শীতের পরিযায়ী পাখি
ফিচার ড. রফিক রইচ জানুয়ারি ২০২৬
শীতকাল সত্যিই সুন্দর। সুন্দরের মাত্রাকে শতগুণ বাড়িয়ে তুলতে ভিন দেশ থেকে আসা পরিযায়ী পাখিদের তুলনা নেই। এসব পরিযায়ী পাখিদের অনেকেই অতিথি পাখি বলে থাকে। এমনকি ফেসবুক ইউটিউবসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলেও পরিযায়ী পাখিদের অতিথি পাখি বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু অতিথি পাখি সঠিক পরিভাষা নয়। কারণ হলো, পাখি কোনো দেশের অতিথি নয়। পরিযায়ী পাখি বলাটাই বিজ্ঞানসম্মত পরিভাষা। কাজেই শীতকাল বা শীতের আগে আমাদের দেশে আসা এসব পাখিদের আমরা অতিথি পাখি না বলে পরিযায়ী পাখি বলব।
নির্দিষ্ট ঋতুতে যে সব পাখি খাবার অথবা বেঁচে থাকার তাগিদে অনুকূল আবহাওয়ার সন্ধানে এক দেশ থেকে অন্য দেশে নিয়মিতভাবে পরিযানের মাধ্যমে যাতায়াত করে তাদের পরিযায়ী পাখি বলে।
পরিযায়ী পাখিগুলো যে সব দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করে সে সব দেশ বরফে ঢেকে যাওয়ায় ভয়াবহ ঠাণ্ডাজনিত কারণে খাদ্য সংকট হলে এবং বেঁচে থাকার পরিবেশ বিঘিœত হলে অধিকতর উষ্ণ দেশে চলে আসে। এদিক থেকে আমাদের বাংলাদেশ এসব পাখিদের খুব পছন্দের। বছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাস থেকে পরিযায়ী পাখি আসতে শুরু করে এবং মার্চ মাসের শেষের দিকে আবার ফিরে যায়।
সাধারণত পরিযায়ী পাখিগুলো ৬ থেকে ৭ মাস পর্যন্ত অবস্থান করে আমাদের দেশে। তারপর আবার ফিরে যায় মা মাটি ও দেশের টানে। ভালোবাসার আসল স্থানে।
পরিযায়ী পাখি প্রজাতির সংখ্যা বাংলাদেশে প্রায় ২৫০-৩০০টি। এগুলোর মধ্যে শীতকালে আসা পরিযায়ী পাখি প্রজাতির সংখ্যা ২১০টি। বাদ বাকি পরিযায়ী পাখিগুলো আমাদের দেশে আসে বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে।
এসব পাখিগুলো বাংলাদেশের কাপ্তাই, নিঝুমদ্বীপ, চর কুকরি-মুকরি, রামসাগর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, নীলফামারী জেলার নীল সাগর দিঘি, সর্ববৃহৎ হাওড় হাকালুকি, সিলেট অঞ্চলের বাইক্কা বিলসহ বিভিন্ন বিল-ঝিল ও বাওড়ের বাঁকে বাঁকে আশ্রয় নেয়। এসব স্থানকে অভয়ারণ্য হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। অভয়ারণ্য হলো একটি নির্দিষ্ট এলাকা যে এলাকায় প্রবেশ করা, প্রাণীদের শিকার করা, বিরক্ত করা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিষিদ্ধ থাকে।
একটি ছকের মাধ্যমে বাংলাদেশে আসা কতগুলো পরিযায়ী পাখিদের অঞ্চলিক নাম, বিস্তার ও বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হলো-
| ক্রম | আঞ্চলিক নাম | যে স্থানে পাওয়া যায় (বিস্তার) | বৈজ্ঞানিক নাম |
| ০১ | লেন্জা হ্যান্স | কাপ্তাই, নিঝুমদ্বীপ | Anas acuta |
| ০২ | লালশীর | নিঝুমদ্বীপ, চর কুকরি-মুকরি | Anas penelope |
| ০৩ | জিরিয়া হ্যান্স | রাম সাগর | Anas querquedula |
| ০৪ | পিয়ং হ্যান্স | রামসাগর, নিঝুমদ্বীপ | Anas strepera |
| ০৫ | কোরাজ হ্যান্স | নিঝুমদ্বীপ, চর কুকরি-মুকরি | Anas indicus |
| ০৬ | কালি হ্যান্স | নিঝুমদ্বীপ, চর কুকরি-মুকরি | Aythya fuligula |
| ০৭ | মৌলভী হ্যান্স | নিঝুমদ্বীপ, চর কুকরি-মুকরি | Rhodonessa rufina |
| ০৮ | বালি হ্যান্স | রামসাগর, সুন্দরবন | Nettapus coroman delians |
| ০৯ | লাল চোখা | নিঝুমদ্বীপ, চর কুকরি-মুকরি | Tadorna ferruginea |
| ১০ | সাহ্ চোখা | নিঝুমদ্বীপ, চর কুকরি-মুকরি | Tedorna tadorna |
| ১১ | হুদহুদ পাখি | আশ্রয় প্রদ সব অঞ্চল | Upupa epops |
| ১২ | নীল থ্রাস | বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চল | Monticola solitarlus |
এ ছাড়াও গ্যাডওয়াল, বড় সরালী, বামনীয়া, গো বক, সাদা বক, মাঝলা বক, জল ময়ূর, গঙ্গা কবুতর, পিন্টেল, পান মুরগি, কাস্তেচড়া, বেগুনি কালেম, দলপিপি পাপিয়া, গুলিন্দা, গ্রিধিনি ও সৈকত পাখিসহ আরও কতরকম যে পরিযায়ী পাখি আসে তা বলে শেষ করার মতো নয়।
পরিযায়ী পাখিগুলোর এক একটি রাজকীয় রংধনু চেহারা। রং-বেরঙের ডানার ঝাপটানো দেখলে মন খুশিতে নেচে ওঠে। ওরা নিজেরা নিজেদের ভাষা বুঝতে পারে। সে মতো চলতে ফিরতে পারে। পাখিপ্রেমিক যেকোনো মানুষও এসব পাখিদের ভাষা বুঝতে পারে। পাখিপ্রেমিক হলে যে কেউ বুঝতে পারবে ওদের ভাষা ও ভাষার প্রকাশ। আমাদের দেশে কিন্তু অনেক পাখিপ্রেমিক ও পাখি বিশেষজ্ঞ আছে। তাদের মধ্যে আছেন-ড. আলী রেজা খান, সালীম আলি, অজয় হোম, শরীফ খানসহ আরও অনেকে। যারা নিরন্তর পাখি নিয়ে গবেষণা করছেন। পাখি নিয়ে কাজ করছেন যারা, তারা পাখির ভাষা ও ভাষার প্রকাশটা পাখির দিকে তাকালেই খুব সহজেই বুঝতে পারেন।
যাহোক, পরিযায়ী পাখিগুলো দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশের তাৎপর্যপূর্ণ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তারা ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষিকাজে সহায়তা করে। বীজ বিস্তার ও পরাগায়নে সাহায্য করে জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে অনন্য অবদান রাখে। এদের বিষ্ঠা মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে এবং পরিবেশের অবস্থা ভালো না খারাপ তা নির্দেশক হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ যে অঞ্চলে যত বেশি পরিযায়ী পাখি আগমন করে, সে অঞ্চলের পরিবেশ তত ভালো বলে বৈজ্ঞানিকভাবে বিবেচিত হয়।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব পরিযায়ী পাখি আগমনের সংখ্যা আমাদের দেশে দিনদিন কমতে শুরু করেছে। কারণ আমরা মানুষেরা বড় অমানুষের মতো নির্দয় ও নিষ্ঠুরভাবে গুলি করে করে নিরীহ এসব পাখিদের শিকার করছি। খাচ্ছি দানব দাঁতালের মতো তাদের মাংস। ক্রমাগত ধ্বংস করছি তাদের আশ্রয়ের জায়গাগুলো। যা মোটেই কাম্য নয়।
পরিশেষে পাখিপ্রেমিক, গবেষক ও নিবিড় পাখি পর্যবেক্ষক শরীফ খানের “বাংলাদেশের পাখি” বইতে লেখা দুটি উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করছি।
“পাখি শিকার করেছি, মাংস খেয়েছি এ কথা মনে পড়লে আজ আমার প্রবল কষ্ট হয়। আমি তো শুধু পাখিদের খুন করিনি, খুন করেছি প্রাকৃতিক পরিবেশকে। আমার উত্তরসূরিদের ওপর প্রতিশোধ নেবেই নেবে প্রকৃতি।”
“আমার দাদার বাবা যা দেখেছিলেন, আমার দাদা তা দেখেননি। বাবা দেখেছেন আরও কম। আমি তো দেখলাম যৎকিঞ্চিৎ। আজ আমি যা দেখছি, তা হয়তো আগামী ৫০ বছর বাদে আমারই উত্তরসূরি বিশ্বাস করবে না।”
আরও পড়ুন...