শহীদের মা
কুরআনের আলো বিলাল হোসাইন নূরী জুলাই ২০২৬
ফাতেমা খানমের হাত দুটো আজকাল কাঁপে।
রান্না করতে গেলে কাঁপে। কাপড় ভাঁজ করতে গেলে কাঁপে। আর চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে লোনা পানির অবিরল ধারা। হয়তো তার সাথে আরশও কেঁপে ওঠে। আসমানের ঠিক যে জায়গাটা দিয়ে সিয়ামের রুহটা ওপরে উঠে গিয়েছিল, হয়তো সে জায়গাটাও কাঁদে। যে মাটিতে তার রক্ত ঝরেছিল-সে মাটিও না কেঁদে থাকতে পারে না!
সবাই বলে-বেচারি পাগল হয়ে গেছে!
পড়াশোনা শেষ করে একটা চাকরি খুঁজছিল সিয়াম। বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। চোখে তার অথই স্বপ্নের তারা। হঠাৎ সরকারি চাকরিতে কোটা বহালের খবর যেন সবকিছু এলোমেলো করে দেয়। জেগে ওঠে বাংলাদেশের মেধাবীরা। প্রতিবাদে জ¦লে ওঠে বিশ^বিদ্যালয়গুলো। উত্তপ্ত হয় রাজপথ।
অধিকার চাইতে গিয়ে তাদের পেতে হলো ‘রাজাকারের নাতি-পুতি’ তকমা! রাতের আঁধারে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়! সবার কণ্ঠে অভিনব স্লোগান-‘তুমি কে, আমি কে? -রাজাকার! রাজাকার!’
পরদিন আন্দোলনকারীদের ওপর শুরু হয় একের পর এক হামলা। আহত হয় শত শত শিক্ষার্থী। এবার ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। রংপুরে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদ। এরপর যেন আর পেছনে ফেরার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীরা ঘোষণা করে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’।
সিয়াম বলল-মা! আমিও মিছিলে যাব।
মা বললেন-না! তুই যাবি না। আমাদের চাকরির দরকার নেই, বাবা। চাকরির চেয়ে জীবন অনেক দামি।
সিয়াম বলল-তা আমি জানি, মা। তবে এ জুলুমের শেষ দেখা দরকার। এ দেশে এখন আর কেউই নিরাপদ নয়। আমরা বসে থাকলে চলবে না, মা! দেখো আল্লাহ কী বলেছেন-
‘আর তোমাদের কী হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহর পথে এবং সেইসব অসহায় পুরুষ, নারী ও শিশুদের পক্ষে লড়াই করছ না, যারা বলছে-হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এ জনপদ থেকে বের করুন, যার অধিবাসীরা জালিম এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একজন অভিভাবক নির্ধারণ করে দিন। আর আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য নিযুক্ত করে দিন একজন সাহায্যকারী।’ [সূরা আন-নিসা : ৭৫]
সিয়াম বের হয়ে গেল ঘর থেকে।
এদিকে সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়। জাতিকে অন্ধকারে রেখে শুরু হয় নির্মম হত্যার খেলা। এখানে-সেখানে পড়ে থাকে লাশ আর লাশ! এমনকি অসংখ্য লাশ পুড়িয়েও দেওয়া হয়। লড়াই দীর্ঘ হতে থাকে। জুলাই মাস যেন আর শেষই হচ্ছিল না। এরপর লাখ লাখ মানুষ বেরিয়ে পড়ে ঢাকার রাস্তায়। জালিম পালিয়ে যায়। মুক্তি পায় মানুষ।
অথচ সিয়াম আর ফেরেনি।
সিয়াম আর ফিরবে না। তবুও মায়ের মন বলে, এই বুঝি ফিরে এলো তার কলিজার ধন!
আরও পড়ুন...