পোকামাকড়ের আদলে রোবট
আইটি কর্নার টি এইচ মাহির জুলাই ২০২৬
মানুষ প্রকৃতির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য থেকে অনুকরণ করে নতুন কিছু উদ্ভাবন পছন্দ করে। পাখি থেকে বিমান কিংবা নীল তিমি থেকে সাবমেরিনের অনুপ্রেরণা সে কথাই বলে। রোবটের ক্ষেত্রেও আমরা দেখি কুকুরের আদলে তৈরি করা রোবট। যেগুলো চার পায়ে চলে। মানুষের মতো কাজ করছে রোবট। প্রযুক্তির এই শাখায়ও প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত জ্ঞানের ব্যবহার ব্যাপক। রোবটের জগতে বিজ্ঞানীরা এখন ছুটছেন পোকামাকড়ের দিকে। ছোট ছোট মৌমাছি, তেলাপোকা, পিঁপড়া আকারে ছোট হলেও এদের মধ্যে ওড়া, দেওয়াল বেয়ে ওঠা, সরু জায়গায় ঢুকে পড়া এবং দলবদ্ধভাবে কাজ করার মতো আশ্চর্যজনক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তাদের এসব বৈশিষ্ট্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বিজ্ঞানীরা তৈরি করছেন রোবট। যেগুলো দেখতে কীট-প্রতঙ্গের মতো। ভিন্ন ভিন্ন কাজে এসব রোবট ব্যবহার করা হবে।
আশেপাশের পরিবেশ বা প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে উদ্ভাবনকে বলা হয় ‘বায়োমিমিক্রি’। যেখানে প্রকৌশলীরা মানুষের সমস্যা সমাধানের জন্য প্রকৃতি থেকে নকশা অনুকরণ করেন। পোকামাকড় অনুকরণের এক অন্যতম মাধ্যম। কেননা প্রকৃতিতে নানা রকম পোকামাকড় আছে। এদের চলাফেরা একেক রকমের হয়ে থাকে। বিভিন্ন পরিবেশে এদের চলাফেরার বৈশিষ্ট্য প্রযুক্তিতে যুক্ত করা যেতে পারে। তাই পোকামাকড়-অনুপ্রাণিত উদ্ভাবনগুলো এমন পরিবেশে কাজ করতে সক্ষম যেখানে প্রচলিত রোবটগুলো হিমশিম খায়। পৃথিবী জুড়ে নানা দেশের প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীরা পোকামাকড়ের আদলে রোবট তৈরি করছেন। তেলাপোকা, মাকড়সা, মৌমাছি থেকে শুরু করে শতপদী, প্রজাপতি, পিঁপড়া কিংবা পাছ-পাতার আড়ালে লুকানো পোকা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি করা হচ্ছে রোবট। চলো পোকামাকড়ের আদলে তৈরি কিছু রোবট সম্পর্কে জেনে আসি।
রোবোবি
ভবিষ্যতে হয়তো আমরা মৌমাছির মতো ঝাঁক বেঁধে রোবট উড়তে দেখব। কেননা রোবোবি নামে এক ধরনের ছোট্ট রোবট বানিয়েছে বিজ্ঞানীরা। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াইস ইনস্টিটিউট ফর বায়োলজিক্যালি ইন্সপায়ার্ড ইঞ্জিনিয়ারিং-এর গবেষকরা এটি তৈরি করেছে। মৌমাছি ও মাছির ওড়া থেকে অনুপ্রাণিত এই ক্ষুদ্র রোবটটির ওজন এক গ্রামেরও কম এবং এটি এমন সূক্ষ্ম ডানা ব্যবহার করে যা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১২০ বার ঝাপটায়। এই রোবোবি আকারে একটি পেপার ক্লিপেরও অর্ধেক। এটি দুর্যোগ, কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছে। রোবোবির মূল পরিকল্পনার পেছনের প্রেরণা ছিল এমন স্বয়ংক্রিয় ক্ষুদ্র-আকাশযান তৈরি করা, যা স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্ব-নির্দেশিতভাবে উড়তে এবং দল বেঁধে উড়তে পারবে। এর কিছু মডেল পানিতে সাঁতারও কাটতে পারে। মৌমাছিরা অত্যন্ত দক্ষ উড়ন্ত প্রাণী। তারা বাতাসে স্থির থাকতে পারে, দ্রুত দিক পরিবর্তন করতে পারে। বিজ্ঞানীরা এই বৈশিষ্ট্যকে রোবটে যুক্ত করতে চেয়েছেন। তাই তারা রোবোবিতে বিশেষ ডানা ব্যবহার করেছেন। যা বৈদ্যুতিক শক্তিকে দ্রুত যান্ত্রিক গতিতে রূপান্তরিত করে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন রোবোবি একদিন কৃষিক্ষেত্রে অত্যন্ত উপকারী হয়ে উঠতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং কীটনাশকের কারণে বিশ্বের অনেক অংশে মৌমাছির সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায়, রোবট পরাগায়নকারী ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনে সহায়তা করতে পারে। ভূমিকম্প বা বড় কোনো দুর্ঘটনার পর রোবোবি এমন বিপজ্জনক পরিবেশেও প্রবেশ করতে পারে যেখানে মানুষ নিরাপদে যেতে পারে না।
হ্যামার
মাছির বৈশিষ্ট্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি করা হয়েছে হ্যামার (হার্ভার্ড অ্যাম্বুলেটরি মাইক্রোরোবট-এর সংক্ষিপ্ত রূপ) নামক ছোট্ট রোবট। শুধু তাই নয় ছয় পায়ের পোকার হাঁটা থেকে অনুপ্রাণিত এটি। হ্যামার নামক রোবটটিও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াইস ইনস্টিটিউট ফর বায়োলজিক্যালি ইন্সপায়ার্ড ইঞ্জিনিয়ারিং-এর গবেষকদের তৈরি। তেলাপোকা কিংবা ছয় পায়ের পোকার চলার মধ্যে এক আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। ছয় পা দিয়ে এক ধরনের হামাগুড়ি দিয়ে চলাফেরা করে পোকাগুলো। মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার লম্বা হ্যামার রোবটেও পোকামাকড়ের চলাচলের অনুকরণে তৈরি ছয়টি ছোট পা ব্যবহার করা হয়েছে। এর কিছু মডেলে ইলেকট্রো-অ্যাডহেশন প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হয়, যা ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক চার্জ তৈরি করে রোবটটিকে বিভিন্ন তলের সাথে লেগে থাকতে সাহায্য করে। এর ফলে এটি দেওয়াল বেয়ে উঠতে পারে বা আসল মাছির মতো উলটোভাবেও চলাচল করতে পারে। মানুষের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক বা সংকীর্ণ জায়গায় হ্যামার রোবট কার্যকর হতে পারে। যেমন : উড়োজাহাজের ইঞ্জিন, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পাইপলাইন বা ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ পরিদর্শন করতে পারে। এর হালকা গঠনের কারণে এটি কোনো ক্ষতি না করেই সংকীর্ণ স্থানের মধ্যে দিয়ে চলাচল করতে পারে। ভবিষ্যতের জন্য বিজ্ঞানীরা এতে আরও বিভিন্ন ধরনের সেন্সর ও প্রযুক্তি যুক্ত করার চেষ্টা করছেন।
স্প্রিংটেল
স্প্রিংটেল নামক এক ধরনের ছোট পোকা থেকে অনুপ্রাণিত রোবট স্প্রিংটেল। এসব পোকা ঝরা পাতা ও বাগানের মাটির মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে বেড়ায় এবং এরা তাদের লাফানোর জন্য বিখ্যাত। এই লাফানো ছয়-পায়ের প্রাণীগুলো থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে হার্ভার্ড জন এ. পলসন স্কুল অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেস-এর রোবটবিজ্ঞানীরা একটি রোবট তৈরি করেছেন। ছোট্ট পোকা স্প্রিংটেল এক সেকেন্ডের কম সময়ে নিজেদের শরীরের দৈর্ঘ্যের চেয়ে বহুগুণ বেশি লাফ দিতে পারে। বিজ্ঞানীরা এই বৈশিষ্ট্যকে রোবটে যুক্ত করেছেন। রোবটটি আসল স্প্রিংটেলের ভেতরের প্রাকৃতিক কাঠামোর মতো একটি স্প্রিং-চালিত লাফানোর কৌশল ব্যবহার করে। শক্তি সঞ্চয় করে এবং সঙ্গে সঙ্গে তা মুক্ত করার মাধ্যমে রোবটটি নিজেকে অনেক উঁচুতে বাতাসে নিক্ষেপ করতে পারে। চাকাযুক্ত রোবটগুলো পাথুরে বা অসমতল ভূমিতে চলতে সমস্যায় পড়ে, কিন্তু লাফানো রোবটগুলো অনেক সহজে ফাঁক ও বাধা অতিক্রম করতে পারে। বাতাসে ওড়ার জন্য রোবটটি ল্যাচ-মিডিয়েটেড স্প্রিং অ্যাকচুয়েশন নামক একটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে ফুরকুলা নামক একটি স্থিতিস্থাপক উপাদানে স্থিতিশক্তি সঞ্চিত থাকে যা গুলতির মতো মিলিসেকেন্ডের মধ্যে নিক্ষেপ করা যায়। এই রোবট মহাকাশ অনুসন্ধানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। চাঁদ, মঙ্গল বা গ্রহাণুতে ভবিষ্যতের অভিযানগুলোর জন্য এমন রোবটের প্রয়োজন হতে পারে যা পাথর ও গর্তে ভরা অপ্রত্যাশিত ভূখণ্ডে চলাচল করতে সক্ষম। লাফিয়ে চলা রোবটগুলো দুর্যোগপূর্ণ এলাকাতেও সাহায্য করতে পারে যেখানে সাধারণ যন্ত্র কার্যকরভাবে চলাচল করতে পারে না।
আরও পড়ুন...