জাফরানের সৌরভে সুবাসিত কাশ্মীর
বিশেষ রচনা সীমান্ত আকরাম সেপ্টেম্বর ২০২৪
পৃথিবীর ভূ-স্বর্গ কাশ্মীর। ভূ-স্বর্গ নামটা দিয়েছিলেন মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর। শৈশবে কাশ্মীরকে আপেলের দেশ মনে হতো। বাস্তবের কাশ্মীর একেক মৌসুমে একেক রূপের। শীতে শুভ্র বরফে আচ্ছাদিত, ফলের মৌসুমে রসালো আপেলের সমারোহ আর বসন্তে জাফরানসহ বাহারি ফুলে ঝলমল করে এই উপত্যকা। কাশ্মীরের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। জাফরান, আপেল, আখরোট, চেরি, নাশপাতি ও হস্তশিল্পই এখানকার অর্থনীতির চালিকাশক্তি আর সঙ্গে পর্যটন শিল্প। স্বপ্নের কাশ্মীর এখন আমার কাছে বাস্তব। শুভ্র-সতেজ আর হিমেল কাশ্মীর মনকে প্রফুল্ল করে তুলছে নিমিশেই। ঝিলাম নদী, ডাললেক, মুঘল গার্ডেন, হজরতবাল মসজিদ, কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়, জাফরান, স্বর্গীয় ফল আপেলের শহরে বুকভরে নিঃশ্বাস নিচ্ছি।
কাশ্মীরের সুইজারল্যান্ড খ্যাত পেহেলগাম যাওয়ার পথে পড়বে দক্ষিণ কাশ্মীরের পুলওয়ামা জেলা। এ জেলার পাম্পোরে কাশ্মীরের সবচেয়ে বেশি জাফরান জন্মায়। কাশ্মীরের প্রাণকেন্দ্র ডাললেক ক্ষেত শ্রীনগর শহর থেকে পাম্পোর জনপদের দূরত্ব প্রায় ১৪ কিলোমিটার। জাফরান চাষের জন্য এই শহর বিখ্যাত। শ্রীনগর থেকে আমাদের আজকের যাত্রা শুরু। ড্রাইভার মালিকের পাশের আসনে বসে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে বলতে চলে এলাম পুলওয়ামা জেলার পাম্পোরের লেথাপোরায়। যাত্রাপথে এঁকেবেঁকে চলা ঝিলাম নদী কোথাও কোথাও আপনার সঙ্গী হবে। হাইওয়ের পাশে লাইন ধরে পশরা বসেছে মসলার দোকান। প্রসিদ্ধ এক মসলার দোকানের সামনে আমাদের গাড়ি দাঁড়ালো। ড্রাইভার মালিক পাশের দোকান থেকে কাহওয়া চায়ের অর্ডার করলো। দারুণ জিনিস কাশ্মীরি কাহওয়া চা। জাফরান, কাঠবাদাম, মধু, এলাচ, দারুচিনি ইত্যাদি মেশানো খুবই সতেজ করা পানীয়। চায়ের সতেজতা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম জাফরান বাগানে। এখানকার কৃষি জমিতে যতদূর চোখ যায় শুধু বেগুনি রঙের জাফরান ফুলের সমারোহ। মূলত ফুলের ভেতরের কেশর বা পরাগই জাফরান।
পাম্পোর জনপদের জলবায়ু পরিস্থিতি এবং মাটি জাফরান উৎপাদনের জন্য আদর্শ স্থান। বিশেষ করে, শরৎকালে পাম্পোরের জাফরান জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়। পাম্পোর অঞ্চলে কাশ্মীরিদের বাড়ির সামনে ছোটো-বড়ো সবজি বা ফুলের কোনো না কোনো বাগান আছে। শুধুমাত্র জাফরান চাষ পাম্পোর শহরে বসবাসকারী প্রায় ৩০ হাজার পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে এই পরিবারগুলো জাফরান চাষের সাথে যুক্ত। অক্টোবর-নভেম্বর মাসে এই শহর সুন্দর বেগুনি ফুলে ভরে যায়। তবে এগুলো সাধারণ ফুল নয়। এই ফুলগুলি থেকেই আসে বিশ্বের সবচেয়ে দামি মসলা ‘জাফরান’। শরৎকালে যখন ফুল ফোটে তখন জাফরান কাটার সূক্ষ্ণ প্রক্রিয়াটি দেখতে দেশ এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এখানে আসেন। এ সময় জাফরানের বাগানগুলো প্রাণবন্ত বেগুনি ফুলে ভরে যায়। জাফরানের সুগন্ধিতে আকাশ-বাতাস সুবাসিত হয়ে ওঠে।
কাশ্মীরে জাফরান চাষের গোড়ার কথা নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে। জানা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে ফিনিসীয়রা নতুন কাশ্মীরি জাফরানের ব্যবসা শুরু করে বেশ লাভবান হয়। প্রধানত, রঙের কাজে ব্যবহৃত হয় জাফরান। অপরদিকে কাশ্মীরি লোককথা অনুযায়ী, দুই সুফি- খাজা মসুদ ওয়ালি ও হজরত শেখ শরিফুদ্দিন একাদশ বা দ্বাদশ শতাব্দীতে কাশ্মীরে এসে জাফরান চাষ ও ব্যবহার প্রচলিত করেছিলেন। দুই ভিনদেশি ব্যক্তিই অসুস্থ হয়ে পড়েন। এক উপজাতির নেতার কাছ থেকে জাফরানের বদলে ঔষধ গ্রহণ করে আরোগ্য লাভ করেন। পাম্পোর এলাকায় তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে একটি সোনালি স্তম্ভ নির্মিত আছে। তবে কাশ্মীরি কবি ও শিক্ষাবিদ মহম্মদ ইউসুফ-এর মতে, প্রায় দু’হাজার বছর ধরে জাফরানের ফসল ফলিয়ে আসছে কাশ্মীরিরা। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে এক ভারতীয় বৌদ্ধ সন্ন্যাসী কাশ্মীরে যাত্রা করেন। তিনিই কাশ্মীরি জাফরানের প্রথম শস্যদানাটি বপন করেন ও সেখান থেকেই ভারত উপমহাদেশে জাফরান বিস্তার লাভ করে। চাইনিজ চিকিৎসাবিদ ওয়ান জনে লিখেছেন, ‘জাফরানের মূল উৎসস্থল হলো কাশ্মীর। বুদ্ধদেবের পূজারীতির জন্য সেখানে এটি ফলানো হয়।’
জাফরান ফুল দেখতে যেমন আকর্ষণীয় তেমনি সুগন্ধি। প্রাকৃতিক কারণে জাফরান ফল তৈরি করতে পারে না। ফলে বংশ বিস্তারের জন্য মানুষের সাহায্য প্রয়োজন হয়। বীজ না হওয়ার কারণ হচ্ছে এই উদ্ভিদের দেহে কোনো মিয়োসিস কোষ বিভাজন হয় না। পুংরেণু আর স্ত্রী রেণু তৈরি হয় মিয়োসিস কোষ বিভাজন থেকে। যেহেতু এর দেহে মিয়োসিস বিভাজন হয় না সেহেতু পুং রেণু ও স্ত্রী রেণুও তৈরি হয় না বিধায় বীজও হয় না। চার বছর পর পর জাফরান উদ্ভিদের মূলে ক্রোম বা টিউব সৃষ্টি হয়। অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা খুব সাবধানে এটি সংগ্রহ করে রোপণ করে। দেখতে অনেকটা পেঁয়াজের মতো। রোপণের প্রথম বছর সাধারণত গাছে ফুল আসে না। একটি জাফরান গাছ পর পর তিন থেকে চার বছর ফুল দিয়ে থাকে। জাফরান ফুলে লাল বর্ণের তিনটি গর্ভদণ্ড থাকে। এই গর্ভদণ্ড সংগ্রহ করে শুকিয়ে জাফরান প্রস্তুত করা হয়। এক গ্রাম জাফরান পেতে প্রায় ১৫০টা ফুটন্ত ফুলের প্রয়োজন হয়। প্রতি কেজি জাফরানের মূল্য প্রায় তিন থেকে চার লাখ টাকা। কাশ্মীরের বিভিন্ন জায়গায় জাফরান চাষ হলেও, শুধু পুলওয়ামা উপত্যকাতে প্রতি বছর গড়ে ৬ থেকে ৮ হাজার কেজি উচ্চমানের জাফরান উৎপাদিত হয়। প্রায় সব ধরনের মাটিতেই জাফরান চাষ করা যায় তবে বেলে-দোআঁশ মাটি এ ফসলের জন্য বেশি উপযোগী। এঁটেল মাটিতে বিশ শতাংশ বালু ও চল্লিশ শতাংশ জৈব সার মিশিয়ে জাফরান চাষের উপযোগী করা যায়।
বর্তমানে কাশ্মীরে জাফরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন চাষিরা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হুমকির মুখে জাফরানের উৎপাদন। স্থানীয় এক জাফরান চাষির ভাষ্যমতে, ২০০৩ ও ২০০৪ সালে এক কানাল বা শূন্য দশমিক এক দুই একর জমি থেকে পাওয়া যেতো ১ কিলো জাফরান। বর্তমানে ১ কিলো জাফরান পেতে প্রয়োজন ১৫ কানাল জমি। অর্থাৎ কৃষি জমির পরিমাণ বাড়লেও কমেছে উৎপাদিত জাফরানের পরিমাণ। এতে চিন্তার ভাঁজ চাষিদের কপালে। জাফরানের উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে ১৩ বছর ধরে কাজ করছেন শ্রীনগরে অবস্থিত ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ইন্টিগ্রেটিভ মেডিসিনের গবেষকরা। তারা বলছেন, উচ্চ মানের রোপণের উপাদানের অভাব, কম-রট রোগ ও সেচব্যবস্থার অভাবই জাফরানের উৎপাদন কমার জন্য দায়ী। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো জলবায়ু পরিবর্তন অর্থাৎ খরা ও অসময়ে বৃষ্টি।
অনেকেই মনে করেন জাফরান শুধুমাত্র খাদ্যের রং ও সুগন্ধি তৈরিতে ভূমিকা রাখে। বিরিয়ানি, কোরমা এবং মিষ্টি জাতীয় অনেক খাবারে জাফরানের ব্যবহার বাড়তি মাত্রা যোগ করে। একইসাথে রূপ চর্চায় জাফরানের বহুল ব্যবহার রয়েছে। তবে এর পাশাপাশি জাফরানের রয়েছে স্বাস্থ্য উপকারিতা। প্রাচীনকাল থেকেই জাফরানের নির্যাস বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধানে ব্যবহার হয়ে আসছে। জাফরান গ্যাস্ট্রিক, উচ্চ রক্তচাপ, হৃৎপিণ্ডের সমস্যা দূর করে এবং খাদ্য হজমে সহায়তা করে থাকে। পরিমাণমত জাফরান নিয়মিত খেলে ফুসফুসের বিভিন্ন রোগ দূর হয়ে যায়। অনিদ্রা দূর করে এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায় জাফরান। যে-কোনো ধরনের ব্যথা নিরাময়ে জাফরান অত্যন্ত কার্যকর। স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তি বৃদ্ধিতেও এটি বেশ সহায়ক।
নয়নাভিরাম রূপের রানী কাশ্মীর যে কত রূপে ধরা দেবে তা আপনার কল্পনাতীত। প্রতিটি রূপই ভিন্ন ভিন্নভাবে বিমোহিত করে পর্যটকদের। কাশ্মীরের মানুষের কৃষ্টি-কালচার, আচার-ব্যবহার যারপরনাই মুগ্ধ করবে যে কাউকে। সে সাথে কাশ্মীরের মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সৌরভ আপনার মনকে সুবাসিত করবে। জীবনে একবার হলেও ঘুরে আসুন পৃথিবীর স্বর্গরাজ্য কাশ্মীরে। দেখে আসুন আল্লাহর অপরূপ সৃষ্টির অনিন্দ্য সৌন্দর্য।
আরও পড়ুন...