রাজকীয় পাখি ডাইনোসর

চিত্র-বিচিত্র ফয়জুল ইসলাম ফুয়াদ মার্চ ২০২৬

পৃথিবীতে এমন কিছু প্রাণী আছে যাদের দেখলে মনে হয় তারা কয়েক কোটি বছর আগের প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে সরাসরি বর্তমান সময়ে চলে এসেছে। সুবিল স্টর্ক পাখিটি ঠিক তেমনই এক বিস্ময়। এই বিশালাকার পাখিটি তার অদ্ভুত গড়ন আর আচরণের জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। 

এরা দক্ষিণ সুদান, উগান্ডাসহ উষ্ণমণ্ডলীয় পূর্ব ও মধ্য আফ্রিকার ট্রপিক্যাল জলাভূমিগুলোতে বাস করে। কঙ্গোর পূর্বাঞ্চল, রুয়ান্ডা, তানজানিয়া এবং উত্তর জাম্বিয়ার বিশাল বিশাল জলাশয় ও নলখাগড়ার বনে এদের পাওয়া যায়।

তিমি-মাথা সারস নামেও পরিচিত এই পাখিরা। এদের বৈজ্ঞানিক নাম বেলায়েনিসেপস রেক্স, অর্থ তিমি মাথার রাজা। আরবি ভাষায় এর নাম আবু মারকুব। যার অর্থ ফাদার অব স্লিপার। 

সুবিল স্টর্ক পাখির শারীরিক গঠন দেখে অনেক বিজ্ঞানী এদের ডাইনোসর যুগের শেষ বংশধর বলে মনে করেন। এদের মাথার খুলি ও পায়ের গঠন সম্পূর্ণ আলাদা, যা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে অপরিবর্তিত রয়েছে।

প্রথমে এদের স্টর্ক বা সারসদের অন্তর্ভুক্ত করা হলেও এরা এখন নিজেদের আলাদা একটি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। তবে সারস এবং বকদের কিছু বৈশিষ্ট্য এদের মাঝে আছে। যেমন লম্বা গলা ও পা। এদের নিকটতম আত্মীয় হলো পেলিকান। এদের ডিমের খোসা পেলিকেনদের মতো।

এরা দেখতে সাধারণ পাখির চেয়ে একদম ভিন্ন। এরা চার থেকে পাঁচ ফুট লম্বা হয়। সোজা হয়ে দাঁড়ালে প্রায় একজন মানুষের সমান উচ্চতা হবে। পাখিটির পালক নীলচে-ধূসর। এদের ওজন ৪ থেকে ৭ কেজি হয়। এদের চোখ সোনালি বা হলুদাভ-ধূসর এবং দৃষ্টি অত্যন্ত তীক্ষè। চোখগুলো একদম সামনের দিকে থাকে। এই বিশেষ অবস্থানের কারণে এরা বাইনোকুলার ভিশন পায় যা শিকারের দূরত্ব নিখুঁতভাবে বুঝতে সাহায্য করে। উড়ন্ত অবস্থায় এদের ডানার বিস্তার প্রায় ২.৫ মিটারের মতো হয়ে থাকে। পুরুষ ও স্ত্রী পাখি দেখতে একই রকম হলেও পুরুষরা আকারে সামান্য বড় হয়ে থাকে।

ঠোঁটের জন্য পাখিটি বিশেষভাবে পরিচিত। এদের ঠোঁট দেখতে অনেকটা ডাচ কাঠের জুতার মতো, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এই ঠোঁটে থাকে বাদামি ছোপ। ঠোঁটের কিনারা চোখা। আর শেষ প্রান্তে একটা হুকের মতো থাকে যা দিয়ে এটি অনায়াসেই পিচ্ছিল শিকারও ধরে ছিঁড়ে ফেলতে পারে। সব মিলিয়ে বিশেষ এই ঠোঁট বড় শিকার ধরতে সাহায্য করে। 

সুবিল স্টর্ক পাখি ধৈর্যের জন্য পরিচিত। এটি শিকার ধরার সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। এরা মাংসাশী এবং অত্যন্ত দক্ষ শিকারি। খাবার হিসেবে এই পাখিদের মাছ বেশ পছন্দ। এদের প্রধান খাদ্য লাংফিশ, ক্যাটফিশ এবং তেলাপিয়া মাছ। ইলের মতো দেখতে বাতাসে শ্বাস নেওয়া ছয় ফুটের মতো লম্বা লাংফিশকে এরা অনায়াসে শিকার করতে পারে। এদের শিকারের তালিকায় মাছ ছাড়াও রয়েছে সাপ, কচ্ছপ, গিরগিটি, এমনকি ছোট কুমিরও।

শিকার করার সময় এরা পুরো শরীর নিয়ে শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, যাকে বিজ্ঞানীরা ঈড়ষষধঢ়ংব পদ্ধতি বলেন। এদের বিশাল ঠোঁট দিয়ে শিকারের শরীর ছিন্নভিন্ন করে দেয়। কুমিরও এদের ভয় পায়। সুবিল স্টর্ক এতটাই শক্তিশালী যে, এরা ছোট সাইজের কুমির অনায়াসে গিলে ফেলে। এমনকি বড় কুমিরদেরও এরা ভয় পায় না এবং তাদের এলাকাতেও নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ায়।

সাধারণত সুবিল স্টর্ক খুব শান্ত ও নীরব পাখি। তবে কখনো কখনও এরা ঠোঁট দিয়ে একধরনের শব্দ করে যা শুনতে অনেকটা মেশিনগানের গুলির মতো মনে হয়। এটি সাধারণত তারা একে অপরকে অভিবাদন জানাতে বা ভয় দেখাতে ব্যবহার করে।

বর্তমানে এই পাখিটি খুব বেশি দেখা যায় না। বিশ্বে মাত্র ৫০০০ থেকে ৮০০০টি সুবিল স্টর্ক পাখি টিকে আছে বলে ধারণা করা হয়। জলাভূমি ধ্বংস, চোরাশিকার এবং অবৈধ বন্যপ্রাণী ব্যবসার কারণে এই রাজকীয় পাখিটি বিলুপ্তির পথে। আফ্রিকান আদিবাসীদের অনেক কুসংস্কারের কারণেও এই পাখিদের হত্যা করা হয়। উনিশ শতকে সুদানের সরকার একে সংরক্ষিত প্রজাতি হিসেবে ঘোষণা করেন। এদের আবাসস্থল রক্ষা করা না গেলে অচিরেই আমরা এই প্রাগৈতিহাসিক বিস্ময়কে হারাতে পারি।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ