রাসূল আমার প্রিয় রাসূল (সা)
প্রবন্ধ নিবন্ধ ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ আগস্ট ২০২৬
সবুজ পাতায় হালকা হাওয়ার দোলা; স্বপ্নমাখা ফুলের সুবাস যায় কি আহা ভোলা! কচি পাতায় ঢেউ খেলে যায় আহারে, মন উঠোনে তিড়িংবিড়িং মিষ্টি হাসির বাহারে। চোখের তারায় কষ্ট হারায় দু-হাত বাড়ায় স্বজনে; আলোর পথে ভালোর পথে আগলে রাখে কজনে! উড়ু উড়ু মন দুয়ারে বন্ধু তোমার যিনি, বিশ^বাসী সবাই তাকে রাসূল বলেই চিনি। নাম তাঁর আহমদ। নাম তাঁর মুহাম্মাদ।
বাবা আবদুল্লাহকে হারিয়েছেন মা আমিনার গর্ভে থাকতেই। তবুও তাঁর হাসিতেই হেসে উঠেছে পৃথিবী। সময়টা ছিল ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দ। জন্মের পরপরেই মায়ের কোল ছাড়তে হয়েছে তাঁকে। এটা কুরাইশদের আভিজাত্য। সংস্কৃতির পার্ট। তাইতো বেড়ে উঠেছেন তায়েফ নগরীতে দুধ মা হালিমার আদরে। এখানেই তিনি আরবের সবচেয়ে খাঁটি ও সাবলীল আরবি ভাষা আয়ত্ত করেছেন। মক্কায় মায়ের কোলে ফিরেছেন ৫ বছর বয়সে। মদিনায় তাঁর নানাবাড়ি। সেখানেই বাবার কবর। ৬ বছর বয়সে বাবার কবর জিয়ারতে গেলেন। ফেরার পথে আবওয়া নামক জায়গায় এসে মাকেও হারালেন।
এতিম শিশুর দায়িত্ব নিলেন দাদা আবদুল মুত্তালিব। মক্কা নগরীর নেতা তিনি। পবিত্র কাবাঘরের খাদেম। তিনি তাঁকে অতি আদর যতেœ রাখলেন। ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না। সেই সুখও সইল না কপালে। ৮ বছর বয়সে তাঁকেও হারালেন শিশু মুহাম্মাদ।
মাথার ওপর আকাশটা পুরোই ফাঁকা হয়ে গেল। অসহায় হয়ে পড়লেন শিশু মুহাম্মাদ। চাচা আবু তালিব এগিয়ে এলেন প্রশান্তির ছায়া হয়ে। পিতার মতোই আগলে রাখলেন আদরে-ভালোবাসায়। এই ছায়া ছিল নবুয়তের পরেও। ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য হয়নি তার। মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)-এর ছায়া হিসেবে ছিলেন তিনি।
কৈশোর এবং তারুণ্যের পুরো সময়টা চাচার সাথেই কাটিয়েছেন হযরত মুহাম্মাদ (সা)। সমকালীন আরবের প্রথাগত কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেননি তিনি। কুরাইশরা ছিলেন উচ্চশিক্ষিত। সাহিত্য-শিল্পকলাতেও তাদের উঁচু আসন বিশ্বময়। আরবি সাহিত্যের ভাব-ভাষা-অলংকার তখন বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু কিশোর মুহাম্মাদ কারো কাছে অক্ষর জ্ঞানও লাভ করেননি। তিনি ছাগল চরিয়েছেন। রাখালি জীবন কাটিয়েছেন মক্কার উপকণ্ঠে। আজওয়াদ ও আজইয়াদ উপত্যকায় নিয়মিত ছাগল-দুম্বা চরাতেন। ছাগল দুম্বাকে ঘাস খাইয়েছেন মক্কার আশেপাশের পাহাড়ি এলাকায়। পশু চরিয়েছেন চাচা আবু তালেবের। কখনো-বা অন্য কোনো মালিকের।
রুক্ষ ও শুষ্ক এলাকা আরব। প্রচণ্ড উষ্ণ ও বৃষ্টিহীন রৌদ্রময় আবহাওয়া সেখানে। মক্কা অঞ্চলও মরুভূমি এবং অনুচ্চ পাহাড় ও উপত্যকা দ্বারা বেষ্টিত। পানির উৎসের কাছে ছোট গাছপালা, বিক্ষিপ্ত কিছু ঝোপঝাড় ও কাঁটাযুক্ত বৃক্ষ প্রাকৃতিকভাবে জন্মে। এগুলোই পশুপালনের প্রধান উৎস।
মক্কার ‘কারারিত’ নামক স্থানে অন্য মালিকের মেষও চরিয়েছেন কিশোর মুহাম্মাদ। প্রতিদিন প্রতিটি মেষের জন্য এক কারাত পারিশ্রমিক হিসেবে পেতেন। এক কারাত মানে এক দিনারের কুড়ি ভাগের একভাগ। অর্থাৎ একদিনে কুড়িটি মেষ চরালে এক দিনার পারিশ্রমিক পেতেন। এভাবেই কেটেছে তাঁর সোনালি কৈশোর সময়ের চঞ্চল ঘড়ি। তারুণ্যের টগবগে দিন।
একটি প্রশ্ন মাথায় ঢেউ খেলে যাচ্ছে। তোমাদের মাথাতেও টোকা দিচ্ছে নিশ্চয়ই। কিশোর মুহাম্মাদ কিংবা তরুণ মুহাম্মাদ লেখাপড়া শিখলেন না কেন? কেন তিনি ছাগল দুম্বা মেষ চরিয়ে জীবনের সোনালি সময় নষ্ট করলেন? তিনি তো কুরাইশ সরদার আবদুল মুত্তালিবের নাতি। কুরাইশ নেতা আবু তালিবের ¯েœহেই বড় হচ্ছিলেন। তবু লেখাপড়া না শিখে রাখালিপনা করলেন কেন?
মহান আল্লাহর পরিকল্পনা অত্যন্ত নিখুঁত। হযরত মুহাম্মাদ (সা)-কে বানানো হবে শেষ নবী। পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। দুনিয়ার কোনো মানুষকে তাঁর শিক্ষক বানানো হবে না। তিনি হবেন স্বশিক্ষিত। তিনি চলবেন ‘গাইডেট বাই আল্লাহ’। তাঁর শিক্ষক হবেন সরাসরি মহান আল্লাহ তায়ালা।
মেষ, ছাগল, দুম্বা স্বভাবগতভাবে অবাধ্য ও বাঁকা প্রকৃতির হয়। এদেরকে দলছুট হওয়া থেকে রক্ষা করা কঠিন। সঠিকভাবে সামনে এগিয়ে নেওয়া কষ্টকর। এদেরকে চরাতে অসীম ধৈর্যের প্রয়োজন। নবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেও অনেক ধৈর্য ও দায়িত্ববোধ দরকার। এজন্য শুধুমাত্র হযরত মুহাম্মাদ (সা)-ই নন, প্রায় সকল নবী-রাসূলকেই ছাগল চরানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এই পেশা নবী-রাসূলদের মধ্যে চরম বিনয়, দায়িত্ববোধ ও মানব পরিচালনার পূর্বপ্রস্তুতি তৈরি করত। এই মেষ চরানো পেশা তাঁদেরকে মরুভূমির কঠিন বাস্তবতার সাথে পরিচিত করে এবং উম্মাহর সেবায় ধৈর্য, সহনশীলতা ও নেতৃত্ব দেওয়ার শিক্ষা দেয়। হযরত মুহাম্মাদ (সা) নবুয়তের কঠিন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অসীম ধৈর্য ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন।
৫৮২ খ্রিষ্টাব্দ। কিশোর মুহাম্মাদ তারুণ্যে পা রাখছেন। মাত্র ১২ বছর বয়সে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়া যাচ্ছেন। যাচ্ছেন চাচার সাথে। বিশাল কাফেলায় অনেক মানুষ। বন্ধু আবু বকরও তাঁর সাথে আছেন। কিন্তু সফর শেষ করতে পারলেন না। বাধ সাধলেন বাহিরা নামক একজন খ্রিষ্টান ধর্মযাজক। তাঁর মধ্যে নবুয়তের লক্ষণ দেখতে পেলেন তিনি। চাচা আবু তালেবকে অনুরোধ করলেন ফিরে যেতে। তিনি বললেন, সিরিয়ার ধর্মজাযকরা তাঁকে চিনে ফেলতে পারে। তারা তাঁর ক্ষতি করবে। আপনি তাঁকে অবশ্যই সেখানে নিয়ে যাবেন না।
মক্কার পরিবেশ ছিল খুব খারাপ। তখন জাহেলিয়া যুগ। সমাজের মধ্যে বর্বরতা নিষ্ঠুরতা ছড়িয়ে পড়েছিল। জুয়া, মাদক এবং অবৈধ নারীর সংস্পর্শ ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। ‘জোর যার মুল্লুক তার’ ছিল ক্ষমতার উৎস। এমন অপরাধপ্রবণ সমাজে বাস করেও কোনো খারাপ কাজে জড়িত হননি কিশোর-তরুণ মুহাম্মাদ। তাঁর প্রিয়বন্ধু ছিলেন আবু বকর। শৈশব ও কৈশোরের দুরন্ত সময়গুলো তাঁর সাথেই কাটিয়েছেন। দু’জনের মিল ছিল অমায়িক। দু’জনেই মদ পান করতেন না। মিথ্যা কথা বলতেন না। জুয়ার আসরে বসতেন না। অশ্লীল ও মন্দ কাজে শরিক হতেন না। সততার সৌরভে মুখরিত ছিল দু’জনের হৃদয়। তাদের বন্ধুত্ব ছিল সুরভিত ফুলের মতো। এ সময় আরবের লোকজন মুহাম্মাদ (সা)-কে আল আমিন এবং আস সাদিক উপাধি দিয়েছিল। আল আমিন মানে বিশ^াসী। আস সাদিক মানে সত্যবাদী। আবু বকরকে বলা হতো আতিক। আতিক মানে বন্ধু। তিনি শৈশব কৈশোর থেকে শুরু করে আমৃত্যু হযরত মুহাম্মাদ (সা)-এর বন্ধু ছিলেন।
জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বন্ধু নির্বাচন। বন্ধুই বন্ধুকে পথ দেখায়। বন্ধু ভালো হলে ভালোর পথ দেখায়। মন্দ হলে মন্দ পথ। তাইতো জীবনের জন্য ভালো বন্ধু খুবই দরকার। আবু বকরের জীবনে মুহাম্মাদ (সা) ছিলেন ভালো বন্ধু। মুহাম্মাদ (সা)-এর জীবনে আবু বকর (রা) ছিলেন ভালো বন্ধু। শৈশব, কৈশোর, যৌবনেও একসাথে ছিলেন। দু’জনেই ছিলেন কুসংস্কার মুক্ত। মূর্তিপূজা করতেন না কেউই। দু’জনেই ছিলেন সত্যবাদী ও পরোপকারী। দুজনেই ছিলেন নম্র ও ভদ্র স্বভাবের।
বন্ধু মানুষের জীবন ও আদর্শকে বদলে দেয়। মানুষ যার সাথে মেলামেশা করে, ধীরে ধীরে তার স্বভাব ও দীনি আচার-আচরণ গ্রহণ করে। তাই বন্ধু বানানোর আগে যাচাই করা জরুরি। ভালো বন্ধু বানানোর বিষয়ে খুব গুরুত্ব দিয়েছেন আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)। সুনানে আবু দাউদ শরিফের ৪৮৩৩ নম্বর হাদিসে উল্লেখ আছে-মহানবী (সা) বলেছেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর আদর্শ বা দীনের অনুসারী হয়। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকেরই লক্ষ্য রাখা উচিত সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।’ হাদিসটি জামে আত-তিরমিজি শরিফেও বর্ণিত আছে। হাদিস নং ২৩৭৮। সুনানে আবু দাউদ শরিফের ৪৮৩২ নম্বর হাদিসে মহানবী (সা) আরও বলেছেন-‘মুমিন ব্যক্তি ছাড়া অন্য কাউকে সঙ্গী বানাবে না এবং তোমার দস্তরখানের খাবার যেন কেবল পরহেজগার বা মুত্তাকি লোকেরাই খায়।
কিয়ামতের দিন বন্ধুর কারণে আফসোস হবে। দুনিয়ার অসৎ বা বিপথগামী বন্ধু আখিরাতে চরম অনুশোচনার কারণ হবে। সহিহ বুখারির ৬১৬৮ নম্বর হাদিসে রাসূল (সা) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি যাকে ভালোবাসে, সে কিয়ামতের দিন তার সাথেই থাকবে। অর্থাৎ দুনিয়ায় সৎ লোকের সাথে থাকলে আখিরাতেও তাদের সাথে হাশর হবে, আর অসৎ লোকের বন্ধু হলে তাদের সাথেই শাস্তি পেতে হবে।’
বন্ধু সম্পর্কে সুন্দর একটি উপমা দিয়েছেন প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)। তিনি বলেছেন, ‘সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উপমা হলো কস্তুরী আতর বা সুগন্ধি বিক্রেতা এবং কামারের হাঁপরের মতো। আতর বিক্রেতার কাছ থেকে তুমি শূন্য হাতে ফিরবে না; হয় তুমি আতর কিনবে, না হয় তার সুঘ্রাণ পাবে। আর কামারের হাঁপর হয় তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে, না হয় তুমি তার দুর্গন্ধ পাবে।’ হাদিসটি সহীহ বুখারিতে ৫৫৩৪ এবং সহীহ মুসলিম শরিফে ২৬২৮ নম্বর হিসেবে সংকলিত হয়েছে।
তরুণদের স্বাস্থ্য সচেতন হতে বলেছেন হযরত মুহাম্মাদ (সা)। তির চালনা, সাঁতার ও ঘোড়সওয়ারি হবার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। শারীরিক ও সামরিক দক্ষতা অর্জনের নির্দেশ দিতেন। এজন্য তরুণদের ভালো বন্ধু নির্বাচন করার এবং অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করার উপদেশ দিয়েছেন। তাইতো একটি সুন্দর প্রবাদ প্রচলিত আছে-‘সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।’ আমরাও হযরত মুহাম্মাদ (সা) এবং আবু বকরের মতো বন্ধু খুঁজে নেব।
সেই বন্ধু আমাদের আলোর পথে এগিয়ে নেবে। ভালোর পথে এগিয়ে নেবে। আমরা সকল সময় রাসূলের (সা) অনুকরণ ও অনুসরণ করব। কারণ রাসূল আমার প্রিয় রাসূল (সা)। তিনি অতুলনীয় এক আদর্শ মহা মানব।
আরও পড়ুন...