রহস্যময় জীব জায়ান্ট অস্টাকোড
চিত্র-বিচিত্র আদনান সোহান সেপ্টেম্বর ২০২৬
সমুদ্রের বৈরী পরিবেশে প্রাণীদের টিকে থাকা বেশ অসম্ভব। তবে এমন একটি প্রাণী রয়েছে যেটি কয়েক কোটি বছর ধরে গভীর সাগরতলে রাজত্ব করে আসছে।
সমুদ্রের তলদেশের এক থেকে দুই হাজার মিটার গভীরে বাস করে এক অদ্ভুত প্রাণী-জায়ান্ট অস্টাকোড। প্রাণীটি এতটাই গভীরে বাস করে যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না এবং প্রচণ্ড পানির চাপ থাকে। সামুদ্রিক বিজ্ঞানীদের কাছে এটি গভীর সমুদ্রের অন্যতম এক রহস্যময় সৃষ্টি।
জায়ান্ট অস্টাকোড আকারে একটি ছোট কমলার মতো। এদের পুরো শরীর একটি স্বচ্ছ, কমলা বা সোনালি রঙের গোলাকার খোলস দ্বারা আবৃত থাকে। তবে ১০০০ মিটার গভীর সমুদ্রে লাল বা কমলা রঙের আলো পৌঁছাতে পারে না। আলো না থাকার কারণে সমুদ্রের গভীরে এই কমলা রংটি সম্পূর্ণ কালো বা অদৃশ্য দেখায়। ফলে কোনো শিকারি প্রাণী চাইলেও এদের সহজে দেখতে পায় না।
জায়ান্ট অস্টাকোডের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো এদের চোখ। গভীর সমুদ্রের ঘুটঘুটে অন্ধকারে বেঁচে থাকার জন্য এদের চোখ দুটি বিশেষভাবে তৈরি। এদের চোখ সাধারণ প্রাণীর মতো নয়। দেখতে অনেকটা গাড়ির হেডলাইটের মতো।
বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, এই চোখগুলো লেন্সের বদলে প্রতিফলক ব্যবহার করে আলো এক জায়গায় জড়ো করে। এর ফলে গভীর সমুদ্রের অন্য প্রাণীদের শরীর থেকে নির্গত হওয়া সামান্যতম জৈব-আলো বা বায়োলুমিনেসেন্সও এরা সহজেই শনাক্ত করতে পারে। এই চোখগুলো এদেরকে শিকার খুঁজে পেতে এবং শিকারি প্রাণীদের হাত থেকে বাঁচতে সাহায্য করে।
২০২৩ সালের শেষ দিকের একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় জানা গেছে যে, জায়ান্ট অস্টাকোডের চোখগুলো কেবল স্থির অবতল আয়নার মতো কাজ করে না। এদের চোখগুলো অনবরত মৃদুভাবে স্পন্দিত বা সংকুচিত-প্রসারিত হতে থাকে।
গভীর সমুদ্রে অনেক শিকারি প্রাণী বিশাল আকৃতির আলো ছড়ায় এবং ছোট শিকারগুলো ক্ষুদ্র আলো ছড়ায়। চোখ অনবরত কাঁপতে থাকার কারণে দূরের বড় আলো ফোকাসের বাইরে চলে যায়, কিন্তু সামনের ক্ষুদ্র শিকারের আলো সব সময় নিখুঁত ফোকাসে থাকে। এটি আত্মরক্ষা ও শিকারের জন্য উপকারী।
খোলসের ভেতর থেকে এদের শরীরে পালকের মতো কিছু শুঁড় বা অ্যান্টেনা বের হয়ে থাকে। পানির নিচে চলাচলের জন্য এরা এই অ্যান্টেনাগুলোকে দাঁড়ের মতো ব্যবহার করে।
জায়ান্ট অস্টাকোড মূলত শিকারি প্রাণী। এদের প্রধান খাদ্য ছোট কোপেপড, ছোট মাছের পোনা। সমুদ্রের তীব্র স্রােতহীন শান্ত ও অন্ধকার পরিবেশে এরা নিঃশব্দে ভেসে থাকে এবং সুযোগ বুঝে শিকারকে খোলসের ভেতর টেনে নেয়। এদের শরীর স্বচ্ছ হওয়ায় ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং অনেক সময় হজম হতে থাকা খাবারও বাইরে থেকে স্পষ্ট দেখা যায়।
জায়ান্ট অস্টাকোড পানির গভীরতা পরিবর্তনের জন্য একটি জটিল শারীরিক মেকানিজম ব্যবহার করে। এদের শরীরে সাধারণ রক্ত বা হিমোলিম্ফের ভেতরে থাকা সালফেট আয়নের মাত্রা এরা নিজের ইচ্ছায় পরিবর্তন করতে পারে।
যখন সালফেট কমিয়ে হালকা আয়ন যোগ করে, তখন এদের ঘনত্ব পানির চেয়ে কমে যায় এবং এরা সহজেই কোনো শক্তি খরচ না করে ওপরে ভেসে উঠতে পারে। জেলিফিশের মতো এদের শরীরের ৯৫% অংশই পানি দিয়ে তৈরি।
গভীর সমুদ্রের এই ছোট্ট বিস্ময়কর প্রাণীটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় পৃথিবীর বিশাল জলরাশির নিচে এখনো এমন অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে যা উন্মোচনের অপেক্ষায় রয়েছে।
আরও পড়ুন...