স্বপ্ন ও সাহসের জয়
বিবিধ শাহানারা স্বপ্না সেপ্টেম্বর ২০২৬
হেলমান্দ নদীর তীরে সূর্য তখন ঢলে পড়ছে। সোনালি আলোয় ঝিকমিক করছে পানি। নদীর ধারে বসে কথা বলছে দুই বন্ধু-বখতিয়ার আর ইওজউদ্দিন।
“শোনো, আমি শিগগিরই গ্রাম ছেড়ে রাজধানীর দিকে যাব,” বলল বখতিয়ার।
“সত্যি? আমিও যাব! আমাকে সঙ্গে নাও,” উত্তেজিত হয়ে উঠল ইওজউদ্দিন।
“তাহলে তো দারুণ হয়! আমরা একসঙ্গে বড় হয়েছি-একসঙ্গেই যাত্রা শুরু করি। গজনীর সেনাবাহিনীতে যোগ দেবো!”
“সিপাহী হব? তোফা! তাহলে তো আর কিছু চাই না। আমাদের পূর্বপুরুষরা যেমন দেশ রক্ষা করেছে, আমরাও তাই করব!”
দুই বন্ধুর চোখে তখন স্বপ্নের আগুন।
তাদের গ্রামের নাম ‘তের আগা’, যা পরে পরিচিত হয় ‘গরমশির’-অর্থাৎ গরমে তেতে ওঠা ভূমি। তাকে ঠাণ্ডা রাখতেই আল্লাহ ব্যবস্থা করে দিয়েছেন পাশে বয়ে চলা নদী-এটাই আফগানিস্তানের হেলমান্দ নদী। পাহাড়ের নিচের এলাকায় প্রচণ্ড গরম, তাই নাম ‘গরমশির’। আর পাহাড়ের অনেক ওপরে বেশ ঠাণ্ডা-তার নাম হলো ‘সরদশির’-অর্থাৎ ঠাণ্ডা মাথা!
আফগানিস্তানের ৩৪টি প্রদেশের মধ্যে হেলমান্দ অন্যতম। হেলমান্দের রাজধানী ‘লশকরাহ’ বেশ বড় শহর। প্রদেশটির প্রায় মাঝ বরাবর ফুঁড়ে প্রবাহিত হয় নদীটি। গ্রামের লোকেরা কৃষি ও সেচের পানি এ নদী থেকেই পায়। পাথুরে এলাকার মানুষেরা এ নদীর পাড় ঘেঁষেই গড়ে তুলেছে আবাস, বেশির ভাগ লোক পশতুন। এ ছাড়া বালুচি, হাজারা, ব্রাহুই, তাজিকসহ বাস করে খলজি উপজাতির শাখা-প্রশাখা। হেলমান্দের ধার ঘেঁষেই ‘তের আগা’র সারি সারি গ্রাম।
এই অঞ্চলে জীবন সহজ নয়। কোথাও পাথুরে জমি, কোথাও মরুভূমি, কোথাও উঁচু পাহাড়। কিন্তু এখানকার মানুষ সৎ আর পরিশ্রমী, তেমনই সাহসী। এক আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে তারা ভয় পায় না। তের আগার একটি গ্রামের নাম ‘ঘোর’। সেই প্রাচীন সময়ে তুর্কি ‘খলাজ’ গোত্রটি তুরস্ক থেকে আফগানিস্তানে এসেছিল। এখানের মাটি ও পরিবেশের মায়ার সাথে মিলেমিশে এক হয়ে যায়। তাদের নাম হয় ‘খলজী’ এবং ধীরে ধীরে ভাষাও পাল্টে ধারণ করে ’পশতু’। উট পালন, যাযাবরী জীবন তাদের খুব প্রিয়। খলজিরা বহু শতাব্দী ধরে বসবাস করছে আফগানিস্তানে। এখন ‘আফগান-খলজী’ নামে পরিচিত। ইতিহাসের সিঁড়ি বেয়ে একের পর এক তারা ভূমিকা রাখে উমাইয়া, আব্বাসি, সেলজুক, খাওয়ারিজম, সুলতান নুরুদ্দিন জিনকি, সুলতান সালাহউদ্দিন আইউবির শাসিত আমলে। বিশুদ্ধ আর্যসন্তান হিসেবে গর্ব করে থাকে খলজিরা। পরিবারের নারী-পুরুষ সবাই যোদ্ধা ও লড়াকু জীবনযাপনে অভ্যস্ত। শিশুকাল থেকেই তারা দেখেছে সাহসের সাথে অস্ত্রের মেলবন্ধন। বিশ^াসী জীবনে সত্যের জন্যই তারা লড়াই করে। বিপদ-আপদ তুচ্ছ বলে মনে করে। তুখোড় যোদ্ধা খলজিরা যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় থাকে প্রস্তুত।
এই ঘোর গাঁয়ের ‘খলজী’ পরিবারে জন্ম নেয় ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি। শিরান খলজিরও জন্মস্থান এই গ্রাম। গাঁয়ের আর দশটা শিশুদের মতো মক্তবে নিয়েছেন কুরআনের পাঠ। ছোটবেলায় পাহাড়ের পাদদেশ থেকে পাথর কুড়িয়ে, নুড়ি ভেঙে একসাথে ঘোড়া দাবড়িয়ে ফিরেছেন। খলজি উপজাতির শিশুরা শেখে ঘোড়ায় চড়া, শিকার করা, অস্ত্র চালানো, কাব্য চর্চা। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি এই কঠিন পরিবেশেই বড় হয়ে উঠেছেন, তার বন্ধু ইওজউদ্দিন শিরান খলজিও তেমনই।
আঠারো বছর বয়সের তরুণ দুই বন্ধু ঘোড়ায় চড়ে রওনা দিলেন গজনীর পথে। পথ সহজ ছিল না মোটেও। ধূলিঝড়, মরুভূমি, নির্জন পাহাড়। কখনো হঠাৎ ঝড় উঠছে, কখনো চারপাশে ভয়ংকর নীরবতা। কিন্তু তারা ভয়হীন। বুকে দৃঢ় বিশ^াস আর সততা, নিজেদের দু-পা আর চারপেয়ে ঘোড়াকে সম্বল করে বেরিয়ে পড়েন তারা পৃথিবীর পথে।
সুলতানের সেনাদলে যোগ দিতে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন গজনীর উদ্দেশ্যে। চাসারান, ফিরোজকূহ পর্যন্ত যেতেই কয়েক দিন লেগে গেল। তখনও এ এলাকা প্রদেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়নি। কোথাও বিরাট পাহাড় ভর্তি ঘন ঝোঁপ-ঝাড়, কোথাও পাহাড় কেবলি ধূসর বাঁধার মতো দাঁড়িয়ে। তারই পাশ দিয়ে সরুপথ। কিছু পথ থাকে বিরান, ভয় ধরানো নীরব শুনসান। ধূ-ধূ বালির মরুভূমির সেই জনমানবহীন পাহাড়ি অরণ্যে মাঝে মাঝে ওঠে বালির ঝড়। কৌশল না জানা থাকলে এ বালুঝড়ে নির্ঘাত মৃত্যু। মরু ঝড়-বাদলের মধ্যে বেড়ে ওঠা দু-বন্ধুর কাছে এগুলো কিছুই নয়। তারা আকাশের রং দেখেই বুঝতে পারে ধূলিঝড়ের নমুনা, বাতাসের গন্ধ শুঁকে টের পায় বিপদ।
পাহাড়ের ভেতরের গারে ‘কুহর’ নামে বড় ধরনের খালি জায়গা থেকে। এ ‘কুহর’গুলো বেশ নিরাপদ। ঝড়ের শুরুতেই দৌড়ে পাহাড়ের ‘গার’ বা গর্তে আশ্রয় নিলেই হলো। কিছু পথের পাশেই রয়েছে সরাইখানা। কাফেলাগুলো এখান থেকে যায় বিভিন্ন স্থানে। কোনো কাফেলার সাথে যুক্ত না হয়ে বেশিদূর যাওয়া সম্ভব নয়। কাফেলার সঙ্গে থাকলে যেকোনো অসুবিধায় সাহায্যের ভরসা থাকে।
অবশেষে তারা পৌঁছাল গজনীতে। সেনাবাহিনীতে চাকরি পেল না তারা। অন্যরা হলে হয়তো হাল ছেড়ে দিত। কিন্তু বখতিয়ার? সে অন্যরকম।
তার চোখে তখন নতুন আগুনের ফুলকি-“নিজের দল গড়ব!”
গ্রামের সাহসী যুবকদের ডাক দিলেন। ধীরে ধীরে তৈরি হলো একদল প্রশিক্ষিত তরুণ যোদ্ধা।
সরাইখানা রাজ্যের খবরের সূতিকাগার, সরাইওয়ালা তার গুরু! জানা গেল গজনীর সুলতান মুইজউদ্দিনের সেনাপতি কুতুবউদ্দিন আইবেক হিন্দুস্তান জয়ের চেষ্টা করছেন। চটপটে অনেক সাহসী সৈন্য চাই তার। এ সংবাদে বখতিয়ারের রক্ত নেচে ওঠে। যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিলো!
বখতিয়ার দলবল নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন নতুন পথে। গজনী, বদাউন একটার পর একটা পাহাড় পর্বত ডিঙিয়ে ছুটে চলেছেন। হিন্দুস্থানের অযোধ্যা রাজ্যে এসে থামেন। কি সুন্দর চারদিক-বখতিয়ারের বেশ পছন্দ হয় জায়গাটা। যোগ দেয় অযোধ্যার সেনাবাহিনীতে। অযোধ্যার সিপাহশালার ও শাসনকর্তা মালিক হুসামউদ্দিন আগলবাক। তিনি বখতিয়ারের ঝকঝকে দুই চোখে যেন স্পষ্ট দেখতে পেলেন তীক্ষè বুদ্ধি আর সাহস! তাকে নিয়োগ দেন-সেনা বিভাগের পর্যক্ষেক হিসেবে।
বখতিয়ার দ্রুত নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করলেন। যুদ্ধের পর যুদ্ধ জিতে তিনি হয়ে উঠলেন এক সাহসী নেতা।
পুরস্কার হিসেবে পেলেন দুইটি পরগন-ভাগবত ও ভূইলি। এবার তিনি নিজের শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তুললেন। শুরু করলেন ইতিহাস গড়া অভিযান। ধীরে ধীরে জয় করলেন বিহার ও আশপাশের কিছু এলাকা।
মাত্র ১৭ জন ঘোড়সওয়ার নিয়ে ঝড়ের গতিতে আক্রমণ! ১২০৫ সালের ১০ মে জয় করলেন গৌড় (বাংলা)। এ যেন অবিশ্বাস্য এক কাহিনি! ইতিহাসের এ এক রোমাঞ্চকর ঘটনা।
বাংলা জয়ের পর রাজধানী ছিল লখনৌতিতেই। পরে কাজের সুবিধার জন্য রাজধানী নিয়ে যান-‘দেবকোট’।
বখতিয়ার খলজি শুধু যোদ্ধা ছিলেন না, ছিলেন একজন নির্মাতা। বাংলায় এসে গড়ে তোলেন সুশৃঙ্খল শাসনব্যবস্থা, শহর নগর, শিক্ষা কেন্দ্র। দেশবাসীর কল্যাণে তৈরি করা হয় মসজিদ, খানকা, জলাশয়, পুকুর, রাস্তা ও সরাইখানা।
হেলমান্দের সেই সাহসী ছেলেটি তার স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন নিজের শক্তিতে, সাহস আর বিশ্বাসে।
দূর পাহাড়ি গ্রামের সেই তরুণ-যে একদিন বন্ধুদের সঙ্গে বসে স্বপ্ন বুনেছিলেন। সে-ই পরে ইতিহাসের পৃষ্ঠায় নিজের নাম স্থায়ীভাবে লেখেন, রেখে যান অবিস্মরণীয় কীর্তি।
স্বপ্ন ও সাহস নিয়ে এগিয়ে গেলে বিজয়ের পথ তৈরি হয়ে যায়।
আরও পড়ুন...