তিন দুরন্ত মিশন জঙ্গলবাড়ি
রহস্যভেদ রবিউল ইসলাম নভেম্বর ২০২৪
স্কুলের নাম ধুলিয়াপুর বালক উচ্চবিদ্যালয়। দু’টি দ্বিতল ভবন। সামনে বিশাল খেলার মাঠ। মাঠের ওপাশে আবার ঘন বন। স্কুলটি ওই বনের কোল ঘেঁষে অবস্থিত। রাকিব, শাইক ও সাব্বির। ধুলিয়াপুর স্কুলের সেরা তিন ছাত্র। এক ক্লাসেই পড়ে ওরা। এবার অষ্টম শ্রেণিতে উঠেছে। তিনজনের আবার ভারি মিল। বলা যায় গলায় গলায় মিল। ক্লাসের রোলও এক, দুই, তিন। স্কুলে সবাই ডাকে তিন দুরন্ত। বলবে না কেন? শুধু কি পড়ালেখা- আদব-কায়দা সবকিছুতে ওরা এগিয়ে। রাস্তায় স্যারের সঙ্গে দেখা হলে সাইকেল থেকে নামা। খেলার সময় আজান হলে খেলা বন্ধ রেখে নামাজে যাওয়া। বড়োদের সঙ্গে দেখা হলে সালাম দেওয়া। সব গুণই আছে ত্রিরত্নের।
সেদিন বিকেলে বাজারে গেছে তিন দুরন্ত। বাজারে আবার চেয়ারম্যানের একটি দোকান আছে। ঘটনা ঘটলো ওই দোকানে। ওরা দেখলো স্কুলের কিছু ছেলে সেখানে মারপিট করছে। তাও আবার চেয়ারম্যানের ছেলের সঙ্গে। ওরা তিনজন এগিয়ে গেল। সবাইকে থামানোর চেষ্টা করলো। এতে চেয়ারম্যানের ছেলে খুব ক্ষেপে যায়। সে রাকিবের পিঠ বরাবর ঘুষি মারলো। রাকিব রাস্তার ওপর পড়ে গেল। তারপর সাকিব ও সাব্বির চেয়ারম্যানের ছেলেকে জাপটে ধরে। কিন্তু ওকে মারলো না। একসময় সেখানে অনেক ভিড় জমে। চেয়ারম্যানের ছেলে পালিয়ে যায়। কিন্তু যাওয়ার আগে বলে গেল, ‘তোদের দেখে নেবো।’
রাকিবকে ডাক্তারের কাছে নেওয়া হয়েছে। সামান্য ব্যথার ঔষধ দিয়েছেন তিনি। বলেছেন এতেই ঠিক হয়ে যাবে।
মাগরিবের আজান হচ্ছে। তিন বন্ধু পাশের মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করলো। নামাজ শেষে হাঁটতে হাঁটতে স্কুলের মাঠের দিকে যাচ্ছে। সেখানে পৌঁছে মাঠের এক কোণায় বসে গল্প করতে শুরু করে। এভাবে অনেকটা সময় পেরিয়ে গেল।
রাত গভীর হচ্ছে। দূর থেকে এশার আজান ভেসে আসে। ওরা নামাজ পড়েই বাড়িতে ফেরার পরিকল্পনা করে। তিন বন্ধু উঠে দাঁড়ালো। তখন শাইকের দৃষ্টি গেল বনের দিকে। ওর মনে হলো, দেখলো বনের মধ্যে কেউ ঢুকছে। সঙ্গে সঙ্গে রাকিব ও সাব্বিরকে ডেকে বললো, ‘আমার মনে হয়, বনের মধ্যে কারা ঢুকেছে।’
শাইকের কথা শুনে ওরাও সেদিকে তাকালো। কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। রাকিব বললো, ‘ওসব তোর মনের ভুল। এই রাতে বনের মধ্যে কারা যাবে। খেয়ে কাজ নেই কারো।’
ওরা দু’জন শাইকের কথাকে পাত্তাই দিলো না। সাব্বির বললো, ‘জামায়াতের সময় হয়ে যাচ্ছে। আগে চল নামাজটা শেষ করি।’
দুই.
পড়ার টেবিলে বসে আছে শাইক। কিন্তু কিছুতেই পড়ায় মন বসছে না। ও ঠিকই দেখেছে বনের মধ্যে কেউ ঢুকেছে। কিন্তু সাব্বির আর রাকিব ওর কথাকে পাত্তাই দিলো না! একটু অভিমান হলো ওদের ওপর। তখন আম্মু এসে বললো, ‘কী ব্যাপার শাইক, পড়া বাদ দিয়ে কী চিন্তা করছো?’
‘না তেমন কিছু না,’ বললো শাইক। শাইক হোমওয়ার্ক করতে শুরু করে। বনের ব্যাপারটা পরে দেখা যাবে। পড়া শেষ করে রাতের খাবার খেলো শাইক। তারপর কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
সকাল হয়েছে। চারদিকে পাখি ডাকছে। জানালার ফাঁক দিয়ে ভোরের সূর্যের নরম রোদ এসে পড়ছে শাইকের কপালে। ও দ্রুত উঠলো। তারপর দাঁত ব্রাশ করলো। এবার সকালের নাশতা খেয়ে স্কুলব্যাগটা ঘাড়ে নিলো। তারপর সাইকেলটা নিয়ে স্কুলের দিকে যাচ্ছে।
শাইক স্কুলে গিয়ে দেখে সেখানে অনেক ভিড়। স্কুলের গেইটে পুলিশের গাড়ি। সাব্বির ও রাকিব সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। পুলিশ হেড স্যারের সঙ্গে কথা বলছে। হেডস্যার মাথা চুলকাচ্ছেন আর উত্তর দিচ্ছেন। দূর থেকেও বোঝা যাচ্ছে হেডস্যার বেশ চিন্তিত। শাইক সাইকেলটা বটগাছের পাশে রাখলো। তারপর রাকিব ও সাব্বিরের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়।
‘এখানে কী হয়েছে রে?’ জানতে চাইলো শাইক। তখন রাকিব বললো, ‘গত রাতে স্কুলের মাঠের কোনায় খুন হয়েছে। পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করেছে।’
‘আচ্ছা, কে খুন হয়েছেন,’ আবার জানতে চাইলো শাইক। এবার সাব্বির বললো, ‘এখনো তার নাম-পরিচয় জানা যায়নি। মনে হয় এই গ্রামের কেউ না। পুলিশ ধারণা করছে শহরের কেউ হবে।’
একটু পর পুলিশ লাশ নিয়ে চলে গেল। হেডস্যারকে বলে গেছে, স্কুলের সবাইকে সাবধানে থাকতে। সেদিন স্কুল হলো। কিন্তু একটি ক্লাস পরেই ছুটি হয়ে গেল স্কুল। সব স্যারদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে।
স্কুল থেকে একসঙ্গে ফিরছে রাকিব, সাব্বির ও শাইক। ওরা সাইকেল রেখে এক জায়গায় বসলো। শাইক বললো, ‘আমি কিন্তু কাল ওদিকে কাউকে যেতে দেখেছিলাম। তোরা তো বিশ্বাসই করলি না।’
‘তোর কি মনে হয়, তুই যদি সত্যি কিছু দেখে থাকিস- তার সঙ্গে এই ঘটনার কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে?’ বললো রাকিব।
শাইক বেশ জোরেই বললো, ‘অবশ্যই থাকতে পারে।’
‘আচ্ছা তোরা তর্ক বাদ দে তো। আমরা বরং আজ রাতে ওদিকে খেয়াল রাখবো। দেখি কিছু চোখে পড়ে কি না।’ বললো সাব্বির।
‘হ্যাঁ, সেটাই ভালো হবে।’ বলে উঠলো শাইক। ‘ঠিক আছে, আজ বিকেলে তাহলে কোনো খেলা হবে না। আসরের নামাজ শেষ করেই আমরা এদিকে চলে আসবো।’ বললো রাকিব।
তিন বন্ধু তাতে সায় দিয়ে বাড়ির দিকে সাইকেল চালানো শুরু করে।
রাকিবকে আজ দ্রুত বাড়িতে ফিরতে দেখ ওর আব্বু জানতে চাইলো, ‘কী ব্যাপার, আজ তুমি এত আগে বাড়িতে এলে যে। স্কুলে ফাঁকি দাওনি তো?’
‘না আব্বু, আমাদের স্কুলের মাঠে একটা খুন হয়েছে। তাই স্কুল আগেই ছুটি হয়ে গেছে।’
এ কথা শুনে রাকিবের আব্বু যেন চমকে উঠলেন, ‘বলো কী, এ গ্রামে খুনটুনতো হয় না! তা কাকে খুন করা হয়েছে।’
‘এখনো পরিচয় জানা যায়নি।’
‘তোমরা সাবধানে থাকবে, কোনো রকম ঝামেলাতে জড়াবে না।’ বলেই রাকিবের আব্বু বাইরে গেলেন।
সাব্বিরের বাসাতেও একই ঘটনা। ও অবশ্য মামাবাড়িতে থাকে। বাবা-মা দু’জনেই অস্ট্রেলিয়া থাকেন। মামা বললেন, ‘তুমি আগে ফিরলে যে?’
‘কেন মামা, তুমি শোননি, স্কুলের মাঠে একজন খুন হয়েছে?’
এ কথায় সাব্বিরের মামা যেন আকাশ থেকে পড়লেন, ‘কী বলছ তুমি? এই গ্রামে খুন!’
অবশ্য শাইকের আম্মু ওকে কোনো প্রশ্ন করলো না। ওরা দুপুরের খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নিলো। তারপর আসরের একটু আগে বের হলো। আজ আর কেউ সাইকেল নিয়ে বের হলো না। বাজারে একটি মসজিদে নামাজ পড়ে স্কুলের মাঠের দিকে গেল। সেখানে অবশ্য একটু গা ঢাকা দিয়ে ওরা পায়চারি করছে, যদি সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়ে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। তখনো সন্দেহজনক কিছু ওদের চোখে পড়লো না। মাগরিবের আজান হলো। ওরা মসজিদে গেল। নামাজ পড়ে এসে মাঠের এক কোনায় বসলো। এমনভাবে বসলো যেন কেউ ওদের দেখতে না পায়। একটু পরে দেখা গেল, ওদেরই স্কুলের দশম শ্রেণির এক ছাত্র বনের ওদিক দিয়ে বের হয়েছে। তারপর রাস্তা ধরে বাজারের দিকে গেল। ওরা তিনজন তাকে অনুসরণ না করে বনের দিকে গেল।
খুব সাবধানে ওরা বনের মধ্যে ঢুকলো। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। তাই কোনোকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু খুব বেশি ভেতরে ঢুকলো না তিন দুরন্ত। তারপর পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। ওরা তিনজন চুপ করে দাঁড়িয়ে গেল। আওয়াজ শুনে বোঝা যাচ্ছে, কয়েকজন আসছে। ধীরে ধীরে সেই আওয়াজ আরও কাছে চলে এলো। রাকিব, সাব্বির ও শাইক নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। তখন দু’জন ওদের পাশ কাটিয়ে স্কুলের মাঠের দিকে গেল। তারা কী সব কথা যেন বলছিল। একটি কথা তিনজনই স্পষ্ট শুনতে পেল, ‘আমার আব্বু এবারের চালান ফুল করে দেবে।’
কণ্ঠটা খুব পরিচিত ওদের। খুব সম্প্রতি এই কণ্ঠ শুনেছে ওরা। তিন দুরন্ত ধীরে ধীরে বনের বাইরে বেরিয়ে এলো। তারপর নিজেদের মধ্যে আলোচনা করলো, কার কণ্ঠ হতে পারে। আর কীসের চালানের কথাই বা বললো তারা। তখন সাব্বির চিৎকার করে বললো, ‘আমি চিনতে পেরেছি। এই কণ্ঠ আমি চিনতে পেরেছি।’
রাকিব বললো, ‘তাহলে বলছিস না কেন?’
‘হ্যাঁ দ্রুত বল।’ বললো শাইক।
সাব্বির বললো, ‘এটা চেয়ারম্যানের ছেলের কণ্ঠ। ওই দিন বাজারে ও আমাদের বলেছিল, তোদের দেখে নেবো। এটা সেই কণ্ঠ।’
সঙ্গে সঙ্গে শাইক বললো, ‘হ্যাঁ আমারও মনে পড়েছে, এটা চেয়ারম্যানের ছেলে হবে।’
রাকিব বললো, ‘কিন্তু, চেয়ারম্যানের ছেলে এখানে কী করতে এসেছে। আর কীসের চালানের কথা বলছে?’
সাব্বির বললো, ‘এটাই রহস্য। হয়তো খুনের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে।’
শাইক বললো, ‘তুইতো দেখি গোয়েন্দাদের মতো কথা বলছিস।’
‘যদি আমার ধারণা সত্যি হয়, এই রহস্য আমরা সমাধান করবো ইনশাআল্লাহ।’ সাব্বির বললো।তিন.
স্কুলে এসেছে তিন বন্ধু। কিন্তু আজও স্কুলে কোনো আনন্দ নেই। কাল সন্ধ্যার পর থেকে দশম শ্রেণির এক ছাত্রকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ওই ছাত্রের নাম ইকবাল। ইকবালের বাবা-মা স্কুলে এসে খুব কান্না করছে। থানায় জিডি করা হয়েছে। কিন্তু পুলিশ এখনো কোনো খোঁজ দিতে পারেনি।
রাকিব, সাব্বির ও শাইক হেডস্যারের রুমের দিকে যায়। ওরা রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। তখন হেড স্যার বললেন, ‘তোমরা ভেতরে এসো।’
স্যারের অনুমতি পেয়ে ভেতরে ঢোকে তিন দুরন্ত। শাইক গিয়েই সালাম দিলো। সালামের উত্তর দিলেন স্যার, ‘তোমরা কিছু বলবে?’
সাব্বির বললো, ‘স্যার, ইকবাল ভাইকে আমরা কাল সন্ধ্যার পর স্কুলের পাশের রাস্তায় দেখেছিলাম।’
‘কী বলছো, সে এখানে কী করছিল? আর গেলই বা কোথায়?’
রাকিব বললো, ‘স্যার ইকবাল ভাই ওই বনের মধ্যে থেকে বের হয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে বাজারের দিকে যাচ্ছিল।’
তখনই কাঁদতে কাঁদতে আতিকের বাবা ঢুকলেন হেডস্যারের রুমে। আতিকও এই স্কুলে দশম শ্রেণিতে পড়ে। আতিকের বাবা বললেন, ‘স্যার, আমার ছেলেটাকে রাত থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সব জায়গায় খোঁজ নিয়েছি। কিন্তু কোথাও নেই। পুলিশও কোনো খোঁজ দিতে পারছে না।’
স্যার উঠে দাঁড়ালেন। তিনি বুঝতে পারছেন না চারিদিকে এসব কী হচ্ছে। আফসোস করে বললেন, ‘হঠাৎ কী শুরু হলো আমার স্কুলে।’ তারপর আতিকের বাবাকে বললেন, ‘আপনি বাড়িতে যান, আমি দেখছি কী করা যায়।’
তখন রাকিব বললো, ‘আমরা মনে হয় এ ব্যাপারে আমরা আপনাকে সাহায্য করতে পারবো।’
‘কীভাবে সাহায্য করবে শুনি?’
সাব্বির বললো, ‘স্যার আমরা হয়তো আতিক ও ইকবাল ভাইকে খুঁজে বের করতে পারবো।’
‘তোমরা সত্যি পারবে?’
তিন বন্ধু তখন একসঙ্গে বললো, ‘ইনশাআল্লাহ পারবো স্যার। আপনি শুধু আমাদের জন্য দোয়া করবেন।’
‘দোয়া আমি অবশ্যই করবো। কিন্তু তোমরা তো বিপদে পড়তে পারো। এটা কিন্তু সহজ হবে না। তাছাড়া তোমাদের হাতে কোনো ক্লু নেই।’
ওরা একটা ক্লু পেয়েছে। আপাতত সেটা ফাঁস করলো না। সাব্বির বললো, ‘আপাতত কয়েকদিন স্কুল বন্ধ রাখুন স্যার।’
‘আমিও সেটাই ভাবছি।’ বললেন হেডস্যার।
ধুলিয়াপুর স্কুলে এক সপ্তাহের ছুটির নোটিশ দেওয়া হলো। জানানো হলো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার স্কুল খোলা হবে। এই মুহূর্তে পুরো গ্রামে যেন এক ধরনের আতঙ্ক নেমে এলো। বাজারে এখন আর মানুষ তেমন আসে না। যারা আসে সন্ধ্যার আগেই ঘরে ফিরে যায়। এখনো সেই খুনের কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি পুলিশ। আতিক ও ইকবালকে খুঁজে বের করতে পারেনি।
রাকিব, শাইক ও সাব্বির ভাবছে কী করা যায়। ওদের ধারণা ওই বনের মধ্যে কোনো একটা রহস্য লুকিয়ে আছে।চার.
দেখতে দেখতে দু’দিন পেরিয়ে গেল, কিন্তু আতিক ও ইকবালের কোনো খোঁজ দিতে পারেনি পুলিশ। আজ বিকেলে তিনি দুরন্ত দেখা করবে। একবার থানায় গিয়ে খোঁজ-খবর নেবে।
কথামতো তিন বন্ধু বিকেলে জড়ো হলো। তারপর হাঁটতে হাঁটতে থানায় গেল। সেখানে গিয়ে দারোগাকে সালাম দিলো। দারোগা সালামের জবাব দিয়ে জানতে চাইলো, ‘কী চাই তোমাদের?’
সাব্বির বললো, ‘আমরা আসলে ইকবাল ও আতিক ভাইয়ের খোঁজ নিতে এসেছি।’
‘তাদের খোঁজ নিয়ে তোমরা কী করবে?’
রাবিক বললো, ‘দু’দিন তো হয়ে গেল, আমরা কেবল আপডেট জানতে চাচ্ছিলাম।’
দারোগা মুখ উঁচু করলো। তারপর পানের পিকটা ডাস্টবিনে ফেললো। আবার একটি পান মুখে ভরলো। মুখটা নিচু করে খাতার দিকে তাকালো, ‘কোনো আপডেট নেই। আর এগুলো বড়োদের বিষয়। তোমাদের মাথা না ঘামালেও চলবে। খামোখা নিজেরা কেন বিপদে পড়তে যাবে?’
ওরা তিন জন সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। দারোগা আবার মুখ তুলে তাকালেন। তারপর নাকের ওপর আঙুল দিয়ে চশমাটা ওপরের দিকে তুলে দিয়ে বললেন, ‘তোমরা এখন এখান থেকে যাও, আমার কাজে বিরক্ত করো না। কোনো আপডেট থাকলে আমরা গিয়ে ওদের বাড়িতে জানিয়ে আসবো।’
তিন বন্ধু হতাশ হয়ে থানা থেকে বের হলো। ওরা স্কুলের মাঠের দিকে হাঁটতে শুরু করে। একটু পরেই আসরের আজান হলো। পাশের মসজিদে ঢুকে ওজু করে নামাজ আদায় করে নিলো। নামাজ শেষে স্কুলের মাঠের কোনায় বসলো।
আসরের নামাজের পর সিদ্ধান্ত নিয়েছে মাগরিব ও এশার নামাজ মাঠে পড়বে। তারপর বনের মধ্যে ঢুকবে।
মাঠের পাশের রাস্তা দিয়ে নানারকম মানুষ যাচ্ছে। কেউ সাইকেলে যাচ্ছে, কেউ বাইকে যাচ্ছে, আবার কেউ প্রাইভেট কারে যাচ্ছে। স্কুলের গেইটের সামনে বিশাল বটগাছ। সেই বটগাছের নিচে একজন অচেনা মানুষ ঘুরঘুর করছে। রাকিবরা তাকে অনুসরণ করছে। এই লোকটাকে ওরা আগে কখনো এই এলাকায় দেখেনি। সূর্য ডুবু ডুবু ভাব। তখনই বটগাছের নিচে একটি বাইক এসে দাঁড়ালো। সেই বাইক থেকে নামলো চেয়ারম্যানের ছেলে। চেয়ারম্যানের ছেলের নাম বলা হয়নি। ওর নাম বল্টু। লেখাপড়া কিছু করে না। বাবার ব্যবসা দেখে। আর মারপিট করে বেড়ায়। অনেকে ওকে আঙুল কাটা বল্টু বলেও ডাকে। একবার ফুটবল খেলতে গিয়ে বিরাট মারামারি। তখন বল্টুর একটি আঙুল কেটে যায়। তখন থেকেই নাম হয়েছে আঙুল কাটা বল্টু। অবশ্য এসব নাম নিয়ে ওর কোনো আগ্রহ নেই।
বল্টু বাইকে থেকে নেমে ওই লোকটার সঙ্গে অনেক সময় কথা বললো। তারপর লোকটাকে বাইকে তুলে আবার বাজারের দিকে চলে গেল। একটু পরেই আজান হলো। স্কুলের মাঠেই নামাজ আদায় করলো রাকিব, সাব্বির ও শাইক।
নামাজ শেষ করে সেখানেই বসে আছে। কিন্তু কোনো সন্দেহজনক কিছুই চোখে পড়ছে না। বিকেলে যতটুকু পড়েছিল ততটুকুই। একটু একটু করে রাত গভীর হচ্ছে।
রাকিব বললো, ‘এভাবে আর কত সময় বসে থাকবি? কোনো কিছুই তো নজরে আসছে না।’
সাব্বির বললো, ‘এটুকুতেই এত ধৈর্যহারা কেন হচ্ছিস?’
‘তোরা বরং এখানে থাক আমি একটু বনের ওদিকটায় ঢু মেরে আসি। যদি কিছু চোখে পড়ে।’ বনের দিকে হাঁটতে শুরু করে শাইক।
রাকিব, সাব্বির ওকে বাধা দিলো না। শাইক প্রায় বনের কাছে চলে এসেছে। এখান থেকে বেড়াটা পার হলেই ঘন জঙ্গল শুরু। একবার ভাবলো বনের মধ্যে ঢুকবে। কিন্তু কী ভেবে আবার পিছিয়ে এলো। ও ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না কী করবে? ওদিকে মাঠে সাব্বির ও রাকিব বসে আছে।
আবার কী ভেবে শাইক বেড়া পার হলো। তারপর বনের মধ্যে পা দিলো। ঘন জঙ্গল, চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। শাইক একটু একটু করে বেশ কিছু দূর চলে গেল। হঠাৎ ওর মনে হলো, ও অনেক দূর চলে এসেছে। আর ভেতরে যাওয়া ঠিক হবে না। ও পেছন দিকে ঘুরলো। তারপর মনে হলো, ওর পেছন থেকে কোনো ছায়ামূর্তি সরে গেল। এই অন্ধকারেও ও স্পষ্ট দেখেছে কোনো একটা ছায়ামূর্তি সরে গেছে।
শাইক ভয় পেয়ে গেল। এখানে আর এক মুহূর্ত থাকা উচিত হবে না। ও হাঁটতে থাকে। উদ্ভ্রান্তের মতো হাঁটছে। অনেকক্ষণ হাঁটলো। কিন্তু স্কুলের সীমানা খুঁজে পেল না। শাইক ক্লান্ত, আর যেন পা চলছে না। যেদিকেই পা দিচ্ছে গাছ আর গাছ। লতাপাতায় পেঁচিয়ে আছে গাছ। শাইক বুঝতে পারছে ও পথ হারিয়ে ফেলেছে। ও নিজেও জানে না এখন বনের কোথায় আছে! শাইক বারবার আল্লাহ তায়ালাকে স্মরণ করতে থাকে।
ক্লান্ত, অবসন্ন শাইক ধপাস করে বসে পড়ে। হয়তো কোনো গাছের গুঁড়িতে বসেছে। অন্ধকারে কয়েকবার হাতড়ে বোঝার চেষ্টা করলো কোথায় বসেছে। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারে না। একটু ঝিমুনি চলে এসেছিল শাইকের। তখনই ঘটলো ভয়ংকর এক ঘটনা। কোনো একটি প্রাণী দৌড়ে এলো শাইকের দিকে। এই অন্ধকারে শাইককে কীভাবে দেখলো সেটাই অবাক করা ঘটনা। সেই প্রাণীটি দেখতে অদ্ভুত! হাতির মতো বড়ো বড়ো কান। কিন্তু হাতির মতো শুঁড় নেই। চোখ দুটো ভয়ংকর লাল। চোখ দিয়ে যেন আগুন বের হচ্ছে। শাইকের দিকে এগিয়ে আসছে প্রাণীটি। শাইক কী করবে বুঝতে পারছে না। আর মাত্র কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে সেই ভয়াবহ প্রাণী! কী করবে শাইক এখন? এই প্রাণীর হাত থেকে কীভাবে বাঁচাবে নিজেকে?(চলবে)
আরও পড়ুন...