শব্দ ভয়ংকর

গল্প হাসনাইন আহমদ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

হিমেল যেখানেই যাবে একটা না একটা কাণ্ড ঘটিয়ে তবেই ফিরবে। বিভাগীয় স্কাউট জাম্বুরীতে ওদের স্কুল থেকে ১৮ জনের একটি টিম অংশগ্রহণ করেছে। তার মধ্যে সে-ও আছে। ক্যাম্পে সারা দিনই একটার পর একটা ইভেন্ট চলতে থাকে। ইভেন্টগুলোকে ভেঞ্চার বলা হয়। দুপুরে খাওয়ার পর মাঠে হাইকিং ও প্যারেড। সন্ধ্যার মধ্যেই মাঠের কাজ শেষ। রাতে ক্যাম্প ফায়ার শেষে ঘুমের প্রস্তুতি। 

সারা দিনের একরাশ ক্লান্তি জড়িয়ে রেজিমেন্টের সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। হিমেলও ঘুমে। শোবার সময় টয়লেটে যেতে ভুলে গিয়েছিল। তাই মাঝরাতে বেশ চাপ ধরে। হিমেল আস্তে উঠে পা টিপে টিপে টয়লেটে যায়। 

ক্যাম্প স্পটটি টিলাবেষ্টিত ও গাছগাছালিতে ভরা। ওদের রেজিমেন্টের তাঁবু থেকে টয়লেট একটু দূরে। টয়লেটে যাওয়ার পথে বৈদ্যুতিক বাল্বের অনুজ্জ্বল আলো। ক্লাস নাইনে পড়ু–য়া হিমেল ছোটবেলা থেকেই বেশ সাহসী। এমন গা ছমছম নীরব গভীর রাতে একা একা টয়লেটে যাওয়া ওর জন্য তেমন কিছুই না। 

টয়লেটের একটু দূরে ঘন জঙ্গল। হিমেল কাজ সেরে টয়লেটের সামনে রাখা সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করছিল। পশ্চিম দিকের ঘন জঙ্গলে হঠাৎ নজর পড়তেই ও চমকে ওঠে। কী যেন নড়াচড়া করছে! ভরা পূর্ণিমার আবছা আলোয় দূর থেকে যতটুকু দেখা যায়, তাতে একাধিক কিছুর অস্তিত্ব বোঝা যায়। হিমেল যতই সাহসী হোক না কেন, মনের মধ্যে একধরনের শিরশির হিম বাতাস বয়ে যায়।

ভূতটুত নাকি আবার? ধুর কী আবোলতাবোল ভাবছি। পৃথিবীতে ভূত বলে কিছু আছে নাকি? গাজী স্যার না সেদিন ক্লাসে এত সুন্দর করে বুঝিয়েছেন। অহেতুক এসব ভাবছি।

মনের অজান্তেই নিজেকে শাসন করে হিমেল।

তাহলে কী ওখানে?

আচ্ছা যা হয় হোক। আমার কী তাতে?। চুপচাপ গিয়ে শুয়ে পড়ি।

মনে মনে বিড়বিড় করে তাঁবুর দিকে পা বাড়াতেই হঠাৎ ধ্রাম করে কিছু একটা পড়ার আওয়াজ কানে আসে।

হিমেল ঘুরে দাঁড়ায়। দূরে তাকিয়ে এদিক-ওদিক দেখে। কই তেমন কিছুই তো দেখা যাচ্ছে না। কয়েক সেকেন্ড পর দেখতে পায়, জঙ্গলের দিকে কিছু একটা নড়ছে। হিমেল কী করবে ভেবে পায় না। সামনে এগিয়ে দেখবে নাকি? নাহ, এ অবস্থায় একা যাওয়া মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। হিমেল তাবুতে চলে যায়। 

পরদিন সকালবেলা হিমেল জামিলকে সব ঘটনা খুলে বলে। ওরা একই স্কুলে পড়ে। ক্লাসে দুজনের ভালো বন্ধুত্ব। ক্যাম্পে একই রেজিমেন্টের সদস্য। জামিল খুব অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়। হিমেলের কাছে সব ঘটনা শুনে জামিলের কান খাড়া হয়ে যায়। ‘কী বলিস? ওটা কি আসলেই ভূত? নাকি অন্য কিছু? চল তো, গিয়ে দেখি।’

দুপুরে বিশ্রামের বিরতির সময়ে দু বন্ধু পশ্চিমের জঙ্গলের দিকে যায়। বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর দেখতে পায়, সেখানে একটি পুরোনো পরিত্যক্ত ঘর। ঘরটির কিনার ঘেঁষে ক্যানেল। ক্যানেলটি কাদায় ভরা। জামিল পরখ করে দেখে। কাদার মধ্যে একধরনের ছাপ দেখা যাচ্ছে। পায়ের ছাপের পাশে পাশে বড় কিছুর ছাপও দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কোনো কিছু টেনেহিঁচড়ে নেওয়া হয়েছে। কিছুই বুঝতে পারে না ওরা। উঁকি মেরে দেখে ঘরটি সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত। কারো বসবাস নেই। 

তাহলে কী হয়েছে এখানে গতরাতে?

হিমেলের প্রশ্ন শেষ হতে না হতেই জামিল বলল, ‘ব্যাপারটা বেশ ভূতুড়ে আবার রহস্যজনকও।’

‘চল তো পাশের দোকানদারদের কাছে জিজ্ঞেস করে দেখি কিছু জানা যায় কি না।’

‘আচ্ছা চল।’

দুই বন্ধু ক্যাম্পের বাইরে চলে যায়। দোকানদারদের সাথে কথা বলে পরিত্যক্ত বাড়িটির বিষয়ে জানার চেষ্টা করে। 

বয়স্ক চা-দোকানদার বলল, ‘অই জায়গাডা বেশি বালা না। মাজে মইদ্যে রাতের কালে ওইখান থাইক্যা ভূতের আওয়াজ আসে। কিছুদিন আগে ওই পথ দিয়া যাওনের সময় একজন লোক হারায়া গেছে। ওই ভূতের বাড়ির আশেপাশে প্রায়ই দিনের বেলাও গরু-ছাগল নাই হয়া যায়। সন্ধ্যার পর আমরা ভুলেও কেউ ওই পথে পা বাড়াই না।’

‘এ রে তিনটা তেত্রিশ বেজে গেছে! মাঠে প্যারেডের কাজ শুরু হয়ে গেছে। আমাদের না পেলেই খোঁজাখুঁজি লেগে যাবে।’

‘আচ্ছা চল দ্রুত যাওয়া যাক।’ বলেই হিমেল ও জামিল জাম্বুরী মাঠে চলে গেল। 


হি হি.. হাহ হাহ..

রাত দশটা ত্রিশ। সকালে ভোরের পাখি থেকে শুরু করে সারাদিনের ভেঞ্চার শেষে রাতে হাইকিং, গ্রিন ডিভেট শেষ করে সবাই ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে। 

জামিল হিমেলকে পাশে ডেকে নিয়ে বলল, ‘চল, আজ রাতে আমরা দেখব ওখানে আসলে কী হয়। কিরে পারবি না? নাকি আবার ভয়ে প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলবি?’

‘তুই আমাকে এভাবে আন্ডার এস্টিমেট করবি না। আমি কিন্তু ভীতু না। গত বছর জাফলংয়ে স্ট্যাডি ট্যুরের কথা ভুলে গেছিস? রাসেলস ভাইপার সাপটা কিন্তু শেষমেশ আমিই মারতে পেরেছি।’

‘আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে! এমনিই মজা করেছি।’

সবার সাথে সাথে ওরা দুজনও শুয়ে পড়ে। ঘুমের ভান ধরে থাকে। 

রাত বারোটা দশ। রেজিমেন্টের সবাই ঘুমিয়ে পড়লে ওরা দুজন উঠে আস্তে আস্তে তাঁবু থেকে বের হয়।

পশ্চিম দিকে একটু এগিয়ে একটা গাছের আড়ালে দাঁড়ায়। আসার সময় জামিলের ব্যাগে থাকা ছোট টর্চটি নিতে ভুল করেনি। পাশের নির্মাণাধীন অফিস বিল্ডিংয়ের নিচ থেকে হিমেল একটা রডের টুকরা নিয়ে নেয়। 

হিমেল বলে, ‘জানিস, দাদি বলেছে-লোহাজাতীয় জিনিসকে ভূত ভয় পায়। তাই সাথে করে এ লোহার রড নিয়ে এসেছি।’

হিমেলের কথায় হো হো করে হাসে জামিল।

হঠাৎ দূর থেকে ভেসে আসা অদ্ভুত শব্দে জামিলের হাসিতে ছেদ পড়ে। পরিত্যক্ত বাড়িটির দিক থেকেই আওয়াজ আসছে, হি-হি-হি... হাহ-হাহ-হা...

দুজনের গা ছমছম করে ওঠে। সাহস করে কিছুক্ষণ থাকার পর দেখতে পায়, কী যেন নড়াচড়া করছে। পরিত্যক্ত বাড়ির দিকেই কিছু একটা এগিয়ে যাচ্ছে। একসাথে বেশ কয়েকটি। ছায়ার মতো। কী করবে ভেবে পায় না হিমেল ও জামিল।

হিমেল বলল, ‘চল, আমরা টর্চ জ্বেলে সামনে যাই।’

‘না, এটা করা একদম বোকামি হবে। কোনো রকম প্রস্তুতি ছাড়া এভাবে যাওয়াটা বিপজ্জনক হতে পারে। ক্যাম্পের তো আরও তিন দিন বাকি আছে। আমরা বরং এখন যাই। দিনের বেলা ওখানে গিয়ে দেখা যাবে। কোনো না কোনো ক্লু অবশ্যই পাওয়া যাবে।’

ওরা আজকের মতো তাঁবুতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। 


২৪ক৯১৬-৯৯৯৯

পরদিন সকালবেলা। নাস্তার ফাঁকে পরিত্যক্ত বাড়িটির ওখানে যায় দুই বন্ধু। তীক্ষèদৃষ্টিতে চারদিক পরীক্ষা করে দেখে, ক্যানেলের কিনারটা বেশ শুকনা। খুব সাবধানে ক্যানেলের কিনার দিয়ে পা টিপে টিপে ভূতুড়ে বাড়িটির ভেতরে ঢুকল। ভেতরে তেমন কিচ্ছু নেই। একপাশে একটা ভাঙা খাট। আরেক পাশে একটা কাঠের আলমারি। আলমারি মানে আলমারির কঙ্কাল পড়ে আছে বলা চলে। জামিল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ঘরটি পরখ করে। হঠাৎ একপাশে পড়ে থাকা একটি জিনিসের দিকে নজর যায়। একটা ছোট লালরঙের প্যাকেটের মতো দেখতে। হাতে নিয়ে দেখে প্যাকেটটির গায়ে ইংরেজিতে কিছু সংকেত লেখা। কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। 

হিমেল বলল, ‘চল, প্যাকেটটি সাথে নিয়ে যাই।’

প্যাকেটটি নিয়ে ওরা ক্যাম্পে চলে যায়।

দুপুরে খাবারের বিরতির সময় ওরা নাফিসকে সব খুলে বলে। নাফিস ওদের রেজিমেন্টের সদস্য। ওদের সাথে বেশ সুসম্পর্ক হয়েছে ইতোমধ্যে।

নাফিস বলল, ‘দে তো প্যাকেটটা। দেখি কিছু বোঝা যায় কি না।’ 

নাফিস জামিলের কাছ থেকে প্যাকেটটি নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে। 

এতে লেখা আছে, ২৪ক৯১৬-৯৯৯৯. নাফিস বলল, ‘অ্যা, এটা তো অন্য কিছু মনে হচ্ছে!’

‘কী হতে পারে?’ উৎকণ্ঠার সাথে জানতে চায় হিমেল-জামিল। 

‘এটা গোল্ডবারের প্যাকেট মনে হচ্ছে।’

‘গোল্ডবার! মানে সোনার প্যাকেট?’ 

জামিলের বাবা সোনার ব্যবসা করেন। সে সুবাদে জামিল বাবার দোকানে গিয়ে বাবার কাছ থেকে এসব কোড শিখেছে। 

এটি ২৪ ক্যারেট, মানে ভালো মানের সোনার বারের প্যাকেট।

‘তাহলে তো মনে হয়, এখানে অন্য কোনো ব্যাপার আছে। বড়সড়ো ব্যাপার!’

‘কী করতে পারি আমরা?’

‘চল, ক্যাম্প ইনচার্জকে সব জানাই গিয়ে।’

নাফিস বলল, ‘আমার মনে হয়, তা ঠিক হবে না। এর পেছনে বড় কেউ জড়িত আছে। আমাদের এ রহস্য উদ্ধার করতেই হবে।’

জামিল বলল, ‘আমাদের ক্যাম্পও আর মাত্র দুদিন বাকি। সময়ও বেশি নেই। আচ্ছা আমরা পুলিশকে সব জানালে কেমন হয়?’

জামিলের কথায় নাফিস-হিমেলও সায় দিলো। 

‘কিন্তু কীভাবে পাব পুলিশদের?’

হিমেল বলল, ‘এক কাজ করা যেতে পারে। আমার কাছে স্মার্টফোন আছে। বন্ধ করে ব্যাগে এনেছি। ওটা দিয়ে গুগল করে দেখা যায়, থানা এখান থেকে কত দূর। অথবা থানার ফোন নম্বর।’

হিমেল সার্চ দিয়ে দেখে খুব কাছেই গোলাপগঞ্জ থানা। ফোন নম্বরও পেয়ে যায়। ফোন করে সংক্ষেপে সব ঘটনা খুলে বলে।

অপর প্রান্ত থেকে ওসি বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে হচ্ছে ওখানে কোনো অস্বাভাবিক কিছু ঘটছে। আমি তোমাদের সাথে দেখা করতে চাই।’

পরদিন সকালে ওসির সাথে দেখা হয়। সব ঘটনা শুনে ওসি কামরুল ইসলাম বললেন, ‘আগামীকাল রাতে আমরা ওখানে সার্ভিল্যান্স অপারেশনে যেতে চাই। তোমরা আমাদের সহায়তা করতে পারবে?’

‘হ্যাঁ আঙ্কেল, পারব ইনশাআল্লাহ।’


ভূত কুপোকাত

পরদিন। ক্যাম্পের সবাই গভীর ঘুমে। পরিকল্পনা অনুযায়ী পুলিশের সশস্ত্র টিম রাত বারোটা থেকেই চারপাশে সতর্ক অবস্থান নেয়। হিমেল, জামিল, নাফিস ওসির সাথে। সবার তির্যক দৃষ্টি পরিত্যক্ত বাড়িটির দিকে। কিন্তু আজ কোনো সাড়াশব্দ নেই। সবাই হতাশ। এভাবে অনেকক্ষণ পার হয়ে যায়। 

হঠাৎ দূরে একটা আলো দেখা গেল। বেশ দূরে। যেদিকে নাফ নদীর শাখা এসে মিশেছে। এ নদীর ওপারে অন্য দেশের বর্ডার। নৌকা থেকে কয়েকজন নামছে। অনেকক্ষণ ধরে আলোটা একই জায়গায় আটকে আছে। বেশ কিছুক্ষণ পর দেখা গেল আলোটা আস্তে আস্তে এদিকে আসছে। পরিত্যক্ত বাড়ির দিকে যাচ্ছে। পুলিশের টিম বেশ সতর্ক। চারদিক ঘিরে ফেলেছে। ওরা টের পেয়ে গেছে মনে হয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধ্রাম ধ্রাম আওয়াজ। ওরা এলোপাথাড়ি গুলি ছুঁড়তে থাকে। পুলিশও পালটা গুলি করে। অন্ধকারে কিচ্ছু বোঝা যাচ্ছে না। ওসি হিমেলদের নিরাপদ দূরত্বে গাছের আড়ালে নিয়ে যায়।

অবশেষে হাতেনাতে চারজনকে ধরে ফেলে। সাথে পাওয়া যায় কয়েক কার্টন স্বর্ণ। এরা আসলে স্বর্ণ চোরাকারবারী! পুলিশের হাতে উত্তম মধ্যম খাওয়ার পর সব স্বীকার করে। জায়গাটিকে তারা সোনা চোরাচালানের নিরাপদ ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছিল। অন্য দেশ থেকে নদী পথে ভারত হয়ে স্বর্ণ চোরাচালান করত। এ কাজে পরিত্যক্ত বাড়িটিকে তারা বেছে নিয়েছিল। কৃত্রিমভাবে ছড়িয়েছিল ভূতের হাসি।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ