টাইম হোল
সাইন্স ফিকশন সুহাইম বিন হাফিজ অক্টোবর ২০২৫
অনেকক্ষণ হলো সূর্য অস্ত গেছে। আকাশ এখন পুরোপুরি কালো রং ধারণ করেছে। ইনাম তার পা দুটো দ্রুত চালাল। ব্যাংক বন্ধ হওয়ার আগেই সেখানে পৌঁছাতে হবে। এখানে ব্যাংক বন্ধ হয় সূর্য ডোবার এক ঘণ্টা পর। সে পৌঁছানোর আগেই হয়তো ব্যাংক বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এই চিন্তা মাথায় আসতেই দৌড়ানো শুরু করল।
এখন চলছে ২২৩৯ সাল। জ্ঞান-বিজ্ঞানে মানুষ এখন অনেক অনেক এগিয়ে গেছে। ধীরে ধীরে তাদের এই পরিসর ক্রমশ বেড়েই চলেছে।
মানুষ এখন সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞানের। এই পর্যন্ত মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির বাইরে আরও ১৯টি গ্যালাক্সিতে সফলভাবে নভোযান পাঠাতে সক্ষম হয়েছে তারা। এ ছাড়াও মঙ্গলগ্রহকে মানুষ তৈরি করেছে দ্বিতীয় আবাসস্থল হিসেবে। বর্তমানে সেখানে বসবাস করছে প্রায় তিন কোটি মানুষ।
মানুষ রোবটিক্সের বিষয়েও ভালো অবদান রেখেছে। এখন অনেক কাজেই তারা রোবটের সাহায্য নিচ্ছে। হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে অফিস-আদালত, এমনকি ব্যাংকের হিসাব-নিকাশও হচ্ছে রোবটের মাধ্যমেই। মানবজাতির অনেক ক্ষেত্রে অগ্রগতি ঘটেছে ঠিকই। কিন্তু এজন্য মানুষকে কম ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়নি।
নিজেদের স্বার্থে মানুষ অনেক বেশি ইনফ্যার্কস্ট্রাকচার ডেভেলপ করতে লাগল। অনেক বেশি জায়গার জন্য গাছ নির্মূল করা শুরু করল। উজাড় করতে লাগল বন-জঙ্গল। বিলুপ্ত হতে লাগল একের পর এক খাদ্য উৎপাদনশীল উদ্ভিদগুলো। এতে তাদের ভেতর ছড়িয়ে পড়ল এক ভয়াবহ খাদ্য-সংকট। কিন্তু তাতেও তারা সতর্ক হলো না। খাদ্য-সংকট আরও বৃদ্ধি পেলে তারা আবিষ্কার করল, টেলেটিউলাস নামক এক খাদ্য ট্যাবলেট। যা গ্রহণ করার মাধ্যমে মানুষ অল্প খাদ্য খেয়েই জীবনধারণ করতে পারে। মানুষকে কৃত্রিমতার জালে আবদ্ধ করে তারা তাদের নিজেদের স্বার্থে চালিয়ে যেতে লাগল এই হত্যাযজ্ঞ।
ফলস্বরূপ, ত্রয়োবিংশ শতাব্দীর নতুন প্রজন্ম যখন পৃথিবীতে আগমন করল, তখন তারা গাছ বলতে চিনল, অতীতে বিলুপ্ত হওয়া এক অভাগা জিনিসের নাম।
মানুষ এখন পানির মাধ্যমে কৃত্রিম উপায়ে তৈরি করছে অক্সিজেন। সেগুলো তারা বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে। এজন্য তারা পৃথিবীতে বসবাসকারী প্রত্যেকটি নাগরিক থেকে আদায় করছে ট্যাক্স। ট্যাক্স দিতে অক্ষম ব্যক্তির জন্য রয়েছে শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থাও।
ইনাম যখন ব্যাংকে এসে পৌঁছাল, তখন তা পুরো বন্ধ হওয়ার উপক্রম। তাড়াতাড়ি লাইনে এসে দাঁড়াল সে। প্রায় তিন মাসের অক্সিজেন বিল জমা হয়ে গেছে তার। এই মাসেরটাও পরিশোধ করতে না পারলে নিশ্চিত রোবট পুলিশের কয়েদখানায় তাকে এক মাস থাকতে হবে। এখন এখানে এটাই নিয়ম।
ধীরে ধীরে কমে এলো ব্যাংকের লাইন। ইনাম তার পকেট থেকে আশি হাজার মিরিট বের করে জমা দিয়ে বাইরে বের হয়ে এলো।
জানুয়ারির ঠান্ডা রাত। তবুও কেন জানি গরম গরম বোধ হতে লাগল ইনামের। ওভারকোটটা খুলে হাতে নিয়ে নিল সে। বর্তমানে, শীতকালের আবহাওয়াই ওঠানামা করে ৪০-৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়। আর গরমকালের আবহাওয়া তো মাঝে মাঝে ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও উঠে যায়।
ইনামের বয়স ২২ বছর। দু-বছর হলো সে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট সম্পন্ন করেছে। এখন তার পরিচয়, সে একজন বিজ্ঞানী। গত বছর জুন মাসে তার একটা লেখা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ পাওয়ায় সারা পৃথিবীজুড়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল। তার ভাষ্যমতে, সে সময়ের চতুর্থ মাত্রাকে অতিক্রম করার মাধ্যমে টাইম মেশিন আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে। যে মেশিন দ্বারা অতীতের যেকোনো সময়ে যাওয়া সম্ভব।
প্রতিবারের মতোই এই বিষয়টি তখন উঠে এসেছিল সমালোচনার শীর্ষে। বহু তর্ক-বিতর্ক হয়েছে এই বিষয়টিকে ঘিরে। অন্যান্য বিজ্ঞানীরা এই সুযোগে তাদের মতামত জানাতে কার্পণ্য করেননি। কিন্তু ইনাম চুপ থেকেছে। সে জানে তার আবিষ্কার সফল। সাংবাদিকদের চাপে সোশ্যাল মিডিয়ায় শুধু সে এতটুকুই জানিয়েছে, এখন তার রিসার্চ প্রায় শেষের দিকে। রিসার্চ শেষ হলেই এ গবেষণা মানবজাতির কল্যাণে উৎসর্গ করবে সে।
আজ ইনাম সিদ্ধান্ত নিয়েছে, শেষবারের মতো সে নিজের যন্ত্রটাকে যাচাই করে নেবে। সে নিজেই এবার বের হবে সময়-ভ্রমণে।
ইনাম হাঁটতে হাঁটতে তার ল্যাবে এসে পৌঁছাল। তার ল্যাবের স্বয়ংক্রিয় সিকিউরিটি সিস্টেম তাকে চেক করে ভেতরে ঢোকার অনুমতি দিলো। নির্দিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি ছাড়া জনসাধারণের এখানে প্রবেশাধিকার নেই। ইনামও তাদের মধ্যে একজন।
ল্যাবে ঢুকতেই ইনামের দেখা হয়ে গেল তার সহকর্মী বিজ্ঞানী এবং ছোটকালের বন্ধু মি. রবার্টের সাথে। রবার্ট জাতে ব্রিটিশ। রবার্টের বাড়ি যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডন থেকে মাত্র ২৮ মাইল দূরে ক্রাউলি নামক এক গ্রামে। আজ থেকে প্রায় ১৫ বছর আগে ওয়াশিংটনের কোনো এক প্রাইমারি স্কুলে রবার্টের সাথে প্রথম দেখা হয় ইনামের।
-হাই ইনাম, তোমার ডাবল টির কাজ কেমন চলছে? [ডাবল টি ইনামের টাইম মেশিন প্রজেক্টের নাম]
-এই তো, প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আর কিছু দিনের মধ্যেই হয়তো আমরা পৃথিবীবাসীকে এক বিরল চমক দেখাতে পারব।
রবার্ট হালকা হেসে বলল, কংগ্রাচুলেশন। তোমার এই আবিষ্কারের মাধ্যমে হয়তো আমাদের সামনে বিজ্ঞানের নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হবে।
-তাই যেন হয়। ইনামও হালকাভাবে একটু হাসল।
তারপর কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ। হঠাৎ ইনাম বলে উঠল, রবার্ট, তোমাকে একটা কথা বলব বলে ভাবছিলাম।
-নির্দ্বিধায় বলতে পারো।
ইনাম রবার্টের দিকে একটা চাবি বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল, আমাদের ল্যাবের ৭৩৮ নম্বর লকারে আমার পরবর্তী প্রজেক্টের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ফর্মুলা রয়েছে। ডাবল টির কাজ শেষ হলেই ওতে হাত দেবো। প্রজেক্টটা ক্যান্সারের ওষুধ সম্পর্কিত। তারপর একটু থেমে আবার বলা শুরু করল সে, আমি কিছুদিনের জন্য একটা কাজে একটু বাইরে যাচ্ছি। ততদিন এটা তোমার কাছেই থাক।
রবার্ট ইনামের হাত থেকে চাবিটা নিয়ে বলল, কোথায় যাচ্ছ বলো তো! তোমার তো এই সময়ে ডাবল টির কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা।
ইনাম একটা রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল, সেই কাজেই তো যাচ্ছি বন্ধু।
রবার্ট অবাক দৃষ্টিতে ইনামের দিকে তাকাল। ইনাম আর তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। লক্ষ্য তার ডেস্ক। সেখানেই আছে তার বহুল আকাক্সিক্ষত টাইম মেশিনটি।
দুই.
নরম হাওয়ার কোমল পরশে শরীর জুড়িয়ে গেল ইনামের। চোখ দুটো খুলতে গিয়েও থেমে গেল সে। কোত্থেকে যেন ভেসে আসছে পাখিদের কিচির-মিচির শব্দ। মন জুড়িয়ে যাচ্ছে হাসনাহেনার গন্ধে।
হাতে নরম ঘাসের স্পর্শ পেল ইনাম। ভোরের শিশিরকণা লেগে আঙুলগুলো ভিজে গেল তার। ধীরে ধীরে চোখ খুলতেই বুঝল, একটি বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতে শুয়ে আছে সে। পাশ দিয়ে কলকলিয়ে বয়ে যাচ্ছে নদী। নদীর ওপারে দেখা যাচ্ছে নাম না জানা হরেক রকমের গাছপালা দিয়ে সাজানো বন।
বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে উঠে দাঁড়াল ইনাম। একসাথে এত গাছ সে জীবনে এই প্রথমবার দেখল। কয়েকটা গাছ অবশ্য সে বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন তাদের হিস্টোরিকাল মিউজিয়ামে দেখেছিল। যেগুলোকে কৃত্রিমভাবে কাচের বাক্সে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে।
অভিভূত হয়ে গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে ইনাম। মহান ¯্রষ্টার কী অপরূপ সৃষ্টি! বুক ভরে শ্বাস নিতেই শরীরে একটা তাজা ভাব চলে আসে তার। মনটা খুশি খুশি হয়ে যায়। কিন্তু তাদের সময়ের মানুষের কথা চিন্তা করতেই খুশি খুশি ভাবটা মুহূর্তেই উবে যায়। সে তার কর্তব্য স্থির করে ফেলে। আপাতত সে এখন এই গাছগুলোর নমুনা সংগ্রহের চেষ্টা করবে। যদি এখান থেকে সে কয়েকটা গাছের নমুনা নিয়ে যেতে পারে, তাহলেই সে সফল। সফল তার এক্সপেরিমেন্ট।
দুদিন পর।
গাছ সংগ্রহের কাজ প্রায় শেষের দিকে। ইনাম তার সময়ে ফিরে যাওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু করল। টাইম মেশিনটা চালু করতে গিয়েই বাধল বিপত্তি। প্রায় আড়াই ঘণ্টা অক্লান্ত পরিশ্রমের পর স্টার্ট নিল সেটি। সিটে উঠে বসল ইনাম। তার পিছু নিল প্রায় বিশ রকম গাছের নমুনা।
সে যাত্রা শুরু করার কিছু সময় পর টাইম মেশিনে আবার সমস্যা হওয়া শুরু করে। সময়ের বেগ তখন সেকেন্ডে হাজার বছর। এত বেগের ফলে সৃষ্টি হয় টাইম হোল। সেই টাইম হোলের গহ্বরে ইনাম হারিয়ে যায় চিরতরে। সঙ্গে তার বিশ রকম গাছের নমুনা।
তারপর কেটে গেছে আরও বিশটি বছর। ইনামের সেই বাল্যবন্ধুটি আজও তার অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু সে জানে না, ইনাম এখন আর জীবিত নেই। সময়ের গহ্বরে সে কবেই হারিয়ে গেছে।
ভেদ হয়নি ইনামের টাইম মেশিন আবিষ্কারের রহস্য। ইনামের পরবর্তী প্রজেক্ট ক্যান্সারের সেই ওষুধটিও আর আবিষ্কৃত হয়নি। রবার্ট অবশ্য সে চেষ্টা একবার চালিয়েছিল। কিন্তু সেই ৭৩৮ নম্বর লকারে সে এক টুকরো কাগজ ছাড়া কিছুই পায়নি। কাগজটি ভরা ছিল কিছু সাংকেতিক চিহ্ন দিয়ে। সেই সাংকেতিক চিহ্নগুলোর আজও সমাধান করতে পারেনি সে।
তবু সে আশাহত হয়নি। সে এখনও আশা করে, ইনাম একদিন ফিরে আসবে। মানুষ আশা করতে ভালোবাসে। এক বুক আশা নিয়েই মানুষ বেঁচে থাকে সারাটি জীবন।
আরও পড়ুন...