আতঙ্কের রাত
উপন্যাস আহমদ মতিউর রহমান জুন ২০২৫
গাজা উপত্যকার দেইর আল বালাহ শহর। নি®প্রাণ নির্জীব এক শহর। এই শহরের খেজুর আর জলপাই গাছগুলোর পাতায় পাতায় বাতাস দোল খেয়ে যায় যখন, তখন বেশ মনোহর লাগে। একসময় জলপাই গাছের পাতার ফাঁকে দেখা যেত টুনটুনি জাতীয় ছোট ছোট পাখি! ছেলের দল খেলে বেড়াতো শহরের আল ফালাহ মাঠে। বলা হতো আল ফালাহ স্টেডিয়াম। তেমন কাঠামো ছিল না, ছিল না ফুটবলের দর্শনার্থীদের বসার কোনো গ্যালারি। কিন্তু খোলা প্রান্তরটা ছিল মনকাড়া। এখন খেজুর বীথি ও জলপাই বাগানের সৌন্দর্য অনেকটাই আর নেই। সব কিছু নির্জীব হয়ে পড়েছে। এক দানব যেন সব কিছু তছনছ করে দিয়ে গেছে।
আল ফালাহ মাঠে মাঝে মাঝে বড়ো বড়ো খেলা হয়েছে। এই মাঠেই ফিলিস্তিন জাতীয় দলের সাথে এক বার খেলে গেছেন লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনার খ্যাতিমান খেলোয়াড়।
খেলাটা ছিল একটি ফ্রেন্ডলি ম্যাচ। প্রীতি ম্যাচ। খেলায় প্রীতি ছিল কি না জানা নেই শহরের বাসিন্দাদের। কিন্তু মেসির প্রীতির পরশ পেয়েছে সবাই।
মেসির খেলা বলে কথা। সেই খেলা দেখতে গিয়েছিল অন্য অনেকের সাথে দেইর আল বালাহ শহরের আল আহলি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ক্লাস সেভেনের ছাত্র জুহাইর আল নাসর। আহ কি মজাই না হয়েছিল সেবার।
সেই আনন্দ আজ বাসি। মজা উধাও হয়ে গেছে। সারা শহর জুড়ে থমথমে পরিবেশ। কি জানি কখন এসে পড়বে ইসরাইলি বাহিনীর কামানের গোলা। অথবা ধেয়ে আসবে বোমারু বিমান। কড় কড় কড়াত। দ্রিমি দ্রিমি দ্রুম।
ছোট একটি ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে বড়ো একটি যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে জায়নবাদী রাষ্ট্রটি। তাই জুহাইরের মন আজ ভালো নেই।
দেইর আল-বালাহ গাজা উপত্যকার মধ্যভাগে অবস্থিত একটি শহর এবং ফিলিস্তিন রাজ্যের দেইর আল-বালাহ গভর্নরেটের প্রশাসনিক রাজধানী। এটি গাজা শহর থেকে চৌদ্দ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। শহরের জনসংখ্যা ৭৫ হাজার। শহরটি তার খেজুর গাছের জন্য পরিচিত, যার নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে।
দেইর আল-বালাহ ব্রোঞ্জ যুগের শেষের দিকে তৈরি, যখন এটি মিসরের নতুন রাজ্যের জন্য একটি সুরক্ষিত ফাঁড়ি হিসেবে কাজ করত। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে খ্রিস্টান সেইন্ট হিলারিয়ন সেখানে একটি মনাস্ট্রি নির্মাণ করেছিলেন। বর্তমানে এটি সেন্ট জর্জের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত একটি মসজিদের স্থান বলে মনে করা হয়, যা স্থানীয়ভাবে আল-খিদর নামে পরিচিত।
ক্রুসেডের সময় দেইর আল-বালাহ ছিল ‘দারুম’ নামে পরিচিত একটি কৌশলগত উপকূলীয় দুর্গের স্থান, যা ১১৯৬ সালে চূড়ান্ত ধ্বংসের আগ পর্যন্ত উভয় পক্ষের ক্রমাগত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বারবার ভেঙে ফেলা এবং পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল। সে এক লম্বা ইতিহাস।
তিরিশ বছর ধরে ইসরাইলি দখলদারিত্বের পর ১৯৯৪ সালে দেইর আল-বালাহ ফিলিস্তিনি স্বশাসনের অধীনে আসা প্রথম শহর হয়ে ওঠে। ২০০০ সালে দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সূত্রপাতের পর থেকে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর ঘন ঘন অনুপ্রবেশের সাক্ষী হয়ে আছে, যার লক্ষ্য ছিল ইসরাইলে কাসসাম ব্রিগেডের রকেট হামলা বন্ধ করা। দেইর আল-বালাহ আরবি নাম অনুবাদ করলে হয় খেজুরের মনাস্ট্রি। শহরের পশ্চিমে অবস্থিত খেজুর গাছের নামানুসারে নামকরণ করা হয়েছে। এক সময় শহরটির নামকরণ করা হয়েছিল আল-খিদরের নামে, যিনি ফিলিস্তিনের এক জন সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। দেইর আল-বালাহর মসজিদে তার সমাধি রয়েছে।
এই শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ভূমধ্যসাগর। তার পাশে একটি নহর, ছোট নদীর মতো কিন্তু আসলে একটি খাল ছাড়া কিছু ছিল না। সেই শহরটি এখন প্রায় বিধ্বস্ত। ইসরাইলি হানায় এই শহরের কোনো ভবন আর টিকে নেই। সব ভবন ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে হানাদার সেনারা।
ইসরাইলি বিমান এলে ভয়ে মরে শিশুরা। জুহাইর আল নাসর আর তার ছোট বোন রাফাত দিয়াব সে সব কথা ভাবতে গিয়ে শুধু অবাক হয় আর নীরবে অশ্রু ফেলে।
দশ বছরের মেয়ে দিয়াব। কিন্তু দেখলে মনে হবে তার বয়স বুঝি ছয় বা সাত। এক বছরের বেশি সময় ধরে ওদের বাবা মা ভাই আত্মীয় স্বজনরা আছে ভয়ের মধ্যে। অবশ্য তাদের মধ্যে অনেকেই আর বেঁচে নেই।
প্রতিদিন গাজা উপত্যকায় একশো পাঁচজনের মতো শহীদ হচ্ছে। এখন খাবার সংকট ভয়াবহ। তিন বেলা খাবার জোটে না সবার। রাফাত দিয়াবদেরও একই অবস্থা। ওর বাবা নাসর আল খিত্তাব রেড ক্রিসেন্টের কর্মী। থাকেন হাসপাতাল বা শরণার্থী আশ্রয় কেন্দ্রে। কদাচিৎ বাড়িতে আসেন। মাঝে মাঝে এসে ছেলেমেয়েদের দেখা দিয়ে যান। ওর মা জুহাম রিশাদ এক হাসপাতালের কর্মী।
২.
দেইর আল বালাহ শহরে সবার মুখে মুখে কিশোর ‘নিউটন’ হিসেবে পরিচিত জুহাইবের নাম। অন্ধকারে ডুবে আছে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা ভূখণ্ড। ডুবে আছে দেইর আল বালাহ। রাতের আঁধারে আলোর দেখা নেই। প্রচণ্ড গরমে পাখার বাতাস নেই। হাসপাতালের সরঞ্জামগুলোও বিদ্যুতের অভাবে অচল।শহরটির এমন দুর্দিনে মৌলিক কিছু সরঞ্জাম দিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করল ফিলিস্তিনি এই কিশোর। গাজায়ও এ রকম একজন নিউটন আছে। তার নাম শুনেছে জুহাইর। সে তার কাছে থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছে। গাজার ছেলেটির নাম হাসসাম আল-আত্তা। বয়স ১৫। পত্রিকাতে পড়েছে তার নাম। নামটি নাকি বেশ ছড়িয়েছে আর সবাই প্রশংসা করছে।
জুহাইরের চাচা হিশাম। স্থানীয় একটি ভার্সিটির কম্পিউটার বিভাগের ছাত্র। তিনি নিয়ে এসেছেন পত্রিকাটি। যদিও এখন মা বাবা ভাই বোন কারো পত্রিকা পড়ার মতো অবস্থা নেই।
আন নাবা পত্রিকাটি হাতে নিয়ে অবাক হয় জুহাইর। সে ভাবে সেও হাসসাম হবে। যেই ভাবা সেই কাজ।
হাসসামের এমন অভিনব কাজে মুখে মুখে এখন হাসসামের নাম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের এলাকায় ইতোমধ্যেই ‘গাজার নিউটন’ হিসাবেও উপাধি পেয়েছে সে। আলজাজিরা টিভিতেও জুহাইর দেখেছে তার খবর। ইসরাইলি গোলার আঘাতে তাদের টিভিটা ভেঙ্গে গেছে। সে কমিউনিটি হাসপাতালে গিয়ে মাঝে মাঝে খবর দেখে। সেখানেই দেখেছে হাসসামের ছবি। আর অবাক হয়েছে।
সে যা জেনেছে তা হলো সাত অক্টোবর ২০২৩ থেকে ইসরাইলি ভয়াবহ হামলায় বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে গাজা। বেশির ভাগ আবাসিক ভবনই মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বৈদ্যুতিক অবকাঠামোগুলো। এ অবস্থায় পকেট ডায়নামো আর টিনের পাখা ব্যবহার করে ছোট পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে হাসসাম। সে বলে, “আমার এলাকার সবাই আমাকে গাজার নিউটন বলে ডাকে। যুদ্ধের কারণে আমি যেখানে থাকি সেখানে কোনো বিদ্যুৎ নেই। তাই আমি আমার সাধ্যমতো এখানে আলো জ্বালানোর চেষ্টা করেছি।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া জিজ্ঞাসা করা হলে সে জানায়, আমি বাজার থেকে এক শেকেল (ফিলিস্তিনি মুদ্রা) দিয়ে একটি পকেট ডায়নামো কিনে আনি।
সাধারণত যখন একটি ডায়নামোকে ঘোরানো হয়, তখন এর সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। এই মূলনীতি অনুসরণ করে আমি আমাদের বাড়ির চালে একটি ডায়নামো স্থাপন করি এবং এটির সঙ্গে একটি পাখা যুক্ত করে দেই। বাতাসের সাহায্যে এই পাখা ঘুরলে ডায়নামো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়।”
গাজার এই উদ্যমী কিশোর আরও বলে, “আমাদের যদি ব্যাটারি থাকত তাহলে হয়তো সেগুলোকে রিচার্জ করে রেখে আরও বেশি বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো যেত। আমরা অল্প করে হলেও ২৪ ঘণ্টাই বিদ্যুতের সুবিধা পেতাম।”
হাসসাম জানায়, তার যমজ ভাগ্নেদের আলোর অভাবে ভয় পেতে দেখে এ উদ্ভাবনের বিষয়টি তার মাথায় আসে। যুদ্ধের আগে সে জাবেল মুকাবের স্কুলের ছাত্র ছিল। হাসসাম বলে, “আমার মতো শত শত উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন কিশোর আছে গাজায়। কিন্তু কেউই তাদের দিকে নজর দেয় না, কাজের প্রশংসা করে না।” আরব বিশ্বের দেশগুলো ও বিশ্ব সম্প্রদায়কে গাজায় যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে এই কিশোর আরও বলে, “আমরা আমাদের স্বপ্নগুলো বাস্তবায়ন করতে চাই।”
টিভির খবরে এত কিছু জানতে পেরেছে জুহাইর। টিভির খবর দেখে অবাকও হয় জুহাইর। তার পর ভেবেছে কি করা যায়। ভাবনাটা তার মাথা খারাপ করে দিচ্ছে। দেশের জন্য শহরের জন্য কিছু একটা করা দরকার।
পরের দিন সে হিশাম চাচাকে বলে-
: চাচা, আমাকে কি একটা পকেট ডায়নামো এনে দেবে?
: এটা আবার কী জিনিস। অবাক হয়ে জানতে চান হিশাম। কম্পিউটার বিজ্ঞানের ছাত্র হিশাম এটা চেনে না এমন নয়। কিন্তু তার ছোট ভাস্তে জুহাইর এটা দিয়ে কি করবে এটাই জানার ইচ্ছে তার।
: এনে দেবে কি না বলো।
: বল না কি করবি?
: ঘর অন্ধকার। আলো জ্বালাব।
: বলিস কি? তুইও নিউটন হবি নাকি?
জুহাইর বুঝতে পারে হিশাম চাচা গাজার ঘটনাটা জানে। তার পর হিশাম বলেন-
: চল কালই তোকে নিয়ে যাব। কিনেও দেবো। দেখিস কারেন্টে পুড়ে মরিস না যেন।
কিছুটা লজ্জা পায় জুহাইর। আবার খুশিও হয়। যাক এবার যদি সমাধান করা যায় বিদ্যুৎ সমস্যার।
দেখতে দেখতে কয়েক দিন যায়। ঘন অন্ধকার চেপে বসে রাত নামার সাথে। সারা শহরে যেন ব্যাপক নিষ্প্রদীপ মহড়া চলছে।
হ্যাঁ নিষ্প্রদ্বীপ মহড়া তো চলেই। কিন্তু এমন ঘন অন্ধকার যে পাশের বাথরুমে যেতেও ভয় করে।
এ সময় মাকে ভয়ে জড়িয়ে ধরে জুহাইরের ছোট বোন রাফাত দিয়াব। সে খুব ভীতু। এটা দেখে মা বকা দেন। বলেন-
: দেখো মা মনি। আমরা যুদ্ধের ময়দানে আছি। ভয় পেলে কি চলবে? বড়ো হয়ে তোমরা একেক জন লায়লা খালেদ হবে এটাই আমরা আশা করি। দেখো না তোমাদের ভাইরা কেমন এক এক জন খালেদ বিন ওয়ালিদ, ইয়াসির আরাফাত হয়ে উঠে যুদ্ধে যাচ্ছে।
সবার ছোট রুকাইয়া দিয়াব এত কিছু বোঝে না। সে মায়ের দিকে অবাক হয়ে তাকায়। আরো জোরে মাকে জড়িয়ে ধরে।
: লায়লা খালেদ কে মা? রাফাত দিয়াব জানতে চায়।
: খায়লা খালেদ আমাদের এক বিপ্লবী অগ্নিকন্যার নাম। বড়ো হও জানতে পারবে।
: বলো না মাম্মি। জুহাইরও আবদার করে।
মা জুহাম রিশাদ শুরু করেন লায়লার গল্প।
লায়লা খালেদ তার নাম। তিনি একজন অসমসাহসী ফিলিস্তিনি যোদ্ধা। তিনি ফিলিস্তিনি যোদ্ধা সংগঠন পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অফ প্যালেস্টাইনের সদস্য ছিলেন। তিনি একটি বিমান হাইজ্যাক করা প্রথম মহিলা হিসাবে বিখ্যাত।
তিনি আরো বর্ণনা দেন। লায়লা ১৯৬৯ সালে একটি বিমান হাইজ্যাকিং এবং পরের বছর জর্ডানে ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরের প্রচারণার অংশ হিসাবে একযোগে চারটি ডসনস ফিল্ড হাইজ্যাকিংয়ের একটিতে তার ভূমিকার জন্য নাম করেছিলেন। বন্দি হওয়ার পর তার প্রাণটাই চলে যেতে পারতো। কিন্তু খোদা রহম। দলের অন্য সদস্যদের দ্বারা অপহৃত বেসামরিক জিম্মিদের বিনিময়ে বন্দি বিনিময় চুক্তির পর তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
: বিমান ছিনতাই? এত অনেক ভয়ের মা। সে এটা করল? প্রশ্ন করে জুহাইর।
: হ্যাঁ বাছা। লায়লা খালেদ খুব সাহসী ছিলেন। তার জন্ম ৯ এপ্রিল, ১৯৪৪, হাইফাতে। তার পরিবার ১৯৪৮ সালে লেবাননে চলে যায়। তার বাবাকে রেখে যায়। পনেরো বছর বয়সে লায়লা তার ভাইয়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে প্যান-আরব আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে যোগ দেন। তখন তিনি আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অফ বৈরুতের একজন মেডিক্যাল ছাত্রী ।
: তিনি ডাক্তার ছিলেন মা? ছোট মেয়েটা বলে।
: হ্যাঁ মা মনি। তবে ডাক্তারি করা তার হয়নি।
লায়লা কুয়েতে শিক্ষকতা করে কিছু সময় কাটিয়েছেন। লায়লা খালেদ ১৯৭০ সালে যুক্তরাজ্য থেকে মুক্তি পাওয়ার পর দামেস্কে আসেন।
: আর বিমান ছিনতাই?
: ২৯শে আগস্ট, ১৯৬৯-এ, লায়লা একটি দলের অংশ ছিলেন যেটি রোম থেকে তেল আবিব যাওয়ার পথে একটি বিমান হাইজ্যাক করেন। বোয়িং ৭০৭ কে ডাইভার্ট করে দামেস্কে নিয়ে যান। এটা করা হয়েছিল ফিলিস্তিনিদের দাবির ব্যাপারে বিশে^র দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। এই বলে থামেন মা।
তিনি আবার শুরু করেন। ৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৭০-এ লায়লা এবং প্যাট্রিক আরগুয়েলো, যিনি একজন নিকারাগুয়ান-আমেরিকান, ডসনস ফিল্ড হাইজ্যাকিংয়ের অংশ হিসেবে আমস্টারডাম থেকে নিউ ইয়র্ক সিটির এল আল ফ্লাইট ২১৯ হাইজ্যাক করার চেষ্টা করেছিলেন। লায়লা ও আর্গুয়েলো তাদের ককপিটে প্রবেশাধিকার না দিলে গ্রেনেড বিস্ফোরণের হুমকি দেন। আর তা ছিল এতটাই দুঃসাহসী যে-কোনো সময় মৃত্যু হতে পারতো।
পাইলটরা তা মানতে অস্বীকৃতি জানায়। কেউ একজন বোতল দিয়ে আর্গুয়েলোর মাথায় আঘাত করে; আর্গুয়েলো একজন ক্রু সদস্যকে গুলি করে আহত করেন। আর একটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করেন যা যাত্রীদের দিকে ছোড়া হলেও বিস্ফোরিত হয়নি।
স্কাই মার্শালরা আর্গুয়েলোকে একাধিকবার গুলি করে, তাকে মারাত্মকভাবে আহত করে। পাইলট বিমানটিকে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে নিয়ে যান। একটি অ্যাম্বুলেন্স আহত ক্রু সদস্য এবং আর্গুয়েলোকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। অ্যাম্বুলেন্সে আর্গুয়েলো মারা গেলে ক্রু সদস্য বেঁচে যান। লায়লাকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু তিনি ভয় পাননি। জিম্মি বিনিময়ের সময় পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
: এর পর কি হলো মা। জুহাইর জানতে চায়।
: তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে প্যালেস্টাইন জাতীয় কাউন্সিলের সদস্য হন এবং বিশ্ব সামাজিক ফোরামে নিয়মিত উপস্থিত হন। জর্ডানের আম্মানে থাকতেন ।
: মা, তুমিও কি লায়লা খালেদ হতে চেয়েছ? জুহাইর প্রশ্ন করে।
: তা তো চেয়েছিই। হতে পারলাম কই। তোদের মানুষ করতেই তো হিমশিম খাচ্ছি দুষ্টুর দল।
: তারপর কী হলো?
: তাকে নিয়ে হাইজ্যাকার নামে একটি সিনেমা হয়েছে। বিশ^ তার মাধ্যমে ফিলিস্তিনকে জেনেছে। ভালোবেসেছে।
: ভালোবেসেছে না ছাই। এভাবে প্রতিদিন আমরা মারা পড়ছি। বিশ^ কেথায় মা?
এ প্রশ্নে থমকে যান মা। তার কি আর বলার আছে?
লায়লার গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ে ছোট মেয়ে। জুহাইর ও দিয়াবও হাই তোলে।
৩.
ফিলিস্তিন বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত একটি দেশের নাম। তবে দেশ হয়েও যেন দেশ নয় ফিলিস্তিন। কারণ জাতিসংঘের সদস্য দেশ হলেও কোনো প্রস্তাবে ভোট দেওয়ার ক্ষমতা দেশটির নেই। ১৯৪৮ সালে এই দেশটির বিশাল এলাকা নিয়ে অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলের জন্ম। উচ্ছেদ হয় মূল বাসিন্দারা। সে এক লম্বা ইতিহাস। সে থেকে একটি দুঃখী রাষ্ট্র ফিলিস্তিন। অসলো চুক্তির মধ্য দিয়ে ১৯৯৩ সালে গাজা আর পশ্চিম তীর নিয়ে গঠিত হয়েছে স্বাধীন ফিলিস্তিন। কিন্তু নামেই স্বাধীন। দেশটি সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সমর্থন পেলেও এর সমস্যাগুলো সমাধান কেউ করছে না।ফিলিস্তিনের ইংরেজি নাম প্যালেস্টাইন। আরবি নাম ফিলাস্তিন। সরকারিভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের নাম দাউলাৎ ফিলাস্তিন। ইতিহাসটি আরো খোলাসা করলে এটি মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের নির্বাসন ঘোষিত একটি রাষ্ট্র, যেখানে ১৫ নভেম্বর ১৯৮৮ সালে আলজিয়ার্স শহরে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অরগানাইজেশন (পিএলও) ও প্যালেস্টাইন জাতীয় পরিষদ (পিএনসি) একপাক্ষিক ভাবে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল। ইয়াসির আরাফাত পিএলওর নেতা ছিলেন। ছিলেন বিশ^ব্যাপী সমাদৃত একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী।
এ সময়ে কোনো অঞ্চলেই পিএলওর নিয়ন্ত্রণ ছিল না, যদিও তারা যে অঞ্চলগুলো দাবি করেছিল। সেইগুলো ইসরাইলের দখলে রয়েছে। ২২ নভেম্বর ১৯৭৪ থেকে একটি জাতি হিসেবে পিএলওকে রাষ্ট্রহীন-সত্তা রূপে পর্যবেক্ষক অবস্থায় রাখা হয়েছিল। যারা কেবলমাত্র জাতিসংঘে তাদের বক্তব্য রাখতে পারবে, কিন্তু ভোট দেবার কোনো ক্ষমতা নেই।
১৯৯৩ সালে অসলো চুক্তির মধ্য দিয়ে বর্তমান ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত হয়। দেশটি ইসরাইলের অস্তিত্ব মেনে নিলেও কথা রাখেনি ইসরাইল। কথা রাখেনি এই চুক্তির পেছনে থাকা আমেরিকা ও অন্য দেশগুলো। ফিলিস্তিন দুই অংশে বিভক্ত। একটি পশ্চিম তীর আর অন্যটি গাজা। ফিলিস্তিনের মোট জনসংখ্যা ৫২ লাখেরও বেশি। বহু ফিলিস্তিনি আশপাশের দেশে উদ্বাস্তু হিসেবে বাস করে।
আর গাজা ভূখণ্ড বা গাজা উপত্যকা, আরবিতে বলা হয় কিত্বাউ গাজজাহ। এটি ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত একটি স্ব-শাসিত ফিলিস্তিনি অঞ্চল। অঞ্চলটির প্রায় ৩২০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় রয়েছে চারটি শহর, আটটি ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবির ও এগারোটি গ্রাম। প্রায় ২৩ লাখ ফিলিস্তিনি ও ১৭,০০০ নতুন ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারী এতে বসবাস করে। গাজা ভূখণ্ডের পশ্চিমে রয়েছে ভূমধ্যসাগর, দক্ষিণ-পশ্চিমে মিসর এবং উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বে ইসরাইল।
এই অঞ্চলটি ফিলিস্তিনি হামাস সরকারের শাসনে রয়েছে। ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তি অনুসারে ইসরাইল ফিলিস্তিনি জাতীয় কর্তৃপক্ষকে স্বীকৃতি দেয়, যারা গাজায় সীমিত পরিসরে স্ব-শাসন প্রতিষ্ঠা করে। ২০০৭ সাল থেকে অঞ্চলটির শাসনকার্য কার্যত হামাস কর্তৃক পরিচালিত হচ্ছে, যারা নিজেদের ফিলিস্তিনি জাতীয় কর্তৃপক্ষ ও ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতিনিধি দাবি করে।
৪.
দেখতে দেখতে রাত নামে। তখন মধ্যরাত। গাজার দক্ষিণ প্রান্তে দেইর আল-বালাহ শহরে তখন সবার ঘুমে থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। ঘুটঘুটে অন্ধকারে কিছু দেখার জো নেই। অন্য অনেকের সাথে শহরের একটি হাসপাতালের বারান্দায় বসে আছে কিশোর জুহাইর।এমন সময় দ্রুম। দ্রিমি দ্রিমি দ্রুম। তারপর আরো বিকট শব্দে বাজ পড়লো যেন। সবাই চমকে যায়।
আকাশ কিছুটা আলো করে এই মাত্র হাসপাতাল কম্পাউন্ডে ইসরাইলি সেনাদের ছোঁড়া একটি রকেট আঘাত হানলো। কি করবে কোনো দিশা না পেয়ে সেখান থেকে বের হয়ে পড়লো জুহাইর।
যুদ্ধে হাসপাতালের চেয়ে নিরাপদ আশ্রয় আর কী হতে পারে? এটা ভেবে রাতে বাড়িঘর ছেড়ে সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল জুহাইর।
অক্টোবর ২০২৩। সাত তারিখের ভোর বেলা আচম্বিতে কড় কড় শব্দ করে একের পর এক ইসরাইলি গোলা আর ক্ষেপণাস্ত্র পড়া শুরু হয় গাজায়। দেইর আল বালাহ শহর আর শহরতলিও এর ব্যতিক্রম ছিল না। পড়ি মরি করে যে যার মতো নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটতে থাকে। এমনি এক দিন ছুটতে ছুটতে বাড়ি আসার পথে গোলার আঘাতে শহীদ হয় জুহাইরের বড়ো ভাই, স্থানীয় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের ছাত্র জুবাইর। ওদের মা মুহূর্তে মূর্ছা যান। বাবা তখন পাশে নেই। তিনি এক রেড ক্রিসেন্টের কর্মী। তিনি কর্মস্থলে মানুষের সেবায় নিয়োজিত।
জুবাইরের জানাজা ও দাফনেও আসতে পারেননি বাবা। হামাসের একটি মারকাজুল ইউনিট এসে লাশ দাফন করেছে। মা সেই সময় বাক হারা হয়ে যান। সারা রাত কান্না করেন ছেলের জন্য। দোয়া করেন। এখন মনে হচ্ছে দোয়া করতেও যেন ভুলে যাচ্ছেন তিনি। ফিলিস্তিনিরা প্রতিদিন ছয় ওয়াক্ত নামাজ পড়েও দোয়া করে। ফরজ পাঁচ ওয়াক্তের সাথে যোগ হয়েছে জানাজার নামাজ। প্রতিদিনই কেউ না কেউ শহীদ হচ্ছে। আর তার জানাজা পড়তে হয়। ফলে প্রতিদিন ছয় ওয়াক্ত নামাজ পড়তে হয়। প্রতি শহরে পাড়া মহল্লায় এই একই চিত্র।
কয়েক মাসে মা তার বড়ো ছেলে হারানোর শোক কিছুটা কাটিয়ে উঠেছেন। কিন্তু তার ভাবনা যেন আর যায় না।
মায়ের মতো জুহাইরও ভাবে। সে অনেক কিছু ভাবে। জুহাইর ভেবে পায় না তারা ফিলিস্তিনিরা কি এমন অপরাধ করেছে যে শুধু মৃত্যুর স্বাদ নিতে হচ্ছে তাদের। তাদের জীবনের কি কোনো দাম নেই? হার্মাদ রাষ্ট্র ইসরাইল এভাবে হাসপাতালে, বাসা বাড়িতে বিভিন্ন জনসমাগমের স্থানে ইচ্ছাকৃতভাবে বোমা ও রকেট হামলা করে ওদের হত্যা করবে? কেউ কি তা দেখার নেই। কেউ প্রতিবাদ করবে না?
বোমার শব্দে কান ফাটার অবস্থা। হাসপাতাল কম্পাউন্ডের বাইরে একটা টিন শেডে রাত কাটিয়ে ওদের বাসায় ফিরে আসে। বাসা বলতে ভাঙা একটি তিনতলা বাড়ির দোতলার দুটি রুম। সেখানেই গাদাগাদি করে থাকে ওরা।
৫.
দেইর আল বালাহ শহরে রাত কেটে গিয়ে যথা নিয়মে ভোর হয়। দূরে লাল সূর্য উঁকি দেয়। খেজুর গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো ঠিকরে মাটিতে পড়ছে। মাটি মানে ইট সুরকি আবর্জনা ছড়ানো ছিটানো ইসরাইলি বিমান হামলার ড্রেব্রিজ, ধ্বংসাবশেষ। খেজুর গাছের পাশে একটা জলপাই গাছ। আশপাশে আরো কয়েকটি আছে।এত মানুষের প্রাণ গেল মনে হয় বড়ো জলপাই গাছটা তা জানে না। তার পাতা হালকা বাতাসে কাঁপছে। সামনে পেছনে অর্ধভগ্ন ভবনগুলো দাঁড়িয়ে আছে।
আচ্ছা কোনো গাছ কি মানুষের দুঃখ কষ্ট বুঝতে পারে? জুহাইরের তা জানা নেই। যদি বুঝতে পারতো তবে কি কান্না করতো? তাও তার জানা নেই।
মা রাতে অনেক কথা বললেও কিছু কথা কিন্তু বলেননি। তার বোন ও ভাইরা ছিল ফিলিস্তিনি গেরিলা দলের কর্মী। তার খালা বুশরা আল খাইর নাম লিখিয়েছিলেন ইজেদ্দিন আল কাসাম ব্রিগেডের নারী দলে। আর তার ভাই, মানে জুহাইরের মামা মাতার আল নিহাব ছিলেন চৌকস যোদ্ধা। তারা দু’জনই শহীদ হয়েছেন।
মামা নিহাব ২০২৩ এর ৭ অক্টোবর ইসরাইলের ভেতরে আক্রমণকারী স্পেশাল ব্রিগেডের যোদ্ধা দলের একজন ছিলেন। ইসরাইলের বারো কিলোমিটার অভ্যন্তরে ঢুকে যায় তার ব্রিগেড। সেখানে পৌঁছে নিহাব সেজদায় লুটিয়ে পড়ার সময় ইসরাইলি গোলার আঘাতে তার দেহ ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
আর খালা বুশরা নিহত হন আদ দিয়াত বন্দরে চোরাগোপ্তা এক হামলায়। তারা দু’জন শাহাদাতের দরজা পাওয়ায় খুশি তাদের পরিবার।
কথায় কথায় সাত অক্টোবরের কথা মনে আসে জুহাইরের। বছর পেরিয়ে গেছে ইসারইলি হানাদারদের ধ্বংসের কোনো শেষ নেই। ২০২৩ সালের সাত অক্টোবর আসে ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি বীরত্বসূচক দিন হিসেবে।
সে মনে করার চেষ্টা করে সব।
সাত অক্টোবর। ২০২৩।
ইসরাইলের অভ্যন্তরে হামাসের আকস্মিক আক্রমণের মাধ্যমে শুরু হয় যুদ্ধ। ক্রমাগত মার খেতে খেতে হামাস যোদ্ধারা এক অভিনব পরিকল্পনা করে। তারা বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ঢুকে পড়ে ইসরাইলের ভেতরে। যেতে যেতে বারো কিলোমিটার পর্যন্ত যায় তারা।
না তেমন প্রতিরোধ করতে পারেনি ইসরাইলি সেনারা। করবে কি করে? হামাসের চৌকস যোদ্ধারা এ রকমটা করবে তাদের কল্পনাতেই তা ছিল না।
কী ঘটেছিল সেদিন?
নাহাল ওজ নামের এক ইসরাইলি ঘাঁটি সাত অক্টোবর সকালে দখলে নিয়েছিলেন হামাসের যোদ্ধারা। ওই ঘাঁটির ষাট ইসরাইলি সেনা নিহত হয়। অন্যদের জিম্মি হিসেবে গাজায় ধরে নিয়ে আসে তারা। হামাস একটা কৌশল করেছিল। হামলার কয়েক দিন আগে হঠাৎ করেই হামাসের কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যায়। হামলার সময় অনেক ইসরাইলি সেনা ছিল নিরস্ত্র এবং দাপ্তরিক নিয়মের কারণে হামলার সময় সেনাদের সামনে অগ্রসর হওয়ার পরিবর্তে পিছু হটতে হয়েছে। এছাড়া কিছু নজরদারি ক্যামেরা হয় অকার্যকর ছিল কিংবা হামাস সহজেই ধ্বংস করতে সমর্থ হয়েছিল।
সীমান্তের কাছের একটি ঘাঁটিতে কমসংখ্যক সেনা অস্ত্রসজ্জিত ছিল। আক্রান্তদের সাহায্যে অতিরিক্ত সেনা পৌঁছাতে দেরি হয়েছিল। ঘাঁটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো অরক্ষিত ছিল।
নাহাল ওজ ঘাঁটি গাজার সীমান্তবেড়া থেকে এক কিলোমিটার দূরে ছিল। সাত অক্টোবর ভোর চারটায় নিজের পালার দায়িত্ব পালন শুরু করে এক নারী সেনাসদস্য। ওই ঘাঁটির ‘তাৎজপিতানিয়ত’ শাখার সদস্য ছিল সে। এই শাখার সব সদস্যই নারী।
এই নারী সেনা সদস্যরা পালা করে ‘হামাল’ নামে পরিচিত ঘাঁটির যুদ্ধকক্ষে বসে কাজ করতো। সেখানে থাকা মনিটরের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা গাজার পরিস্থিতির ওপর নজর রাখতো।
ওই দিন ঘাঁটিতে অনেক সামরিক সদস্য নিরস্ত্র ছিল। অন্যান্য দিনের মতো সকাল হওয়ার আগে ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে সীমান্তের ইসরাইলি অংশে গাড়িতে করে টহল দেওয়ার প্রস্তুতি নেয় গোলানি ইউনিটের সদস্যরা। কিন্তু তাঁদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা টহল বিলম্বে শুরু করার এবং ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি থাকায় পিছু হটার নির্দেশনা দেন।
সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া এড়াতে এ ধরনের পিছু হটার নির্দেশনা ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর নিয়মের মধ্যে পড়ে। হামাস বিষয়টি বুঝতে পেরেছিল এবং এ সুযোগ কাজে লাগিয়েছিল।
গোলানি ইউনিটের সদস্যরা যখন সীমান্তে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল, হামাস যোদ্ধাদের চলাফেরা সেই নারী সেনার নজরে পড়ে। তবে বিষয়টি অন্য কয়েকটি দিনের চেয়ে আলাদা কিছু মনে হয়নি।
সকাল ৬টা ২০ মিনিটের দিকে রকেট ছুঁড়তে শুরু করে হামাস। কিন্তু নারী সেনার এটি তাৎক্ষণিক সতর্ক করার মতো কিছু মনে হয়নি। এ ধরনের রকেট হামলা দেখতে আগে থেকেই সে অভ্যস্ত এবং এসব রকেট থেকে ঘাঁটিটি ভালোভাবেই সুরক্ষিত।
তার দেখা আছে, সাধারণত পাঁচ মিনিট ধরে রকেট ছোঁড়া হয় এবং এরপর বিরতি দেওয়া হয়। এবার কিন্তু কোনো বিরতি দেওয়া হচ্ছিল না।
সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে সে দেখতে পায় হামাসের বাহিনী সীমান্তের কাছে আসতে শুরু করেছে। এ সময় স্থলবাহিনীকে সতর্ক করতে রেডিওতে বার্তা পাঠাতে শুরু করে এই তাৎজপিতানিয়ত সদস্য।
সীমান্তের কথিত লোহার প্রাচীরটি দীর্ঘকাল ধরে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী ও সাধারণ ইসরাইলিরা দুর্ভেদ্য হিসেবে দেখেছিল। অথচ দেশটির ঘাঁটিগুলোই তখন সে প্রাচীর ভেঙে ফেলার খবর দিতে শুরু করেছিল।
ওই পালায় নাহাল ওজ ঘাঁটিতে দায়িত্ব পালন করা প্রত্যেক তাৎজপিতানিয়ত সীমান্তবেড়ার দুটি থেকে পাঁচটি জায়গায় বেড়া ভেঙে ফেলতে দেখে।
৬টা ৪০ মিনিটের দিকে রকেটের আঘাতে নাহাল ওজ ঘাঁটির একটি নজরদারি পোস্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হামালের ওপর স্নাইপারদের অবস্থান নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। দূর থেকে বন্দুকধারীদের গুলি করার চেষ্টা করেন একজন কর্মকর্তা।
যুদ্ধকক্ষে তাৎজপিতানিয়তের সঙ্গে যোগ দেন পদাতিক কর্মকর্তারা। একজন কমান্ডার সামরিক পোশাক পুরোপুরি না পরেই সেখানে যান। হামাসের চৌকস বন্দুকধারীরা একের পর এক নজরদারি ক্যামেরায় গুলি করতে থাকলে যুদ্ধকক্ষের মনিটরের স্ক্রিন কালো হয়ে যায়।
দরজায় হাজির হামাসের বন্দুকধারীরা। সেটা ছিল অবাক হওয়ার মতো। সকাল সাতটার কিছুক্ষণ পরে সেই ক্ষণ এসে হাজির। সবাই ভীতসন্ত্রস্ত। কী হতে যাচ্ছে, কেউই কল্পনা করতে পারছিল না। যুদ্ধ কক্ষের দরজায় এসে হাজির হামাসের বন্দুকধারীরা। তাৎজপিতানিয়ত শাখার সদস্যদের নিজেদের অবস্থান থেকে সরে এসে যুদ্ধকক্ষের ভেতরের একটি কার্যালয়ে যেতে বলা হয়।
সকাল ৭টা ২০ মিনিটের দিকে যুদ্ধকক্ষের বাইরের একটি বোম্ব শেল্টারে আক্রমণ চালায় হামাসের যোদ্ধারা। সেখানে অন্যদের মধ্যে দায়িত্বে না থাকা তাৎজপিতানিয়ত সদস্যরাও ছিলেন।
সকাল আটটার দিকে যুদ্ধকক্ষে হামলা শুরু হয়। ব্যাপক গুলি করা হয়। যাদের হাতে অস্ত্র ছিল, তারা ভবনের দরজায় লড়ছিল, যাতে হামাস সদস্যরা ভেতরে প্রবেশ করতে না পারেন। প্রায় চার ঘণ্টা লড়াই চলতে থাকে।
সেখানকার সেনা এবং অন্য ঘাঁটির সেনারা লড়তে থাকে। সেখানে তাদের সংখ্যা খুবই কম ছিল। অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছিল না। সবকিছু ধোঁয়াশা ঠেকছিল। সকাল নয়টার দিকে খাবারের কক্ষের দিকে এগিয়ে আসেন গোলানি সদস্যরা। সেখানে বেশির ভাগ বন্দুকধারী হামাস যোদ্ধারা লুকিয়ে ছিলেন।
ওই দিন নাহাল ওজ ঘাঁটিতে প্রতি ২৫ জন ইসরাইল কমব্যাট সেনার বিপরীতে ১৫০ জন হামাস যোদ্ধা প্রবেশ করেছিলেন।
সীমান্তবেড়ার সত্তরটির বেশি জায়গা ভেঙে তিন হাজার হামাস যোদ্ধা ঢুকে পড়েছিল। তারা জানত, তাদের বেশি দক্ষতা নেই, তাই তারা সংখ্যায় জোর দিয়েছিল।
সকাল নয়টার দিকে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে বন্দুকধারীদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু হয়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সেই নারীসেনাসহ সাতজন যুদ্ধকক্ষ থেকে টয়লেটের জানালা বেয়ে বের হওয়ার পথ খুঁজে পান। ঘাঁটির ওই পালায় দায়িত্বরত তাৎজপিতানিয়ত সদস্যদের মধ্যে শুধু সেই নারী বেঁচে ছিল। অন্যরা হয় নিহত হয়েছেন বা তাঁদের ধরে নিয়ে যায় হামাসের বন্দুকধারীরা।
এটা ছিল হামাসের জন্য বীরত্বসূচক একটি দিন। তারা ইসরাইলিদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিতে পেরেছিল। এ রকম দুঃসাহসী আক্রমণ সত্তর বছরে আর হয়নি।
ওই দিন ইসরাইলে তিনশো সেনাসহ প্রায় বারোশো জন নিহত হন। ২৫১ জনকে গাজায় নিয়ে বন্দি করা হয়। ওই দিন থেকেই গাজায় নির্বিচার হামলা শুরু করে ইসরাইল। যা চলমান চৌদ্দ মাস পরেও। যুদ্ধ বিরতির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ইসরাইলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৪৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
ইসরাইলের ওপর প্রাণঘাতী হামলায় হামাসের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল পাঁচটি সশস্ত্র ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী। ২০২০ সাল থেকে সামরিক মহড়ায় একসঙ্গে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরই তারা এই হামলা চালায়। তারা এসব মহড়া চালিয়েছিল এমন স্থানে যেখান থেকে ইসরাইলের সঙ্গে ‘সীমানার’ দূরত্ব এক কিলোমিটারেরও কম। তাদের ভিডিও তারা সমাজমাধ্যমেও পোস্ট করে।
এই মহড়ার সময় জিম্মিদের কীভাবে নিজেদের হেফাজতে নেওয়া হবে, কম্পাউন্ডে হামলা চালানোর কৌশল এবং ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা-সহ একাধিক বিষয় তারা অনুশীলন করে। তাদের শেষ মহড়াটি হয়েছিল সাত অক্টোবরের হামলার মাত্র ২৫ দিন আগে।
‘যৌথ অপারেশন রুম’-এর তত্ত্বাবধানে হওয়া মহড়াগুলি অনেকটা ‘ওয়ার গেম’-এর মতো যাতে অংশগ্রহণের জন্য আরও দশটি সশস্ত্র ফিলিস্তিনি উপগোষ্ঠী একত্রিত করতে সমর্থ হয়েছিল ওই জোট।
ইজ্জেদিন আল-কাসাম ব্রিগেড, যা হামাসের সশস্ত্র শাখা। এর কমান্ডার আয়মান নোফাল। আর মূল দায়িত্বে ছিলেন মুহাম্মদ দেইফ এবং ইয়াহিয়া সিনাওয়ার। হামাস প্রধান ইসমাইল হানিয়া ও তার পর এই পদে দায়িত্ব পাওয়া সিনওয়ারকে ইহুদিরা হত্যা করেছে। দেইফকে হত্যার দাবি করা হলেও তিনি বেঁচে আছেন। তবে তার পরিবারের সবাই গোলায় নিহত।
৬.
দেইর আল-বালাহ শহর খেজুর গাছ চাষের জন্য সুপরিচিত। রাস্তায় বের হয়ে জুহাইরের তাই মনে হয়। যে দিকে তাকায় শুধু খেজুর গাছ আর খেজুর গাছ। এসব গাছের মধ্যে হাজার হাজার গাছ নব্বইয়ের দশকে শহরের দক্ষিণ ও পশ্চিমে অবস্থিত ছিল। তবে ২০০০ সালে শুরু হওয়া দ্বিতীয় ইন্তিফাদার প্রথম দিকে ইসরাইলি সেনাবাহিনী প্রায় চার হাজার গাছ উপড়ে ফেলে বা বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলে। ২০০৩ সালেও দেইর আল-বালাহে হাজার হাজার খেজুর গাছ ছিল।স্থানীয় সুস্বাদু খাবার ছাড়াও খেজুর চাষ দেইর আল-বালাহর অনেক বাসিন্দার আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। এই অঞ্চলে যে বিশেষ ধরনের খেজুর চাষ করা হয় তা ‘হায়ানি’ নামে পরিচিত। এর রং স্পষ্টভাবে লাল। দেইর আল-বালাহে চাষ করা অন্যান্য প্রধান কৃষিপণ্যের মধ্যে রয়েছে লেবু, বাদাম, ডালিম ও আঙ্গুর।
শহরটিতে একটি ছোট মাছ ধরার শিল্প রয়েছে এবং এটি গাজা উপত্যকার চারটি ঘাটের একটি। শত শত জেলে এখানে কাজ করে। ২০০৬ সালের নির্বাচনে হামাসের জয়ের পর ইসরাইলি নৌবাহিনী উপকূলে মাছ ধরার এলাকা সীমাবদ্ধ করে দেয়। এর ফলে সৃষ্ট ক্ষতি কমাতে ফিলিস্তিনি মৎস্য কর্তৃপক্ষ দেইর আল-বালাহ এবং গাজা সিটি উভয় স্থানে আটটি কৃত্রিম প্রাচীর নির্মাণের চেষ্টা করেছে।
বন্দরের কাছাকাছি জুহাইরের এক বন্ধুর বসতভিটা। এক তলা একটা বাড়ি। পলেস্তারা খসে গেছে। সেখানে হুম্মাম নিদার তার বাবা মায়ের সাথে থাকত। ওরা পাঁচ ভাই, তিন বোন। হুম্মাম জুহাইরের সাথে এক স্কুলে পড়তো। ওদের বাড়ির কাছে ছিল একটি ছোট হাসপাতাল।
এক দিন সেটাকে টার্গেট করে হামলা করে ইসরাইল। হাসপাতালটির সাথে সাথে হুম্মামদের বাড়ি গোলার আঘাতে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। মারা যায় হুম্মামের পুরো পরিবার। মা বাবা ভাইবোনসহ সাতজন। একটি মাত্র ভাই বেঁচে গেছে সেই সময়ে বাড়িতে না থাকার কারণে।
মোটর কেনার জন্য চাচার সাথে সে পথ দিয়ে বাজারে যাচ্ছিল জুহাইর। ওদের ভগ্ন বাড়িটি দেখে তার মনে ভেসে ওঠে হুম্মারের মুখ। হুম্মাম মাঝে মাঝে কেফিয়া পরতো। কেফিয়া হলো ফিলিস্তিনিদের মাথায় শোভা পাওয়া বিশেষ পোশাক। নেতা ইয়াসির আরাফাত তা পরতেন। হুম্মামের কেফিয়া পরা সেই হাসি মাখা মুখটাই ওর মনে আছে।
ওর চোখ ছল ছল দেখে চাচা বুঝতে পারেন।
: কিরে হুম্মামের কথা মনে পড়ছে? আহা ছেলেটা ভারি ভালো ছিল।
এই কথাতে ডুকরে কেঁদে ওঠে জুহাইর। আর বলে-
: হুম্মাম, হুম্মাম। প্রিয় বন্ধু আমার। বেহেশতে কেমন আছিস ভাই?
জওহাইর শুনেছে যারা শহীদ হয় তারা বেহেশতে থাকে বা থাকবে। ওর ধারণা হুম্মাম এখন বেহেশতে আছে।
এর পর চোখ মুছে উঠে দাঁড়ায় জুহাইর। হাতে নেয় একমুঠো মাটি। কাঁকর মেশানো ধুলো। যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষে মাটি এ রকমই। তার পর বলে-
: এই মাটির কসম। হুম্মাম, তোকে যারা হত্যা করেছে তাদের বিরুদ্ধে লড়বো আমি। আমি তাদের ছাড়বো না। এই অপরাধের প্রতিশোধ আমি নেবই।
চাচা আস্তে করে পিঠে হাত দেন জুহাইরের।
: চল যাই। পা চালা। তার চোখও চিক চিক করছে। কিন্তু তার ভাস্তেকে বুঝতে দিতে নারাজ তিনি। এতে তার দুঃখ আরো বাড়বে।
তারপর বহু ভাঙা দালান কোঠা দেখতে দেখতে কয়েকটি সড়ক পেরিয়ে বাজারে পৌঁছে তারা দুই জন।
বাজারের একটি ওষুধের দোকানের সামনে তিনটি খেজুর গাছ। পাতা দুলছে হালকা হাওয়ায়। ওপাশে জয়তুন গাছের ছোট একটা বাগান। দু তিনটি ছোট ছোট ছেলে মেয়ে সেখানে। হয়তো খেলছে বা জয়তুন পারছে। এই ফিকে সবুজ বাগান দেখে ভালো লাগে জুহাইরের। ভাবে এত যুদ্ধ ও বেদনার মধ্যেও তাহলে সবুজ মরে যায়নি।
দোকান থেকে কেনাকাটা শেষ করে রাস্তায় নামামাত্র কড় কড় কড়াত।
দ্রিমি দ্রিমি। দুরুম দুরুম।
আর বজ্রপাতের মতো বিকট শব্দ।
যেন এক একটি আগুনের গোলা। গোলাগুলো এসে পড়তে থাকে সেই এলাকাটায়। যেখানে ছিল জয়তুন বীথি।
আকাশেও হানা দেয় ইসরাইলের বোমারু বিমান।
পড়িমরি করে ওরা ঢোকে নিরাপদ স্থান ভেবে একটি ভাঙা বাড়িতে। একটি গোলা পড়লো পাশের সবুজ উদ্যানটাতে। সাথে সাথে রক্তে ভিজে গেল তিনটি শিশুর দেহ।
চোখ ঢাকে জুহাইর।
কিছুক্ষণের মধ্যে হামাসের রেড ক্রিসেন্ট টিম তাদের দেহ পাজা কোলা করে নিয়ে গাড়ি ছোটাল হাসপাতালের দিকে।
৭.
যন্ত্রপাতি পেয়ে কাজে লেগে যায় জুহাইর। তাকে সহযোগিতা করে তার দুই বোন রাফাত ও রুকইয়া। আর পাশের বাড়ির একটি ছেলে আশবিদ। তিন দিনের মাথায় তাদের কাজ শেষ হয়।এক রাতে সংযোগ দেয় তারা তাদের বাড়িতে। আলো ঝলমল করে ওঠে বাড়িটি। মা পাশে এসে দাঁড়ান।
: কত দিন বাদে রাতের বেলা তোদের দেখতে পাচ্ছি। বেটা জুহা। আমার নিউটন।
: মা। বলে কোলে আছড়ে পড়ে জুহাইর।
পরের দিন কয়েকটি বাড়িতে দেওয়া হলো সংযোগ।
পাশের বাড়ির লোকরা এলো জুহাইরের কারিকুরি দেখতে। দোয়া করলেন সবাই তার জন্য।
জুহাইরের চোখ সাফল্যের আনন্দে একটু চিকমিক করে ওঠে। সারা দেইর আল বালাহ শহরে নিউটন জুহাইরের নাম ছড়িয়ে পড়ে।
এক দিন আসেন সাংবাদিকের দল। তাকে নিয়েও কি রিপোর্ট বের হবে? বুঝতে পারে না জুহাইর।
দেখতে দেখতে কয়েকটি দিন কেটে যায়। জুহাইরদের এলাকার বাড়িগুলো এখন সন্ধ্যার পর আর অন্ধকারে থাকে না।
৮.
যুদ্ধে ইসরাইলে এখন পর্যন্ত দু’ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহত ইসরাইলি সেনার সংখ্যা দেড় হাজার। দেইর আল বালাহর একটি মার্কেটে মানুষের কাছে এ কথা শুনেছে জুহাইর। গর্বে তার বুকটা ভরে গেছে। হামাস যোদ্ধারা সত্যি বাঘের বাচ্চা। পাল্টা হামলায় অনেক বেশি ফিলিস্তিনি শহীদ হচ্ছে। কিন্তু তারপরও এবার যেন মানুষের মধ্যে ভিন্ন একটা চঞ্চলতা দেখা যাচ্ছে। আর তা হচ্ছে শত্রু শিবিরে ঢুকে শত্রু খতম করার একটা আনন্দ।সত্তর বছর ধরে মার খেতে খেতে তারা ক্লান্ত। এখন পাল্টা মার দেওয়ার খবরে তাই চাঞ্চল্য। জুহাইরের ভালো লাগছে। ভালো লাগছে পরিবারের সবার। এর চেয়ে ভালো খবর আর হয় না। এবার ইসরাইলের অহংকার চূর্ণ করে দিয়েছে হামাসের বীর সেনারা।
হামাসের আক্রমণে ইসরাইলে নিহতদের কিছু বেসামরিক নাগরিক। এক হামলায় এত সেনা নিহত হওয়ার কথা কোনোদিন ভাবেনি ইসরাইলি সেনারা। তারা এখন মরণ কামড় দেবে এটাই স্বাভাবিক। তবে পরিস্থিতি বুঝে আগাতে হবে সবাইকে। বলছিলেন হামাসের এক কমান্ডার।
ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি উচ্ছেদ করে তারা বানিয়ে নিয়েছে ইহুদি রাষ্ট্র। একটি অবৈধ রাষ্ট্র। বিশ্বের বহু দেশ আজও এ রাষ্ট্রকে স্বীকার করে না। তারা দখল করে আছে ফিলিস্তিনের পবিত্র শহর জেরুসালেমসহ বিভিন্ন উপকণ্ঠ ও শহর। এখন ফিলিস্তিনিরা নিজ দেশে পরবাসী। এসব কথা ভেবে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বের হয়ে আসে জুহাইরের। অথচ সে কিছুই করতে পারছে না।
কিশোর জুহাইর দেইর আল বালাহ শহরের একটি বস্তি ঘরের বাসিন্দা। আসলে এটি একটি উদ্বাস্তু শিবির। জুহাইরের এই নামটা ভালো লাগে না। সে বলে আমাদের বাড়িঘর এখানে। আমরা এখানে কেন উদ্বাস্তু হবো?
৯.
দিনটি ছিল ষোলো ডিসেম্বর। দেইর আল বালাহবাসীর জন্য একটি প্রচণ্ড দুঃখের দিন। খবরটি শুনে জুহাইরও দুঃখের সাগরে ভাসে। গাজা ভূখণ্ডে দুঃখ আর ত্যাগের প্রতীক হয়ে ওঠা খালেদ নাভান এ দিন ইসরাইলি বাহিনীর বোমা হামলায় নিহত হন। তার মৃত্যু গাজার সাধারণ মানুষের ওপর চলমান নির্যাতনের এক হৃদয়বিদারক উদাহরণ হয়ে উঠলো। তিনি একসময় তার নাতনি রীমকে ‘আত্মার আত্মা’ বলে ভালোবেসে বিশ্বকে কাঁদিয়েছিলেন, এখন নিজেও কান্নার বিষয় হয়ে গেলেন।: ওঠ বাবা। কিছু খেয়ে নে। আমিও যাব তোদের সাথে শোক মিছিলে। মা ঝিম মেরে থাকা জুহাইরকে তাড়া দেন।
মায়ের মনটাও ভালো নেই। রীমের মৃত্যুতে তিনি কষ্ট পেয়েছিলেন। আর তার দাদার মৃত্যু তাকেও স্তব্ধ করে দিয়েছে। হাত পা আর চলতে চায় না। কিন্তু তার পরও চলতে হবে। ইহুদিরা চির জীবন মুসলমানদের সংকটে ফেলেছে। মুসলমানরা তবু ন্যায়ের ঝাণ্ডা হাতে নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। তাদের পিছিয়ে পড়ার কোনো সুযোগ নেই।
তুচ্ছ ছুতানাতায় তারা ফিলিস্তনিদের ওপর বিশাল বিশাল যুদ্ধ আর ধ্বংস চাপিয়ে দিয়েছে। এক বছরের বেশি সময় ধরে তারা গাজাবাসীর ওপর বিমান ও গোলা হামলা চালাচ্ছে প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে গাজার এই ছোট্ট এলাকাটাতে। তবু তাদের থামার নাম নেই।
না এতে ফিলিস্তিনিরা দমে যাবার নয়। তারা ইন্তিফাদার পর ইন্তফাদাহ চালিয়ে যাবে। তবু নিজ ভূখণ্ড তারা ছাড়বে না। যত মায়ের কোল খালি হোক ফিলিস্তিনি মায়েরা এক জন শহীদ হলে দ্বিতীয় সন্তান যুদ্ধের ময়দানে ছেড়ে দিতে কোনো সময়ই কুণ্ঠিত নন। তারা জানেন জীবন তো একদিন এমনিতেই চলে যাবে। নিজ ভূখণ্ড আর সম্মান রাখার লড়াইয়ে তা গেলে সেটা আরো গৌরবের। তারা এ কারণে অনেক সন্তান নিতে পছন্দ করেন। মা গর্বে পরিচয় দেন আমি পাঁচ শহীদের মাতা, আমার এটা গৌরব। ইয়া আল্লাহ তুমি আমার ছেলেমেয়েদের শাহাদাত কবুল কর।
মা শুনেছেন দেইর বালাহর ইয়াওবিল চত্বরের সামনে থেকে শোক মিছিল বের হবে। কিছুক্ষণ পর ছেলেমেয়েদের নিয়ে বের হয়ে পড়লেন।
এখন যদি বিমান হানা দেয় তখন কি হবে! না এটা ভাবার সময় তাদের নেই।
দেখতে দেখতে ইয়াওবিল চত্বর ভরে গেছে লোকের দ্বারা। অনেক ফিলিস্তিনি এখন বেঁচে নেই। অনেকে চলে গেছে নিরাপদ এলাকায়। তবু লোক ভালোই হয়েছে। অনেক পরিচিত মুখ আর দেখা যাচ্ছে না। অবাক হন জুহাইরের মা জহাম রিশাদ।
অনেকে স্লোগান দিচ্ছে। মিছিল হচ্ছে।
ডাউন উইথ ইসরাইল। ডাউন ইউথ আমেরিকা।
ইসরাইল নিপাত যাক। আমেরিকা নিপাত যাক।
ভাই আমার ভাই, শহীদ ভাইকে ভুলবো না।
শহীদ বোনকে ভুলবো না।
ফিলিস্তিন রাষ্ট্র জিন্দাবাদ। আল্লাহু আকবার।
একটা ঢিবির ওপর বসে আছে জুহাইর। দূরে দেখা যায় ফিলিস্তিনি নিশান। প্রতিদিন ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা ঘোষণা করার জন্য পতাকা টানানো হয়। টানানো হয় কালেমা খচিত পতাকা। সেøাগান ওঠে আল্লøাহু আকবার। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ।
রীমের কথা মনে হয় জুহামের। ২০২৩। উনত্রিশ নভেম্বর। সাদামাটা একটি দিন। দেইর আল-বালাহর জন্য একটা শোকের দিন। ইসরাইলি বিমান হামলায় খালেদ নাভানের তিন বছর বয়সী নাতনি রীম এবং পাঁচ বছর বয়সী নাতি তারেক নিহত হয়। না না শহীদ হয় এ দিন।
সেই সময় তিনি রীমের নিথর দেহ কোলে নিয়ে বলেন, “রূহ আল-রূহ” আত্মার আত্মা। এই হৃদয়স্পর্শী মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি হয়ে সারা বিশ্বের হৃদয়ে দাগ কেটেছিল।
ষোলো ডিসেম্বর, ২০২৪। গাজার নুসাইরাত শরণার্থী শিবিরে আরেকটি ইসরাইলি হামলায় খালেদ নাভান নিজেও নিহত হন। তার মৃত্যুর চৌদ্দ মাস আগে তিনি তার নাতনির কবর দিয়েছিলেন।
আহা কত ভালো মানুষ ছিলেন খালেদ নাভান। তিনি সকল পরিবার এবং সমাজের জন্য একজন আশ্রয়স্থল ছিলেন। নাতনি রীমের মৃত্যুর পর তিনি শুধু তার শোক বহন করেননি, বরং নিজের দুঃখ দূরে সরিয়ে গাজার দুর্দশাগ্রস্ত মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তার মানবিক কাজগুলো তাকে “এক ব্যক্তির ত্রাণ সংস্থা”তে পরিণত করে। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য খাবার, কাপড় এবং আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতেন।
খালেদ তার নিজের ক্ষুধা লুকিয়ে রেখে পরিবারের জন্য খাবার নিশ্চিত করতেন। ক্ষুধার্ত অবস্থায়ও তিনি মজুরের কাজ করে পরিবার চালাতেন। তিনি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বিশ্বজুড়ে সমবেদনা ও ভালোবাসাকে কাজে লাগিয়ে সাহায্য পৌঁছে দিয়েছিলেন। গাজার অভাব-অনটন তাকে ব্যথিত করত। তিনি বলতেন, “গাজায় মানবতার চূড়ান্ত অপমান হলো জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম চাহিদাগুলোও পূরণ না হওয়া।”
খালেদ নাভানের মৃত্যু গাজার মানবিক সংকটের এক করুণ উদাহরণ। তার জীবন আর ত্যাগ গাজার মানুষের সংগ্রামকে তুলে ধরে। অন্য অনেকের মতো জুহামেরও প্রশ্ন বিশ্ব কি এই মানবিক সংকটে মনোযোগ দেবে? নাকি খালেদের মতো আরও অনেকেই একই পরিণতির শিকার হবেন? এর কোনো উত্তর নেই।
এর এক দিন পর। দেইর এল-বালায় আবার আকস্মিক বিমান হামলা হলো। নবজাতকসহ নিহত ছয়। এর দু দিন পর ত্রাণ আসার অপেক্ষায় থাকা একদল ফিলিস্তিনিকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসরাইলি বাহিনী। বারো জন নিহত হয়।
১০.
প্রখর রোদ উঠেছে আজ। মনে হচ্ছে পুরো দেইর আল বালাহ শহর রোদের আলোয় ভাসছে। নিজেদের বাসা থেকে বের হয়ে জুহাইর ডানে মোড় নেয়।আল মারকাজুল হাসপাতালের সামনে এসে থামে। রাতে এখানেই সে টিভিতে খবর দেখে।
এরি মাঝে কড় কড় করে বাজ পড়ার শব্দ হয়। তারপর জঙ্গি বিমান উড়ে যাওয়ার শব্দ। সাইরেনের শব্দ। দ্রিম দ্রিম। গোলা ও গুলি এসে পড়তে লাগলো তার সামনে ও পেছনে।
না ভয় পেলে চলবে না। সাহস রাখতে হবে।
প্রচণ্ড শব্দ করে একটা গোলার বড়ো স্পিøন্টার আছড়ে পড়ে সামনে।
আশপাশের লোকগুলো নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে দৌড়ে যায়। এই ভর দুপুরে ইসরাইলি বিমান হামলায়ও কেউ অবাক হয় না। ওরা হায়েনা। ওরা জানে বোমা মেরে মানুষ খুন করতে। ওদের জন্য রাত যা দিনও তা।
কোত্থেকে যেন চাচা হিশাম এসে হাজির হন জুহাইরের সামনে।
এখন ওরা দুজন। বুকে একটু সাহস সঞ্চার হয় জুহাইরের।
: সাবধান জুহা। হার্মাদগুলো পাগল হয়ে গেছে রে।
: তাইতো দেখছি চাচা।
: কোথায় গিয়েছিলি?
: হাসপাতালে। কাজ ছিল না, এমনি। তুমি?
: বন্দরের দিক থেকে এলাম। নতুন একটা অভিযানের প্রস্তুতি চলছে।
: ওহ তাই!
তারা দাঁড়িয়ে ছিল ভগ্ন হাসপাতাল কমপ্লেক্সটির সামনে। যুদ্ধের আইন অনুসারে এটা একটা নিরাপদ এলাকা। কিন্তু ইসরাইল তা মানলে তো?
আবার বিমানের শব্দে কান খাড়া করে দুই জনই।
প্রচণ্ড শব্দ করতে করতে আসছে চারটা জঙ্গি বিমান। স্পষ্ট দেখতে পায় তারা। দুজনই আবার পড়ি মরি করে ছোটে।
একটি গোলা সরাসরি আঘাত করে ওদের মাথার ওপর। মুহূর্তে হাসপাতাল কমপ্লেক্সে আগুন ধরে যায়। ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় পুরো এলাকা। জুহাইর দেখতে পাচ্ছে না কোনোকিছু। তবে বুঝতে পারে রক্তারক্তি কাণ্ড হয়েছে। না, তার কিছু হয়নি। সে অক্ষত আছে। কিন্তু হিশাম চাচাকে দেখতে পাচ্ছে না। রক্তে ভেসে গেছে এলাকাটা। আহত কয়েকজনকে ধরাধরি করে ভগ্ন হাসপাতালের ভেতর ঢোকে জুহাইরসহ বেঁচে যাওয়া কয়েকজন।
এখনো থর থর করে কাঁপছে জুহাইরের শরীর।
আহত চার জনকে বেডে শুইয়ে দেওয়া হয়।
কিছুক্ষণ বাদে আবছায়া কেটে ধোঁয়া দূর হয়ে গিয়ে পরিষ্কার না হলেও কিছুটা দেখা যাচ্ছে। একটি বেডে শুয়ে আছেন চাচা হিশাম। একটা পা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। কাপড়ে লাল লাল তাজা রক্ত। চোখটা এখনো মনে হয় জীবিত। জুহাইরের দিকে তাকিয়ে আছেন হিশাম। তবে জীবিত নন, মৃত। অ্যাপ্রন পরা এক ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করে গেছেন। কান্নায় বুক ভাসিয়ে সেই চাচার বেডের ওপর আছড়ে পড়ে জুহাইর। এখনো চাচা হিশামের দৃষ্টি অপলক।
আরও পড়ুন...