীন টেন্ডুলকার, রাহুল দ্রাবির, বিরাট কোহলিরা মাঠে দাপট দেখিয়েছেন। যে কারণে এই লড়াইকে অনেকে পাকিস্তানের বোলিং বনাম ভারতীয় ব্যাটিংয়ের লড়াই হিসেবেও দেখেন।

১৯৪৭ সালে উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হওয়ার পর পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি দেশের জন্ম হয়। ওই সময় দাঙ্গায় প্রায় ১০ লাখ লোকের মৃত্যু হয়, ১ কোটির বেশি লোক উদ্বাস্তু হয়। এসব কারণে দুই দেশের মধ্যে শুরু থেকেই রাজনৈতিক বিরোধ ও প্রতিযোগিতা ছিল। অন্য সব সেক্টরের মতো সেটা ক্রিকেট মাঠেও এসে হাজির হয়।


প্রথম সিরিজেই উত্তাপ

১৯৫২ সালের অক্টোবরে প্রথমবার মুখোমুখি হয় দুই দেশ। সেটি ছিল পাকিস্তান দলের প্রথম টেস্ট ম্যাচ। দিল্লিতে সেই ম্যাচে ইনিংস ও ৭০ রানের ব্যবধানে জয় পায় লালা অমরনাথের ভারত; কিন্তু পরের ম্যাচেই ঘুরে দাঁড়িয়ে জবাব দেয় হানিফ মোহাম্মদ, আবদুল হাফিজ কারদারের পাকিস্তান। লখনৌতে তারা ভারতকে ইনিংস ৪৩ রানে হারায়। নতুন দল হিসেবে পাকিস্তান আন্ডারডগ ছিল; কিন্তু দুই ম্যাচে পালটাপালটি ফলাফলের পর প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমে ওঠে। চাঙা হয়ে ওঠে দুই দেশের সমর্থকরাও। ৫ ম্যাচের সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জেতে ভারত, দুটি ম্যাচ ড্র হয়।

১৯৫৪ সালে পাকিস্তান সফর করে ভারতীয় দল। ৫ ম্যাচের টেস্ট সিরিজে কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলেনি। ৫টি ম্যাচই ড্র হয়। ১৯৬০ সালের ৫ ম্যাচ সিরিজেও ফলাফল একই। এভাবে পাকিস্তান নতুন দল হলেও ভারতের সাথে সমানতালে লড়তে থাকে। যে কারণে লড়াইটা জমে ওঠে। তবে ১৯৬২ সালের পর থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত দুই দেশ পরস্পরের মুখোমুখি হয়নি। ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ ও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কারণে দুই দেশের মধ্যে খেলাধুলা বন্ধ ছিল দীর্ঘদিন।

১৯৭৮ সালে আবার শুরু হয় দ্বিপক্ষীয় সিরিজ। পাকিস্তানে খেলতে যায় ভারতীয় দল। ততদিনে পাকিস্তান দল আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। দলে তখন ইমরান খান, জাভেদ মিয়াঁদাদ, জহির আব্বাসের মতো বিশ^তারকা। তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজ ২-০ তে জিতে নেয় স্বাগতিক পাকিস্তান। ততদিনে ওয়ানডে ক্রিকেটও যাত্রা শুরু করেছে। তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজেও ২-১ ব্যবধানে তারা সফরকারীদের হারায়।


ক্রমশ জমে ওঠা লড়াই

এভাবেই মাঠের লড়াই আরও জমজমাট হয়ে ওঠে। ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে দুই দলের তুলনামূলক ফলাফলে পাকিস্তান অনেকটা এগিয়ে ছিল। কারণ, ইমরান খান-ওয়াসিম আকরামদের যুগে পাকিস্তান দারুণ ক্রিকেট খেলেছে। তবে ভারতও যে ছেড়ে কথা বলত তা নয়। শচীন টেন্ডুলকার, সুনীল গাভাস্কার, সৌরভ গাঙ্গুলিরা ভারতকে অনেক জয় এনে দিয়েছেন। তবে এই শতাব্দীতে এসে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলতে শুরু করে ভারত। ২০০৯ সালে পাকিস্তানে শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটারদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার কারণে দেশটিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বন্ধ ছিল ১০ বছর। যার জেরে পাকিস্তান ক্রিকেট দলও ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে। অন্যদিকে মহেন্দ্র সিং ধোনির নেতৃত্বে ভারত হয়ে ওঠে প্রতাপশালী দল।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৮ সাল পর্যন্ত দুই দলের মুখোমুখি হওয়া ১১৭টি ওয়ানডেতে পাকিস্তান ৬৮টি ও ভারত ৪৫টিতে জয় পায় (৪ ম্যাচ পরিত্যক্ত)। ২০২৫ এশিয়া কাপের আগে ব্যবধান দাঁড়ায় ৭৩-৫৮। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত ভালো ক্রিকেট খেলে ক্রমশই ব্যবধান কমিয়ে আনছে। যে কারণে গত কয়েক বছরে দুই দেশের ক্রিকেটে আগের সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঝাঁঝ পাওয়া যাচ্ছে না। ২০১২ সালের পর থেকে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ বন্ধ রয়েছে রাজনৈতিক গোলমালে। এখন তাই দুই দলকে আইসিসির টুর্নামেন্ট ও এশিয়া কাপ ছাড়া মুখোমুখি হতে দেখা যায় না।

২০০৮ সালের পর দুই দল আর টেস্ট সিরিজ খেলেনি। সে পর্যন্ত ১৫টি সিরিজে উভয় দল চারটি করে সিরিজ জিতেছে। ১৯৯৮ সালে পাকিস্তান, ভারত ও শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে অনুষ্ঠিত এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতেছে পাকিস্তান। সব মিলে ৫৯ টেস্টের মধ্যে পাকিস্তান জিতেছে ১২টি, ভারত জিতেছে ৯টি। আর ২০০৭ সাল থেকে শুরু হওয়া টি-টোয়েন্টিতে ১৩ বারের মোকাবিলায় পাকিস্তান মাত্র ৩টিতে জিতেছে। আরেকটি জায়গায় ভারত এগিয়ে আছে। ওয়ানডে বিশ^কাপে দুই দলের ৮ মোকাবিলায় ভারত প্রতিবারই জিতেছে।


ক্রিকেট বাণিজ্য

রাজনৈতিক শত্রুতার কারণে খেলা কম হলেও বা মাঠে পাকিস্তান আগের মতো ফাইট দিতে না পারলেও এই লড়াই নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ কমেনি। এখনো দুই দল আইসিসি বা এশিয়া কাপের কোনো আসরে মুখোমুখি হলে চরম উত্তেজনা বিরাজ করে মাঠে ও মাঠের বাইরে। দুই দলের সাবেক ও বর্তমান খেলোয়াড়রা মেতে ওঠেন কথার লড়াইয়ে। সোশ্যাল মিডিয়ায় চলে ভক্তদের লড়াই। টিভিতে বিজ্ঞাপনের স্পট বুকিং দিতে কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। ২০২৩ ওয়ানডে বিশ^কাপে দুই দলের ম্যাচের ফাঁকে বিজ্ঞাপনের জন্য প্রতি ১০ সেকেন্ডের দাম বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩৫ হাজার মার্কিন ডলার। অন্য ম্যাচগুলোতে যা থাকে অর্ধেকেরও কম। ওই আসরে পাক-ভারত ম্যাচের টিকিট কালোবাজারে ৩ লাখ ডলার পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে বলে শোনা যায়। এ ছাড়া দুই দলের ম্যাচকে ঘিরে জার্সি বিক্রি, হোটেল ভাড়া, বিমান ভাড়া ইত্যাদিতে কোটি কোটি ডলারের বাণিজ্য হয়। স্বাগতিক দেশের পর্যটন সেক্টরও লাভবান হয় এই ম্যাচকে ঘিরে।

আর্থিক লাভের কারণেই ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি বিশ^কাপে আইসিসি চেষ্টা করে পাকিস্তান ও ভারতকে একই গ্রুপে রাখতে। এশিয়া কাপের ফিকশ্চার এমনভাবে করা হয় যাতে ফাইনালসহ দুই দলের তিনবার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এসবই বাণিজ্যিক কারণে। কারণ যত ম্যাচ তত ব্যবসা। আইসিসি জানিয়েছে, ২০১৯ বিশ^কাপে বিশ^ব্যাপী মোট টেলিভিশন দর্শক ছিল ৭০৬ মিলিয়ন (১০ লাখে এক মিলিয়ন), যার মধ্যে ২৭৩ মিলিয়নই ছিল পাকিস্তান-ভারত ম্যাচের দিন।

ক্রিকেট কূটনীতি

দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধকে পাশ কাটিয়ে সম্পর্ক রক্ষায় ক্রিকেট বিভিন্ন সময় ভূমিকা রেখেছে। ১৯৮৭ সালে কাশ্মীর সংকট নিয়ে উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, তখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক সবাইকে চমকে দিয়ে ভারত সফরে যান টেস্ট সিরিজ দেখতে। যার ফলে দুই দেশের সম্পর্ক আবার উষ্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধের পর দুই দেশের সম্পর্ক যখন খুবই খারাপ, তখন (২০০৪ সালে) ভারতীয় দল যায় পাকিস্তান সফরে। সফরের আগে অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলিকে একটি বার্তা পাঠান ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ী। বার্তাটি ছিল, শুধু ম্যাচ জিতলেই হবে না, পাকিস্তানিদের হৃদয়ও জিতে আসতে হবে (‘দিল জিতকে আনা’)। এটি ছিল ভারতের পক্ষ থেকে দারুণ একটি পদক্ষেপ। যা দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে দারুণ ভূমিকা রাখে। ২০১১ বিশ^কাপের সেমিফাইনালে দুই দল যখন মুখোমুখি হয় তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি সেই ম্যাচ দেখতে ভারত সফর করেন। এ ছাড়া ইমরান খান পাকিস্তানের প্রধান থাকাকালীন ভারতের সাথে ক্রিকেট সম্পর্ক উন্নয়নে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছেন।

দুই দেশের ক্রিকেটাররাও বিভিন্ন সময় সামরিক উত্তেজনার মাঝে শান্তির বার্তা দিয়েছেন। যে কারণে ভারতে যেমন প্রচুর ইনজামাম-উল হক, শহিদ আফ্রিদির ভক্ত রয়েছে, তেমনি পাকিস্তানের বহু মানুষ কোহলিদের ভালোবাসেন। ক্রিকেটের কারণে দুই দেশের নাগরিকদের মাঝেও একটা সম্প্রীতির বন্ধন লক্ষ করা যায়। দুই দেশের ক্রিকেটারদের মধ্যেও বন্ধুত্বের অনেক নজির আছে। ১৯৯৬ সালে শহিদ আফ্রিদি শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৩৭ বলে সেঞ্চুরির যে রেকর্ড গড়েছিলেন, সেই ম্যাচে তিনি খেলেছিলেন শচীন টেন্ডুলকারের দেওয়া ব্যাট দিয়ে। পাকিস্তানি পেসার ওয়াকার ইউনুসকে ব্যাটটি উপহার দিয়েছিলেন শচীন। সেই ব্যাট নিয়েই মাঠে নামে আফ্রিদি। আবার মোহাম্মাদ আমিরকেও একবার ব্যাট উপহার দিয়েছিলেন বিরাট কোহলি।

তিক্ততাও আছে

মুদ্রার উলটো পিঠে কিছু তিক্ততার ঘটনাও রয়েছে। ১৯৯৯ সালে ইডেন টেস্টে ভারত হারতে শুরু করলে স্বাগতিক দর্শকরা মাঠে বিশৃঙ্খলা করে। তারা পাকিস্তানি ফিল্ডারদের গায়ে জুতা, ইট, বোতল মারতে শুরু করে। একপর্যায়ে ম্যাচ বন্ধ হয়ে যায় এবং মাঠ থেকে সব দর্শক বের করে দিয়ে শূন্য গ্যালারিতে ম্যাচ শেষ করা হয়।

১৯৮৯ সালে করাচি টেস্টের সময় এক পাকিস্তানি দর্শক মাঠে নেমে ভারতীয় অধিনায়ক কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্তকে আঘাত করেন। ১৯৮৭ সালে আহমেদাবাদ টেস্টে পাকিস্তানি ফিল্ডাররা বাউন্ডারির কাছে হেলমেট পরে ফিল্ডিং করেন ভারতীয় দর্শকদের ছোড়া ইট থেকে বাঁচতে। আবার দুই দেশের খেলোয়াড়রাও মাঠে বিভিন্ন সময় বিবাদে জড়িয়েছেন। ২০০৭ সালে শহিদ আফ্রিদি ও গৌতম গম্ভীর এবং ২০১০ সালে হরভজন সিং ও শোয়েব আক্তার ম্যাচের মাঝখানেই তর্কে জড়িয়ে পড়েন।

এবারের এশিয়া কাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের টসের সময় সালমান আঘা ও সুর্যকুমার যাদব হাত মেলাননি। ম্যাচ শেষে পাকিস্তানি খেলোয়াড়রা হাত মেলানোর জন্য লাইনে দাঁড়ালেও ভারতীয় খেলোয়াড়রা এড়িয়ে যান। ক্রিকেটের মাঠে রাজনীতিকে টেনে আনায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন ভারতীয় ক্রিকেটাররা।

এসব কিছুই এই লড়াইকে জমিয়ে তোলার উপাদান হিসেবে কাজ করেছে। যে কারণে দর্শকদের মাঝেও যুগ যুগ ধরে এই লড়াই উপভোগের উপলক্ষ্য হয়ে আছে।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ