সৈনিক পিঁপড়া
চিত্র-বিচিত্র মেহেদি হাসান মে ২০২৬
পিঁপড়া দলবদ্ধভাবে ঘুরে বেড়ায়। এই খুদে প্রাণী দিনরাত পরিশ্রম করে। কঠিন পরিশ্রমের পাশাপাশি সুসংগঠিত একটি কলোনিতে বাস করে পিঁপড়া। প্রতিটি কলোনিতে একটি ‘রানি পিঁপড়া’ থাকে। রানি পিঁপড়াকে ঘিরে গড়ে ওঠে একেকটি কলোনি।
পিঁপড়া মাটির ঢিবি করে বাসা বানায়। এদের ঢিবি নির্মাণ কৌশলে ফুটে উঠেছে কারিগরি নৈপুণ্য। ঢিবি নির্মাণের সময় পিঁপড়ারা মাটি খুঁড়ে অনেকগুলো সরু সুরঙ্গ তৈরি করে থাকে। অনেক সময় এদের সুড়ঙ্গ প্রায় ২০-২৫ মিটারের মতো গভীর হতে পারে।
সৈনিক পিঁপড়া কী?
সাধারণ পিঁপড়ার মতোই দেখতে হলেও সৈনিক পিঁপড়ার কাজ আলাদা। একটি পিঁপড়ার উপনিবেশে (কলোনিতে) বিভিন্ন ধরনের পিঁপড়া থাকে-রানি, শ্রমিক আর সৈনিক। সৈনিক পিঁপড়ার প্রধান দায়িত্ব হলো পুরো দলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
সৈনিক পিঁপড়াদের মাথা সাধারণ পিঁপড়ার চেয়ে বড় এবং চোয়াল অত্যন্ত শক্তিশালী। এদের প্রধান কাজ হলো কলোনিকে রক্ষা করা এবং শিকারে নেতৃত্ব দেওয়া। এরা খাবার সংগ্রহ করে এবং লার্ভাদের দেখাশোনা করে। মজার ব্যাপার হলো, অনেক শ্রমিক প্রায় অন্ধ হয় এবং তারা ঘ্রাণশক্তির সাহায্যে একে অপরকে অনুসরণ করে। কিছু প্রজাতির সৈনিক পিঁপড়া এতটাই শক্তিশালী যে, তারা নিজেদের মাথা দিয়েই বাসার দরজা বন্ধ করে দিতে পারে!
সৈনিক পিঁপড়ারা একা লড়াই করে না-তারা দলবদ্ধভাবে কাজ করে। যদি কোনো শত্রু আসে, তখন একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে প্রতিহত করে। এই দলগত শক্তিই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
আফ্রিকার জঙ্গলে পাওয়া যায় এক বিশেষ ধরনের সৈনিক পিঁপড়া, যাদের অনেক সময় “আর্মি অ্যান্ট” বলা হয়। এরা চলমান বাহিনীর মতো একসাথে হেঁটে চলে এবং পথে যা পায়, তা আক্রমণ করে। এদের বিশাল বাহিনী যখন বনের ভেতর দিয়ে মার্চ করে, তখন বড় বড় কীটপতঙ্গ তো বটেই, এমনকি সাপ বা গিরগিটিও তাদের রাস্তা ছেড়ে পালিয়ে বাঁচে। হাজার হাজার পিঁপড়ার এই মিছিল দেখে বড় বড় প্রাণীরা পথ ছেড়ে দেয়!
এশীয় ওয়েভার পিঁপড়া তাদের নিজেদের দেহের ওজনের ১০০ গুণ ভারী ওজন বহন করতে সক্ষম। অনেক ক্ষেত্রে পিঁপড়ার বড় কর্মীদের অস্বাভাবিক বড় আকারের মাথা ও শক্ত চোয়াল থাকে। এরা শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারদর্শী। এ ছাড়া এই বড় মাথার সদস্যরা ছোট ও মেজোর মতো রুটিনমাফিক কাজগুলো করে থাকে। সৈনিক পিঁপড়ারা তাদের অদ্ভুত আক্রমণাত্মক শিকারি গোষ্ঠীর জন্য পরিচিত, যাকে বলা হয় ‘রেইড’। এদের কোনো স্থায়ী বাসা নেই। এরা যাযাবরের মতো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। এদের এই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা কয়েক হাজার থেকে শুরু করে ২০ লক্ষ পর্যন্ত হতে পারে।
সৈনিক পিঁপড়াদের বুদ্ধিমত্তা অবাক করার মতো। চলার পথে কোনো গর্ত বা নদী পড়লে এরা নিজেরা একে অপরের পা কামড়ে ধরে একটি ‘জীবন্ত সেতু’ তৈরি করে, যার ওপর দিয়ে কলোনির বাকি সদস্যরা পার হয়ে যায়। এ ছাড়া বিশ্রামের সময় এরা নিজেদের শরীর দিয়ে একটি বিশাল গোলাকার ঘর বা ‘বিভোয়াক’ তৈরি করে, যার ভেতরে রানি ও লার্ভারা নিরাপদ থাকে।
এরা যখন আক্রমণ করে, তখন অনেকটা সাঁড়াশি অভিযানের মতো চারপাশ থেকে শিকারকে ঘিরে ফেলে। তাদের ধারালো ম্যান্ডিবল দিয়ে তারা শিকারকে টুকরো টুকরো করে ফেলে এবং চোখের পলকে কঙ্কাল বানিয়ে দেয়। এমনকি উইপোকার ঢিবিতে তারা দলবদ্ধভাবে আক্রমণ চালিয়ে মুহূর্তেই সব দখল করে নিতে পারে।
কীভাবে যোগাযোগ করে?
পিঁপড়ারা কথা বলতে পারে না, কিন্তু তারা রাসায়নিক সংকেত (ফেরোমোন) ব্যবহার করে একে অপরকে বার্তা দেয়। কোনো বিপদ আসলে সৈনিক পিঁপড়ারা দ্রুত সেই সংকেত ছড়িয়ে দেয়, আর মুহূর্তেই পুরো দল প্রস্তুত হয়ে যায়।
সৈনিক পিঁপড়া শেখায়
সৈনিক পিঁপড়া আমাদের শেখায়-আকার নয়, সাহস আর একতাই আসল শক্তি। ছোট্ট এই প্রাণীগুলো আল্লাহর এক অসাধারণ সৃষ্টি, যারা প্রতিদিন আমাদের চোখের আড়ালে নিজেদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে নিঃশব্দে।
সৃষ্টিজগৎ যেন এক বিশাল যুদ্ধক্ষেত্র-এখানে টিকে থাকতে হলে দরকার শক্তি, বুদ্ধি আর দলবদ্ধতা। এই তিন গুণের অসাধারণ উদাহরণ হলো সৈনিক পিঁপড়া। ক্ষুদ্র হলেও এরা এমন সাহসী ও সংগঠিত যে অনেক বড় প্রাণীকেও হার মানাতে পারে।
আরও পড়ুন...