ফিলিস্তিনের জন্য ভালোবাসা

খেলার চমক আবু আবদুল্লাহ জুন ২০২৫

আর সবার মতোই ক্রীড়া তারকাদেরও সমাজের দুঃখ-দুর্দশা, হাসি-কান্না হৃদয় ছুঁয়ে যায়। যে কারণে যুগে যুগে তাদের অনেকেই ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরাইলি বর্বরতার প্রতিবাদ করেছেন। খেলোয়াড় হিসেবে সমর্থন হারানোর ভয় না করে অন্যায়কে অন্যায় বলেছেন। ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকারের পক্ষে সোচ্চার হয়েছেন। কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন, কেউবা মাঠে খেলার ফাঁকে ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। কেউ দিয়েছেন অনুদান। তেমনই কয়েকজন ক্রীড়া তারকার কথা তুলে ধরছি এবারের লেখায়।

এই তালিকায় সবার আগে আসবে কিংবদন্তি বক্সার মোহাম্মাদ আলীর নাম। গত শতাব্দীতে পৃথিবী সেরা এই ক্রীড়াবিদ বিশে^র যে-কোনো প্রান্তের নিপীড়িত মানুষের পক্ষে কথা বলেছেন সবসময়। ১৯৭৪ সালে মধ্যপ্রাচ্য সফরের অংশ হিসেবে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি আগ্রাসনের নিন্দা করতে গিয়ে বলেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে ইহুদিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের শক্ত ঘাঁটি।’

এর কয়েকদিন পর দক্ষিণ লেবাননে ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের দুটি শিবির পরিদর্শনে যান আলী। ক্যাম্পে উদ্বাস্তু হয়ে আসা মানুষদের দুঃখ-দুর্দশার কথা শোনেন তিনি। সেখানে আলী বলেন, ‘আমার ও আমেরিকার সব মুসলিমের পক্ষ থেকে নিজেদের ভূখণ্ড স্বাধীন করা এবং ইহুদি দখলদারদের বিতাড়িত করতে ফিলিস্তিনিদের এই সংগ্রামের প্রতি আমরা সমর্থন জ্ঞাপন করছি।’

১৯৮৮ সালের প্রথম ইন্তিফাদার সময় যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি আগ্রাসনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিলেও অংশ নিতে দেখা যায় তাঁকে। এসব কারণে ইসরাইল তাঁকে ইহুদিদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতে চাইত, যদিও মোহাম্মাদ আলী সবসময় বলেছেন, ইহুদি ধর্মের সাথে তাঁর কোনো বিরোধ নেই। তিনি ইসরাইল রাষ্ট্রের অন্যায় কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি, ১৯৮৫ সালে দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি আগ্রাসনের পর ৭০০ লেবানিজকে ইসরাইলি কারাগার থেকে ছাড়িয়ে আনতে ইসরাইল সফর করেছিলেন মোহাম্মাদ আলী। সেখানে তিনি ইসরাইলি সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে সাক্ষাৎ করে ‘৭০০ মুসলিম ভাইয়ের’ মুক্তির সুপারিশ করেন, যদিও ইসরাইল সরকার তাঁর অনুরোধ রাখেনি।

ফিলিস্তিনের মানুষের প্রতি ভালোবাসা ছিল ডিয়াগো ম্যারাডোনার। নিজেকে মনে করতেন ফিলিস্তিনের নিপীড়িত জনতার একজন। ২০১২ সালে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, ‘আমি ফিলিস্তিনি জনগণের এক নম্বর ভক্ত। আমি তাদের সম্মান করি ও তাদের কষ্টগুলো বুঝি।’

২০১৪ সালের যুদ্ধে ইসরাইল ৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করলে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, ‘ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের সাথে যা করছে তা লজ্জাজনক।’

২০১৮ সালের জুলাইয়ে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে জড়িয়ে ধরে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, ‘হৃদয় থেকে আমি একজন ফিলিস্তিনি।’ রাশিয়ার মস্কোয় ওই বৈঠকে ম্যারাডোনা মুক্তিকামী ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে বলেছিলেন, ‘প্রেসিডেন্ট আব্বাসের একটি দেশ রয়েছে, সেই দেশটিরও আছে অধিকার। এই মানুষটি ফিলিস্তিনে শান্তি চান।’

ওই বৈঠকের পর নিজের ইনস্টাগ্রাম পেজে মাহমুদ আব্বাসকে আলিঙ্গনের ছবিও শেয়ার করেন তিনি। ম্যারাডোনা আশা করতেন, ফিলিস্তিন একদিন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। ম্যারাডোনার মৃত্যুর খবরে ফিলিস্তিনি সাংবাদিক রামজি বারুদ বলেছিলেন, ‘ম্যারাডোনাকে শুধু ভালোই বাসা যায়। তার সম্পর্কে নেতিবাচক কিছু বলা যায় না।’

ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের অলরাউন্ডার মঈন আলী তাঁর ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময় ফিলিস্তিনিদের সংগ্রাম ও অধিকারের বিষয়ে সরব ছিলেন। ২০১৪ সালে মঈন আলী ভারতের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচে একটি ব্রেসলেট পরে খেলতে নামেন, যেটিতে লেখা ছিল ‘সেভ গাজা’ অর্থাৎ গাজাকে রক্ষা করো। ওই বছর গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসনের বিপক্ষে প্রতিবাদ জানাতে তিনি এ কাজ করেন। তবে আইসিসি তাঁর এই সিদ্ধান্তে বাধা দেয়। ‘আন্তর্জাতিক ম্যাচের সময় কোনো ধরনের রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও জাতি-বিষয়ক বক্তব্য-সংবলিত বার্তা প্রদর্শন করা যাবে না’-এমন আইনের দোহাই দিয়ে মঈন আলীকে ব্রেসলেট খুলতে বাধ্য করা হয়।

ফ্রান্স ও রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক স্ট্রাইকার করিম বেনজেমা এক এক্স (সাবেক টুইটার) পোস্টে বলেছেন, ‘আমাদের সব দোয়াজুড়ে রয়েছে গাজার বাসিন্দারা, যারা আরো একবার অন্যায় বোমা হামলার শিকার হচ্ছে। যে হামলা থেকে নারী ও শিশুরাও রক্ষা পাচ্ছে না।’ মিশর ও লিভারপুলের তারকা স্ট্রাইকার মোহাম্মাদ সালাহ বরাবরই ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি বর্বরতার নিন্দা জানিয়ে আসছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে সালাহ বিরাট অঙ্কের অর্থ দান করেন গাজার মানুষদের জন্য ত্রাণ সহযোগিতা হিসেবে। তবে এই সহায়তার অর্থের পরিমাণ প্রকাশ করেননি মিশরীয় সুপারস্টার।

অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটার ওসমান খাজাও বরাবরই ফিলিস্তিনের পক্ষে সোচ্চার। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে এক টেস্ট ম্যাচে খাজা তাঁর ব্যাটে মানবাধিকার আইনের একটি ধারা লেখা স্টিকার লাগাতে চাইলে আইসিসি তাতে বাধা দেয়। খাজা ওই আইনটির মাধ্যমে বিশ^কে ফিলিস্তিনিদের অধিকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। একই সিরিজে একটি ম্যাচে গাজার প্রতি সংহতি জানিয়ে কালো আর্মব্যান্ড পরে খেলতে নামেন ওসমান খাজা। তাতেও আপত্তি জানায় ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা আইসিসি।

একই সিরিজে একদিন অনুশীলনে খাজা তাঁর কেডসে দুটি বার্তা লিখে মাঠে নামেন। বার্তা দুটি ছিল, ‘সবার জীবনের মূল্য সমান’ এবং ‘স্বাধীনতাও একটি মৌলিক অধিকার’। ফিলিস্তিনিদের উদ্দেশ্য করেই বার্তা দুটি লেখা হয়। ম্যাচের সময় আইসিসি এসব বার্তা লেখা জুতা পরতে দেবে না বুঝতে পেরে হামজা অনুশীলনে ওই জুতা পরেন। সেটিও ক্রিকেট বিশে^ আলোড়ন তোলে।

এর আগে-পরেও অনেকবার ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি বর্বরতার নিন্দা জানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত এই অজি ক্রিকেটার। ফিলিস্তিনিদের অধিকারের বিষয়ে বিশ^ সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছেন।

বাংলাদেশের গর্ব হামজা দেওয়ান চৌধুরীও সবসময় ফিলিস্তিনিদের প্রতি অন্যায়ের প্রতিবাদ করে আসছেন। ২০২১ সালে লিস্টার সিটির হয়ে এফএ কাপ জয়ের পর হামজা মাঠের মাঝখানে ফিলিস্তিনি পতাকা তুলে ধরেন। এমনকি চ্যাম্পিয়ন মেডেল গ্রহণের সময়ও তাঁর গায়ে ছিল সেই পতাকা। এ ঘটনায় খুবই খুশি হয় ফিলিস্তিনিরা। লন্ডনে দায়িত্ব পালনকারী ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত হামজাকে চিঠি পাঠিয়ে গোটা ফিলিস্তিনের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানান। সে চিঠিতে বলা হয়, ‘এফএ কাপ জয়ের ঐতিহাসিক মুহূর্তে ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে তুলে নেওয়ার জন্য হামজা চৌধুরী ও ওয়েসলে ফোফানাকে ফিলিস্তিন সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানাই।’

সাতবারের ফরমুলা ওয়ান (মোটর রেস) চ্যাম্পিয়ন লুইস হ্যামিলটন গাজায় ইসরাইলি গণহত্যা দেখে এক ইস্টাগ্রাম পোস্টে লিখেছেন, ‘যথেষ্ট হয়েছে। এই সন্ত্রাসবাদ ও আতঙ্ক-বিশেষ করে নিষ্পাপ শিশুদের জন্য ভয়ংকর। এসব থামাতেই হবে।’

বিভিন্ন সময় আরো অনেক নামিদামি ক্রীড়াবিদ কিংবা ক্লাব ফিলিস্তিনিদের ন্যায়সংগত সংগ্রামের পাশে দাঁড়িয়েছে। আবার এমন অনেকেই আছেন, যারা এত সব নৃশংসতা ও গণহত্যা দেখেও না দেখার ভান করে কিংবা পশ্চিমাদের বিরাগভাজন হওয়ার ভয়ে চুপ করে থেকেছেন। যারা সেই ভয় না পেয়ে প্রতিবাদী হয়েছেন, সারা দুনিয়া তাদের এসব কর্মকাণ্ড চিরদিন কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করবে।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ