প্রাণহীন প্রথিবী
সাইন্স ফিকশন আদর্শ চক্রবর্তী এপ্রিল ২০২৬
য়ুল প্রাণপণ চেষ্টা করে জেগে উঠতে। মনে করার চেষ্টা করে সে কে, কোথায় আছে, কে তাকে ডাকছে এবং কেন ডাকছে। কিন্তু তার কিছুই মনে পড়ে না। সে অনুভব করে এক গভীর জড়তায় দেহ আর চেতনা যেন কোথাও অবরুদ্ধ হয়ে আছে; সেটার ভেতর থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না।
‘ওঠো, য়ুল। আমরা পৃথিবীর কাছাকাছি চলে এসেছি।’
পৃথিবী! হঠাৎ করে য়ুলের সব কথা মনে পড়ে যায়। পৃথিবী হচ্ছে সূর্য নামক সাদামাঠা একটি নক্ষত্রের মহাকর্ষে আবদ্ধ নীলাভ একটি ছোট গ্রহ-যে গ্রহে তার পূর্বপুরুষ মানুষের জন্ম হয়েছিল। সেই মানুষ রোবটদের নিয়ে দুই শতাব্দী আগে ক্রসিয়াস গ্রহপুঞ্জে বসতি স্থাপন করেছে। সেই ক্রসিয়াস গ্রহপুঞ্জ থেকে সে ফিরে যাচ্ছে পৃথিবীতে-সূর্য নামক সাদামাঠা একটি নক্ষত্রের কক্ষপথে আবদ্ধ তৃতীয় গ্রহটিতে।
য়ুল খুব ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকাল। তার মুখের ওপর ঝুঁকে আছে একটি ধাতব মুখ। সেই ধাতব মুখে তার জন্য উৎকণ্ঠা ও মমতা।
য়ুলকে চোখ খুলতে দেখে ধাতব মুখটি আরও নিচু হয়ে এলো। শীতল ধাতব হাতে তার মুখমণ্ডল স্পর্শ করে বলল, ‘তুমি প্রায় এক যুগ ধরে ঘুমিয়ে আছ, য়ুল। তোমার এখন ওঠার সময় হয়েছে।’
য়ুল ধাতব মুখ, তার শীতল স্পর্শ এবং কোমল কণ্ঠ চিনতে পারে। ওটা ক্রন-একজন রোবট, ক্রসিয়াস গ্রহপুঞ্জ থেকে তার সঙ্গে এসেছে। প্রায় এক যুগ দীর্ঘ মহাকাশ অভিযানে তাকে একা আসতে দেয়নি ক্রসিয়াস গ্রহপুঞ্জের বিজ্ঞান একাডেমি। তার সঙ্গে পাঠিয়েছে একজন রোবট-ক্রন এবং একজন আধা-জৈবিক, আধা-যান্ত্রিক বায়োবট-কীশ। বার্ধক্য তাদের স্পর্শ করে না বলে গত এক যুগ তারা এই মহাকাশযানের শূন্য করিডরে অপেক্ষা করেছে, ক্রসিয়াস গ্রহপুঞ্জের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেছে এবং শীতল ঘরের কালো ক্রোমিয়াম ক্যাপসুলে য়ুলের দেহকে পর্যবেক্ষণে রেখেছে।
য়ুল জিজ্ঞেস করল, ‘ভালো আছ, ক্রন?’
‘হ্যাঁ, আমি ভালো আছি।’
‘কীশ কোথায়? সে ভালো আছে?’
‘কীশ মূল নিয়ন্ত্রণকক্ষে। সে-ও ভালো আছে।’
য়ুল আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ক্রন তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘এখন তুমি কথা বলবে না, য়ুল। তুমি চুপ করে শুয়ে থাকবে। তুমি প্রায় এক যুগ শীতল ঘরে ঘুমিয়ে ছিলে। তোমার দেহকে খুব ধীরে ধীরে জাগিয়ে তুলতে হবে।’
‘আমি তো জেগেই আছি!’
‘তোমার মস্তিষ্ক জেগে আছে, কিন্তু দেহ এখনো পুরোপুরি জাগেনি। আমাকে একটু সময় দাও। আমি তোমার দেহকে ধীরে ধীরে সক্রিয় করব।’
‘বেশ।’
কীশ বলল, ‘আমি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ করেছি।’
‘কী দেখেছ?’
‘দেখেছি, এই বায়ুমণ্ডল বিষাক্ত।’
য়ুল চমকে উঠে বলল, ‘কী বললে?’
কীশ কাতর কণ্ঠে বলল, ‘আমি দুঃখিত, য়ুল। তুমি এত আশা করে সেই সুদূর ক্রসিয়াস গ্রহপুঞ্জ থেকে পৃথিবীতে এসেছ তোমার পূর্বপুরুষের জন্মগ্রহ দেখতে। কিন্তু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ করে আমার মনে হচ্ছে-এই গ্রহ প্রাণহীন।’
‘প্রাণহীন?’
‘হ্যাঁ। বাতাসের ওজোন স্তর প্রায় নিশ্চিহ্ন। আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি সরাসরি পৃথিবীতে আঘাত করেছে। বাতাসে মাত্রাতিরিক্ত ডাইঅক্সিন, প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং নানা ধরনের অ্যাসিড রয়েছে। সবচেয়ে ভয়ংকর হলো-অক্সিজেনের পরিমাণ এত কম যে, এখানে কোনো প্রাণ থাকার সম্ভাবনা নেই।’
য়ুল স্তব্ধ হয়ে যায়।
কীশ বলল, ‘মানুষ থাকলে আমরা তাদের চিহ্ন পেতাম-রেডিও তরঙ্গ, আলো, লেজার রশ্মি বা পারমাণবিক বিকিরণের। আমরা এসবের কিছুই পাচ্ছি না। পৃথিবী যেন একটি মৃত গ্রহ।’
কীশ ধীরে ধীরে বলল, ‘প্রফেসর রাবেল বলেছিলেন-মানুষের সব ছিল, কিন্তু তাদের কারণেই পৃথিবীর ধ্বংস হয়েছে।’
‘তাহলে তারা খুবই বোকা, তাই না, য়ুল?’
য়ুল মাথা নাড়িয়ে বলল, ‘না, কীশ। তুমি সবটা বোঝোনি। চলো, আমাদের কাজ আমরা করি। অতীত নিয়ে অনুশোচনা আমাদের কাজ নয়।’
কীশ ধীরে বলল, ‘কিন্তু তারা তো আমাদের সৃষ্টিকর্তা।’
য়ুল আর কিছু বলল না।
সায়েন্স ফিকশন প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত
আরও পড়ুন...