কোলা সুপারডিপ বোরহোল
বিজ্ঞান মঈন উদ্দীন জুন ২০২৪
পৃথিবীর শুরু থেকে আজ পর্যন্ত রহস্যময় অনেক আবিষ্কার আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এমন অনেক আশ্চর্যজনক মানব সৃষ্ট জায়গা রয়েছে যার সৃষ্টির উদ্দেশ্য আমাদের অবাক করে তোলে। কোলা সুপারডিপ বোরহোল তেমন একটি মানব সৃষ্ট গর্ত যা পৃথিবীর কৃত্রিম গভীরতম স্থান হিসেবে পরিচিত।
পৃথিবীর কেন্দ্র নিয়ে সবার আকষর্ণ রয়েছে। লোহা, সিসা, নিকেল, পারদ ইত্যাদি কঠিন ও ভারী পদার্থ দিয়ে তৈরি পৃথিবীর কেন্দ্র। কিন্তু পৃথিবীর প্রচণ্ড চাপে সেসব পদার্থ গলিত অবস্থায় আছে। এমন কোনও বস্তু বা পদার্থ নেই যেটি পৃথিবীর কেন্দ্রে সচল থাকে! তারপরও পৃথিবীর কেন্দ্রে পৌঁছাতে বিজ্ঞানীরা চালিয়েছেন চেষ্টা। আর তাতেই সৃষ্টি হয়েছে কোলা সুপারডিপ বোরহোল।
বিজ্ঞানীরা ভূপৃষ্ঠ থেকে পৃথিবীর কেন্দ্র পর্যন্ত স্থানকে তিন ভাগে ভাগ করেন। ভূত্বক, ম্যান্টল ও কেন্দ্রমণ্ডল। ভূত্বকে আমরা সবাই নানা রকম গর্ত খুঁড়তে পারি। কিন্তু ম্যান্টল পর্যন্ত যাওয়াটা দুঃসাধ্য।
পৃথিবীর ব্যাসার্ধ প্রায় ৬ হাজার ৩৭১ থেকে ৬ হাজার ৩৫৭ কিলোমিটার। ভূমির ৪০ শতাংশ ম্যান্টল। ভূত্বক ৫ থেকে ৫০ কিলোমিটার পুরু। এরপর ২ হাজার ৮৯০ কিলোমিটার ম্যান্টল। বাকিটুকু কেন্দ্রমণ্ডল। ম্যান্টলে পৌঁছানোর জন্যই বিজ্ঞানীদের এই দীর্ঘ প্রচেষ্টা। ভূত্বক ভেদ করে যেতে হবে ম্যান্টলে। ভূত্বকের নিচের দিকে তাপমাত্রা এত বেশি যে এখন পর্যন্ত খুঁড়ে ম্যান্টল পর্যন্ত কেউ যেতে পারেনি।
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন সর্বপ্রথম পৃথিবীর কেন্দ্রে পৌঁছাতে একটি খননকাজ চালায়। এই খননকাজটি করা হয়েছিল বর্তমান রাশিয়ার পেচেংস্কি জেলার কোলা উপদ্বীপে। প্রকল্পটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘কোলা সুপারডিপ বোরহোল’।
পৃথিবীর কেন্দ্র নিয়ে মানুষের এত কৌতূহল কেন! কারণ পৃথিবী সৃষ্টির ইতিহাস আছে এর কেন্দ্রে। বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর জন্ম মহাকাশে ছড়ানো ধুলার মেঘ থেকে। নক্ষত্র বিস্ফোরণে ছড়ানো কণা পাওয়া যাবে পৃথিবীর গভীরে। তাই মহাবিশ্ব ও পৃথিবীর ইতিহাস প্রমাণসহ জানার জন্য এ রকম গর্ত খোঁড়া গুরুত্বপূর্ণ। ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরি ইত্যাদির ব্যাপারেও জানা যাবে বিস্তারিত।
১৯৭০ সালের ২৪ মে কোলা উপদ্বীপে খনন কাজ শুরু করা হয়। উদ্দেশ্য ১৫,০০০ মিটার খনন করা। ১৯৮৩ সালে কোলা সুপারডিপ বোরহোলের খনন কাজ ১২,০০০ মিটার পর্যন্ত করা হয় এবং এক বছরের জন্য বন্ধ রাখা হয় এটি উদযাপনের জন্য। এরপর ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৮৪ সালে ১২,০৬৬ মিটার খননের পর হঠাৎ করেই ৫,০০০ মিটার সেকশনের ড্রিলিং স্ট্রিংটি কুপের মধ্যে পড়ে যাওয়ায় কুপের রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। আর এর জন্য পরবর্তীতে ৭,০০০ মিটার থেকে আবার খনন করতে হয়েছিল। ১৯৮৯ সাল পযর্ন্ত গর্তটি ১২,২৬২ মিটার পর্যন্ত খনন করা হয়। খননের গভীরতা বাড়ার সাথে সাথে পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে ক্রমশ তাপমাত্রা বাড়তে থাকে যার ফলে ১২,২৬২ মিটার গভীরের বেশি খনন করা সম্ভব হয়নি। কারণ ১৫,০০০ মিটার পর্যন্ত খনন করতে প্রায় ৩০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা মোকাবিলা করতে হতো যেখানে ড্রিলিং বিট অচল হয়ে যেত। অবশেষে ১৯৯২ সালে খনন কাজটি বন্ধ হয়ে যায়।
এর এক যুগ পর পরিত্যক্ত হয়েছে জায়গাটি। ধীরে ধীরে সময়ের স্রােতে ভরাটও হয়ে গেছে এর অনেক অংশ। গর্তটির ব্যাস মাত্র ৯ ইঞ্চি। গভীরে ১২ দশমিক ২৬২ কিলোমিটার। মেশিনের সহায়তায় এই গভীরতায় যেতে মানুষের ২০ বছর লেগেছে। এই খনন কাজে প্রথমে উরালমাস-৪ই ড্রিলিং রিগ ব্যবহার করা হয়েছিল। তারপর উরালমাস-১৫০০০ সিরিজের রিগ ব্যবহার করা হয়।
২০০৮ সাল পর্যন্ত গভীরতার পরিমাপে এবং বোরের বিচারে এটিই ছিল মানুষের তৈরি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বোরহোল, কিন্তু ২০০৮ সালে কাতারের আল শাহীন তেল খনির গভীরতা পরিমাপ করা হয় ১২,২৮৯ মিটার দৈর্ঘ এবং পরবর্তীতে এর তিন বছর পর রাশিয়ার শাখালিন দ্বীপের উপকূলবর্তী শাখালিন-আই ওডোপ্টু ওপি-১১ এর দৈর্ঘ পরিমাপ করা হয় ১২,৩৪৫ মিটার।
লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারলেও থেমে নেই বিজ্ঞানীরা। একের পর এক চালিয়ে যাচ্ছেন চেষ্টা এবং গবেষণা। হয়তো একদিন উন্মোচন হবে পৃথিবীর কেন্দ্রে কি আছে তার রহস্য।
আরও পড়ুন...