বাড়ি থেকে পালিয়ে

গল্প অনুবাদ : জাফর তালুকদার জুন ২০২৫

টনিটো আর লুপে দুই ভাই-বোন। টনিটো বড়ো আর বোন লুপে ছোটো। মা নেই। হাসি-আনন্দে দিন কাটছিল তাদের। কিন্তু বাবা একদিন নতুন মা আনলেন ঘরে। তাদের সংসারে ছিল জিনা নামের একটি মেয়ে। মেয়েটি ছিল হিংসুটে স্বভাবের। টনিটো আর লুপের সঙ্গে বনিবনা হতো না মোটেই। সারাদিন ঠোনাঠুনি লেগে থাকত এটা-ওটা নিয়ে। এ নিয়ে ঝামেলার অন্ত ছিল না।

একদিন বাগান থেকে কিছু ফুল ছিঁড়েছিল জিনা। 

বাগানটি ছিল সৎ-মায়ের। তার মেজাজ চড়ে গেল বাগানের দুর্দশা দেখে।

কে করল এমন অপকম্ম?

নিজের মেয়ে জিনা পাশেই খেলছিল। তাকে দেখে খেঁকিয়ে উঠল, ‘এই জিনা, তুই কি ফুল ছিঁড়েছিস নাকি?’

জিনা ফিরে তাকাল। উত্তর দিলো না।

‘তাহলে কী লুপে করেছে?’

‘না।’ জিনা ভয় পেয়ে গেল। 

‘টনিটো?’

জিনা পায়ের দিকে চোখ রেখে  মৃদুস্বরে ডাহা মিথ্যাটা বলল, ‘হ্যাঁ।’

সৎ-মার মেজাজ গেল বিগড়ে। সে ধুপধাপ করে পা বাড়াল ঘরের দিকে। 

সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চিৎকার করে ডাকল, ‘টনিটো!’

টনিটো আর বোন লুপে মেঝেতে উবু হয়ে ছবি আঁকছিল। সৎ-মায়ের চিৎকারে ধড়ফড়িয়ে লাফিয়ে উঠল ভাইটি।

মহিলা রাগে গরগর করে তার কান খামচে ধরে বলল, ‘তোর কত বড়ো সাহস, আমার বাগানের ফুল ছিঁড়েছিস! আজ রাতে তোর খাবার বন্ধ।’

‘না, আমি ফুল ছিঁড়িনি। সত্যি বলছি ছিঁড়িনি।’

টনিটোর গলায় প্রতিবাদ ঝরে পড়ল।

‘মিথ্যুক কোথাকার, আবার মুখে মুখে কথা!’ সৎ-মা তার কান ধরে হিড়হিড়িয়ে টেনে বাথরুমে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো।

‘খবরদার, যতক্ষণ না বলছি কিছুতেই বাইরে বেরুবি না। মনে থাকে যেন হ্যাঁ।’

লুপে আড়চোখে সব দেখলেও কিছু বলার সাহস হলো না। সে আঁকাজোকার ভান করে আড় দিয়ে পড়ে থাকল মেঝেতে। সে যদি এখন সাড়া দেয় তার অবস্থাও হবে টনিটোর মতো। হয়তো এজন্য তাকেও আটকে রাখা হতে পারে বাথরুমে।

সৎ-মা চলে যাওয়ার পর লুপে চুপিচুপি গিয়ে খুলে ফেলল বাথরুমের দরজাটা, ‘ভাইয়া, আমি এসেছি। শিগগির বেরিয়ে এসো।’

‘চলে যা লুপে, উনি দেখতে পেলে তোরও বিপদ হবে।’

লুপে বলল, ‘আর দেরি করো না, তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসো। চলো, আমরা পালিয়ে যাই।’

টনিটো বলল, ‘মাথা খারাপ! বাড়ি ছেড়ে কোথায় যাব? বাবার কী হবে! তাকে রেখে আমাদের যাওয়া ঠিক হবে না।’

লুপে ঠোঁট ওলটাল, ‘না, আমি তেমনটা মনে করি না। উনি অনেক বদলে গেছেন। এটা ভাবলে ঘৃণা হয়। সবসময় ব্যস্ত। আমাদের দিকে ফিরে তাকানোর সময় নেই। আমরা চলে গেলেও উনার চোখে পড়বে না।’

টনিটো দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘ঠিক আছে। তবুও উনি আসল ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন।’

পরের দিন সকালে সূর্য ওঠার আগে টনিটো বোন লুপেকে ঘুম থেকে ডেকে তুলল। একটুও টুঁ শব্দ না করে বাইরে বেরোনোর পোশাক পরে নিল তারা। জিনা, সৎ-মা আর বাবা তখনও মাদুরে শুয়ে আছে মেঝেতে। 

টনিটো লুপেকে নিয়ে চুপিচুপি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল। চাঁদের আলোয় ধানক্ষেত, পাহাড়, জঙ্গল পেরিয়ে দ্রুত এগিয়ে চলল সামনের দিকে। হাঁটার চোটে টনিটোর স্যান্ডেল গেল ছিঁড়ে। খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে তেষ্টায়-খিদেয় ক্লান্ত হয়ে পড়ল। সঙ্গে আনা চাল, মাছ, পানি সব শেষ হয়ে গেছে। এখন উপায়! 

নদী তীরে গাছপালার মধ্যে একটা বাড়ির দেখা পেয়ে সেদিকে পা বাড়াল তারা। বলা যায় নির্জন ভূতুড়ে বাড়ি। দরজা-জানালা বন্ধ। জনমনিষ্যির দেখা নেই। 

টনিটো চারদিকে চোখ বুলিয়ে বলল, ‘এখানে কেউ থাকে বলে মনে হয় না। চলো, ভেতরে যাই।’

কথাটা লুপের পছন্দ হলো না। এভাবে হুট করে ঢোকা ঠিক নয় কারো বাড়িতে। কিন্তু খিদে-ক্লান্তিতে শরীর এমনই অসাড় হয়ে পড়ছিল যে, একটু বিশ্রাম না নিয়ে আর উপায় কী! টনিটোর পেছনে হেঁটে হেঁটে অবশেষে একটা দরজা খুঁজে পেল রান্নাঘরে যাওয়ার। চুলোর ওপর কড়াইতে ছিল সবজি দিয়ে রান্না করা কিছু স্টু। সেটা কতটা টাটকা তা পরখ করার সময় ছিল না। খেতে সুস্বাদু না হলেও কয়েক মিনিটের মধ্যে চেটেপুটে পুরোটা সাবাড় করে ফেলল।

হঠাৎ রান্নাঘরের দরজায় একটা ভীতিকর বড়ো ছায়া ফুটে উঠল। লুপে চিৎকার করে খালি হাঁড়িটা ছুড়ে ফেলে দিলো। পশুর চামড়া পরা মানুষটার মুখ যেখানে থাকার কথা সেখানে ছিল তার থুতনি।

‘তবেরে পুচকের দল, তোদের এত সাহস আমার ঘরে না বলে ঢুকেছিস!’ ভয়ংকর গলায় গর্জন করে উঠল কদাকার লোকটা।

টনিটো চিৎকার করে বোনকে সরিয়ে দিলো লোকটার কাছ থেকে। তারপর পাত্রটা ছুঁড়ে মেরে জানালার ফোকর গলিয়ে দৌড়ে পালাল ঘরের বাইরে।

প্রাণপণে ছুটে তারা নদীর কাছে পৌঁছল। আর যেতে পারল না সামনে। 

টনিটো পেছন ফিরে বলল, ‘শিগগির আয়, শয়তানটা আমাদের ধরতে আসছে।’

‘চলো, আমরা গাছে উঠে লুকিয়ে থাকি পাতার আড়ালে।’ লুপে মাথা খাটিয়ে পরামর্শ দিলো ভাইকে।

দুজনে গাছে উঠে নিঃশব্দে মিশে থাকল ডালপালার ভেতর। টনিটো ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ থাকার জন্য সতর্ক করল বোনকে। জানোয়ারটা শুকনো পাতা মাড়িয়ে ধুপধাপ করে ছুটে আসছিল এদিকে। চোখের পলকে লোকটা গাছ বেয়ে চলে এলো তাদের কাছে।

লুপে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল, ‘ও না, না...।’

আর একটু হলেই লুপেকে ছুঁয়ে ফেলবে ওই কুৎসিত লোকটা। টনিটো হাত বাড়িয়ে বলল, ‘সর্বনাশ, শিগগির আমার হাত ধর।’

এই বলে লুপেকে টেনে তুলল অন্য একটা উঁচু ডালে।

এই ফাঁকে লুপে একটা টুকটুকে আম ছুঁড়ে মারল লোকটার দিকে। কিন্তু সেটা হাত ফসকে নদীতে ছিটকে পড়ল দেখে খেই হারিয়ে কদাকার মানুষটা ধপাস করে পড়ল মাটিতে। আর পড়বি পড় মালির ঘাড়ে। প্রচণ্ড জোরে পাথরে মাথা ঠুকে চিতপটাং হয়ে সরাসরি আছড়ে পড়ল নদীতে। নদীর স্রােতে আপদ ভেসে যাচ্ছে দেখে তারা খুশিতে আটখানা হয়ে গেল। এবার নিশ্চিত মনে রওনা দিলো সেই দুষ্ট লোকটার বাড়িতে।

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে লুপে বলল, ‘এখন কী আমরা বাবার কাছে ফিরে যাব?’

টনিটো বলল, ‘তোর কী ইচ্ছে?’

লুপের গলা আবেগে কেঁপে উঠল, ‘কিছুতেই না। বাড়ির লোকজন খুবই খারাপ। জিনা আরও ভয়ংকর।’

টনিটো কষ্টের নিঃশ্বাস ছেড়ে বোনের কথায় সায় দিলো, ‘বাবা এ নিয়ে কিছু করতে পারবেন বলে মনে হয় না। উনি তো সবই জানেন। আর আমরা যে সুখে ছিলাম না, এটা তো তাঁর অজানা ছিল না।’

এ কথা বলতে না বলতে শুয়ে পড়ল বোনের কাছে, ‘আমরা মনে হয় এখানে কিছুক্ষণ নিরাপদে থাকতে পারব।’

এরপর কখন যে ওরা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল টের পেল না।

পরদিন ভোরে তারা আবার ফিরে গেল গতকালের নদীটার কাছে। সেই গাছের ছায়ায় বসে রসালো আম দিয়ে জম্পেশ করে সারল সকালের নাশতা।

এরপর নদীর পাড়ে হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ টনিটোর চোখে পড়ল একটা লোক নদীতে নেমে আঁজলা ভরে পানি খাচ্ছেন। দৃশ্যটি খুঁটে খুঁটে দেখে বিস্ময়-আনন্দে চিৎকার করে উঠল, ‘বাবা, আপনি!’

বাবা চোখ ফিরে তাকিয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন, ‘আমার টনিটো! আমার লুপে! আহারে, বাছারা আমার!’

ছেলেমেয়ে দুটি আনন্দে আটখানা হয়ে ঘিরে ধরল বাবাকে, ‘আপনি এখানে কেন বাবা?’

বাবা মলিন মুখে বললেন, ‘তোদের খুঁজতে বেরিয়েছি সোনা। তা তোরা এভাবে না বলে চলে এলি কেন?’

লুপে এক পা পেছন সরে বলল, ‘বাড়িতে থাকতে খুব ঘৃণা হয়, বাবা। আমরা যা করিনি সেজন্য আমাদের শাস্তি দেওয়া হয়।’

বাবার গলা দুঃখে বুজে এলো, ‘হ্যাঁ, আমিও সেটা ভেবেছি। আর কষ্টটা হলো, এটা আমি ঘটতে দিয়েছি।’

বাবার চোখ পানিতে ভরে গেল। লুপের হাত ধরে বললেন, ‘চল মা, বাড়িতে যাই। কথা দিলাম, এ রকম আর হবে না।’

টনিটো এবার মুখ খুলল, ‘কিন্তু জিনা আর নতুন মায়ের কী হবে! কীভাবে তাদের সামলে রাখবেন?’

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘সেটা আমি অনেক ভেবেছি। তারা যদি না শুধরায়, তাহলে আমরা তিনজনই আমাদের মতো এক হয়ে থাকব।’

লুপে আর টনিটো খুশিতে লাফিয়ে উঠল, ‘সত্যি বাবা!’

বাবা মাথা নেড়ে আনন্দে হাত বাড়িয়ে বাচ্চাদের নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরলেন, ‘হ্যাঁ সোনারা, চলো, এবার বাড়িতে যাই।’

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ