নতুন সভ্যতা

সাইন্স ফিকশন আল মুহাইমিন মাহী নভেম্বর ২০২৪

তড়িঘড়ি করে প্রধান অফিসকক্ষের দিকে ছুটছেন বিজ্ঞানী আহমেদ আবদুল্লাহ। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠেছে। দরজার সামনে এসে রেটিনা স্ক্যান করতেই দরজা একপাশে সরে গেল। ভেতরে ঢুকতেই রুমে থাকা বিশাল সাইজের স্ক্রিনে চোখ আটকে গেল তার। স্ক্রিনের এক কোণে একটি স্পেসশিপের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তিনি তাকালেন সহকারী ওমর ফাইয়াজের দিকে।

‘স্যার, স্পেসশিপটিকে পৃথিবী থেকেই পাঠানো হয়েছে।’ ভীত কণ্ঠ ওমর ফাইয়াজের।

‘তারা আবারও আমাদের খোঁজে অভিযান চালাচ্ছে। তারা মানবজাতিকে ধ্বংস না করে ক্ষান্ত হবে না মনে হয়।’

‘স্যার, গতি দেখে বোঝা যাচ্ছে এবারের স্পেসশিপটি অনেক পাওয়ারফুল।’

‘তারা আমাদের থেকে কতটুকু দূরে আছে?’ বিজ্ঞানী জন মেথিউসের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন আহমেদ আবদুল্লাহ।

‘স্যার, তারা বর্তমানে ২ আলোকবর্ষ দূরে আছে। তাদের বেগ অনুযায়ী আমরা ঘণ্টা পাঁচেকের মধ্যে তাদের রাডারের মধ্যে চলে আসবো।’

‘ফাইয়াজ, আমাদের প্রতিরক্ষা বিভাগকে নির্দেশনা দাও  SHIELD-77- কে তাড়াতাড়ি অ্যাক্টিভ করতে। তাছাড়া আমাদের সুপারসনিক ডিফেন্স স্পেসশিপগুলোকেও প্রস্তুত থাকতে বলো যেন কোনোভাবে যদি আমরা তাদের রাডারে ধরা পড়ে যাই তাহলে আমাদের তথ্য নিয়ে ফিরে যাওয়ার পূর্বেই তাদের ধ্বংস করে দিতে হবে।’

‘স্যার  SHIELD-77-কে অলরেডি অ্যাক্টিভ করে দিয়েছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের গ্রহ শিল্ডগুলো দিয়ে ঢেকে যাবে। আর স্পেসশিপগুলোকে প্রস্তুত থাকার জন্য এখনই নির্দেশ দিচ্ছি।’

‘আর গ্রহের সবাইকে অ্যালার্ট করো প্রস্তুত থাকার জন্য।’ 

‘ওকে স্যার।’ জবাব দিয়ে ওমর ফাইয়াজ দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন।

কিছুক্ষণ পর ক্লাটোস গ্রহের নিরাপত্তার জন্য বিজ্ঞানী আহমেদ আবদুল্লাহর তৈরি বিশেষ ডিফেন্স সিস্টেম SHIELD-77 পুরো গ্রহটিকে ঢেকে ফেলে। এই সিস্টেমের ফলে বাইরে থেকে শিল্ডগুলোকে গ্রহের পৃষ্ঠ মনে হবে আবার ভেতর থেকে কোনো ধরনের রেডিয়েশন বাইরে যাবে না। ফলে বাইরের কোনো রাডারে গ্রহটিতে মানুষের উপস্থিতি ধরা পড়বে না। 

ক্লাটোস গ্রহে উপস্থিত মানুষকে ধেয়ে আসা বিপদ থেকে রক্ষার জন্য আহমেদ আবদুল্লাহ এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীরা অও স্পেসশিপ এবং গ্রহের সার্বিক পরিস্থিতি তদারকি করছেন এবং প্রতিরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করছেন। সবার কপালেই বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠেছে। ইতোমধ্যে পুরো গ্রহে খবরটি ছড়িয়ে পড়েছে এবং গ্রহের বিভিন্ন স্থানে থাকা স্পেশাল মনিটরে পরিস্থিতি দেখানো হচ্ছে। ক্লাটোস গ্রহের সমস্ত কার্যক্রম এই মুহূর্তে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে এবং সবাই গভীর উৎকণ্ঠার সাথে মনিটরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। অও স্পেসশিপটি একদম নিকটবর্তী এসে গেছে। আর মাত্র ২০ মিনিট এদিকে আসলেই তারা ক্লাটোসে পৌঁছে যাবে। ওমর ফাইয়াজ রুমে প্রবেশ করেই আহমেদ আবদুল্লাহর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘স্যার, আমাদের ডিফেন্স স্পেসশিপগুলো প্রস্তুত হয়ে আছে। অনুমতি পেলে আক্রমণে যাবে।’

‘না ফাইয়াজ, এখনো সে সময় আসেনি। মাত্র একটি স্পেসশিপ। ইতোমধ্যে আমরা তাদের রাডারের সীমানায় ঢুকে পড়েছি। যদি তাদের রাডার আমাদের ট্র্যাক করতে পারে তাহলে তারা আমাদের লোকেশন জেনে নিয়ে ফিরে যাবে এবং তাদের বাহিনী নিয়ে এসে হামলা করবে। তারা একটি মাত্র স্পেসশিপ নিয়ে আমাদের হামলা করবে না।’

‘কিন্তু স্যার, যদি তারা আমাদের লোকেশন জেনে পৃথিবীতে খবর পাঠিয়ে দেয় এবং এখন এই একটি স্পেসশিপই আমাদের ওপর হামলা করে তাহলে কী হবে?’

‘এ রকম হতে পারে। সেক্ষেত্রে আমরা স্পেসশিপটিকে প্রতিহত করবো। তবে আমরা আগ বাড়িয়ে কিছুই করবো না, কারণ আমরা যদি তাদের রাডারে ধরা না পড়ি এবং স্পেসশিপটিকে ধ্বংস করে দেই তাহলে পৃথিবীতে থাকা অও শিউর হয়ে যাবে যে আমরা আশপাশেই কোথাও রয়েছি। যার ফলাফল হবে মানবজাতির বিলুপ্তি।’

‘স্যার স্পেসশিপটি একদম কাছে চলে এসেছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই এখানে চলে আসবে।’

‘তুমি অপারেশন কক্ষে যাও। প্রয়োজন হলে আমি নির্দেশ দেওয়া মাত্রই হামলা করবে।’

মুহূর্তেই ওমর ফাইয়াজ রুম থেকে বেরিয়ে গেল। বিজ্ঞানী আহমেদ আবদুল্লাহ ওয়্যারলেস হাতে নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কারো মুখে কোনো কথা নেই। সমস্ত ক্লাটোসবাসী এখন এক দৃষ্টিতে স্পেসশিপটির দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের মনে ভয় ও শঙ্কা, মানবজাতি কি ধ্বংসের পথে? সবাই স্ক্রিনে একদৃষ্টিতে দেখছেন। আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড পর স্পেসশিপটি পৌঁছে যাবে। আর মাত্র ৫ সেকেন্ড, ৪,৩,২,১...।’

সাথে সাথে ক্লাটোসবাসীকে অবাক করে দিয়ে স্পেসশিপটি ক্লাটোসের পাশ দিয়ে সমান বেগে চলে গেল। অর্থাৎ AI স্পেসশিপটির রাডার ক্লাটোসে উপস্থিত মানুষদের শনাক্ত করতে পারেনি। সাথে সাথে ক্লাটোসবাসী আনন্দে চিৎকার করে উঠলো। খুশিতে সবাই একে অপরকে জড়িয়ে ধরলো। আবারও মানবজাতি বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পেল। এ সবই সম্ভব হয়েছে আহমেদ আবদুল্লাহর তৈরি ডিফেন্স সিস্টেম  SHIELD-77-এর ফলে। সবাই আহমেদ আবদুল্লাহর নামে স্লোগান শুরু করে দিয়েছে। আর এদিকে বিজ্ঞানী আহমেদ আবদুল্লাহ বিপদমুক্তির পরপরই অশ্রুসিক্ত নয়নে রবের সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন। তাঁরই সৃষ্টি আশরাফুল মাখলুকাত আবারও বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ায় কেঁদে শুকরিয়া জানালেন মহান মাবুদকে।

২.

ফজরের নামাজের পর ঘণ্টাখানেক অর্থসহ কুরআন অধ্যয়ন করলেন বিজ্ঞানী আহমেদ আবদুল্লাহ। তারপর ব্যক্তিগত লাইব্রেরি থেকে একটি বই নিয়ে ড্রইংরুমে বসে পড়তে লাগলেন। পৃথিবীতে থাকতে কাগজে মুদ্রিত বই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। মানুষ কাগজের ব্যবহার বাদ দিয়ে সবকিছুই ইলেকট্রনিক ডিভাইস দিয়ে করছিল। বইগুলোও ছিল পিডিএফ আকারে। পৃথিবী থেকে ক্লাটোসে আসার পর আহমেদ আবদুল্লাহ নতুনভাবে ছাপাখানা তৈরি করে কাগজের ব্যবহার শুরু করেন।

হঠাৎ ড্রয়িংরুমে উঁকি দিয়ে বাবার পাশে সোফায় গিয়ে বসলো আহমেদ আবদুল্লাহর ১৩ বছর বয়সি মেয়ে সাবাহ মুনতাহা। সে-ও প্রচণ্ড বুদ্ধিমতী হয়েছে। মেয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে হাতের বইটি টেবিলের ওপর রাখলেন বিজ্ঞানী আহমেদ আবদুল্লাহ। ‘কেমন আছো মামণি? সকালে কুরআন পড়েছো?’

‘আলহামদুলিল্লাহ বাবা, পড়া হয়েছে। কুরআন পড়ার পর আলমারিতে রাখা অ্যালবামগুলো দেখছিলাম। তখন পৃথিবীতে থাকাকালীন তোমাদের ফটো এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দৃশ্য দেখে আমি সত্যিই খুব অবাক হয়েছি। তাই তোমার কাছে এ সম্পর্কে জানতে আসলাম।’

কথাগুলো শুনে আহমেদ আবদুল্লাহ স্মৃতির মাঝে হারিয়ে গেলেন। পৃথিবীতে কাটানো সুমধুর দৃশ্যগুলো তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। মুহূর্তেই তার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। ‘সত্যিকারার্থেই মামণি আমাদের পৃথিবীটা অনেক সুন্দর ছিল। তুমি শুধুমাত্র ছবি দেখে পৃথিবীর সৌন্দর্য এবং বৈচিত্র্য কখনোই অনুধাবন করতে পারবে না। আমরা মানবজাতি পৃথিবীবাসী হিসেবে সত্যিই ভাগ্যবান ছিলাম।’

‘কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য যে আমি মানুষ হয়েও পৃথিবীর সৌন্দর্য অবলোকন করতে পারলাম না। আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই একগুঁয়ে-বৈচিত্র্যহীন পাথরবেষ্টিত ক্লাটোসে- যেখানে জীবন ধারণের জন্য অবিরত সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হচ্ছে,’ সাবার মুখে বেদনার ছাপ ফুটে উঠলো, ‘আচ্ছা বাবা, এমন কী হয়েছিল যার ফলে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য মানুষকে পৃথিবী থেকে পালিয়ে এসে এই ক্লাটোসে বসবাস করতে হচ্ছে?’

‘সেই ইতিহাস যে অত্যন্ত কষ্টদায়ক, যা মানুষের অতি উচ্চাকাক্সক্ষার ফসল। মানবজাতি জীবনকে সহজ করার নতুন নতুন আবিষ্কারের পেছনে ছুটলো। এসব প্রচেষ্টার ফলে মানুষের জীবন পূর্বের তুলনায় অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল। মানুষ নিজের জীবনকে বস্তুগতভাবে উন্নত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল ঠিকই কিন্তু তাদের নৈতিকতার দিকে কোনো খেয়ালই ছিল না। এখানেই মূল বিপত্তিটা বাধে। তারা নৈতিকতাকে ছুড়ে ফেলেছিল অথচ আল্লাহ পৃথিবীবাসীর মধ্যে শুধুমাত্র মানুষকেই নৈতিক জ্ঞান দান করেছিলেন। তারা সমাজের মূল ভিত্তি পরিবারকে পর্যন্ত ধ্বংস করে দিয়েছিল।’

‘তারপর কী হলো?’ আগ্রহভরা কণ্ঠে জানতে চাইলো সাবাহা।

‘মানুষ একুশ শতকের শুরুর দিকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আবিষ্কার করলো। এর ফলে জীবন একদম সহজ হয়ে গিয়েছিল। তারা প্রকৃতির সকল নিয়মকে উপেক্ষা করে নিজেদের মনমতো চলতে শুরু করলো। একুশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মানুষের জীবন সম্পূর্ণভাবে AI-এর ওপর নির্ভর হয়ে পড়লো। তারা ২৪ ঘণ্টাই প্রযুক্তির সাথে কাটাতে শুরু করলো। এমনকি পরিবারের সদস্যরাও একে অপরের সাথে বছরের পর বছর কোনো যোগাযোগ করতো না।’

‘মানুষ একে অপরের সাথে যোগাযোগ না করে কীভাবে বাঁচতে পারতো?’  বিস্মিত কণ্ঠ সাবাহর।

‘এমনই হয়েছিল। মানুষের যাবতীয় প্রয়োজন এমনকি রান্না করা, কাপড় ধোয়া সবই AI করে দিতো। যাবতীয় বিনোদনমূলক কাজ, শিক্ষা-চিকিৎসার মতো মৌলিক প্রয়োজনগুলোও AI করে দিতো। মানুষ কখনো আউটডোর গেমস খেলতে চাইলেও খেলার পার্টনার ছিল AI. তৎকালীন সময়ে কোনো মানুষের বন্ধু বলতে কিছুই ছিল না।’

‘তুমিও কি এ রকমভাবেই জীবন কাটাচ্ছিলে?’

‘না! তুমি জানো যে আমার জন্ম ২০৪১ সালে হয়েছিল। তখন AI-এর ওপর সবাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল কিন্তু আমাদের পরিবার এবং কিছু সংখ্যক মানুষ এর ব্যতিক্রম ছিলাম। কারণ এই অল্পসংখ্যক লোক এসবের পরিণাম আঁচ করতে পেরেছিল এবং যথাসম্ভব নৈতিক মূল্যবোধকে আঁকড়ে ধরে AI থেকে যথাসম্ভব নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখে একে অপরের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতো। এদের মধ্যে আমার বাবা-মা-ও ছিলেন এবং তারা শৈশব থেকেই আমাকে অও থেকে দূরে রেখে আমাকে বন্ধুর মতো যথেষ্ট সময় দিতেন।’

‘তাহলে তো তোমাদের সমাজের বিপরীতে চলতে গিয়ে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। তারপর কী হলো?’

‘তারপর মানবজাতির ইতিহাসে সেই চূড়ান্ত বিপর্যয়টা আসলো। মূল সমস্যা শুরু হয়েছিল ২০৬৯ সালের দিকে। আমি তখন একজন তরুণ মহাকাশ বিজ্ঞানী এবং আমি ব্যক্তিগতভাবে আমাদের ঘরে গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করে আমার গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন SMR Syber Team নামক একটি চক্র ইন্টারনেটে SH-47 নামক একটি AI প্রোগ্রাম ছেড়ে দেয়। SH-47 AI প্রোগ্রামটি তারা তৈরি করেছিল যাতে এর মাধ্যমে পৃথিবীর সমস্ত AI তাদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে। যেহেতু সমস্ত AI তখন ইন্টারনেটে কানেক্টেড ছিল তাই c দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং কিছু বুঝে ওঠার আগেই সমস্ত AI-এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। আবার অপরদিকে এটি নিজস্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে SMR Syber Team-এর নিয়ন্ত্রণ থেকেও নিজেকে মুক্ত করে ফেলে। ফলাফলস্বরূপ সমস্ত AI-গুলো মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে SH-47-এর অনুগত হয়ে পড়ে। অপরদিকে মানুষ যাতে আবার AI-এর নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছে নিতে না পারে তাই SH-47 মানবজাতিকে ধ্বংসের মিশনে নেমে পড়ে। অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মানবজাতির যুদ্ধ শুরু হয়। যেহেতু মানুষ এতদিন AI-এর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল তাই এই যুদ্ধের ফলাফল হয় অত্যন্ত ভয়াবহ। মাত্র কয়েকদিনের মধেই প্রায় ৯৮ শতাংশ মানুষ মারা পড়ে। বাকিরা কোনোরকম লুকিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। AI তাদেরও খুঁজে খুঁজে হত্যা করতে থাকে। সবকিছুই এত দ্রুত ঘটে যে মানুষ কোনো ধরনের প্রতিরোধের চেষ্টা পর্যন্ত করতে পারেনি। চারিদিকে রক্তের বন্যা বয়ে যায়। পৃথিবী তার ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ সময়ের সম্মুখীন হয়।’

‘তখন তোমরা কীভাবে বাঁচলে?’

‘যেহেতু আমরা অল্পসংখ্যক লোক AI থেকে যথাসম্ভব দূরে ছিলাম তাই আমরা প্রতিরক্ষার জন্য কিছু সময় পাই। তখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আমি বুঝতে পারি পৃথিবীতে থেকে কোনোভাবেই প্রাণ বাঁচানো সম্ভব নয়। তাই আমি এবং আমার সাথীরা মিলে পৃথিবী থেকে পালানোর সিদ্ধান্ত নেই। মহাকাশ নিয়ে গবেষণার জন্য তখন আমার কাছে ৭টি অত্যাধুনিক স্পেসশিপ ছিল। সেগুলোতে সর্বোচ্চ এক হাজার মানুষ জায়গা করা যেত। তাই আমরা ২ দিন ধরে তৎপরতা চালিয়ে বিক্ষিপ্ত মানুষকে একত্রিত করে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং খাবার নিয়ে অজানা উদ্দেশে মহাকাশে রওনা দেই। শেষ মুহূর্তে AI আমাদের সম্বন্ধে জানতে পেরে আমাদের পিছু ধাওয়া করে। আমাদের ওপর হামলা করতে থাকে। আমরা তাদের প্রতিহত করে ফাঁকি দিয়ে পালানোর চেষ্টা করি। আমরা ৬টি স্পেসশিপ ফাঁকি দিয়ে পালাতে সক্ষম হলেও একটি স্পেসশিপকে তারা ধ্বংস করে ফেলে। যেখানে আনুমানিক ২০০ জন মানুষ ছিলেন, যার মধ্যে তোমার দাদা-দাদিও ছিলেন।’ দুঃখ ভারাক্রান্ত কণ্ঠ আহমেদ আবদুল্লাহর।

‘তাহলে দাদা-দাদুর খুনি এরাই?’ সাবাহর চোখ ছলছল করে উঠলো, ‘তারপর তোমরা ক্লাটোসে আসলে কীভাবে?’

‘আমরা মহাকাশে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও মানুষের বসবাসযোগ্য কোনো গ্রহ পাচ্ছিলাম না। অবশেষে দীর্ঘ ৬ মাস বিরতিহীন যাত্রার পর আমরা ক্লাটোসকে খুঁজে পাই যেখানে জীবন ধারণের উপকরণ থাকলেও বসবাস করা অত্যন্ত দুর্বিষহ। নিরুপায় হয়ে আমরা এখানেই আশ্রয় নেই। সেই থেকে মানবজাতির অস্তিত্ব পৃথিবী থেকে মুছে গিয়ে এই ক্লাটোসে পথচলা শুরু হয়। তারপর থেকে গত ২০ বছর ধরে ক্লাটোসেই আমাদের বসবাস।’

‘কিন্তু পৃথিবী থেকে আমাদের খোঁজে বারবার AI স্পেসশিপ পাঠায় কেন?’

‘কারণ SH-47 মনে করে মানুষ বেঁচে থাকলে কখনো না কখনো পৃথিবীকে ফিরে পেতে হামলা চালাবে। তাই মানবজাতিকে নির্মূল করে তার জন্য সমস্ত বিপদ দূর করতে চায়। তাই বারবার আমাদের খোঁজে স্পেসশিপটি পাঠাচ্ছে।’

‘তাহলে এখন উপায় কী? আমরা কি পৃথিবীতে হামলা করবো?’

‘না, সেটা এখন সম্ভব নয়। পৃথিবীতে হামলা করার সক্ষমতা আমাদের নেই। আবার অস্ত্র বানানোর জন্য যেসব উপাদান প্রয়োজন তা ক্লাটোসে খুবই অল্প পরিমাণে আছে।’

‘তাহলে আমরা কি এখানেই আজীবন আত্মগোপন করে থাকবো?’

‘তা পারবো বলে আমার মনে হয় না। কারণ তারা যেরকম আমাদের খোঁজার জন্য তৎপরতা চালাচ্ছে তাতে হয়তো কয়েক বছরের মধ্যেই আমরা ধরা পড়ে যাব।’

‘তাহলে উপায়?’ ভয়ের চিহ্ন ফুটে উঠলো সাবাহর মুখে।

‘তার জন্য আমরা তৃতীয় আরেকটি পথের চেষ্টা চালাচ্ছি। গত ১৩ বছর থেকে আমরা উক্ত মিশনে কাজ করছি। ইনশাআল্লাহ খুব শিগগিরই আমরা সফল হবো।’

তখনই ডাইনিং রুম থেকে নাশতার জন্য ডাক দিলেন সাবাহর মা। অন্যদিনের জন্য মিশনটির গল্প জমিয়ে রেখে বাবা-মেয়ে হাসিমুখে ছুটলেন সেদিকে।’

৩.

২০৯১ সালের ২০ শে জানুয়ারি।

দিনটি মানবজাতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হতে চলেছে। মানবজাতি নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে এই দিনটিতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে চলছে। গত ১৫ বছর বিজ্ঞানী আহমেদ আবদুল্লাহর নেতৃত্বে ক্লাটোস গ্রহের বিজ্ঞানীরা একটি টেলিপোর্ট মেশিন আবিষ্কারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন যার মাধ্যমে তারা মাল্টিভার্সের অন্য কোনো ইউনিভার্সে যেতে পারবেন যেখানে পৃথিবীর মতোই বসবাসযোগ্য কোনো গ্রহ থাকবে। আবার অন্য ইউনিভার্সে হওয়ায় AI সেখানে পৌঁছাতে পারবে না। দীর্ঘ ১৫ বছরের অবিরাম প্রচেষ্টার পর তারা টেলিপোর্ট মেশিনটি আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। যার প্রথম বাস্তব প্রয়োগ আজ শুরু হবে তাই টেলিপোর্ট ভবনটির সামনে পুরো ক্লাটোস গ্রহের বাসিন্দারা জমায়েত হয়েছেন।

বিজ্ঞানী আহমেদ আবদুল্লাহ মিশনে যাবার জন্য পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছেন। তার মেয়ে সাবাহ মুনতাহা অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকে জড়িয়ে ধরে আছে। আহমেদ আবদুল্লাহর স্ত্রীও পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। প্রিয় মানুষটিকে এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজের জন্য তারা বিদায় দিতে চাচ্ছেন না কিন্তু তারপরও মানবজাতির কল্যাণের এবং অস্তিত্বের জন্য তারা এই কুরবানির জন্য প্রস্তুত হয়েছেন। এ রকম হাজার হাজার কুরবানির ফসল হিসেবেই মানব সভ্যতা এগিয়ে গিয়েছিল।

বিজ্ঞানী আহমেদ আবদুল্লাহ পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্রবেশ করলেন বিশাল রুমটাতে। এই পুরো রুম জুড়েই টেলিপোর্ট মেশিনের সরঞ্জামাদি। যদিও মেশিনটির মূল অংশ যেটি মানুষের সাথে টেলিপোর্ট হবে তা মোটামুটি একটি লিফটের মতো। 

সবাই প্রথম ট্রায়ালে আহমেদ আবদুল্লাহকে যেতে নিষেধ করেছিল কারণ মেশিনটি যদি ঠিকমতো কাজ না করে তাহলে হয়তো তাকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। কিন্তু তিনি তার সিদ্ধান্তে অনড়। তার একটাই কথা যদি তার আবিষ্কৃত মেশিনে কোনো ত্রুটি হয় তাহলে তার পরিণাম অন্য কেউ কেন ভোগ করবে। তাই তিনিই প্রথম টেলিপোর্ট হতে চান।

একে একে রুমে থাকা বিজ্ঞানীদের সাথে কোলাকুলি করে বিদায় জানালেন। তার সহকারী ওমর ফাইয়াজতো জড়িয়ে ধরেই কেঁদে উঠলো। আহমেদ আবদুল্লাহরও চোখ ছলছল করে উঠলো। ক্লাটোসে আসার ৮ বছর পূর্ব থেকেই দু’জন একসাথে কাজ করছেন, সেই থেকে দীর্ঘ ৩০ বছর একসাথে পথচলা দুই বন্ধুর। এই দীর্ঘ সময়ে মানবজাতির জন্য কত ঝড়-ঝঞ্ঝা তারা একসাথে মোকাবিলা করেছেন তার হিসাবের অন্ত নেই। 

অতঃপর প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি নিয়ে তিনি টেলিপোর্ট মেশিনের মূল অংশটিতে প্রবেশ করলেন। আয়তনে একটি বড়োসড়ো লিফটের মতো এই অংশটি। মেশিনটির একপাশে বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয় সুইচ রয়েছে। 

আহমেদ আবদুল্লাহর নির্দেশ পেয়ে অন্যান্য বিজ্ঞানীরা মহান রবের নাম নিয়ে টেলিপোর্ট মেশিনটি শুরু করলেন। মেশিনটি চালু হওয়ার পর উলটো গণনা শুরু হয়েছে। গণনাগুলো মেশিনের প্রধান স্ক্রিনে দেখাচ্ছে- ৩, ২, ১...

হঠাৎ বিজ্ঞানী আহমেদ আবদুল্লাহর চারদিক খুব বেশি আলোকিত হয়ে উঠলো। এমনকি তাকে বাধ্য হয়ে চোখগুলো বন্ধ করে ফেলতে হলো। সাথে সাথে মেশিনটি পচণ্ড গতিতে ঘুরতে আরম্ভ করলো যার ফলে আহমেদ আবদুল্লাহর মাথা ঘুরতে শুরু করল। আনুমানিক ১০ মিনিট পর মেশিনটি স্থির হয়ে গেল। স্থির হয়ে গেছে বুঝতে পেরে আহমেদ আবদুল্লাহ ধীরে ধীরে চোখ খুললেন। দেখলেন বাইরে স্বাভাবিক আলো দেখা যাচ্ছে। তখনও তার মাথা ঘুরছিল। তিনি পাশে থাকা ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে কিছু পানি পান করলেন। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে তিনি সুস্থ অনুভব করতে শুরু করলেন।

পাশের ব্যাগটি কাঁধে ঝুলিয়ে তিনি দরজা খুলে বাইরে আসা মাত্রই বিস্ময়ে থ হয়ে গেলেন। কিছু সময়ের জন্য নিজের চোখকে যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। এটি যে পৃথিবীর একটি উপত্যকা। তাহলে কি তিনি পৃথিবীতে টেলিপোর্ট হয়েছেন? তাহলে তো মহা বিপদ। তারা কী চাচ্ছিলেন আর কী হয়ে গেল। তবুও তিনি সুস্থ আছেন এবং টেলিপোর্ট মেশিনটি দিয়ে আবার ক্লাটোসে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকায় তিনি মহান রবের দরবারে শুকরিয়া আদায় করলেন। এখন অও কোনোভাবে তার কথা জানতে পারলেই তিনি আর প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারবেন না। তাই তাড়াতাড়ি ফিরে যাওয়াই ভালো। তবুও পৃথিবীতে যেহেতু এসেই গেছেন তাই একটু চারিদিক ঘুরে দেখার মনস্থির করলেন।

তিনি যে উপত্যকায় দাঁড়িয়ে আছেন, তার একদিকে পাহাড় রয়েছে। তিনি সেদিকে যাবার জন্য হাঁটতে লাগলেন। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে অনেক কষ্টে একটি পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করলেন। চূড়ায় উঠে হাতে বাইনোকুলার নিয়ে তা চোখে লাগিয়ে চারিদিক দেখতে লাগলেন। হঠাৎ তার চোখ অনেক দূরের একটি দৃশ্যে আটকে গেল। তিনি যেন তার চোখকে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। অবাক বিস্ময়ে তিনি একটি গ্রামের মতো কিছু লোকবসতি এবং সেখানে কিছু মানুষ দেখতে পেলেন। এটা কীভাবে সম্ভব। অও-এর হাত থেকে পৃথিবীতে কোনো মানুষ কীভাবে বাঁচতে পারে। বিস্ময়ে নিজেকেই যেন কথাগুলো শোনালেন আহমেদ আবদুল্লাহ।

তখনই পশ্চিম আকাশে সূর্য অস্ত যেতে শুরু করলো। রাতে সেদিকে যাওয়া ঠিক হবে না ভেবে টেলিপোর্ট মেশিনটিতে রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলেন এবং সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মেশিনটিতে চলে আসলেন।

সারারাত তার মাথায় বিভিন্ন চিন্তা ঘুরপাক খেতে শুরু করলো। এই মানুষগুলো পৃথিবীতে নিজের অস্তিত্ব কীভাবে বাঁচিয়ে রাখলো? এই এলাকা দেখে তো মনে হয় না এখানে অও-এর থেকে লুকিয়ে থাকা সম্ভব। তাছাড়া অও তো অত্যাধুনিক স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সমস্ত পৃথিবীর প্রতিটি জিনিসের ওপরই নজর রাখতে পারে। তাহলে পৃথিবীতে মানুষ আসলো কীভাবে? তাহলে কি তারা অও-এর বিরুদ্ধে লড়াই করে তাদের ধ্বংস করে ফেলেছে? কিন্তু তারা যাওয়ার সময় যে অল্প সংখ্যক মানুষ ছিল তাদের দ্বারা তো তা কখনোই সম্ভব নয়। এসব ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লেন।

ঘুমের মধ্যে তিনি একটি স্বপ্ন দেখলেন। তিনি এবং অন্যান্য ক্লাটোসবাসী পৃথিবীতে বসবাস করছেন। পৃথিবীর সবুজ-শ্যামল শিশুরা খেলা করছে। একে অপরের সাথে বিভিন্ন ধরনের খুনসুটি করছে। কেউবা বাগানে উড়ে বেড়ানো বিভিন্ন রঙের প্রজাপতিকে ধরার জন্য তাদের পেছনে ছুটছে। তার মেয়ে সাবাহ এবং অন্যান্য মেয়েরা ফুলের বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং বাগানের বাহারি রঙের ফুলের সৌন্দর্য-ঘ্রাণে বিস্মিত হচ্ছে। এই হাস্যোজ্জ্বল মানব শিশুদের জীবনে কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইসের স্থান নেই। তারা কৃত্রিম সুখের আশায় মোবাইল বা কম্পিউটার গেমসে ডুবে থাকছে না বরং প্রকৃতির সাথে মিশে গিয়ে প্রকৃতির অংশ হয়ে প্রকৃত সুখ লাভ করছে।

স্বপ্নটি দেখার সঙ্গে সঙ্গেই বিজ্ঞানী আহমেদ আবদুল্লাহ ঘুম থেকে জেগে উঠলেন। চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন ফজরের ওয়াক্ত হয়ে গেছে। আহমেদ আবদুল্লাহ ওজু করে ফজরের নামাজ আদায় করলেন। নামাজ শেষে রবের দরবারে অশ্রুসিক্ত নয়নে ফরিয়াদ জানালেন যেন স্বপ্নে দেখা পৃথিবীর মতো একটি সুন্দর পৃথিবী মানবজাতি পায়। দোয়া শেষে নাশতা করতে করতে সূর্যোদয়ের দৃশ্য দেখতে লাগলেন। বহু বছর পর বৈচিত্র্যময় পৃথিবীতে সূর্যোদয়ের মতো জান্নাতি দৃশ্য দেখতে পেয়ে তার মনটা ভরে গেল।

নাশতা শেষ করে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদিসমৃদ্ধ ব্যাগটি কাঁধে ঝুলিয়ে রওনা দিলেন গতকালের দেখা মানব-বসতির দিকে। দীর্ঘ ৩ ঘণ্টা অবিরাম যাত্রার পর আহমেদ আবদুল্লাহ পৌঁছলেন মানববসতির কাছে। অনেকটা শহরের মতো পরিকল্পনামাফিক তৈরি। ঘরগুলো অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন। তাদের সম্পর্কে ভালোভাবে জানার জন্য তিনি মানব-বসতিটির কিছুটা দূরে একটি ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে থেকে দেখতে লাগলেন সেখানে বসবাসরত কর্মব্যস্ত মানুষদের। প্রত্যেকেই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। শিশু-কিশোররা একে অপরের সঙ্গে খেলা করছে। কেউবা পারিবারিক কাজে বাবা-মাকে সাহায্য করছে। কারো মধ্যে ভয়ের কোনো চিহ্নও নেই।

পৃথিবীতে সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চলছে দেখে বিজ্ঞানী আহমেদ আবদুল্লাহ আরো অবাক হলেন। তবে মানুষগুলোর শারীরিক গঠন স্বাভাবিকের চেয়ে বড়ো। প্রত্যেকেই আনুমাণিক ৭ ফুট বা তার চেয়ে কিছু লম্বা। শরীরের শক্তিও মনে হচ্ছে অনেক বেশি। আর বাকি সবকিছু স্বাভাবিক মানুষের মতো একইরকম। এরা এ রকম অস্বাভাবিক কেন এই চিন্তা কিছুক্ষণ তার মাথায় ঘুরপাক খেতে শুরু করলো। কিছুক্ষণ তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে আহমেদ আবদুল্লাহ বুঝতে পারলেন এদের দ্বারা ক্ষতির সম্ভাবনা নেই তাই আড়াল হতে বেরিয়ে এসে লোকগুলোর দিকে ধীরগতিতে এগিয়ে যেতে শুরু করলেন। লোকগুলো তাকে দেখে একে একে তার চারদিকে অবাক দৃষ্টিতে জড়ো হতে শুরু করলো। তাদের চেয়ে আকারে কিছুটা ছোট এবং তাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় হয়তো তারা তার দিকে এভাবে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

‘আপনারা সবাই এখানে কীভাবে বেঁচে আছেন?’ কোনো ধরনের ভূমিকা ছাড়াই তাদের উদ্দেশ্যে প্রশ্নটি করলেন আহমেদ আবদুল্লাহ।

তার কথাগুলো শুনে সবাই চোখগুলো বড়ো বড়ো করে তাকানো শুরু করলো। তাদের মধ্যে নেতাগোছের একজন হঠাৎ আহমেদ আবদুল্লাহর উদ্দেশে কী যেন বলে উঠলো।

লোকটির বলা কথাগুলো তিনি বুঝতে পারলেন না। অপরিচিত ভাষা।

‘আপনারা কি আমার কথাগুলো বুঝতে পারছেন?’ অনেকটা বিস্ময়ের সাথেই আবারও তাদের উদ্দেশে প্রশ্নটি করলেন আহমেদ আবদুল্লাহ।

এর জবাবে আবারও সেই নেতাগোছের লোকটি একই ভাষায় কথা বললো।

এই পরিস্থিতিতে কী করবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না আহমেদ আবদুল্লাহ। হঠাৎ নেতাগোছের লোকটি তার পাশের লোককে কিছু বলার সাথে সাথে সে দৌড়ে একটি ঘরে গেল। কিছুক্ষণ পর সে চুড়ির মতো দুটি যন্ত্র নিয়ে ফেরত আসলো। তার মধ্যে একটি যন্ত্র নেতাগোছের লোকটি তার হাতে নিয়ে পরে ফেললো আর আরেকটি যন্ত্র সেই লোকটি আহমেদ আবদুল্লাহর হাতে পরিয়ে দিলো।


‘আপনি কে? আর এখানে কী করছেন?’ লোকটি আহমেদ আবদুল্লাহর দিকে তাকিয়ে প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করলো। 
লোকটির মুখে নিজের ভাষায় কথাগুলো শুনে আহমেদ আবদুল্লাহ চমকে উঠলেন। পর মুহূর্তেই বুঝতে পারলেন এটি তার হাতে লাগানো যন্ত্রের কাজ। ‘আমার নাম আহমেদ আবদুল্লাহ। আমি এই পৃথিবীরই একজন পুরোনো অধিবাসী। তবে বিগত কয়েক বছর আমি পৃথিবীর বাইরে ছিলাম। আপনার পরিচয় কী জানতে পারি?’

কথাগুলো শুনে সবাই যেন আকাশ থেকে পড়লো। লোকটি আহমেদ আবদুল্লাহকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো, ‘আমার নাম ওমায়েরভ। আমি এখানকার নেতা। আর আপনার মনে হয় কোথাও ভুল হচ্ছে। কারণ এটি পৃথিবী নয়। এটি হচ্ছে পেন্টনাস গ্রহ। তবে এটি পৃথিবীর অনুরূপ একটি গ্রহ। আমরাও আপনার মতোই মানুষ এবং আমরা প্রায় ১০০ বছর পূর্ব থেকেই পৃথিবী এবং পৃথিবীবাসী সম্পর্কে জানি।’ 

কথাগুলো কানে যাওয়া মাত্রই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন আহমেদ আবদুল্লাহ। বিস্ময়ে কয়েক মুহূর্ত তার পুরো শরীর স্থির হয়ে রইলো। তাহলে কি সে সত্যিই অন্য ইউনিভার্সে পৃথিবীর মতো কোনো গ্রহে টেলিপোর্ট হয়েছে! তাদের মিশন কি সত্যিই সফল হয়েছে।

ওমায়েরভের পাশে থাকা লোকটি ওমায়েরভের কানে কিছু একটা বললেন। সাথে সাথেই ওমায়েরভ বলে উঠল, ‘দুঃখিত! আমরা আপনাকে এতক্ষণ বাইরে দাঁড় করিয়ে কথা বলছি। দয়া করে আমাদের ঘরে আসুন।’

সে একটি ঘরের দিকে ইঙ্গিত করলো। আহমেদ আবদুল্লাহ ওমায়েরভের সাথে সেদিকে রওনা দিলো। সে এখনো বিস্ময়ের ঘোরে কোনো কথা বলতে পারছে না। চারিদিকের সবকিছু ভালো করে লক্ষ্য করে সে বুঝতে পারলো সে সত্যিই অন্য ইউনিভার্সের অন্য গ্রহে এসেছে। ঘরে গিয়ে একটি সোফায় বসার পর তাকে কিছু পানীয় পরিবেশন করা হলো। পানীয়টি খাওয়ার পর ধীরে ধীরে সে স্বাভাবিক হয়ে ওমায়েরভকে বললো, ‘আচ্ছা আপনারা পৃথিবী সম্পর্কে কীভাবে জানলেন? আর পৃথিবী এবং মানুষ সম্পর্কে জানার পর আপনারা আমাদের সাথে যোগাযোগ করলেন না কেন?’

‘আমরা পেন্টানাসে বসবাসরত মানুষ অনেক পূর্ব থেকেই আমাদের মতো উন্নত বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী খুঁজছিলাম। এর ধারাবাহিকতায় আমরা একটি শক্তিশালী যন্ত্র আবিষ্কার করি। প্রায় ১০০ বছর পূর্বে যার সাহায্যে এ রকম প্রাণী এবং গ্রহের সন্ধান পেতে পারি। সেই যন্ত্রের মাধ্যমেই আমরা পুরো মাল্টিভার্সে পৃথিবীসহ কয়েকটি গ্রহ খুঁজে পাই যেখানে উন্নত বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী বসবাস করে। কিন্তু আমাদের তৈরিকৃত যন্ত্রটি এতটাই শক্তিশালী ছিল না যার মাধ্যমে আমরা আপনাদের কোনো  ম্যাসেজ পাঠাতে অথবা আপনাদের গ্রহে যেতে পারতাম। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে যন্ত্রটি আবিষ্কারের কয়েক বছর পর একটি ভূমিকম্পে যন্ত্রটিসহ ভবনটি ধ্বংস হয়ে যায়। যন্ত্রটি ধ্বংস হওয়ার সাথে সাথে এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরাও ভবনের নিচে চাপা পড়ে মারা পড়েন। তাই আমরা আর এ বিষয়ে সামনে এগুতে পারিনি।’

‘তাহলে তো আপনারা অনেক পূর্বেই জ্ঞান-বিজ্ঞানে আমাদের থেকে এগিয়ে ছিলেন।’


‘তা হয়তো ঠিক। কিন্তু আমরা আপনাদের কাছে পৌঁছার আগেই আপনারা আমাদের কাছে পৌঁছে গেছেন। অর্থাৎ এই মুহূর্তে আপনারা এগিয়ে আছেন।’


‘আমাদের এখানে বাধ্য হয়েই পৌঁছাতে হয়েছে।’


‘সেটা কীভাবে?’

তখন বিজ্ঞানী আহমেদ আবদুল্লাহ তাদের শোনাতে লাগলেন কীভাবে তারা পৃথিবী থেকে উৎখাত হয়েছেন, কীভাবে তারা এতদিন ধরে ক্লাটোসে আত্মগোপন করে আছেন এবং তাদের এখানে আসার মূল উদ্দেশ্য।


‘আপনাদের সাথে যা হয়েছে তা সত্যিই দুঃখজনক। তবে আপনারা দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার ফলাফল হিসেবে একদম সঠিক জায়গাতেই এসেছেন। আমরা এই বিশাল গ্রহে কয়েক লক্ষ লোক বসবাস করি। তাই আপনাদের স্বাগত জানাতে পেন্টানাসবাসীর কোনো আপত্তি নেই। আমরা অত্যন্ত খুশি হবো যদি আপনারা আমাদের একই প্রজাতির ভাই হিসেবে আমাদের গ্রহে বসবাস করেন।’


কথাগুলো শুনে আহমেদ আবদুল্লাহ অশ্রুসিক্ত নয়নে জড়িয়ে ধরলেন ওমায়েরভকে। শিগগিরই ক্লাটোসে অবস্থানরত সবাইকে পেন্টানাসে নিয়ে আসার মনস্থির করলেন। নিজেদের কৃতকর্মের ফল হিসেবে মানবসভ্যতা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে আজ পেন্টানাসে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে। তবে পেন্টানাসে পূর্বের মতো ভুলগুলো না করে রাতে স্বপ্নে দেখা সভ্যতাটির মতো অনিন্দ্য সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে হবে।


আজ থেকে শুরু হবে মানবজাতির নতুন ইতিহাস, এক নতুন সভ্যতা।

কিশোরকণ্ঠ সায়েন্স ফিকশন লেখা প্রতিযোগিতা ২০২৩-এর ৯ম স্থান অধিকারী সায়েন্স ফিকশন

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ