সাঁঝের আওয়াজ
গল্প মাহমুদ শরীফ এপ্রিল ২০২৬
পুরস্কারটা গ্রহণ করার পর থেকে আনন্দ আর উত্তেজনা বেড়েই চলেছে রাফির। উপজেলা পর্যায়ের মেলার মতো এখানেও সেরা পুরস্কার পেয়েছে সে। সমস্ত শরীরজুড়ে বইছে এক ভিন্ন রকম অনুভূতি। বিজয়ের আনন্দে যেন হু-হু করে কান্না বেরিয়ে আসবে। নোনতা আনন্দাশ্রু বাঁধ ভেঙে এই বুঝি নাকের দু-পাশে গড়িয়ে পড়বে। কিন্তু আশপাশের সবাই কী বলবে? এই আশঙ্কায় অনেক কষ্টেই নিজেকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে খুদে বিজ্ঞানী সামিউল হাসান রাফি। ওর চারপাশে জেলা পর্যায়ে অনুষ্ঠিত একাদশ বিজ্ঞান মেলায় আগত শত শত দর্শনার্থী। সমগ্র জেলা থেকে মেলায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মেধাবী শিক্ষার্থীরা ছাড়াও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, সমাজসেবক, শিক্ষাবিদ, কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ, এনজিও কর্মী, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ সাধারণ দর্শনার্থীরা এসেছেন।
প্রধান অতিথি মাননীয় জেলা প্রশাসক এইমাত্র তিন দিনব্যাপী বিজ্ঞান মেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে পুরস্কার বিতরণ শেষ করে মঞ্চ থেকে নামলেন। মেলার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বিভিন্ন টিভি চ্যানেল ও প্রিন্ট মিডিয়ায় সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন।
এদিকে রাফিকে নিয়েও দর্শনার্থীদের আগ্রহ আর কৌতূহলের শেষ নেই। ওর সঙ্গে সেলফি তোলার ধুম লেগে গেছে। ইউটিউবাররা কনটেন্ট তৈরির চেষ্টায় করছে ছোটাছুটি। কয়েকজন বিজ্ঞ ব্যক্তি রাফির ব্যাপারে মন্তব্য করলেন, ‘এই ছেলেটা একদিন অনেক বড় বিজ্ঞানী হবে। মানুষের জন্য কল্যাণকর নতুন নতুন কিছু আবিষ্কার করে বিশ্বখ্যাতি অর্জন করবে।’
জেলা প্রশাসক ও বিশিষ্টজনদের সাক্ষাৎকার শেষে সাংবাদিকরা বুম ও ক্যামেরাসহ রাফির কাছে হাজির হলো। তারা রাফির সাক্ষাৎকার রেকর্ড করবে। সবাই আগ্রহসহকারে জায়গা করে দিলো সাংবাদিকদের। রাফির প্রিয় শিক্ষক মীর সোহেল রায়হান ওর পাশে দাঁড়িয়েছেন। ছোট ছোট প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে সাক্ষাৎকার শেষ হলো।
সবাই ফিরে যাচ্ছে। ফেরার সময় সকলেই একনজর রাফির দিকে তাকাতে ভুল করছে না। এক বয়স্ক রসিকজন তো বলেই ফেললেন, ‘হ্যাঁ দাদু, বড় হয়ে এ রকম আরও নতুন ডিভাইস আবিষ্কার করে বিশ্বে তাক লাগিয়ে দেবে। তুমিই স্বপ্নবাজ, তুমিই বাংলাদেশের আশা-জাগানিয়া নতুন প্রত্যাশা।’
রাফি সালাম দিয়ে ঐ বয়স্ক লোকটির সঙ্গে মোসাফাহা করে। রাফির মাথায় হাত বুলিয়ে চুল-দাড়ি সাদা লোকটি দোয়া করে প্রাণ খুলে, ‘বড় হও দাদুভাই, অনেক বড় হও!’
জেলা সদরের শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত একাদশ বিজ্ঞান মেলায় প্রজেক্ট উপস্থাপন করায় সেরা পুরস্কারটা পেয়েছে ক্লাস নাইনের এই মেধাবী ছাত্র রাফি। চমৎকার ট্রফি, সনদপত্র ও ২৫ হাজার টাকা মূল্যের প্রাইজবন্ডের খামটি এখন ওর হাতে।
রাফিদের স্কুলের আরও তিনজন ছাত্র উপজেলা পর্যায় থেকে বিজয়ী হয়ে এই মেলায় প্রজেক্ট উপস্থাপন করলেও তারা জেলায় সান্ত¡না পুরস্কার ছাড়া কিছুই পায়নি। রাফি এখানেও শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছে। তবে অন্যদের মন খারাপ বলা যাচ্ছে না; রাফিকে ঘিরে তাদের মনেও চরম খুশি আর আনন্দের বন্যা বইছে। হইচই-হুল্লোড় করে তারা আনন্দ প্রকাশ করছে নিজেদের মতো। বিভাগীয় পর্যায়ের বিজ্ঞান মেলায় যাবে রাফি। সেখানে বিজয়ী হলে জাতীয় পর্যায়ে যেতে পারবে। জাতীয় সায়েন্স ফেস্টে চমক দেখাবে রাফির প্রজেক্ট-এমন আশা সকলের।
স্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষক সোহেল রায়হান স্নেহের প্রিয় ছাত্রদের নিয়ে গ্রামে ফিরতে তাগাদা দিলেন। মেলাঙ্গন থেকে বের হলো সবাই। কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী আঞ্চলিক সড়কে গিয়ে একটি অটোতে উঠে বসল তারা। অনেকটা ফাঁকা রাস্তায় নতুন অটো শোঁ শোঁ করে শিমুলডাঙ্গি গ্রামের দিকে এগিয়ে চলেছে। আনন্দ আর ফুর্তিতে বাতাসের সঙ্গে ভাসছে যেন তারা সবাই।
অটোরিকশায় গান-কবিতা, আনন্দ-হইচই করতে করতে সোয়া ঘণ্টার মধ্যে তারা উপজেলা শহর পেরিয়ে নিজেদের প্রিয় গড়াই মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে পৌঁছে গেল। ততক্ষণে সূর্য প্রায় অস্তাচলে। গড়াই নদীর তীরে দাঁড়িয়ে দেখা গেল, ডিমের কুসুমের আভায় সূর্যাস্ত হবে এখনই।
অটো থেকে নামতেই স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলায়রত সহপাঠীরা ছুটে আসে। মিছিলের স্লোগানের মতো রাফিকে স্বাগত জানায়-কেউ কেউ ছুটে এসে আনন্দে জড়িয়ে ধরল রাফিকে। ক্লাস নাইনের ছাত্র নাদুসনুদুস মোটা শরীরের জামশেদ রাফিকে কাঁধে তুলে নাচতে থাকে। আনন্দ আর ফুর্তির বন্যা বয়ে যায় ওদের প্রিয় স্কুল আঙিনায়।
ইতোমধ্যে সবাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে রাফির এই কৃতিত্ব আর সফলতার সংবাদ জেনেছে। ওর পুরস্কার গ্রহণের ছবি আর ডিসি সাহেবের মুখে রাফির প্রশংসার খবর ভাইরাল হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই। ভিন্নধর্মী বর্ণনায় ইতিবাচক কমেন্ট, লাইক, শেয়ার আর ভালোবাসার রিঅ্যাকশনে সয়লাব ফেসবুকের নিউজফিড। ছাত্রদের উল্লাসে গ্রামের অনেকেই ছুটে আসছে স্কুল মাঠে।
রাফির ছোট চাচা আরমান সাদীও ভাতিজার কৃতিত্বে চরম খুশি। তিনি মসজিদে মাগরিবের সালাত আদায় করতে বেরিয়েছেন। শিক্ষক সোহেল রায়হানের ফেসবুকে কৃতিত্বের পোস্ট দেখে তিনি ভাতিজা রাফিকে একটি ল্যাপটপ উপহার দিতে চেয়েছেন কমেন্টে। রাফির প্রিয় এই ছোট চাচা আরমান সাদী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির শেষ বর্ষের মেধাবী ছাত্র। টিভিতে বিতর্ক প্রতিযোগিতার জন্য সমগ্র দেশে বেশ পরিচিত তিনি।
ছোট চাচা ছুটে এসে সবাইকে সালাম দিলেন স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায়। রাফিকে জড়িয়ে ধরে কপালে আদর আর চুমোয় ভরিয়ে দিলেন। উপস্থিত সবার মনে সাদীকে পেয়ে আনন্দের মাত্রা বৃদ্ধি পেল। ওদিকে মসজিদে মাগরিবের নামাজের আজান শুরু হয়েছে। সাদী চাচা সবাইকে নিয়ে মসজিদের দিকে পা বাড়ালেন। জানিয়ে দিলেন, নামাজের পরে সবাইকে নিয়ে স্কুলের মাঠে বসতে হবে। পবিত্র হতে অজুখানার দিকে ছুটে চলল তারা।
নামাজ শেষ করে সকলেই হাজির হয় স্কুলের মাঠে। দুর্বাঘাসের প্রাকৃতিক কার্পেটে গোল হয়ে বসেছে তারা ২৫ জন। সোহেল স্যার নামাজ আদায় করেই বাড়ি ফিরে গেছেন। রাফির সহপাঠী ছাড়াও এলাকার অনেকেই যোগ দিয়েছেন তাদের সঙ্গে। সাদী চাচা এখন কিছু প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবেন-এটা সবাই জানে। ঢাকা থেকে বাড়ি এলে মাঝেমধ্যেই তিনি এভাবে বসেন। জ্ঞানগর্ভ কথা বলেন। ছাত্রদের স্বপ্ন দেখান ভবিষ্যতে আদর্শবান ভালো মানুষ হতে। ছাত্ররা কান পেতে মেধাবী ঢাবিয়ান সাদীর কথা শোনে। গড়াই মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এসএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়া সাবেক মেধাবী ছাত্র আরমান সাদী যেন ওদের সকলের প্রিয় আইকন।
ঘাসের কার্পেটের ওপর সবাই বসে আছে নীরবে। সাদী চাচা মোবাইলে কোথাও কথা বললেন কয়েকবার। বেশ চিন্তিত ও নার্ভাস মনে হচ্ছে চাচাকে। নীরবতা ভেঙে তিনি সবাইকে সালাম দিয়ে কথা শুরু করলেন।
‘স্নেহের ভাই ও ভাতিজারা! আজ রাফি যে সুনাম ও খ্যাতি অর্জন করেছে, সেটা সকলের জন্যই গর্বের। ওকে স্পেশাল থ্যাংকস!’ হাততালির আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। চাচা বললেন, ‘সারা দেশে বিদ্যুতের চরম সংকট। লোডশেডিংয়ের ভয়াবহতা দেখলে সহজেই বোঝা যায়। রাফি গবেষণা আর চেষ্টায় এক ইউনিট বিদ্যুৎকে তার আবিষ্কৃত ডিভাইসের মাধ্যমে দশ ইউনিটে রূপান্তরিত করার শতভাগ সফলতা দেখিয়েছে। প্রতিজন বিদ্যুৎ গ্রাহক রাফির যন্ত্রটি স্থাপন করলে খরচ কমে আসবে দশ ভাগের এক ভাগে। এক ইউনিট বিদ্যুৎ এই যন্ত্রটির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দশ ইউনিটে রূপান্তরিত হবে। গ্রাহক এক ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে রাফির ডিভাইসের মাধ্যমে আরও দশ ইউনিট নিজেই উৎপাদন করে নেবে।
এই পরিকল্পনা ও প্রজেক্ট বাস্তবায়ন হলে বিদ্যুৎখাতে দেশ-বিদেশে আর্থিক সাশ্রয় হবে ইনশাআল্লাহ। রাফির ‘সেভ পাওয়ার’ প্রজেক্টকে সে জন্যই বিজ্ঞান মেলা শ্রেষ্ঠ হিসেবে মনোনীত করেছে। তাই এই সফলতার জন্য আগামী সপ্তাহে আমরা তোমাদের ‘অনুশীলন ক্লাব’-এর পক্ষ থেকে রাফিকে সংবর্ধনা দিতে চাই।’ সবাই আবার তালি দিয়ে সম্মতি জানাল।
ক্লাবের উপদেষ্টা সাদী চাচা উপস্থিত ছাত্রদের সামনে উপদেশমূলক, জ্ঞানগর্ভ, পরামর্শসূচক চমৎকার যুক্তিনির্ভর আলোচনা করলেন। সবাই হা করে যেন গিলছিল কথাগুলো। তিনি সবাইকে জাতি, সমাজ ও দেশের জন্য আদর্শিক দেশপ্রেমিক হওয়ার আহ্বান জানালেন। সব সময় ঢাবিয়ান সাদীর কথাগুলো সবাইকে উদ্দীপ্ত, স্বপ্নবাজ, বিপ্লবী হতে উৎসাহিত করে-আজও তার ব্যতিক্রম হলো না।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে সাদী চাচার মোবাইলে আবার কল এলো।
রিসিভ করতেই সাদী ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পাঠ করলেন। তারপর তিনি ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেললেন। উপস্থিত সবাই যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। শোকের পরশে নীরবতায় ছেয়ে গেল চারদিক। ঝোপঝাড়ে ঝিঁঝির একটানা সুর পরিবেশকে আরও শোকময় করে তুলল যেন। চোখের পানি মুছতে মুছতে সাদী চাচা বললেন, ‘আমার প্রিয় বন্ধু শরীফ ওসমান হাদি আর নেই। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শাহাদাত বরণ করেছেন।’ কথাটা শুনে সকলে পড়ল-‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।’ একটু আগে চাচার মন খারাপ হওয়ার কারণ অনুমান করতে কারোর আর অসুবিধা হলো না।
কয়েক দিন আগে চাচার বন্ধু শরীফ ওসমান হাদিকে মাথায় গুলি করেছিল খুনিরা। উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয় তাকে। সেখানেই তিনি শাহাদাত বরণ করলেন। চাচা আর কথা বলতে পারছেন না। উঠতে উঠতে তিনি বললেন-‘সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আপাতত স্থগিত থাক। তোমরা সবাই বাড়ি যাও। আমি রাতের ট্রেনে ঢাকা যাচ্ছি। তোমরা সবাই হাদির মতো সাহসী হও, হাদির মতো বিপ্লবী হয়ে দেশটা সুন্দর করতে তৈরি হও! হাদি হও, বিদ্রোহী বিপ্লবী হাদি হও! আর আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লেখার কারণে নির্মমভাবে প্রাণ হারানো আবরার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো আবু সাঈদ এবং শহীদ হাদির আত্মত্যাগ আমাদের প্রেরণা-এটা ধারণ করো।’
কথাগুলো একনাগাড়ে বলতে বলতে সাদী চাচা রাফির হাত ধরে বাড়ির দিকে পা বাড়ালেন। ততক্ষণে থেমে গেছে ঝিঁঝিদের সুর। জোনাকিরা আলো নিভিয়ে দিয়েছে। পাখিদের সন্ধ্যাকালীন কিচিরমিচির ডাকাডাকির শব্দও বন্ধ হয়ে গেল হঠাৎ করেই। প্রকৃতিতেও যেন শোকের বিষাদসিন্ধুর সূচনা হলো। উপস্থিত সকলেই আরমান সাদীর প্রস্থানে সমস্বরে বলে উঠল-‘আমরা সবাই হাদি হব, প্রয়োজনে জীবন দেব!’
সন্ধ্যাকালের নিস্তব্ধ গ্রামীণ নীরবতা ভেদ করে গড়াই মাধ্যমিক স্কুলের সবুজ মাঠের গণ্ডি পেরিয়ে তাদের এই আশা-জাগানিয়া আওয়াজ সাঁঝের আঁধার ভেদ করে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল বাতাসের সঙ্গে-কোটি কোটি বিপ্লবী কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীর মাঝে।
সারা দেশ ছাড়িয়ে বিশ্বের দিকদিগন্তে সেই সাঁঝের আওয়াজ ইথারে যেন ছুটতে থাকল তীব্র গতিতে।
আরও পড়ুন...