সবার আগে বাংলা ভাষা
প্রবন্ধ নিবন্ধ সৈয়দ ইশতিয়াক ফেব্রুয়ারি ২০২৬
আচ্ছা ধরো, পৃথিবীতে আমাদের কোনো ভাষা নেই। আমরা কেউ কথা বলতে পারছি না। না কাজের কথা। না মনের কথা। না পরস্পরের সম্পর্কের কথা, কোনো কথাই বলার অবকাশ নেই। কেমন হতো!
মনে করো, ক্ষুধায় চোঁ-চোঁ করছে পেট, কিন্তু বলতে পারছ না। অসুস্থ কিন্তু বলা যাচ্ছে না। কষ্ট পাচ্ছ কিন্তু প্রকাশ করতে পারছ না। এভাবে দুঃখ, সুখ, আনন্দ, বেদনা, আশা, স্বপ্ন কোনো কিছুই বলার সুযোগ নেই-এমন পরিবেশ কি কল্পনা করা যায়! না, একদমই না। কী করে কল্পনা করব! ভাষাহীন মুহূর্ত কোনোমতেই কল্পনা করা যায় না। তাহলে? তাহলে আর কি, ভাষা আমাদের অর্থাৎ মানুষের এক বিস্ময়কর গুণ। এ গুণের কারণেই আমরা মানুষ হিসেবে পৃথিবীর সকল প্রাণী ও পরিবেশের বিষয় প্রকাশ করতে পারি। তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারি। তাদের নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল করতে পারি।
এ ভাষার মাধ্যমেই আমরা আমাদের জীবনের সকল কিছু বর্ণনা করতে পারি। সকল প্রয়োজনের কথা বলতে পারি। যদি ভাষা না থাকত, আমরা কীভাবে লেখাপড়া শিখতাম। কীভাবে কবিতা লিখতাম, গল্প লিখতাম, উপন্যাস এবং ছড়া কিংবা গান লিখতাম! কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে-এ ভাষা কীভাবে সৃষ্টি হলো? ভাষা কি মানুষ সৃষ্টি করেছে? নাকি আপনা-আপনি সৃষ্টি হয়েছে। এর জবাব এককথায় না! না মানে না! অর্থাৎ মানুষ ভাষা সৃষ্টি করেনি। আপনা-আপনিও সৃষ্টি হয়নি। ভাষা সৃষ্টি করেছেন এই বিশ্বজগতের যিনি মহান স্রষ্টা তিনিই। যিনি সকল সৃষ্টির স্রষ্টা। যিনি মানুষের ¯্রষ্টা। মানুষকে সৃষ্টি করে, মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছেন ভাষা। সে ভাষায় কথা বলে মানুষ। কথা বলো তুমি, আমি তিনি। সকলেই।
এখানে একটি প্রশ্ন হতেই পারে-পৃথিবীর দেশে দেশে বিচিত্র মানুষ। বিচিত্র জাতি। একেক দেশে একেক ভাষা। একেক জাতি একেক ভাষায় কথা বলে। তাহলে পৃথিবীতে ভাষা সংখ্যা কত?
আসলেই তো!
ভাষা সংখ্যা কত পৃথিবীতে? কত ভাষায় কথা বলে মানুষ? কেন এত ভাষা দুনিয়ায়? কত কত প্রশ্ন! কত জিজ্ঞাসা! এসব জিজ্ঞাসা হয়তো অনেকেরই।
পৃথিবীতে কত ভাষা এর ঠিক সংখ্যাটি বলা বড় মুশকিল। কেননা, এত এত ভাষায় কথা বলে মানুষ। কী করে এর সংখ্যা নির্ণয় করবে মানুষ। তবুও সংখ্যাটি জানার কৌতূহল আছে মানুষের। সেই কৌতূহল থেকেই একটি জরিপ চালিয়েছে এস আই এল নামে একটি সংস্থা। এটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান। এস আই এল-এর পুরো নাম হলো-সামার ইনস্টিটিউট অব লিঙ্গুইস্টিক। জরিপটি হয়েছে ২০০৯ সালে। পৃথিবীতে ভাষার সংখ্যাটি কত হতে পারে? কিছু মানুষকে এমনই প্রশ্ন করেছিল সংস্থাটি। জবাবে কেউ বলেছেন-কত আর হবে ১০০টি। কেউ বলেছেন ৮০। কেউবা ৯০। কেউ সংখ্যাটি বাড়িয়ে বলেছিল ১৫০ বা ২০০।
কিন্তু মজার বিষয় হলো, বিবিসির জরিপের ফলাফল শুনে বিস্ময়ে কপালে উঠেছে সবার চোখ! জরিফের ফলাফলে উঠে এলো ভাষার সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার। নির্দিষ্ট সংখ্যাটি হলো, ৬৯০৯টি। নিশ্চয় হয়তো অবাক হচ্ছ তুমিও। অবাক হওয়ারই কথা। এত ভাষা! কেন? কারণ কত ভাগে যে ভাগ হয়েছে মানুষ। কত জাতি এ পৃথিবীতে! যখন মানুষ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যায়, সে জায়গায় নিজেদের কিছু ভাষা থাকে। মূল ভাষার সাথে সে ভাষাগুলো যোগ হতে থাকে। এভাবে অনেক বছর ধরে যখন ভাষা যোগ হয় তখনও নতুন ভাষা সৃষ্টি হয়।
মানুষ তো এক আদম ও হাওয়া থেকে এসেছে। কিন্তু ভাষা এত হলো কী করে। সত্য হলো, হযরত নুহ (আ)-এর সময়ের প্লাবনের পর ভাষার বৈচিত্র্য শুরু হয়। পৃথিবীর প্রথম মানুষ হযরত আদম (আ) এবং তাঁর সন্তানরা আরবি ভাষায় কথা বলতেন। হযরত নুহ (আ)-এর বংশধারা পৃথিবীর নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। সেই ছড়িয়ে পড়া মানুষগুলো তাদের আয়োজন ও প্রয়োজনে ভাষার বৈচিত্র্য এনেছেন। মজার বিষয় হলো, ভাষা সৃষ্টি করেছেন মহান আল্লাহ তায়ালা। তিনিই সকল ভাষার ¯্রষ্টা।
এখন প্রশ্ন হলো, এই যে হাজার হাজার ভাষা, এগুলো সব শোনা যায় না কেন? অল্প কটি ভাষাই তো শুনি আমরা।
এর কারণ হলো, অনেক ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। আবার অনেক ভাষা অল্প কিছু মানুষ বলে। এখন পৃথিবীতে ৪০% ভাষা হারিয়ে যাওয়ার পথে। এই সংখ্যাটি ২৮৯৫টি। এত এত ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে! ইস!
এখানে আরও অবাক করার বিষয় হলো, সারা পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি মানুষ কথা বলে মাত্র ২৩টি ভাষায়। আবার এই ২৩ ভাষার মধ্যে প্রধান ১০টি ভাষায় কথা বলে সবচেয়ে বেশি মানুষ।
জাতি যেমন আছে পৃথিবীতে। তেমনই আছে উপজাতি। উপজাতিদেরও নিজস্ব ভাষা আছে। জাতি ও উপজাতি মিলে ভাষার সংখ্যা বেড়েছে। বহু জাতিও পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। জাতি বিলুপ্ত হলে সে জাতির ভাষাও বিলুপ্ত হয়ে যায়। এভাবে কোনো কোনো জাতির লোক সংখ্যা কমতে থাকে। মারা যায়। অথবা অন্য কোনো জাতির সাথে মিলে যায়। তখনও ভাষা বিলুপ্ত হয়।
আবার কোনো কোনো দেশে এক ভাষায় কথা বলে বেশি মানুষ। একইভাবে কোনো কোনো দেশে অল্প লোক অনেক ভাষায় কথা বলে। যেমন : পাপুয়া নিউগিনির কথা ধরা যাক। এদেশে লোক সংখ্যা ৪০ লাখেরও কম। অথচ
ভাষা সংখ্যা ৮৩২টি। কী, বিস্ময় লাগছে! বিস্ময় হলেও এটিই সত্যি!
ভারতেও প্রায় ১ হাজারের বেশি ভাষা আছে। এমন করেই ভাষার সংখ্যা বেড়েছে।
ভাষা মহান আল্লাহ তায়ালার এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। যা মানুষকে তিনি দান করেছেন। অবশ্য পৃথিবীর সকল প্রাণীরই ভাষা আছে। কিন্তু প্রাণীদের ভাষা মানুষের মতো নয়। প্রাণীরা প্রাণীদের ভাষা বোঝে। মানুষ বোঝে মানুষের ভাষা।
সেই শুরুর কথাই আবার বলি-যদি পৃথিবীতে ভাষা না থাকত! একবার কি ভাবা যায়! ইস! কীভাবে কথা বলত মানুষ! কীভাবে সুখ-দুঃখ বোঝাত একজন আরেকজনকে! মহান আল্লাহ তায়ালা কত দয়ালু, তিনি ভাষা দিয়েছেন মানুষের জন্য। সেই ভাষা দিয়েই আমরা দোয়া করি তাঁর কাছে। আর কত ভাষা তিনি দিয়েছেন মানুষকে সে সংখ্যাটি কেবল তিনিই জানেন।
আমাদের ভাষা বাংলা। এটিই আমাদের মাতৃভাষা। আমাদের মাতৃভাষার জন্য শহীদ হয়েছে বেশ কজন। আহত হয়েছে অনেকেই। লড়াই সংগ্রাম করতে হয়েছে বেশ। কেন? কারণ আমাদের ভাষা বাংলা রাষ্ট্রভাষা হতে বাধা দেওয়া হয়েছে। বাধা দিয়েছে তখনকার পাকিস্তানি শাসকগণ। এর প্রতিবাদে আমাদের ভাইয়েরা জীবন পর্যন্ত দিয়েছে। তাদের জীবন ও রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি রাষ্ট্রভাষা বাংলা।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো-যে ভাষার জন্য জীবন দিলো, রক্ত এবং অঙ্গ দিলো, সেই ভাষার উন্নতি করার জন্য আমরা কাজ করি না। ভাষার অগ্রগতির জন্য পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করি না। আমাদের সবার উচিত-মাতৃভাষা বাংলা ভালো করে জানা, বোঝা এবং বলা। আমরা পৃথিবীর আরও আরও ভাষা শিখব। যত ইচ্ছে গ্রহণ করব। কিন্তু সবার আগে বাংলা ভাষা। এটিই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা।
আরও পড়ুন...