চাঁদের হাট

গল্প কামাল হোসাইন জুন ২০২৫

রাফাতদের বাড়িতে এখন মহাহইচই। লোক থইথই। কতদিন পর যে এ বাড়িতে এমন কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ ফিরে এসেছে, তা হিসেব করে বলতে হবে। সত্যি বলতে, অনেক দিন এ বাড়িতে এমন শোরগোল শোনা যায়নি। বাড়ির লোকজন যে কম, তা কিন্তু নয়। লোকজন থাকলেও যে যার কর্মসূত্রে বাড়ির বাইরে দূরদূরান্তে থাকে। ফলে ইচ্ছে থাকলেও দীর্ঘ সময় ধরে যাতায়াতের ভয়ে অনেকে এমন উৎসবে শামিল হয় না বলতে পারো। 

এই যেমন শাফাতরা থাকে বান্দরবান। শাফাতের বাবা রাফাতের বড়ো চাচা। তিনি সেখানে চাকরি করেন। বান্দরবানে মা-বাবার সঙ্গে শাফাত ও তার ছোটো বোন সুইটি থাকে। ছুটিছাটা মিললেও এতদূর বাস জার্নির ভয়ে আর বাড়ির কথা ভাবেন না তেমন করে শাফাতের বাবা-মা। 

ওদিকে উমামার বাবাও চাকরি নিয়ে সুদূর দিনাজপুরে পড়ে আছেন। আসতে-যেতে প্রায় তিন দিন ফুরিয়ে যায়। ফলে ইচ্ছেটা মনের মধ্যে গুমরে কাঁদলেও কিছুই করার থাকে না বললেই চলে। দিনাজপুরে উমামার বাবা-মা আর তার ছোট দুই ভাই মুনিম ও আবরার। মানে সংসারে তারা পাঁচজন।

এ ছাড়া রাফাতের দুই ফুফু আছেন-একজন রাফিয়া ফুফু আর জন সোনিয়া ফুফু। তারাও দেশের দূরবর্তী দুই প্রান্তে থাকেন ফুফাদের চাকরির কারণে। তাদের ঘরেও দুজন করে ছেলেমেয়ে রয়েছে। বিশেষ ছুটির সময় বাসের টিকিট করা, ব্যাগ-ব্যাগেজ নিয়ে মুভ করা মানে বিরাট এক ঝকমারি ব্যাপার-স্যাপার আর কি!

রাফাতের ছোটো চাচা শফিউর থাকেন পঞ্চগড়। তিনি অবশ্য এখনও বিয়েশাদি করেননি। চাকরির সুবাদেই তার পঞ্চগড় থাকা। কেউ কেউ তো রাফাতকে বলেই বসে, তোদের বাড়ির লোকের এমন ভাগ্য কেন বলো তো? সবাই চাকরি করে, কিন্তু তিনজন দেশের তিন প্রান্তে। চাইলেও সহজে ফোন ছাড়া সরাসরি অল্প সময়ে যোগাযোগের সুযোগ নেই!

কথা তো সত্যি। 

বাড়িতে থাকে কেবল রাফাতরা। ওরা দুই ভাই-বোন। বোনের নাম সাবরিনা। রাফাতের বাবা এ বাড়ির মেজো ছেলে। তার সঙ্গে দাদিই এই বাড়ির পাহারাদার। গাছপালায় ঘেরা বিশাল আয়তনের ভিটেয় সারি সারি কতগুলো ঘর থাকলেও সেখানে রাত যাপন করার মতো মানুষের বড়োই অভাব। রাফাতরা ছাড়া দাদি এই বিশাল বাড়িতে একাকিত্ব বোধ করলেও ঠিক সেভাবে মুখ ফুটে বলতে পারেন না। মানে সবার দূরদূরান্ত থেকে আসা-যাওয়ার কষ্টের কথা চিন্তা করে নিজের মনের কথা মনেই চেপে রাখেন। তারও ইচ্ছে করে, সবাই তার সামনে ঘোরাফেরা করুক। ইচ্ছে করে ঈদে বা বিয়েশাদির মতো বড়ো বড়ো আয়োজনে তাঁর ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি যে যেখানে আছে, সবাই যেন এক জায়গায় এসে জড়ো হয়। কয়টা দিন হইহল্লা করে কাটিয়ে যাক। খুশির দোলায় ভেসে যাক এই বাড়ির চারপাশ। তাতেই তো তার বড়ো আনন্দ। মনভরা তৃপ্তির রোশনাই।

রাফাতের দাদা বেঁচে নেই। তিনি আজ প্রায় সাত বছর হলো পৃথিবীর মায়া ছেড়েছেন। বেশ কিছুদিন পক্ষাঘাতগ্রস্ত ছিলেন তিনি। ওই যে বিছানায় পড়লেন, এরপর নানা অসুখ-বিসুখে তিনি আর খাড়া হতে পারলেন না। আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে দাদা দুনিয়া থেকে হারিয়ে গেলেন। 


কুরবানি ঈদ প্রায় আসন্ন। রাফাতের দাদি এবার কেন যেন বেজায় অধৈর্য হয়ে পড়লেন। মনের ইচ্ছেটাকে আর দমিয়ে রাখতে পারলেন না। মেজো ছেলে দিদারকে ডেকে দাদি বললেন, ‘আমি কিচ্ছু বুঝি না। এবার এই কুরবানি ঈদের ছুটিতে সবাই যেন এই বাড়িতে হাজির হয়। কীভাবে জড়ো হবে, জানি না। সবাই কষ্টের দোহাই দেবে, তা আমি শুনব না, এই বলে রাখলাম। সবাই ভেবেছেটা কী? ভেবেছে, মায়ের খাওয়াদাওয়া, পরা, ওষুধ, টাকা-পয়সা-কোনো কিছুরই তো অভাব হচ্ছে না। সব চাহিদাই তো সময়মতো পূরণ হয়ে যাচ্ছে, তাই না? কিন্তু মনে রেখো, এগুলোই কেবল মানুষের একমাত্র চাহিদা না। এগুলো তো বাহ্যিক চাহিদা। ছেলেমেয়েরা সব এক জায়গায় এসে মা-বাবার চোখের সামনে কাটিয়ে দেওয়ার মধ্যেও অনেক অভাব দূর হয়। বাবা তো তুমিও হয়েছ। তোমাদের রেখে সন্তানরা যখন দূরে থাকবে, তখন আমার এই কথা মর্মে মর্মে অনুভব করবে, বুঝেছ?’

এরপর আর কথা থাকে না। রাফাত আর সাবরিনার বাবা দিদার মাহমুদ সবাইকে ফোন করলেন। জানালেন মায়ের আকুতির কথা। মায়ের এমন নাছোড় আরজি কেউ আর ফেলতে পারল না। কথা হলো যে যেখানে আছে, সবাই এবার বাড়ি এসে কুরবানির ঈদ উদ্যাপন করবে। প্রয়োজনে যে যার অফিস থেকে এবার বাড়তি ছুটি নিয়ে আসবে। যেন সবাই বিশেষ করে বাচ্চারা যেন কয়েকটা দিন গ্রামের বাড়িতে এসে হইচই করে কাটিয়ে যেতে পারে।

এই খবরে বাড়িটা যেন নতুন করে সাজতে শুরু করল। সাবরিনার মায়ের তাই কোনো ফুরসত নেই। এত বড়ো বাড়ি। সবই প্রায় অগোছালো। ঝাড়পোঁছ করে রাখতে হবে। অপরিষ্কার ঘরবাড়ি ঝেড়েমুছে পরিচ্ছন্ন করে তুলতে হবে। এতগুলো মানুষের থাকার ব্যাপার বলে কথা। ছোট্ট সাবরিনাও মায়ের সঙ্গে যতটুকু পারে হাত লাগাল। সঙ্গে আছে কুলসুম। অনাথ মেয়ে কুলসুম। ওর বাবা-মা নেই। তাই কুলসুমকে রাফাতের মা এ বাড়িতে এনে রেখেছেন। নিজের মেয়ের মতো আদর-যত্ন দিয়ে গড়ে তুলছেন। সাবরিনার মতোই কুলসুম যেন এ বাড়ির আরেকটি মেয়ে। পড়াশোনা থেকেও কুলসুম বঞ্চিত নয়। মা ওকেও বাবা আর দাদির সম্মতি নিয়ে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন। যারা জানে না, তারা বুঝতেই পারবে না যে, কুলসুম এ বাড়ির মেয়ে নয়। 

মোটামুটি সকলের দু-তিন দিনের পরিশ্রমে বাড়িটার যেন শ্রী ফিরল। হলো ঝকঝকে-তকতকে।  

সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছে সাবরিনা। সঙ্গে কুলসুম তো আছেই। রাফাতের কথা তো বাদই দিলাম। কতদিন পর এ বাড়ির সবাই এক জায়গায় জড়ো হবে! ভাবতেই ওদের মনটা খুশিতে বাকবাকুম। ময়ূরীর মতো পেখম তুলে যেন নাচতে শুরু করল ওরা দু-বোন। এবারের এই ঈদে কত প্ল্যান ওদের! চাচা-চাচিদের সঙ্গে চাচাতো ভাইবোনরা আসবে। আহা! সে কী জম্পেশ আড্ডা হবে রাতে-দিনে!

হলোও তাই। বাড়িটা যেন গমগম করছে এখন। বাড়িটাতে যেন চাঁদের হাট বসেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যখন ঠিক ঈদের দুই দিন আগে এক একটা করে গাড়ি গ্রামে আসছে, সেই দৃশ্যটা দেখার মতো ছিল। গাড়ি থেকে বড়োরা বড়োদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছে, আর ছোটোরা ছোটোদের সঙ্গে গলাগলি করে আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠছে। 

একসময় সবাই রাফাতের দাদির ঘরে গিয়ে হাজির হলো। দাদি ঠিক আগের মতো চলাফেরা করতে পারেন না। চোখের পাওয়ারও আগের মতো নেই। ঘরেই বেশির ভাগ সময় থাকেন তিনি। নামাজ-কালাম পড়া আর ঘরে বসে খাওয়া-এই তাঁর সারাদিনকার কাজ। ছোটো-বড়ো মিলিয়ে এত জনসংখ্যা হলো যে, দাদির ঘরে সবার দাঁড়ানোর জায়গা হলো না। সবাই গিয়ে একে একে দাদিকে সালাম করল। দাদি সকলের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। আর এ সময় তাঁর দু-চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু গড়াতে দেখা গেল। দাদি কাঁদছেন। কিন্তু কেন?

শাফাত দাদির কোলের কাছে গিয়ে বলল, ‘দাদি, তুমি কাঁদছ কেন? আমরা সবাই তো এসেছি তোমাকে দেখতে! তুমি খুশি হওনি?’

দাদি শাফাতকে আরও কাছে টেনে নিয়ে বললেন, ‘কী বলিস তোরা! আমি খুশি হইনি? আমার চেয়ে এই মুহূর্তে পৃথিবীর আর কেউ খুশি নয় রে ভাই। আমার ঘরে সব টুকরো টুকরো তারা নেমে এসেছে। এটাই তো আমি চেয়েছিলাম। আর সেই আনন্দে আমার চোখ ভিজে গেছে রে!’ দাদি চোখ মুছলেন।

একটু থামলেন। তারপর ভিড়ের মধ্যে ঘোলা চোখে কাকে যেন খুঁজলেন। বললেন, ‘আমার শফিউর কই? শফি আসেনি?’

এ সময় রাফিয়া ফুফু দাদির বিছানার পাশে বসে বললেন, ‘শফিউর এখনও এসে পৌঁছতে পারেনি মা। তবে ওর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। কিছুটা দেরি হচ্ছে। চলে আসবে আর ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই।’

এরই মধ্যে দাদি যেন কোথায় হারিয়ে গেলেন। উদাস হয়ে দূরে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। একটা দীর্ঘশ^াস বেরিয়ে এলো তাঁর গলা থেকে। বললেন, ‘তোদের বাবা আজ বেঁচে থাকলে কত যে খুশি হতো!’ বলেই আবার তিনি খানিকটা অশ্রুপাত করলেন। এরই মধ্যে সকলের চোখ ভিজে উঠেছে। সত্যিই, রাফাতের দাদা খুবই আমুদে আর অমায়িক মানুষ ছিলেন। সহজ-সরল আর শান্ত মানুষ ছিলেন। কেউ তাকে কখনো রাগ করতে দেখেনি। সেই মানুষটা হঠাৎ করে আরও শান্ত হয়ে গেলেন। শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত তাঁর সেই শান্তরূপ বজায় ছিল।

এরই মধ্যে রাফাতের বড়ো চাচা নীরবতা ভেঙে বললেন, ‘এখন এখান থেকে ভিড় কমাও। এখন সবাই ক্লান্তশ্রান্ত। মেজো বউ কী ব্যবস্থা করেছে দেখো। পেটে কিছু দিতে হবে তো, নাকি এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা গিললেই চলবে? কারো কিছু সমস্যা না হলেও আমার কিন্তু পেটের মধ্যে ছুঁচো দৌড়াচ্ছে। মা, তুমি অনুমতি দাও।’

বড়ো চাচার কথায় সবাই হেসে দিলো। দাদিকে রাফিয়া ফুফু আর শাফাতের মা বড়ো চাচি ধরাধরি করে বাড়ির বাইরের উঠোনে খোলা হাওয়ায় একটা চেয়ারে বসিয়ে দিলেন। 

খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা আগেই করা ছিল। বড়ো চাচা আগেই ফোন করে বলে দিয়েছেন, গ্রামে গিয়ে কোনো নাশতা খাব না। শুধু সাদা ভাত, কিছু একটা ভাজি আর মসুর ডাল, ব্যস। সঙ্গে ঘি দিয়ে মাখা আলুভর্তাও হতে পারে। 

শাফাতের মা চিকন চালের ভাত, ডিমভাজি, আলুভর্তা, বেশি পিঁয়াজ দিয়ে ছোটো মাছের চচ্চড়ি আর মসুর ডাল রান্না করেছেন। বাচ্চারা কেউ কেউ এখন ভাত খেতে চায়নি। নাক সিটকেছে। কিন্তু বড়ো চাচা তাগিদে কেউ আর না করতে পারেনি। অবশ্য মুখে তোলার পর সবারই ভালো লেগেছে। সবকিছু এতটাই স্বাদের ছিল যে, সবাই হাত চেটে খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলেছে।

তারপর বিকেলে সবাই হইচই করে দলবেঁধে গ্রাম ঘুরে দেখেছে। গ্রামের প্রকৃতির ছোঁয়ায় সবার মন কেমন যেন সিক্ত হয়ে উঠল। খোলা আকাশ, গাছের পাতায় দোল খাওয়া বাতাস তাদের যেন কোন অজানায় নিয়ে গেছে! ছোটোদের লিডার হলো রাফাত। কারণ, সে এ গ্রামেই থাকে। তার সবকিছু চেনাজানা। তাই শহর থেকে আসা ভাই-বোনদের বিভিন্ন প্রশ্নবাণে জর্জরিতও হতে হচ্ছে তাকে। ওরও খুব ভালো লাগছে। কারণ, সবাই ওকে বেশ পাত্তা দিচ্ছে।  

সন্ধ্যার পর চাঁদের আলোয় উঠোনে মাদুর পেতে বসেছে সবাই। ছোটোরা একটা দলে। বড়োরা আরেকটা ভাগে গোল হয়ে বসে গল্প করছে। দাদিও সেখানে উপস্থিত। সবাইকে তিনি চোখভরে দেখছেন। তিনি হয়তো ভাবছেন, তাঁরও সময় শেষ হয়ে এসেছে। এমন করে হয়তো আর সবার একসঙ্গে দেখা হবে না। তাইতো তিনি সকলকে প্রাণভরে দেখে নিচ্ছেন। আর মনে মনে আল্লাহর কাছে দোয়া করছেন, ‘আল্লাহ! তুমি এদের সবাইকে এমনভাবে সারাজীবন মিলেমিশে থাকার তাওফিক দিয়ো। সবাইকে তুমি সহিসালামতে রেখো।’

ওদিকে ছোটোরা মেতেছে তাদের ঈদের পোশাক নিয়ে। বড়োরা সবাই সবার জন্য জামাকাপড় কিনেছেন। বাদ যায়নি কুলসুমও। এত এত জামাকাপড় পেয়ে সবার সে কী আনন্দ! 

এরই মধ্যে বড়ো চাচার পরামর্শে রাফাতের বাবা একটা নাদুসনুদুস গরু কিনে রেখেছেন। এই গরুটাই এবার আল্লাহর ওয়াস্তে কুরবানি দেওয়া হবে। এখন কেবল ঈদের দিনের অপেক্ষা।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ