তারুণ্য জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ

প্রবন্ধ নিবন্ধ আবদাল মাহবুব কোরেশী সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর
প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন!
আসছে নবীন-জীবন-হারা
অসুন্দরে করতে ছেদন!’

এভাবেই আমাদের জাতীয় ও তারুণ্যের কবি কাজী নজরুল ইসলাম তরুণদের আহ্বান করেছেন। তারুণ্যের জয়ধ্বনি করেছেন আর তরুণদের নিয়ে স্বপ্নের উজ্জ্বল আগামী অন্তরে বপন করেছেন। তরুণের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, “ইহাই যৌবন, এই ধর্ম যাহাদের-তাহারাই তরুণ। তাহাদের দেশ নাই, জাতি নাই, অন্য ধর্ম নাই। দেশ-কাল-জাতি-ধর্মের সীমার ঊর্ধ্বে ইহাদের সেনানিবাস।” কবির এমন দৃঢ়চেতা কণ্ঠকে সম্মান রেখে আমরাও বলি-তরুণ কোনো পরিবারের নয়, কোনো সমাজের নয়-এমনকি কোনো দেশেরও নয়। তরুণ সবার। তারুণ্য হলো, বিস্ময় থেকে মহাবিস্ময়। নব-নব জাগরণ। মহাপ্রাণ। এক মহাপ্রলয়। যার প্রাণবন্ত উচ্ছল একটা মন আছে। মায়া-মমতা ও দরদ আছে। আছে সীমাহীন দৃষ্টি। ইস্পাতকঠিন প্রত্যয়। বাহুতে প্রচণ্ড বল, বুকে আছে অজেয় শক্তি ও সাহস। তারুণ্য কোনো বাধা মানে না। তারুণ্য দুর্বার। তারুণ্য মুক্ত স্বাধীন এক অগ্নিশিখা, আবার কখনো বাঁধভাঙা জোয়ার। আবার কখনো ভূমিকম্প।

এ তারুণ্যকে বশ মানাতে পারে কে? প্রশ্ন কঠিন! উত্তর কিন্তু সহজ। তারুণ্যকে বশ মানাতে পারে হৃদয়ের গহিন থেকে জন্ম নেওয়া নির্মল মনের এক টুকরো হাসি। যে হাসিতে কোনো কৃত্রিমতা থাকে না, থাকে না কোনো লৌকিকতা। যে হাসিতে প্রকাশ পায় উজাড় করা ভালোবাসা আর মায়া ভরা দরদ। তারুণ্যকে যারাই বুকে আগলে ধরেছেন তারাই লাভবান হয়েছেন। ভালোবাসার অমিয় সুধা তারুণ্য পায়ে ঠেলতে পারে না। সঠিক দিকনির্দেশনা দিলে তারুণ্য ইতিহাস সৃষ্টি করে। আদিকাল থেকে আজ অবধি দেশে দেশে এমন নজির আছে ভূরিভূরি। আমাদের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন তথা ২৪-এর গণবিপ্লব সবই আমাদের অহংকার। যা তারুণ্যের হাত দিয়ে আমাদের ইতিহাসকে গৌরবান্বিত করেছে। যেখানে তারুণ্যের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছে রাষ্ট্রীয় সকল অপশক্তি। তারুণ্যের বুক ঝাঁঝরা করা খুনে রাঙা কালো রাজপথ এ বিজয়ের জীবন্ত সাক্ষী।

আমাদের তারুণ্য শির উঁচু করে বিশ্বকে জানান দিতে পেরেছে, আমরা কারো চোখ রাঙানি সহ্য করতে পারি না। আমরা আমাদের স্বাধীনসত্তা নিয়ে বীর তিতু আর টিপু সুলতানদের মতো বাঁচতে চাই। প্রয়োজনে সিংহের মতো এক ঘণ্টা বাঁচব, কিন্তু বছর বছর ধূর্ত শৃগালের মতো নয়। এমন বীরদর্প সাহসিকতা যখনই চোখে পড়ে তখনই শ্রদ্ধায় মনটা ভরে ওঠে তারুণ্যের কাছে, মনের অজান্তেই চিৎকার করে মুখ থেকে বেরিয়ে যায়-সাব্বাস তারুণ্য, সাব্বাস! যা করেছ, যা দেখিয়েছ তা তো কোনো রূপকথা নয়। গল্পও নয়। একেবারে বাস্তবতা। তাইতো বলি, তারুণ্যকে চৌহদ্দির ভেতরে আটকে রাখার সাধ্য কে রাখে? তারুণ্য হলো সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ আর বিজলির ঝলকানি। বোশেখের আকাশ ভাঙা গর্জন। ঠাঠা পড়া আওয়াজ। ভাঙা-গড়া তারুণ্যের বৈশিষ্ট্য। তারুণ্যের সাহস ও শক্তি দেশ গঠনের শ্রেষ্ঠ নিয়ামক। কালের ইতিহাস বদলে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ একমাত্র তারুণ্যই গ্রহণ করতে পারে। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে আবু সাঈদ-মুগ্ধ-ইয়ামিন হতে। মহান আল্লাহ তারুণ্যের শারীরিক শক্তি, অসীম সাহস, উদ্ভাবনী মেধা ও গবেষণা করার যোগ্যতা অনেক অনেক গুণ বেশি দিয়েছেন।

তারুণ্যের দ্বারাই সম্ভব হয় মরা বাগান উর্বর করে ফুলে ফুলে বিকশিত করে দিতে। সুতরাং তারুণ্যই হলো ইতিহাস বিনির্মাণের অগ্র সেনাপতি। তারুণ্য যদি চরিত্রবান, সুন্দর ও সঠিক জ্ঞানের অধিকারী হয়ে গড়ে ওঠে, তাহলেই এ জাতির ভাগ্য বদলে যাবে। 

আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) তরুণদের গুরুত্ব দিতেন। তিনি তরুণদের খুব ভালোবাসতেন। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, পৃথিবীতে যত বড় বিপ্লব হয়েছে-বেশির ভাগ তারুণ্যের হাত ধরেই হয়েছে। সুতরাং বৃদ্ধের জ্ঞান আর তরুণের শক্তি ও রক্ত যেকোনো অসম্ভবকে সম্ভব করে দিতে পারে।

আমরা যদি তৎকালীন আরব সমাজের দিকে তাকাই তবে দেখতে পাই, রাসূল (সা) ইসলামের সুমহান বাণী ও সৌন্দর্য আরব তথা বিশ্বের আনাচে-কানাচে পৌঁছে দেবার অগ্রণী ভূমিকা পালন করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন একঝাঁক তরুণ সাহাবীদের ওপর এবং তাঁরা তাঁদের কাজ খুবই নিষ্ঠা ও সততার সাথে পালন করে গোটা আরব সমাজের চিত্রই বদলে দেন। মানুষের চারিত্রিক গুণাবলি যে একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে তৎকালীন আরব সমাজ তার জীবন্ত সাক্ষী।

রাসূল (সা)-এর সঠিক দিকনির্দেশনা পেয়ে যে সমস্ত তরুণ সাহাবী এসব কাজে আত্মনিয়োগ করেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন-মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা), আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা), খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা), আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা), জায়েদ ইবনে সাবেত (রা), আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা) ও মুসান্নাহ ইবনে হারেসা (রা) প্রমুখ। আজও তারা তারুণ্যের প্রতীক হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। রাসূল (সা) তারুণ্যের সাহস ও শক্তিকে বরাবরই সম্মান দিয়েছেন এবং তাদের যথাযথভাবে দেশ, জাতি ও সমাজ বিনির্মাণে কাজে লাগিয়েছেন। কারণ, পবিত্র কুরআনের ভাষায় তারুণ্যের সময়টাকে শক্তি হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তাই এ শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানোই হলো একজন ভালো অভিভাবক বা নেতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ