রাতুলের খেলার সাথী
গল্প আতাউল হক মাসুম ফেব্রুয়ারি ২০২৬
স্কুল থেকে বাসায় ফিরে ব্যাগটা যথাস্থানে রেখে রান্নাঘরে উঁকি দিলো রাতুল। মায়ের কাছে অনুমতি চাওয়ার ভঙ্গিতে বলল, মা, আজ কিন্তু আমি বাইরে খেলতে যাব!
মা রান্নার দিকে মনোযোগ রেখেই বললেন, না, বাইরে গিয়ে বস্তির ছেলেদের সাথে খেলার দরকার নেই। তার চেয়ে বরং তুমি মোবাইলে গেমস খেলো। আর কিছুক্ষণ পরেই তো তোমার টিচার আসবেন। টিচারের কথা শুনেই যেন দপ করে নিভে গেল রাতুল। সে মাকে অনেকবার বলেছে বিকেলে পড়তে ওর ভালো লাগে না। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে সে বিভিন্ন প্ল্যান করেছিল, মায়ের এক কথাতেই তা হাওয়ায় মিশে গেল।
অগত্যা রাতুল বাসায় বসেই মোবাইলে গেমস খেলে সময় কাটাতে লাগল। কিছুক্ষণ পর তার টিচার পড়াতে আসেন। পড়ার পুরোটা সময় রাতুলের মন ভারী হয়ে রইল।
এভাবেই রাতুলের দিন কাটতে লাগল। স্কুল থেকে এসে মোবাইলে গেমস খেলা, টিচার এসে পড়িয়ে চলে গেলে আবার মোবাইল দেখা-যতক্ষণ না ওর বাবা এসে পড়াতে না বসেন। ওর মা-ও ভাবলেন, সমস্যা কী, ছেলে তো আর বাইরে গিয়ে বস্তির ছেলেদের সাথে মিশছে না।
রাজধানীর একটি স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে রাতুল। ওর বাবা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, মা গৃহিণী। রাতুল সকালে ওর বাবার সাথে স্কুলে যায়, ফেরার পথে কোনোদিন বন্ধুদের সাথে ফেরে, কোনোদিন ওর মা গিয়ে নিয়ে আসে। রাতুল ওর বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান।
কয়েক দিন পরের কথা। স্কুল থেকে বাসায় ফিরে রাতুল মাকে বাসায় না দেখে মনে মনে ভাবল, বুয়াকে বলে আজ বাইরে খেলতে যাবে। মা শপিংয়ে গেছে, নিশ্চয় ফিরতে দেরি হবে। কিন্তু মা কখন ফিরবে জানা দরকার। কারণ তার আগেই বাসায় না ফিরলে বকা শুনতে হবে। বুয়ার কাছে মা কখন ফিরবে জানতে গিয়ে একটা অদ্ভুত জিনিস চোখে পড়ল রাতুলের। ওর চেয়ে বয়সে সামান্য ছোট একটা ছেলে রান্নার ব্যবহার্য আলু-পটল-করলা প্রভৃতি দিয়ে এক মনে খেলা করছে। রাতুলকে প্রথমে দেখল বুয়া। ছেলেটার পিঠে মৃদু একটা কিল দিয়ে সবজিগুলো কেড়ে নিল।
রাতুল ছেলেটির কাছে গিয়ে বলল, তোমার নাম কী?
শাওন। জবাবটা দিলো বুয়া।
চলো, আমার সাথে খেলবে? আমার অনেক খেলনা আছে।
এবার বুয়া কী বলবে বুঝতে পারল না। রাতুলই আবার বলল, এসো, আমার খেলনাগুলো নিয়ে আসছি।
মন্ত্রমুগ্ধের মতো বুয়ার ছেলে শাওন রাতুলের পিছু পিছু চলতে লাগল। মুহূর্তের মধ্যেই রাতুল আর শাওনের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়ে গেল। নিমিষে দুই কিশোরের মাঝে ধনী-গরিবের দেওয়াল ভেঙে গেল।
রাতুল বলল, তুমি আলু-পটল দিয়ে একা একাই কীভাবে খেলছিলে? আমার এত খেলনা, কিন্তু আমার একা একা খেলতে ভালো লাগে না।
শাওন বোকার মতো হেসে বলল, আমার যে কোনো খেলনা নেই।
রাতুল বাইরে যাওয়ার কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে আস্তে আস্তে শোকেস থেকে তার সমস্ত খেলনা বের করে ফেলল। এর কোনো কোনোটা সে এক বছরের মধ্যেও হাত দেয়নি, অথচ আজ খেলতে বেশ ভালো লাগছে।
দেখতে দেখতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। একসময় বাসায় ফিরলেন রাতুলের মা। রাতুলের রুমে সবকিছু ছড়ানো ছিটানো আর বুয়ার ছেলেকে রাতুলের সাথে খেলতে দেখে তিনি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে রাতুলকে ধুপধাপ পিটুনি দিয়ে বুয়ার ছেলেকে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। রাতুল বিছানায় পড়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। তারপর আর কোনো দিন শাওন ওদের বাসায় আসেনি।
এক মাস পর।
শুক্রবার দুপুরে রাতুলের মা তার এক বান্ধবীর বাসায় দাওয়াতে গেলেন। রাতুলের হাতে মোবাইল দিয়ে বললেন, বাসায় বসে গেমস খেলো, আমি বিকেলের মধ্যেই ফিরে আসব।
বিকেলে কিছুক্ষণ গেমস খেলে কী মনে হতে রাতুল মোবাইল নিয়েই বাইরে বের হলো। হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে গেল সে। একসময় রেললাইন দেখতে পেয়ে রেললাইন ধরে হাঁটতে লাগল। হঠাৎ দেখল, একটা মাঠে ছেলেরা ফুটবল খেলছে। তার মধ্যে শাওনকেও দেখতে পেল। শাওন ওকে দেখে খেলার জন্য ডাকল। কিন্তু ও তো কখনো মাঠে খেলেনি। তাই রেললাইনে বসে ওদের খেলা দেখতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর অভ্যাসবশত মোবাইল ফোনটা বের করে ভিডিও গেমস খেলা শুরু করল। এখন ওর কাছে মোবাইলের খেলাই বেশি ভালো লাগে। এক মনে সে গেমসের জগতে চলে গেল। হঠাৎ দূর থেকে হুইসেল দিয়ে ট্রেন আসতে শুরু করল, কিন্তু সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই রাতুলের। খেলার মাঠ থেকে শাওন ঠিকই বিষয়টা লক্ষ করেছিল। সে কয়েকবার ডেকেও সাড়া পেল না, অথচ ট্রেন প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে। সময় নষ্ট করল না শাওন। দৌড়ে এসে হ্যাঁচকা টান মেরে রাতুলকে নিয়ে এক পাশে ছিটকে পড়ল। রাতুলের হাত থেকে মোবাইল ফোন ছিটকে পড়ে মুহূর্তেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল।
প্রচণ্ড ভয় পেয়ে রাতুল শাওনকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। খেলায় ইস্তফা দিয়ে রাতুলকে ওদের বস্তিতে নিয়ে গেল শাওন।
ওদিকে বিকেলে রাতুলের মা বাসায় ফিরে তন্নতন্ন করে তাকে খুঁজতে লাগলেন। মোবাইল ফোন বন্ধ পেয়ে আরও শঙ্কিত হয়ে পড়লেন তিনি। অবশেষে বুয়াদের বস্তিতে গিয়ে দেখা গেল, রাতুল সেখানে দিব্যি বুয়ার ছেলের সাথে খেলা করছে। মা কিছু বলার আগেই রাতুল বলল, মা, শাওনকে কিছু বলো না-ওর সাহসিকতায় আজ আমি বড় একটা দুর্ঘটনার কবল থেকে বেঁচে গেছি। তারপর রাতুল তাকে সব বুঝিয়ে বলল।
রাতুলের মা তার ভুল বুঝতে পারলেন। তিনি বুয়ার কাছে সেদিনের ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন। রাতুল মাকে বলল, বুয়ার বেতনটা বাড়িয়ে দিতে যাতে শাওনকে স্কুলে ভর্তি করাতে পারে।
আরও পড়ুন...