ইন্টারনেট প্রোটোকল
আইটি কর্নার নাদিম নওশাদ ডিসেম্বর ২০২৪
বর্তমান দুনিয়ায় ইন্টারনেট ছাড়া আমাদের কি এক মুহূর্তও চলে? নিশ্চয়ই না। ইন্টারনেট ব্যবহার করে আমরা সারা পৃথিবীর যে-কোনো প্রান্তের মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে পারি। কখনো ভেবে দেখেছো, কীভাবে এই ইন্টারনেট কাজ করে? কীভাবে আমরা ঘরে বসেই দূর-দূরান্তের মানুষের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারি?
ইন্টারনেটের সাহায্যে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য কিছু নিয়ম মানতে হয়, যেগুলোকে ইন্টারনেট প্রোটোকল বলে। বর্তমান ইন্টারনেট জগতে অনেক ধরনের ইন্টারনেট প্রোটোকল রয়েছে, যেগুলোর প্রত্যেকটাই এক একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। এসব প্রোটোকল ব্যবহার করে ইন্টারনেটে আমরা একে অপরের সাথে যোগাযোগ করি।
ইন্টারনেট প্রোটোকল কীভাবে কাজ করে
আমরা যখন কোনো তথ্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে কারো কাছে পাঠাই, ইন্টারনেট প্রোটোকল তখন সেই তথ্যকে খুব ছোট ছোট অংশে ভাগ করে ফেলে। এই ছোট ছোট অংশকে এক একটা প্যাকেট বলে। প্রতিটা প্যাকেটে তথ্যের ছোট অংশ ছাড়াও একটা অ্যাড্রেস থাকে, যেটাকে ইন্টারনেট প্রোটোকল অ্যাড্রেস বা সংক্ষেপে আই.পি অ্যাড্রেস বলে। ইন্টারনেটে যুক্ত প্রতিটি ডিভাইসের একটা করে আই.পি অ্যাড্রেস থাকে। এই অ্যাড্রেসের মাধ্যমেই নির্ধারণ করা হয় তথ্য কে পাঠাচ্ছে ও কার কাছে পাঠাচ্ছে।
প্যাকেটগুলো বিভিন্ন নেটওয়ার্কস্টেশন ঘুরে অবশেষে প্রাপকের ঠিকানায় চলে যায়। এই নেটওয়ার্ক স্টেশনগুলো হচ্ছে রাউটার। প্যাকেটগুলো বিভিন্ন রাউটার ঘুরে কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছে যায়। ঠিক যেভাবে পোস্ট অফিসের মাধ্যমে পাঠানো চিঠি বিভিন্ন পোস্ট অফিস ঘুরে আমাদের কাছে আসে। এভাবে যখন সবগুলো প্যাকেট প্রাপকের কাছে পৌঁছে যায়, তখন সবগুলো প্যাকেট মিলে আগের পূর্ণাঙ্গ তথ্যে পরিণত হয়ে যায়।
বিষয়টা সহজে বোঝার জন্য চলো একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরো আমাদের কাছে ১৬ টন মাছ আছে। তাহলে ২ টন করে বহন করতে পারে এমন ৮টা ট্রাকে করে আমরা মাছগুলোকে পাঠিয়ে দিতে পারি। এখানে ১৬ টন মাছ যদি আমাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য হয়, তাহলে প্রতিটা ট্রাক হচ্ছে প্যাকেট ও ট্রাকের ২ টন মাছ হচ্ছে তথ্যাংশ। আমরা যদি মাছগুলো সাতক্ষীরা থেকে ঢাকাতে পাঠাই, তাহলে কোথা থেকে মাছ নেওয়া হলো ও কোথায় মাছগুলো যাবে তার স্পষ্ট তথ্য পাওয়া গেল। এখানে সাতক্ষীরা ও ঢাকা প্রত্যেকটা এক একটা আইপি অ্যাড্রেস। এরপর মাছগুলো সাতক্ষীরা থেকে রওনা হয়ে চুকনগর, ডুমুরিয়াম, খুলনা, মুকছুদপুর, ভাঙা পার হয়ে ঢাকাতে পৌঁছালো। পার হওয়া এই প্রতিটা স্টেশনকে আমরা রাউটার হিসাবে গণ্য করতে পারি। অবশেষে মাছ ঢাকাতে পৌঁছানোর পর সবগুলো ট্রাক থেকে ২ টন করে মাছ নামিয়ে একত্রে রাখলে আমরা মোট ১৬ টন মাছ পাবো। তাহলে সমস্ত তথ্যাংশ মিলে একটা সম্পূর্ণ তথ্য তৈরি করবে।
তোমাদের মনে হয়তো এই প্রশ্ন জাগতে পারে, যদি কোনো প্যাকেট প্রাপকের কাছে না পৌঁছায়, তাহলে কী হবে? মানে, যদি একটা ট্রাক ভুল করে রওনা না দেয় তাহলে কী হবে? যদি কোনো কারণে কোনো প্যাকেট প্রাপকের কাছে না পৌঁছায়, তাহলে প্রাপকের সিস্টেম থেকে নিখোঁজ প্যাকেটের জন্য প্রেরকের কাছে আবার আবেদন করতে পারবে।
ইন্টারনেট প্রোটোকলের প্রকার
বর্তমানে অনেক ধরনের ইন্টারনেট প্রোটোকল রয়েছে, যেগুলো বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য ইন্টারনেট প্রোটোকল সম্পর্কে নিচে দেওয়া হলো :
টি.সি.পি (ট্রান্সমিশন কন্ট্রোল প্রোটোকল)
ইউ.ডি.পি (ইউজার ডাটাগ্রাম প্রোটোকল)
এইচ.টি.টি.পি.এস (হাইপার টেক্সট ট্রান্সফার প্রোটোকল সিকিউর)
এফ.টি.পি (ফাইল ট্রান্সফার প্রোটোকল)
ইন্টারনেট প্রোটোকল ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা
আমরা ইন্টারনেট ব্যবহার করে বিশে^র এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারি। এক্ষেত্রে সবথেকে বড়ো যে প্রতিবন্ধকতা, সেটা হলো ভিন্ন ভিন্ন নেটওয়ার্ক। যখন কোনো তথ্য আমরা পাঠাই বা গ্রহণ করি, তখন প্রেরক ও প্রাপক ভিন্ন ভিন্ন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে। সুতরাং তথ্য পাঠানোর গতি দুটো জায়গাতে দুই রকম। এ অবস্থায় কোনো তথ্য পাঠালে সঠিক তথ্য প্রাপকের কাছে পৌঁছাবার কোনো সম্ভাবনা নেই। এই প্রয়োজন অনুভব করেই বিজ্ঞানীরা ইন্টারনেট প্রোটোকল তৈরি করেছেন। ইন্টারনেট প্রোটোকল ব্যবহারের ফলে তথ্য একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে ও হারে তথ্য প্রাপকের কাছে যেতে থাকে।
চলো একটু সহজ করে বোঝা যাক। মনে করো তোমার বাড়িতে ইন্টারনেটের ডাটা পাঠানোর গতি ১০ মেগাবাইট প্রতি সেকেন্ডে। তুমি তোমার বন্ধুর কাছে একটা ফাইল পাঠাতে চাচ্ছো। তোমার বন্ধুর বাড়িতে ইন্টারনেটের ডাটা গ্রহণের গতি ৫ মেগাবাইট প্রতি সেকেন্ডে। তাহলে ফাইলটি যখন প্যাকেটে পরিণত হয়ে তোমার থেকে ১০ মেগাবাইট প্রতি সেকেন্ডে গতিতে যাবে, তোমার বন্ধু তখন মাত্র ৫ মেগাবাইট প্রতি সেকেন্ড গতিতে প্যাকেটগুলো গ্রহণ করতে পারবে। ফলে প্রতি সেকেন্ডে ৫ মেগাবাইট তথ্যাংশ হারিয়ে যাবে। এবং তোমার বন্ধু পূর্ণাঙ্গ ফাইলটি পাবে না। কিন্তু যদি ইন্টারনেটের ডাটা পাঠানোর ও গ্রহণের গতি প্রতি সেকেন্ডে ১ মেগাবাইট করে হয় তাহলে তোমার বন্ধু ফাইলটি পেয়ে যাবে। ইন্টারনেট প্রোটোকল তথ্যের এই অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করে।
এবার চলো আরেকটা ঘটনা লক্ষ করা যাক। মনে করো তুমি যেই সময় তোমার বন্ধুর কাছে ফাইল পাঠাচ্ছো, ঠিক সেই সময় অন্য আরেকজনও তোমার বন্ধুর কাছে ফাইল পাঠাচ্ছে। তাহলে সিস্টেম কার প্যাকেট গ্রহণ করবে? এমন ক্ষেত্রে তথ্যের সংঘর্ষ হতে পারে। যার কারণে ডাটা লস হতে পারে। এসব সমস্যার সমাধানের জন্য ইন্টারনেট প্রোটোকল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইন্টারনেট ব্যবহারের ব্যাপকতার সাথে সাথে সামনে এসেছে ইন্টারনেট প্রোটোকলের গুরুত্ব। একটা ফাইল ইন্টারনেটে কতগুলো ধাপ পার করে প্রাপকের কাছে পৌঁছায়, তা সত্যিই অবিশ^াস্য। ইন্টারনেট প্রোটোকলগুলোর কারণে কোনো তথ্য আমরা খুব সহজেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে পাঠাতে পারি।
আরও পড়ুন...