ই-ম্যান
সাইন্স ফিকশন আরাফাত ইসলাম সয়ন সেপ্টেম্বর ২০২৪
‘স্যার!’
অধ্যাপক সেবার্স সেবার্স চমকে উঠলেন। ডানে-বামে তাকিয়ে দেখলেন, খানিকটা মানুষের মতো দেখতে দুটো রোবট। যন্ত্র দুটো ফের বললো, ‘স্যার, আপনি কি আমাদের কথা শুনতে পাচ্ছেন?’
সেবার্স হকচকিয়ে গিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ পাচ্ছি। তোমরা কারা?’
‘আমরা ই-ম্যান। অর্থাৎ ইলেকট্রনিক মানুষ।’
সেবার্স নিজেকে কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে ফেললেন। কেননা দুটো রোবট নিজেদের মানুষ দাবি করছে! তাও আবার ই-ম্যান! ব্যাপারটা মেনে নেওয়ার মতো নয়। সেবার্স বললেন, ‘তোমাদের নাম কী?’
প্রথম ই-ম্যান বললো, ‘আমার নাম ক্লেকন।’ অপরজন বললো, ‘আমার নাম ফ্লেকন।’
‘তোমরা কোন বিজ্ঞানীর আবিষ্কার?’
‘আমরা কোনো বিজ্ঞানীর আবিষ্কার নই, আমরা আর পাঁচজন মানুষের মতোই সৃষ্টি হয়েছি।’
‘আমি একজন অধ্যাপক, আমাকে তোমরা বোকা বানাতে পারবে না।’
‘আমরা আপনাকে বোকা বানাচ্ছি না। আমরা সুদূর ভবিষ্যৎ ৪০২৩ থেকে এসেছি।’
সেবার্স মোটেও অবাক না হয়ে ওদের দু’জনের রসিকতার মাত্রা পরীক্ষা করছেন। ‘আমি যুক্তির খাতিরে মেনে নিলাম তোমরা ই-ম্যান। কিন্তু তোমাদের নামের আলাদা বৈশিষ্ট্য কী?’
দু’জনই এক সাথে বললো, ‘নিশ্চয়ই আছে, আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন মানুষ।’
‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বলতে তোমরা নিশ্চয়ই এআই-এর কথা বলছ।’
ফ্লেকন বললো, ‘মোটেও না। আমরা ডুয়েল এটিআই বা এটিআই-এর কথা বলছি।’
ক্লেকন বললো, ‘উনি ঠিক বলছেন, এটিআই পূর্বে পৃথিবীতে এআই নামে পরিচিত ছিল।’
‘তোমাদের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রয়েছে?’
‘আমাদের মস্তিষ্ক আর পাঁচটা মানুষের মতো নয়, আমরা মায়ের গর্ভে থাকাকালীন আর্টিফিশিয়াল সার্জারির মাধ্যমে আমাদের ব্রেনকে কাস্টমাইজড করা হয়। শুধু তাই নয়, আমাদের রক্তে ট্রাকল নামক তরল কৃত্রিম এ্যানজাইমের প্রবাহ করানো হয়। যার ফলে আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন।’
‘এটা কি নতুন জিনের বৈশিষ্ট্য যা বংশানুক্রমে সকলের মধ্যে বিস্তার লাভ করবে?’
ক্লেকন বললো, ‘না। এই বিশেষ সার্জারিটা প্রতিটি গর্ভস্থ শিশুর জন্যই করা হয়।’
সেবার্স ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘তোমরা আমার কাছে কেন এসেছ?’
দু’জন ফের বললো, ‘আমরা আপনার সাহায্য চাই।’
সেবার্স ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘আমি তোমাদের কী সাহায্য করতে পারি?’
‘আমরা এক হাজার একটি সমস্যা নিয়ে আপনার কাছে এসেছি।’
‘বেশ মেনেই নিলাম, তোমরা ৪০২৩ থেকে এসেছ। তবে তোমরা কী করে এলে? নিশ্চয়ই কোনো টাইম মেশিনের কথা বলবে।’
‘না। আমরা টাইম মেশিনের সাহায্যে আসিনি। আমরা দু’জন আলোর গতিতে এখানে এসেছি।’
‘ইয়ার্কি মারছ না?’
‘মোটেও নয়, আলোর গতিতে সৌরজগতে পথ অতিক্রম করা সম্ভব যা নিয়ে মানুষ এখনো গবেষণা করছে তাতে তারা সফল হয়। পরবর্তীতে পৃথিবীতে কী করে এই গতি ব্যবহার করা যায় তা নিয়ে গবেষণা করে। যার ফলে বিজ্ঞানী ওহেড ক্রম ৩৯৯২ সালে সফলতা লাভ করে।’
‘যদি এতই সোজা হয় তাহলে ই-ম্যানরা নিয়মিত ভ্রমণ করছে না কেন?’
‘সব প্রযুক্তির দ্রুত ব্যবহার সম্ভব নয়। পৃথিবীর বুকে আলোর গতিতে ভর করে অতীতে বা ভবিষ্যতে যাওয়ার এই প্রক্রিয়াকে ফটোসেল ট্র্যাভেলিং বলে। অর্থাৎ আলোকশক্তি ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এবং আরো বিভিন্ন কার্যাদি সম্পন্ন করে ভ্রমণ। এটি দ্বিতীয় এবং প্রথম সফল ফটোসেল ট্র্যাভেলিং।’
‘কেন প্রথম অভিযানটির কী হলো?’
‘আমরা জানি না, তারা আমাদের যে সিগন্যাল পাঠিয়েছে তা সঠিক নয়। তারা ৩৫০০-এর কাছাকাছি সময়ে অবতরণ করেছিল কিন্তু আর ফিরে আসতে পারেনি।’
‘তো আমি তোমাদের কীভাবে সাহায্য করতে পারি?’
‘আমাদের অক্সিজেন প্রয়োজন।’
‘কিন্তু যেটুকু আছে তা আমাদের প্রয়োজনীয়। তোমাদের এত অক্সিজেন প্রয়োজন কেন?’
‘আমাদের কাছে আর কোনো অক্সিজেন নেই। যেটুকু আছে তাও শেষের পথে। আমরা কী করে বাঁচবো। আমরা অন্যান্য গ্যাস নিয়ে অনেক এক্সপেরিমেন্ট করেছি কিন্তু সফল হতে পারিনি। কারো ফুসফুস পুড়ে গেছে, কারো ছিঁড়ে গেছে, কারো গলে গেছে।’
‘এটা তো বোকামি। অক্সিজেন ছাড়া অন্য কোনো গ্যাস দিয়ে মানুষ বাঁচতে পারে না। আবার এটাও ঠিক তোমরা ই-ম্যান।’
‘আমরা যতই ই-ম্যান হই না কেন আমরা স্রষ্টার সৃষ্টি তাই আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার আমাদের কোনো ক্ষমতা নেই কেননা আমাদের জন্ম-মৃত্যু সবই মহান স্রষ্টার হাতে।’
‘তা ঠিক। তবে তোমাদের ঠিক কী কী হয়েছে বলো তো।’
ফ্লেকন অতি উৎসাহে বলা শুরু করলো, ‘আমাদের মূলত অক্সিজেন নেই। মানুষের অতিরিক্ত চাহিদার জন্য সব গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। আমাদের ৩০ তলার নিচে কোনো বিল্ডিং নেই। চার হাজার কোটি মানুষ মুখের কথা নয়। অতিরিক্ত বসতির ফলে কোনো আবাদি জমি নেই।’
‘তোমাদের তো খাবার প্রয়োজন?’
‘শুধু খাবার নয়, আমাদের পানি প্রয়োজন যা নেই। মাত্র দুটো মহাসাগর আছে যাদের পানি পুরো লবণাক্ত। মাটির নিচে খাবার পানির পরিমাণ শূন্যের কাছাকাছি।’
‘তোমরা একটু দাঁড়াও, তোমাদের সাথে এভাবে কথা বলতে আমার অসুবিধা হচ্ছে। আমি জানালাটি খুলে দিই।’
দু’জন ই-ম্যান সেবার্সকে বারবার জানালা খুলতে নিষেধ করলেও তিনি শুনলেন না। জানালা খোলার সাথে সাথে ক্লেকন আর ফ্লেকন কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল। হুটহাট করে উধাও হয়নি। নিজেদের হাতে থাকা একটা লাল বোতামে চাপ দিয়েই পুরো নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। সেবার্স জানালা খুলে পেছনে ফিরে পুরো অবাক। ক্লেকন বা ফ্লেকন কেউ এখানে নেই। তারা গেল কোথায়?
দুই.
বিশ^বিদ্যালয়ের গবেষণাগারে এসে কাউকে পেলেন না সেবার্স। চারদিকে বেশ অন্ধকার। পেছন থেকে ফ্লেকন ডাক দিলো। সেবার্স চমকে উঠলেন, ‘ক্লেকন-ফ্লেকন তোমরা দু’জন কোথায় চলে গিয়েছিলে?’
‘আমরা আলো সহ্য করতে পারি না। তাই অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলাম।’
‘কিন্তু তোমরা আলো সহ্য করতে পারো না কেন?’
‘আপনাদের জন্য।’
সেবার্স খানিক বিস্মিত হয়ে বলে উঠলো, ‘আমরা কী করেছি? এটা তোমাদের বেয়াদবি না ভুল জ্ঞান, কী হিসেবে ধরে নেবো?’
‘আপনি সত্য হিসেবে ধরে নিলেই চলবে। আচ্ছা আপনারা বর্তমানে যেই পৃথিবীতে রয়েছেন তা কি আদৌ বসবাসের যোগ্য?’
সেবার্স খানিক কপালে হাত দিয়ে ভেবে বললেন, ‘হুম, এই পৃথিবী মোটেও বসবাসের যোগ্য নয়। ধীরে ধীরে গাছের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। রাসায়নিকরণে ভরে যাচ্ছে পৃথিবীর আকাশ বাতাস। কার্বন ডাইঅক্সাইড হুহু করে বাড়ছে। সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ছে এভাবে কি বাঁচা যায়?’
‘একটু ভেবে বলুন এসব কারা করছে?’
‘আমাদের মতো মানুষরাই করছে। আমি তো নিজেই একটি গাড়িতে করে রোজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসি।’
‘আমরা সূর্যের আলো কী জানি না, শুধুমাত্র আপনাদের জন্য।’
‘কেন?’
‘আপনাদের অদ্ভুত কিছু করার নেশায় দু’হাজার বছর পরের পৃথিবীতে কোনো গাছ নেই। কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাসে ভরে গেছে পৃথিবী। আরও নতুন নতুন অনেক গ্যাস সৃষ্টি হয়েছে যেসবের নাম আপনি কোনোদিন শুনেননি। আমাদের কাছে দিন রাত সমান। ইউনিভার্সাল অ্যালার্মের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি কখন রাত-দিন-দুপুর হয়। এটি স্যাটেলাইটের সাহায্যে সকল তথ্য আমাদের প্রদান করে। শুধু কি তাই? বিষাক্ত গ্যাসে তো আমরা শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে পারি না।’
ফ্লেকন আর কিছু যুক্ত করার উদ্দেশ্য বলে ওঠে, ‘আপনি কি জানেন প্রতিটি রাস্তায় রাস্তায় এয়ার কন্ডিশন সেট করা রয়েছে। তাছাড়া কারও পক্ষে বাইরে বেরোনো সম্ভব নয়।’
‘তোমরা তোমাদের অতিরিক্ত গবেষণা বন্ধ করলে তো সব মিটে যায়।’
‘কেউ বন্ধ করবে না। এখন ই-ম্যানের থেকে উন্নত কিছু করার প্রচেষ্টা চলছে।’
‘তোমরা কি জানো প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে কেউ কোনোদিন টিকতে পারেনি? তোমরা মহান রবের সৃষ্টিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছ।’
ফ্লেকন বলে ওঠে, ‘স্যার, একে যুগ বলা হয়। যুগের সাথে তাল মেলাতে হয়। আর সেই তাল মেলাতে গিয়ে আমরা বিলুপ্ত হতে চলেছি।’
সেবার্স মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েন। অধ্যাপক লেভির টেবিলে পড়ে থাকা একটা বইয়ের দিকে তিনি তাকান। লেভিও মানুষের মরণব্যাধি ক্যান্সার রোধে কাজ করেন। কিন্তু এর থেকে বড়ো মরণব্যাধি অদূর ভবিষ্যতে। বইটির দিকে তাকিয়ে ফ্লেকন বলে, ‘অধ্যাপক লেভি কি জানেন মানুষ ক্যান্সার নির্মূলের সফল ঔষধ তৈরি করেছে?’
‘তাহলে তো উন্নত পৃথিবীর সবকিছু খারাপ নয়। ভালো কিছুও রয়েছে।’
‘না, এইডস বা ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধির ঔষধ মানুষ তৈরি করলেও আরও নতুন রোগের উৎপত্তি হয়েছে। প্রতি পঞ্চাশ বছর অন্তর অন্তর একটি করে মরণব্যাধি পৃথিবীতে নাম লেখায়। কোটি কোটি মানুষ মারা যায় এই রোগগুলোতে। আচ্ছা আপনার মতে এই আধুনিক পৃথিবীর প্রথম প্রযুক্তি বিপ্লব কী?’
‘অবশ্যই কম্পিউটার আবিষ্কার।’
‘আর আমাদের মতে কম্পিউটারকে একটি লেন্সে পরিণত করে চোখে স্থাপনের মাধ্যমে প্রযুক্তির এই বিপ্লব ঘটে। এটিই প্রথম বিপ্লব।’
‘আচ্ছা তোমরা তো এসব নিয়ে কিছু বই লিখে প্রিন্ট করতে পারো।’
‘৪০২৩ সালে কোনো প্রিন্টার নেই। কারণ কোনো কাগজ নেই। তাছাড়া আমাদের বই পড়তে হয় না। আর্টিফিশিয়াল সার্জারিতে আমাদের সকল তথ্য প্রদান করা হয়। পরে শুধু আমরা গবেষণা করি।’
হঠাৎ দরজা দিয়ে অধ্যাপক লেভি প্রবেশ করেন। সেবার্স পেছনে তাকিয়ে দেখেন ক্লেকন ফ্লেকন আবার উধাও। লেভি বলেন, ‘আজকাল প্রচুর কাজের চাপ। এত চাপ একটি সাধারণ মস্তিষ্ক সামলাতে পারে না। মানব মস্তিষ্ক নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। যাতে মানুষ মস্তিষ্কের ওপর চাপ কমানো যায়। মানুষের এই প্রচুর গবেষণা ও ভাবনা চিন্তার কাজ ঐ যন্ত্রটি করে দেয়।’
‘সেই জন্যই হয়তো চ্যাট জিপিটির আগমন হয়েছে।’
‘না, এটা যথেষ্ট নয়। কেননা এটা স্বতন্ত্র কারও জন্য নয়। বরং সর্বজনীন। কিন্তু মানুষের এমন কিছু দরকার যা তার নিজের। তা সে নিজের ইচ্ছেমতো চালনা করবে ঠিক মানব মস্তিষ্কের মতো।’
‘মানুষ কি অদ্ভুত! নিজের ধ্বংসকে নিজের উন্নতি ভাবে। ভাবছি আমাদের এই পরিবেশের কী হবে?’
‘কেন যেমন চলছে তেমন চলবে। ভাবতে পারছ, যদি ক্যান্সার আর এইডসের প্রতিষেধক আবিষ্কার করা যায় পৃথিবী কত উন্নত হবে?’
‘তবে আরও যেসব গবেষণা চলছে তা পৃথিবীর কোনো উন্নয়নে কাজে লাগবে?’
‘পারমাণবিক বোমার কথা বলছ? তুমি কি জানো একটি পারমাণবিক বোমা একটি দেশকে যুদ্ধে জিতিয়ে দিতে পারে?’
‘আমি এটাও জানি, অপর প্রান্তের দেশটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শুধু ধ্বংসের ফসলই দেখে যাবে। এখানে ভালো কিছু থাকতে পারে না। দুই দেশই তো আমাদের পৃথিবীরই অংশ। তারা ধ্বংস হলে আমরা কতদিন টিকে থাকতে পারবো? একটা সভ্যতা ধ্বংস হয় মানুষের নিজের কর্মগুণে।’
‘শোনো, আজ তুমি গাড়ি ছাড়া বাড়ি যাবে। মাইক্রোফোন ছাড়া বক্তব্য দেবে। মোবাইল ছাড়া কারও সাথে যোগাযোগ করবে। গ্যাসবিহীন রান্না করবে। ল্যাপটপ ছাড়া তোমার ক্লাসের প্ল্যান তৈরি করবে।’
সেবার্স হাসলেন। লেভি ফের বললেন, ‘প্রযুক্তি মানুষকে পঙ্গু করে দিয়েছে। এই প্রযুক্তি ছাড়া মানুষ এখন আর বাঁচতে পারবে না। সামনে এগোতে পারবে না।’
অধ্যাপক সেবার্স একপ্রকার অমনোযোগী হয়ে ক্লাসে ঢুকলেন। এমন তিনি কখনো করেনি। ক্লাসের একদম শেষ পর্যায়ে বললেন, ‘প্রযুক্তি সম্পর্কে তোমাদের ধারণা কী?’
উপস্থিত সকল শিক্ষার্থীর অবাক হওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার কেননা পরিবেশ সংরক্ষণের ক্লাসে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করার কথা নয়। তারপরও একজন ছাত্রী দাঁড়িয়ে বললো, ‘প্রযুক্তি আমাদের আধুনিক সভ্যতা। এই সভ্যতার সবকিছুই প্রযুক্তি।’
সেবার্স বললেন, ‘না, আমি প্রযুক্তির বর্তমান অবস্থার কথা বলছি। এর বিস্তৃতির কথা বলছি।’
‘স্যার এই প্রযুক্তি কোনোদিন থামবার নয়।’
‘না-না-না, থামতে তো হবেই। একদিন সবকিছুকেই থামতে হবে। কোনোকিছুই চিরকাল চলবে না।’
লম্বা লিকলিকে স্বাস্থ্যের একটা ছেলে দাঁড়িয়ে বললো, ‘স্যার, এই প্রযুক্তি পৃথিবীর চিরবিস্ময় কিছু তৈরি করবে। ধরুন এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে তারা মানুষের মস্তিষ্কে নিয়ে গেল বা মানুষের মস্তিষ্কের একটা অংশ হয়ে গেল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।’
অধ্যাপক সেবার্স থমকে গেলেন। যেই সভ্যতা দু’হাজার বছর পরে রয়েছে তার ধারণা তো এই সময় দেওয়া যায় না। তিনি অবাক হয়ে বললেন, ‘তোমার নাম কী?’
‘লুই আর্ন।’
‘তোমার স্বপ্ন কী?’
‘প্রযুক্তি নিয়ে কিছু করা।’
সেবার্স অবাক হয়ে বললেন, ‘তাহলে এসব নিয়ে পড়ছ কেন? সফটওয়্যার নিয়েই তো পড়তে পারো।’
‘স্যার আমি শুধু এই বিষয়টিকে চিনতে এসেছি। আমি বিশ্বাস করি আমাদের যে বিষয়ে কিছু করার ইচ্ছে সে বিষয়ে অ্যাকাডেমিক সার্টিফিকেটের কোনো দরকার নেই।’
অধ্যাপক সেবার্স হুট করে ক্লাস থেকে চলে গেলেন। এমনটা সাধারণত তিনি কখনোই করেন না।
তিন.
সারা দিন ধকলের পর এখন ঘুমানোটা জরুরি। তবে ঘুটঘুটে অন্ধকারে ক্লেকন আর ফ্লেকন রুমে চলে এলো, ‘স্যার, আপনারা কত ঘণ্টা ঘুমিয়ে থাকেন?’
‘নিয়ম আট ঘণ্টা, তবে আমরা কেউই আট ঘণ্টা ঘুমাই না।’
ক্লেকন বললো, ‘আমরা দৈনিক দু’ ঘণ্টা করে ঘুমাই। ঘুমের কমবেশি আমাদের জীবনে কোনো তারতম্য ঘটায় না।’
অধ্যাপক সেবার্সের হঠাৎ করে মনে পড়ে ‘লুই আর্ন’ নামক সেই ছেলের কথা। তিনি ক্লেকনকে বলেন, ‘আচ্ছা ক্লেকন, তোমাদের এই ই-ম্যান তত্ত্বের জনক কে?’
‘লুই আর্ন। তিনি ২০৬১ সালে প্রথম এ তত্ত্ব প্রদান করেন।’
সেবার্স বেশ অবাক হলেন। তারই ছাত্র কি না এমন একটি বিস্ময়কর কাজ করেছে।
‘তবে এ তত্ত্ব নিয়ে বহু গবেষণা চললেও প্রায় দেড় হাজারেরও বেশি বছর পর এই ই-ম্যান তত্ত্ব সফলতা লাভ করে।’
‘আচ্ছা তোমরা গাছ লাগালেই তো পারো।’
‘আমাদের পৃথিবীতে এতটাই বিষাক্ত গ্যাস আর ধোঁয়া জমেছে যে সেখানে বায়ুমণ্ডল ধ্বংস হয়ে গেছে। মানুষ এখন কৃত্রিমভাবে চলাচল করছে। যার ফলে সেখানে কোনো গাছের চারাই অবশিষ্ট নেই। যে কয়েকটা কৃত্রিমভাবে রাখা হয়েছে তাদের রোপণ করলেই মরে যায়।’
‘বেশ অদ্ভুত পৃথিবী!’
ক্লেকন বললো, ‘স্যার, আমরা আপনার সাহায্য পেয়েছি।’
‘আমি তোমাদের কী সাহায্য করেছি?’
‘আপনি আগামীর পৃথিবীর চিত্র নিজের মস্তিষ্কে এঁকেছেন।’
ফ্লেকন বললো, ‘আপনার শত বইয়ে অন্তত আমাদের কথা থেকে যাবে। এতে করে আগামীর পৃথিবী থেকে গাছপালা ধ্বংসের হাত থেকে হয়তো বেঁচে যাবে।’
ফ্লেকন ও ক্লেকনের সময় শেষ হয়ে এসেছিল। পাঁচ মিনিট পর ওরা চলে গেল। অধ্যাপক সেবার্স মুচকি হেসে বলেন, ‘মানুষ নতুন কিছুর নেশায় ছুটে। কিন্তু তার কী প্রতিক্রিয়া হয় তা নিয়ে ভাবে না। ভাবার সময় নেই। আসলে মানুষের নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখারও ক্ষমতা নেই।’
কয়েকদিন পর অধ্যাপক সেবার্স একটি প্রবন্ধ লিখলেন। সবাই অবাক হলো তার প্রবন্ধের শিরোনাম দেখে, শুধু লুই আর্ন ব্যতীত। শিরোনামটি হলো, ‘ই-ম্যান।’ হ
কিশোরকণ্ঠ সায়েন্স ফিকশন লেখা প্রতিযোগিতা ২০২৩-এর
৭ম স্থান অধিকারী সায়েন্স ফিকশন
আরও পড়ুন...