ভালোবাসার গল্প
গল্প আশরাফ আল দীন মার্চ ২০২৬
নানাভাইয়ের গল্পের আসর জমে উঠেছে। উমেইর আর উমাইজা গা ঘেঁষে বসেছে দুই পাশে, আর জয়নব এসে নানাভাইয়ের কোলের ওপর তার জায়গা করে নিয়েছে। নানাভাই বললেন,
: আজ তোমাদের মিস্টার জ্যাকের গল্প বলব।
: মিস্টার জ্যাক কে, নানাভাই? উমাইজার চটজলদি প্রশ্ন। নানাভাই খানিকটা রহস্য রেখে বললেন,
: আমাদের পাহারাদার, আমাদের বাড়ি পাহারা দিতো। আচ্ছা, পাহারাদারের গল্প বলার আগে যে বাড়িটা সে পাহারা দিতো তার খানিকটা বর্ণনা দিয়ে নিই।
: তোমাদের কয়টা ফ্ল্যাট ছিল? প্রশ্ন করল উমেইর। নানাভাই হাসলেন এবং সুন্দরভাবে ওদের বোধগম্য ভাষায় শহরের ফ্ল্যাট আর গ্রামের বাড়ির তফাতটা বুঝিয়ে দিলেন। সবকিছু শুনে জয়নব অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,
: এত বড় জায়গা নিয়ে তোমরা সবাই থাকতে? নানা ভাই বললেন,
: আমার দাদার বাড়ি হলো ইউসুফ তালুকদার বাড়ি। এর দীর্ঘ ইতিহাস এবং ঐতিহ্য আছে। কিন্তু, তাহলে কি হবে? এই বাড়িতে লোক হয়ে গিয়েছিল অনেক। এই বাড়ির চারিদিকে অন্য আরও অনেকগুলো বাড়ি গড়ে উঠেছিল। ফলে, এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে আমার আব্বা নতুন একটি বাড়ি করলেন রেলওয়ে স্টেশনের নিকটে, উনার গড়া হাই স্কুলের পাশে। নানা ভাই এবার তাদের মনের চোখে দেখার জন্যে ছবির মতো করে বাড়িটার বর্ণনা দিলেন।
: বাড়িটার মূল দালানের সামনে ছিল বড় উঠান, এবং তারপর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সদর দরজা। সদর দরজার পাশে উঠানের এক প্রান্তে একখানা কাচারি ঘর।
: কাচারি ঘর কি নানা ভাই? উমেইরের প্রশ্ন। নানা ভাই বুঝিয়ে দিলেন,
: তোমাদের যেমন ‘ড্রয়িং-রুম’ গ্রামের বিশাল আয়তনের বাড়িতে তেমনি আলাদা বৈঠকখানা থাকে। একে কখনো বলে ‘কাচারি-ঘর’, কখনো বলে ‘দেউড়ি-ঘর’। আমার আব্বার সামাজিক কাজকর্মের বৈঠকগুলো এখানেই হতো। এছাড়াও উঠানের দক্ষিণ পাশে একখানা ছোট ঘর ছিল, মূলত মেহমানদের থাকার জন্য, আমরা বলতাম দেউড়ি-ঘর। এর পাশেই ছিল একটা চাপা কল বা টিউবওয়েল। মূল দালানের পেছনে ছোট্ট আর একটি উঠান ছিল। তার এক পাশে রান্নাঘর। উঠানের অপরপাশে পুকুর, ভেতর-বাড়ির ছোট্ট পুকুর। বাড়ির উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অনেকখানি জায়গা নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল দু’টি বাগিচা, নানা রকম ফলের গাছে ভরা। বাড়ির দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশ দিয়ে চলে গেছে পায়ে চলা মাটির রাস্তা আর পূর্ব দিকে ফসলের মাঠ। পূর্ব দিকে একটি পাকা রাস্তা আমাদের সদর দরজায় এসে শেষ হয়েছিল। পশ্চিম পার্শ্বে প্রতিবেশীদের কয়েকটা বাড়ি ছিল, আমাদের বাড়ি থেকে পৃথক।
আমাদের বাড়ি আর রাস্তার মাঝখানে ছিল সীমানা-দেওয়াল। অন্যদিকে ফসলের মাঠ থেকে বাড়িটাকে পৃথক করা হয়েছিল খাল কেটে। ওই খালে পানি ছিল, মাছ ছিল। এই খাল, দেওয়াল আর গাছ-গাছালি দিয়ে বাড়িটা এমনভাবে ঘেরা ছিল যে বাইরে থেকে সদর দরজা ছাড়া অন্য কোনো পথে কোনো ভদ্রলোক বাড়িতে ঢুকতে পারতো না। এই পুরো বাড়াটাই পাহারা দিতে হতো জ্যাককে।
: উনি কি তোমাদের দারোয়ান? কোন দেশের মানুষ, নানাভাই? উমেইর প্রশ্ন করল। নানা ভাই হাসলেন, জবাব দিলেন না, শুধু রহস্য করে বললেন,
: হ্যাঁ, পাহারাদার বটে! তার আগে চলো তোমাদের নিয়ে অন্য জায়গা থেকে ঘুরে আসি। নানা ভাই উনার বসার ভঙ্গিমা পরিবর্তন করে আবার বলতে শুরু করলেন,
: আমাদের যে পুরাতন দাদার বাড়ি সেটা আমাদের বাড়ি থেকে মাইল দুয়েক দূরে। আমি আর মেজভাই, আমরা দুই ভাই মাঝে মাঝে সেখানে যেতাম। কারণ, আমাদের খেলার সাথীরা সবাই ছিল ওই বাড়িতেই! একবার খবর পেলাম সেখানে বাঘা কুকুরটা বাচ্চা দিয়েছে। আমি আর সেজো ভাই গিয়ে একটি কুকুরছানাকে খুব পছন্দ করে ফেললাম। আমাদের আগ্রহ এত বেশি ছিল যে কুকুরটা মায়ের দুধ ছাড়ার আগেই আমরা তাকে নিয়ে আসলাম আমাদের বাড়িতে।
কুকুরছানার কথা শুনে সবার মধ্যে টানটান উত্তেজনা! নানাভাই এর ভেতরেই আবার বলতে শুরু করলেন,
: বাড়িতে আনার পর আমরা টেনশনে থাকলাম এই ভেবে যে আব্বু এটাকে কীভাবে নেবেন। কারণ, আমরা তো আব্বুকে বলিনি যে বাড়িতে কুকুর আনছি। তাছাড়া, মুরব্বিদের কাছে শুনেছি, কুকুর ঘরের ভেতরে আনতে নেই, তাহলে ঘরে ফেরেশতা আসে না। আমরা দুই ভাইয়ের যুক্তি হলো, ওকে তো আমরা ঘরে ঢোকাবো না। সে তো ঘরের বাইরে থাকবে, তবে বাড়ির ভেতরে।
অফিস থেকে ফিরে আব্বু ঘটনাটা জানতে পারলেন কিন্তু কিছুই বললেন না। আমরা খানিকটা স্বস্তি বোধ করলাম। আমরা কুকুর ছানাটাকে দুধ খেতে দিলাম। ভাত খাওয়ার বয়স তার এখনো হয়নি। ওর তো ভালো করে চোখও ফোটেনি। কুকুর ছানাটি সারাক্ষণ মায়ের জন্য কান্নাকাটি করল। কিন্তু আমাদের আদর-যতেœর কমতি নেই। আম্মা আমাদের সহযোগিতা করেন, কীভাবে কী কী করতে হবে বলে দেন। ওর কান্নার মাত্রা ধীরে ধীরে কমে এলো। শুধু দুধ খায় আর কাপড়ের কুণ্ডলীর ভেতর ঘুমায়।
ওর কী নাম দেবো তা নিয়ে আমাদের মধ্যে ভাবনার শেষ নেই। কেউ বলে, বাঘা। কেউ বলে, টমি। কেউ বলে, ভুলো। নাহ! সবই পরিচিত নাম, গল্প-কবিতায় আর মুখে মুখে এসব নামই তো শোনা যায়! অফিস থেকে ফিরে আব্বু বললেন, ওর নাম হবে, জ্যাক। বাহ, সুন্দর নাম তো! একেবারেই আনকমন! সবার মনে ধরলো নামটা। এইবার জয়নব বলল,
: ও নানাভাই! এটাই তোমাদের দারোয়ান, মিস্টার জ্যাক?
নানাভাই হো হো করে হেসে উঠলেন, আর হাসতে হাসতেই বললেন,
: হ্যাঁ, নানাভাই। এত বিশ্বস্ত দারোয়ান আর হয় না! সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমরা সবাই তাকে খুব ভালোবাসতাম, আর জ্যাকও আমাদের ভীষণ ভালোবাসতো। এবার উমেইজা বলল,
: সেই গল্পটাই বলো, নানাভাই! নানাভাই আবার বলতে শুরু করলেন।
: কয়েক দিনের মধ্যেই জ্যাক আমাদের সাথে বন্ধুত্ব করে ফেলল। সে আর খুব বেশি চ্যাঁচামেচি করে না বা ভয় পায় না। আমরা চাইলাম তাকে বাঘা কুকুর হিসেবে বড় করতে। আব্বার পরামর্শে আমরা একটা পদ্ধতি বের করলাম। সেটা হলো, জ্যাককে রাতের বেলা আমরা ছেড়ে দিতাম কিন্তু দিনের বেলা একটি ড্রামকে উপুড় করে তার ভেতরে তাকে রেখে দিতাম। ওপরের কাটা অংশ দিয়ে আলো-বাতাস যেত কিন্তু সে আর কোথাও বের হতে পারতো না, এবং কাউকে দেখতে পেতো না। সে কিছুক্ষণ ঘেউ ঘেউ করতো, তারপর ঘুমিয়ে পড়তো। সঠিক সময়ে তাকে বের করে এনে খাবার-দাবার দেওয়া হতো, আবার তার ঘরে তাকে রেখে দেওয়া হতো। দিনে দিনে জ্যাক বেড়ে উঠতে থাকলো। ওর রং ছিল লাল, গলার কিছু অংশ ছিল সাদা, কান দুটো ছিল ঝুলঝুলে। ওকে দেখতে ভালোই লাগতো।
: কয়েকদিন পর আব্বু ওর জন্য গলার একটি বেল্টসহ সুন্দর একখানা চেইন নিয়ে আসলেন। তাতে ওকে নিয়ে চলাফেরা করতে আমাদের সুবিধা হলো। দিনের বেলায় তাকে আমরা খুব অল্প সময় বাইরে রাখি, বাকি সময় সে তার ঘরে অন্ধকারের মধ্যে থাকে এবং রাত্রিবেলা তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। সে সারা রাত জেগে জেগে বাড়ির চতুর্দিকে ঘুরে বেড়ায় এবং যে-কোনো জীবন্ত কিছু বা নড়াচড়া করছে এমন কিছু দেখলেই ঘেউ ঘেউ করে তাড়িয়ে দেয়।
: কিছুদিন যাওয়ার পর ওকে আর আমরা দিনের বেলা অন্ধকার ঘরের মধ্যে রাখতাম না। ঘরের পেছনের দাওয়ার ওপর তাকে চেইন দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। আমাদের বাড়ির সবাইকে সে ভালোভাবেই চিনতো। কিন্তু অন্য অজানা কাউকে দেখলেই সে ঘেউ ঘেউ করে উঠতো। এর কিছুদিন পর আমরা দিনের বেলায়ও তাকে ছেড়ে দিয়ে রাখতাম। সে সারাদিন মূল দালানের দরজার বাইরে অথবা সদর দরজার কাছে শুয়ে বিশ্রাম নিতো এবং অপরিচিত কেউ আসলেই ঘেউ ঘেউ করে উঠতো। আমরা কেউ গিয়ে সামলে নিলে তারপর সে নিষ্ক্রান্ত হতো। কিন্তু রাত্রিবেলা তাকে কখনো দেখিনি কোথাও শুয়ে বসে থাকতে। সে সারাক্ষণ বাড়ির চতুর্দিকে ছুটে বেড়াতো এবং পাহারা দিতো।
: চোর তাড়ানোর অনেকগুলো ঘটনা তার আছে। তার মধ্যে কয়েকটা তোমাদের বলি। উমেইর বলল,
: হ্যাঁ! হ্যাঁ! ওই ঘটনাগুলোই বলো, নানাভাই! অন্যরাও বলল, হ্যাঁ! হ্যাঁ! নানাভাই বলতে শুরু করলেন। : একবার রাত দশটার দিকে হঠাৎ জ্যাক প্রচণ্ড শোরগোল শুরু করল। আমাদের ঘরের উত্তর দিকে বাগিচার সাথে ঘরের কোনায় একটা কচু বনের মতো ছিল। সেদিকে লক্ষ্য করে সে প্রচণ্ড ঘেউ ঘেউ করছে, এক পলকের জন্যও সেদিক থেকে অন্যদিকে দৃষ্টি সরাচ্ছে না। আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য সে একটুখানি দরজার সামনে এসে আবার ঘেউ ঘেউ করে ওই দিকে ছুটে যাচ্ছে। আব্বা হাতে লাঠি ও টর্চ লাইট নিয়ে বের হলেন। আমি তাঁর পিছে পিছে হাতে হারিকেন নিয়ে বের হলাম। তখনও আমাদের এলাকায় ইলেকট্রিসিটি আসেনি। ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত। আমাদের এগোতে দেখে জ্যাক কচুবনের মাঝখানটা লক্ষ্য করে প্রচণ্ড লাফালাফি এবং ঘেউ ঘেউ করতে শুরু করল। আমার ভীষণ ভয় ভয় লাগছিল। হারিকেনের আলোতে বেশি দূরে স্পষ্ট দেখা যায় না। আব্বা হাতের টর্চ লাইট জ্বেলে কচুবনের ভেতর লক্ষ্য করে দেখলেন, একটি ছোট্ট ছেলে উদাম গায়ে সেখানে লুকিয়ে আছে। আব্বা তাকে সেখান থেকে বের করে আনলেন।
: ছেলেটা যদিও মিথ্যা করে বলছিল সে ভুল করে এখানে এসেছে এবং কুকুরের ভয়ে লুকিয়ে আছে। কিন্তু আব্বা আমাদের যা বললেন তা হলো, গ্রামে ওই সময়ে চোর-ডাকাতদের উৎপাত বেড়ে গিয়েছিল। ওদের একটা পদ্ধতি ছিল এই যে, তারা ছোট কোনো ছেলেকে বাড়ির আশপাশে পাঠিয়ে দিতো। বাড়ির লোকেরা দরজা খোলা রেখে কিছু করছে এই ধরনের সুযোগে ছেলেটা লুকিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে যেত। পরে রাত্রিবেলা সে দরজা খুলে দিতো এবং চোর-ডাকাতরা খুব সহজে ঘরের ভেতর ঢুকে যেত। জ্যাকের সতর্কতার জন্য আল্লাহ সেবার একটি বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে আমাদের বাঁচিয়ে দিলেন।
: চোর ঢুকলে সব জিনিস নিয়ে যেত না? উমাইজা যেন আশ্বস্ত হয়ে বলল। এর জবাবে উমেইর অনেকটা বড়োদের মতো করে বলল,
: তাছাড়া মানুষেরও তো ক্ষতি করতে পারতো! চোর-ডাকাতরা তো মানুষের ক্ষতিই করে। জ্যাক আসলেই ভালো পাহারাদার ছিল, নানাভাই। তোমাদের উপকার করেছে অনেক!
নানাভাই বললেন,
: ওর জীবনের অনেকগুলো ঘটনাই আছে। সব তো বলে আজ শেষ করা যাবে না! আরেকটি ঘটনা বলি। রাতটা ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকার, আকাশে কোনো চাঁদ ছিল না। পাশের লোককেও দেখা যায় না, এমন অন্ধকার! চারিদিকে সুনসান নীরবতা। আমরা রাতের খাবার শেষ করেছি মাত্র। তখন, হঠাৎ জ্যাক খুব শোরগোল শুরু করে দিলো। সে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বারবার দরজার সামনে আসে আবার ঘেউ ঘেউ করতে করতে দৌড়ে ঘরের দক্ষিণ দিকে ছুটে যায়। এবারও আব্বা হাতে লাঠি এবং টর্চ নিয়ে বের হলেন, আর হাতে হারিকেন নিয়ে আমি আব্বার পিছু পিছু গেলাম। জ্যাক যেখানে লাফালাফি করছিল এবং ঘেউ ঘেউ করছিল সেখানে বড় আকারের কয়েকটা কলা গাছ ছিল। একটি কলা গাছে অনেক বড় একটা কলার ছড়ি এসেছিল বলে সেই কলার ছড়ির ভারে কলাগাছটি যেন ভেঙে না পড়ে তার জন্য ঠেকা দেওয়া হয়েছিল একটা বড় বাঁশ দিয়ে। চোর এসেছে কলার ছড়িটা চুরি করতে, আর কুকুরের ধাওয়া খেয়ে সে ওই বাঁশ বেয়ে ওপরে উঠে আত্মরক্ষা করছে। কুকুর তো আর বোঝাতেও পারে না বা আঙুল দিয়ে দেখাতেও পারে না! সে শুধু বাঁশটির কাছে লাফালাফি করছে আর অস্থির হয়ে খুব জোরে জোরে ঘেউ ঘেউ করছে। আমরা প্রথমে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। চারিদিকে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। খামোখা সে এত চিৎকার করছে কেন? হঠাৎ আব্বা ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখলেন চোরটা কাচুমাচু হয়ে কুকুরের ভয়ে ওপরে বাঁশটাকে আঁকড়ে ধরে বসে আছে। এমন অন্ধকারেও চোর জ্যাকের চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি। আমরা চোরকে ধরে ফেললাম।
এ কথা শুনেই ভীষণ উৎফুল্ল হয়ে উঠলো তিনজন শ্রোতাই! তিনজনেই নানা প্রশ্ন শুরু করল : চোর নিয়ে কী করা হলো? চোর দেখতে কেমন? পুলিশ ডাকা হয়েছিল কি-না? ইত্যাদি। নানাভাই তাদের সমঝে দিলেন যে চোর নিয়ে পরে অন্যদিন গল্প হবে, আজকে জ্যাকের কথাই শেষ করি। নানাভাই বলতে শুরু করলেন,
: জ্যাক আমাদের সবাইকেই খুব পছন্দ করতো। প্রতিদিন সে আমার আব্বাকে স্টেশন থেকে এগিয়ে নিয়ে আসতো। কেমনে জানি সে জানতো এই ট্রেনে আব্বা আসবেন। আগে থেকেই অনেক দূর এগিয়ে গিয়ে সে অপেক্ষা করতো। আব্বাকে এগিয়ে আসতে দেখলে কিছুক্ষণ কাচুমাচু করে তারপর আব্বার সামনে সামনে থেকে সে যেন আব্বাকে পাহারা দিয়ে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে আসতো। আম্মাও কখনো বাড়ির বাইরে গেলে, যেমন নানাবাড়িতে বেড়াতে গেলে, যখন ফিরে আসতেন অনেকক্ষণ ধরে সে আম্মার সামনে এমন অঙ্গভঙ্গি এবং নাচানাচি করতো যে বোঝাই যেত সে খুব খুশি হয়েছে।
: আসলেই জ্যাক ছিল ভীষণ সাহসী এবং এক বড় যোদ্ধা। আমাদের বাড়িতে রাত্রিবেলা অনেক সময় অন্য বাড়ি থেকে কুকুর আসতো। বিশেষ করে আশ্বিন-কার্তিক মাসে বাইরের কুকুরদের উপদ্রব বেড়ে যেত। জ্যাক তাদের তাড়াতে গেলেই ঝগড়া শুরু হতো। মাঝে মাঝেই কুকুরগুলোর মধ্যে প্রচণ্ড ঝগড়া হতো। জ্যাক কখনও অন্য কুকুরকে ছাড় দিতো না। এই বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে কোনো কুকুর আসুক সেটা জ্যাক সহ্য করতে পারতো না। জ্যাকের আকৃতি ছিল সাধারণ কুকুরের মতো ছোটখাটো। একদিন রাতে একটি অনেক বড় আকারের কুকুর এসেছিল। সে জ্যাকের সাথে অনেকক্ষণ ঝগড়া করল। কিন্তু ছোটখাটো আকৃতির জ্যাক তাকে কোনোমতেই ছাড় দিতে রাজি নয়। ঝগড়া যখন চরম পর্যায়ে আমরা তখন বের হলাম হাতে লাঠি এবং হারিকেন নিয়ে, ঝগড়া থামানোর জন্য। আমাদের বের হতে দেখে জ্যাকের যেন সাহস অনেকগুণ বেড়ে গেল। সে এত বড় কুকুরটার গায়ের ওপর যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লো তা অবিশ্বাস্য! প্রথমে সে ওই কুকুরটার পেছনের একটা পা কামড়ে ধরলো এবং সেই পা-কে অচল করে দিলো। এবার সে ওই কুকুরের পেছনের অপর পা-কেও প্রচণ্ডভাবে কামড়ে ধরলো এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটাকেও অচল করে দিলো। কুকুরটা এবার রণেভঙ্গ দিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে চলে যেতে চেষ্টা করছিল। কিন্তু জ্যাকের রাগ তখনও কমেনি। সে তীব্র বেগে ছুটে গিয়ে কুকুরটার গলায় প্রচণ্ডভাবে কামড়ে ধরলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই এত বড় কুকুরটা অনেকটা নির্জীব হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। আমরা কোনোমতেই জ্যাককে শান্ত করতে পারছিলাম না। আব্বা অনেক ধমক দিয়ে তাকে কাছে ডেকে আনলেন। আম্মা তাকে খাবার দিলেন। তারপরও তার রাগ যায় না। সে বারবার ওই কুকুরের দিকে ছুটে যায়। আমরা শেষে তাকে গলায় চেইন দিয়ে আটকে তার সামনে খাবার রাখলাম। পরদিন সকালে আমরা দেখেছিলাম যে বাইরের কুকুরটা একটু দূরেই মরে পড়ে আছে।
: এভাবে অন্য কুকুরের সাথে ঝগড়া করতে গিয়ে জ্যাক শরীরের নানা জায়গায় আঘাত পেতো। আমরা তাকে ঔষধপত্র দিয়ে সারিয়ে তুলতাম। একবার অন্য কুকুরের কামড় খেয়ে তার ঘাড়ে ঘা হয়ে গেল। ঔষধপত্রেও তা সেরে উঠলো না এবং ঘাটা দিন দিন বাড়তে থাকলো। জ্যাকেরও বয়স হয়েছে! ঘাটা তাকে খুব কাবু করে ফেলল এবং সে ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ছিল। ঘাটা অনেক বড় হয়ে গেল এবং সেখানে সারাক্ষণ মাছি ভনভন করতো। মাছি তাড়ানোর জন্য মাথা ঝাঁকি দিলে চারিদিকে পুঁজ ছিটিয়ে পড়তো। এতে ঘরের দরজার সিঁড়ি নোংরা হচ্ছিল। তাই একদিন আব্বা ওকে একটু ধমক দিয়ে বলেছিলেন, দূরে কোথাও যেতে।
: আমরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম এরপর থেকে জ্যাক আর কখনো আমাদের ঘরের দরজায় আসেনি। সে গিয়ে জায়গা করে নিল আমাদের দেউড়ি ঘরের কোণে চাপাকলের পাশে শুকনো জায়গাটাতে। প্রতিদিন তাকে খাবার দেওয়া হয়। খাবার খেয়ে জ্যাক ওখানেই শুয়ে থাকে। ওর ঘাড়ের ঘা-টাও কমেনি বরং বেড়েছে। কয়েকদিন পর দেখলাম তার প্রাণহীন দেহটা পড়ে আছে। আমাদের ঘরের সকলের জন্য এটা ছিল অত্যন্ত দুঃখজনক একটি ঘটনা। আমাদের কেউ যেন কান্না চেপে রাখতে পারিনি।
: মৃত্যুর পর ওর মৃতদেহটাকে চাপাকলের পাশেই একটি গর্ত করে পুঁতে দিয়েছিলাম আমি। আমি তখন একটা কাজ করেছিলাম। একটি কাচের বোতলের ভেতর এক টুকরো কাগজে জ্যাক সম্পর্কে কিছু তথ্য দিয়ে তার মৃতদেহের সাথে রেখে দিয়েছিলাম, এই ভেবে যে কোনোদিন কেউ যদি এই পত্রখানা পায় তাহলে তারা জানতে পারবে- এখানেই একটি প্রভুভক্ত নিবেদিতপ্রাণ কুকুরের দেহাবশেষ ছিল। গল্প শেষ করতে গিয়ে নানা ভাইয়ের গলার স্বর যেভাবে নরম হয়ে এসেছিল, তাতে উমেইররা কেউ কোনো প্রশ্ন করল না। গল্প শুনে সবার যেন মন খারাপ হয়ে গেছে।
এটাই জ্যাক নামের প্রভুভক্ত কুকুরটির জন্য সবার ভালোবাসা।
আরও পড়ুন...