গ্রীষ্মের ছুটি
তোমাদের গল্প জাকারিয়া আব্দুল্লাহ্ জুন ২০২৫
এবারের গ্রীষ্মের ছুটিতে দুরন্ত তার বড়ো আপু তমালীর সঙ্গে গ্রামের বাড়ি যাবে। পুরো সতেরো দিন ছুটিই সেখানে মজা করে কাটাবে। গ্রামের বাড়িতে আছেন ওর বৃদ্ধা দাদি। বাড়ি দেখাশোনার জন্য আছে একজন দূরসম্পর্কের কাকা-নিহাদ। দুরন্ত তাকে নিদু কাকা বলে ডাকে। নিদু কাকার সঙ্গে দুরন্তের খুব ভাব। সে বাড়িতে গেলে কাকার সঙ্গে বাজারে যায়, বাগান পরিচর্যা করে, গরু-ছাগলদের মাঠে নিয়ে গিয়ে খাওয়ায়।
গ্রামে দুরন্তের একটা ভালো বন্ধু আছে, তার নাম সৌম্য। দুরন্তের মতো সৌম্যও সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। তারা নিয়মিত পত্র চালাচালি করে। সর্বশেষ পত্রে সৌম্য লিখেছে-‘দুরন্ত, তুই এবার গ্রীষ্মের ছুটিতে এলে আমরা দুজন রাতে সবাইকে ফাঁকি দিয়ে নীলপাহাড়ে যাব। সেখানে তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটাব। বনমোরগ ধরে লাকড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাব।’
এই পত্র আসার পর থেকে বইয়ে মন নেই দুরন্তের। সে ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে এই পত্র বারবার পড়েছে। পত্রটি যতবার পড়ছে, ততবারই তাদের গ্রামের দৃশ্যগুলো চোখে ভেসেছে-দাদুবাড়ি, বিস্তৃত মাঠ, আমের বাগান, মাটি দিয়ে তৈরি মসজিদ, দরজা-জানালাহীন মক্তব ঘর, নীলপাহাড়ের গুহা, ঈদগাহ মাঠের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রকাণ্ড বটগাছ আরও কত কী!
দুরন্ত আর তমালী ট্রেনে ওঠার সময় মা এসেছিলেন পৌঁছে দিতে। দিয়েছেন একগাদা উপদেশ-‘দাদির সাথে দুষ্টুমি করবি না, দাদিকে কাজে সাহায্য করবি, সময়মতো খাবার খাবি, সন্ধ্যা হলেই বাড়ি ফিরবি আর ছুটির পড়াগুলো শেষ করবি।’
তমালী খুব ভালো মেয়ে। সে মন দিয়ে সেসব শুনলেও দুরন্তের কানে এগুলো একেবারেই ঢুকছিল না। সে গ্রামে কীভাবে সময় কাটাবে সেই পরিকল্পনাতেই তার মন ব্যস্ত।
গ্রামের এক কিলোমিটার দূরেই ছোট্ট স্টেশন। সেখানেই ওদের নামতে হবে। নিদু কাকাকে পত্র লেখা আছে। সে সময়মতো নিতে আসবে।
রাত হয়ে গেছে। ট্রেন থামল স্টেশনে। তারা দুজন নামার সময় দেখল দুটি আলো এগিয়ে আসছে। দুরন্ত ব্যাগ থেকে দুটো লাইট বের করে আলো জ্বালাল। সে জানে নিদু কাকা আর সৌম্য তাদের নিতে এসেছে। তাই তাদের সাথে মজা করতেই আলো জ্বেলেছিল। কিন্তু নিদু কাকুর সাথে যাকে দেখতে পেল সে সৌম্য নয়, স্টেশন মাস্টার। দুরন্তের মন খারাপ হলো। নিদু কাকা বুঝতে পেরে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিলো হাতে। তাতে লেখা-‘দুঃখিত দুরন্ত, আমি তোকে নিতে আসতে পারিনি, তুই তো জানিস আজ সাপ্তাহিক হাটের দিন। বাবার দোকানে এদিন ভীষণ ভিড় থাকে, বাবা একা সামলাতে পারেন না।’
চিরকুট পড়ে দুরন্ত ঘাড় থেকে ব্যাগ নামিয়ে নিদু কাকার হাতে ধরিয়ে দিলো। দুটো লাইট নিয়ে সোজা দৌড় দিলো সৌম্যদের দোকানে। বাজার স্টেশন থেকে খুব কাছে, পাঁচ মিনিটের রাস্তা। সেখানে পৌঁছে লাইট ধরল সৌম্যের চোখে, লাইটের আলোয় তার চোখ অন্ধকার হয়ে গেল। সৌম্য ছেলেটা তার নামের মতোই শান্ত। সহজে রাগে না। কিন্তু সে এখন ভীষণ রাগান্বিত হয়ে গেল। তার মনটা এখন দোকানে নেই। তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে বাড়ি গিয়ে দুরন্তের সাথে দেখা করার জন্য মন উদ্্গ্রীব হয়ে আছে। এজন্য সে বেশ বকাও দিলো চোখে লাইট ধরা মানুষকে।
লাইট বন্ধ করে দুরন্ত সোজা গিয়ে জড়িয়ে ধরল সৌম্যকে। সৌম্য তখনও বুঝতে পারেনি। তারপর দুরন্তের আওয়াজ শুনে সে চমকে উঠে তাকে বুকে টেনে নিল। দুরন্ত তাকে দুটো লাইট দেখিয়ে বলল-‘মামা কুয়েত থেকে দুটো লাইট পাঠিয়েছেন। দেখ কত সুন্দর। একটা তোর জন্য এনেছি, অনেক দূর আলো যায়।’ বলেই দূরের রাস্তায় আলো ধরল।
দোকান গোছাতে দুরন্তও হাত লাগাল। সৌম্য আর দুরন্ত ফিরল দুরন্তের দাদিবাড়িতে। দেখল দাদি রান্নাঘরে তাদের প্রিয় পায়েস রান্না করছে।
রাতে সবাই একসাথে খাওয়ার পর, দাদির কাছে গল্প শুনতে শুনতে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমিয়ে গেল।
পরদিন ভোরে জামা গায়ে বেরিয়ে পড়ে দুরন্ত। গ্রামের সকাল তার খুব প্রিয়। ঝিলিমিলে সোনালি আলো, দখিনের বাতাস, সবুজে ঘেরা গ্রাম। এই সজীব পরিবেশ খুব টানে তাকে। সে সোজা চলে যায় মক্তবে, হুজুরের সাথে সালাম বিনিময়ের পর ভালোমন্দ গল্প করতে করতে পুরো গ্রাম এক চক্কর ঘুরে ফেলে।
একদিন বিকেলে সৌম্য আর দুরন্ত নীলপাহাড়ে রাত্রিযাপনের পরিকল্পনা করে। তাদের এই মিশন থাকবে সুপার সিক্রেট, অন্য কেউ জানবে না।
ঘড়িতে যখন রাত এগারোটা, পুরো শহর এই সময় জেগে থাকলেও গ্রামের চরিত্র পুরো বিপরীত। পুরো গ্রামের কেউ জেগে নেই। নিস্তব্ধতার শীতলে জমে আছে পুরো গ্রাম। ঠিক এমন সময় দুজন বের হয়েছে তাদের মিশনে। হাতে লাইট, ঘাড়ে প্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে ভরা ভারী ব্যাগ, চোখে-মুখে নীলপাহাড় রাত্রিযাপনের রোমাঞ্চ।
নীলপাহাড়ের গুহার ভেতর তাঁবু খাটানোর কথা থাকলেও সাপ, বিষাক্ত পোকামাকড়ের ভয়ে সমতলের একটি বিশাল পুরোনো আমগাছের নিচে তাঁবু খাটায়। সবকিছু গুছিয়ে তারা বনমোরগ শিকারের উদ্দেশ্যে সেই গুহার দিকে যেতে শুরু করল।
এমন সময় হঠাৎ দেখল গ্রামের মেঠোপথ বেয়ে একটা মাইক্রোবাস আসছে। সৌম্য বলল-‘এখন সময় কত রে?’ দুরন্ত হাতঘড়িতে দেখল, রাত ১টা পেরিয়ে গেছে। সৌম্য বলল-‘এই রাস্তা দিয়ে দিনেও কখনো মাইক্রোবাস আসতে দেখিনি। এত রাতে কেন এলো! বিষয়টি দেখতে হবে।’
গাড়িটি নীলপাহাড় থেকে বেশ খানিকটা দূরে থামল। তারপর আর চারচাকার যান আসার মতো প্রশস্ত রাস্তা নেই। গাড়ি থেকে নামল মোট চারজন।
সৌম্য বলল-‘চুপচাপ ওদের মতলব জানতে হবে।’ ওরা আলো না জে¦লে চুপিচুপি পেছন দিকের জঙ্গল দিয়ে লোকগুলোর কাছাকাছি পৌঁছে গেল। কান খাড়া করে শুনতে চেষ্টা করল ওদের কথাবার্তা। ওদের মধ্যে একজন বিদেশি। একজন বলল-‘এই সাদা চামড়াটা গাড়ির কাছে থাকুক, তুই যাবি গ্রামের ওদিক। কাউকে আসতে দেখলে সিগন্যাল পাঠাবি, অন্য দুজন যাবে নীলপাহাড়ের গুহার ভেতরের জিনিসগুলো আনতে। খুব সাবধানে। কেউ আলো জ্বালাবি না। আলো জ্বালালেই মানুষ বুঝে ফেলতে পারে।’
জিনিসগুলো কী দুরন্ত ও সৌম্য না জানলেও বুঝল মূল্যবান কিছু হবে। এরা চারজন সেগুলো চুরি করে বিদেশ পাচার করবে।
দুরন্ত বলল-‘আমাদের কিছু করতে হবে। এদের আটকাতে হবে।’ ওরা পরিকল্পনা করল। তিনজন দূরে সরে গেলে বিদেশি লোককে আটকে মুখ বেঁধে জঙ্গলে ফেলে রাখবে। গ্রামের দিকে যাওয়া লোককেও একই কাজ করবে। এরপর ওদের একজন যাবে থানায় পুলিশে খবর দিতে আরেকজন যাবে গ্রামবাসীদের জাগাতে।
তিনজন লোক দূরে যাবার পর দুরন্ত চুপিচুপি পেছন দিক থেকে বিদেশি নাগরিকের ওপর আক্রমণ করে বসল।
এরপর দুজন মিলে গেল গ্রামের দিকে পাহারা দেওয়া লোকটার কাছে। তবে এবার কাজটা সহজ হলো না। সৌম্যকে ধরে ফেলল লোকটা। অন্যদিক থেকে আরেকজন ছুটে এলো। অবস্থা বেগতিক দেখে গ্রামের দিকে ছুটে গেল দুরন্ত। বাড়ি গিয়েই সে প্রথমে নিদু কাকাকে জাগিয়ে তুলল। নিদু কাকা তার অবস্থা দেখে চমকে উঠল। তার গায়ে জামা নেই, পুরো শরীর থেকে টপটপ করে ঘাম ঝরছে, আর জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে। দুরন্তের মুখে সবকিছু শুনে পুরো গ্রামবাসীকে জাগিয়ে তুলল। তাদের নিয়ে ছুটে চলল নীলপাহাড়ের দিকে।
সৌম্যকে জিম্মি বানাল তারা। তবে সুবিধা করতে পারল না। ততক্ষণে পুলিশ চলে এলো।
একসময় তারা চারজনই ধরা পড়ল। তাদের চারজনকে আনা হলো গ্রামে। বেঁধে রাখা হলো দুরন্তদের উঠোনে। গ্রামের কেউ আজ ঘুমিয়ে নেই।
পুরো ঘটনাটি পত্রে লিখে শেষ করে থামল দুরন্ত। এ ঘটনার পর ওদের দুজনকে নিয়ে অনেক হইহই হয়েছে। এখনো সবাই ওদের সাহসের প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
আরও পড়ুন...