বৃষ্টি-বাদল দেয় দোলা

প্রবন্ধ নিবন্ধ শাহাদাৎ সরকার জুলাই ২০২৪

আষাঢ়-শ্রাবণ এই দুই মাস নিয়ে বাংলাদেশে বর্ষাকাল। ঋতুচক্রে বর্ষার অবস্থান দ্বিতীয়। গ্রীষ্মের দাবদাহের পরে বর্ষার আগমন ঘটে। বর্ষা এসে শুষ্ক ভূপৃষ্ঠকে করে তোলে সরস। শূন্য খাল-বিল-নালা-পুকুর-ডোবা ভরে ওঠে পানিতে। নতুন পানি পেয়ে ভূপৃষ্ঠ হয়ে ওঠে উজ্জীবিত। তাই অন্য ঋতুর তুলনায় এই ঋতুতে প্রকৃতি একটু বেশি সবুজ হয়ে ওঠে। 

বর্ষা ঋতু বিশেষ করে বর্ষা বাংলা ভাষার কবিদের মন ও আবেগকে যেভাবে আলোড়িত করে; আর অন্য কোনো ঋতু তা পারে বলে মনে হয় না। যদিও বাংলা ভাষার কবিরা সব ঋতুকে নিয়ে কবিতা লিখে থাকেন, তবু বর্ষার আবেদন সবার কাছে অন্যরকমের, অন্য মেজাজের। বাংলা সাহিত্যের লেখকদের লেখনীতে বাংলার ষড়ঋতু উজ্জ্বল হয়ে থাকবে চিরকালই। 

বর্ষা নিয়ে প্রাচীনকাল থেকেই সৃজিত হয়েছে কবিতা। কবিদের কবিতায় বর্ষা বন্দনা থাকাটাই স্বাভাবিক। বিষয়বস্তু হিসেবে বর্ষা কমবেশি সকল কবির কবিতায় উপস্থাপিত হয়ে আসছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কবিতায় বর্ষাকে উপস্থাপন করেছেন বিভিন্ন আঙ্গিকে। তাঁর কবিতায় বর্ষার বিচিত্র রূপ প্রকাশ পায়। বর্ষার ঘনকালো মেঘ আকাশকে ঢেকে দিয়ে গুরু গর্জনে যখন নেমে আসে বৃষ্টির অবিরাম ধারা; সে বৃষ্টির ধারা তাকে হাত ধরে নিয়ে যায় শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিময় দিনগুলোতে। রবীন্দ্রনাথের বহু জনপ্রিয় কবিতার মধ্যে অন্যতম ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’, যা বর্ষার দিনে কবি মনকে সিক্ত করে অতীত রোমন্থনে।

তাই বুঝি বৃষ্টি এলেই দুরন্ত শৈশব তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে, আর কবি আক্রান্ত হন নস্টালজিয়ায়; তখনই তাঁর কবিতায় ঝরে পড়ে স্মৃতিকাতরতার বৃষ্টি-

মেঘের খেলা দেখে কত

খেলা পড়ে মনে-

কত দিনের লুকোচুরি

কত ঘরের কোণে।


তারি সাথে মনে পড়ে

ছেলে বেলার গান

বৃষ্টি পড়ে টাপুর-টুপুর

নদেয় এলো বান।


বর্ষা এলেই কবিকে তাড়িত করে অন্য এক আবেগ। বৃষ্টির নির্ঝরণীতে অধিক যেন ব্যাকুল হয়ে ওঠে আবেগতাড়িত কবি মন। জীবন, জীবনের বন্ধন, জগৎ সংসারের পিছুটান তখন কবির কাছে গৌণ হয়ে ওঠে। কবি বর্ষার নির্ঝরণীতে ধুয়ে-মুছে দিতে চান যাবতীয় দুঃখ, যাতনা, বিষাদময় ক্লেদাক্ততা।

এইতো গেল কবি রবীন্দ্রনাথের কথা। বাংলা ভাষাভাষী কবিরা প্রত্যেকেই বর্ষাকে বেশি করে আত্মস্থ করার প্রয়াস চালিয়েছেন। তেমনি আরো বেশি প্রয়াস চালিয়েছেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তার কবিতায়ও বর্ষা ধরা দিয়েছে বিভিন্ন প্রতীকী ব্যঞ্জনায়। বর্ষার প্রকৃতির রূপ মাত্র তিন লাইনে তিনি অনন্য উচ্চতায় তুলে এনেছেন তাঁর দেশাত্মবোধক গানে। দেখা যাক সেই চরণগুলো-

রিম ঝিম্ রিম ঝিম ঐ নামিল দেয়া

শুনি’ শিহরে কদম, বিদরে কেয়া।

ঝিলে শাপলা কমল

ওই মলিল দল,

মেঘ-অন্ধ গগন, বন্ধ খেয়া

নামিল দেয়া।

 বর্ষা নিয়ে জসীমউদ্দীনও বাদ যাননি। বাদ যাওয়ার কথাও না! তিনি যে পল্লীকবি! ‘পল্লী-বর্ষা’ কবিতায় তিনি বর্ষার অলস সময়ের কর্মচিত্র এঁকেছেন এভাবে- 

গাঁয়ের চাষীরা মিলিয়াছে আসি মোড়লের দলিজায় 

গল্প গানে কি জাগাইতে চাহে আজিকার দিনটায়! 

কেউ বসে বসে কাখারী চাঁচিছে, কেউ পাকাইছে রশি; 

কেউবা নতুন দোয়াড়ীর গায়ে চাকা বাঁধে কষি কষি। 

মাঝখানে বসে গাঁয়ের বৃদ্ধ, করুণ ভাটীর সুরে 

আমির সাধুর কাহিনী কহিছে সারাটি দলিজা জুড়ে। 

বাহিরে নাচিছে ঝর ঝর জল, গুরু মেঘ ডাকে, 

এসবের মাঝে রূপ-কথা যেন আর রূপ আঁকে।’

কবি ফররুখ আহমদও বর্ষা আর বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন অসাধারণ কিশোর কবিতা। তাঁর ‘বৃষ্টির গান’ কবিতাটি পড়েনি এমন পাঠক পাওয়া দুষ্কর। সকলের জন্য তুলে দিচ্ছি সে কবিতা-

বৃষ্টি এলো কাশবনে

জাগলো সাড়া ঘাসবনে

বকের সারি কোথায় রে

লুকিয়ে গেলো বাঁশবনে।


নদীতে নাই খেয়া যে

ডাকলো দূরে দেয়া যে

কোন সে বনের আড়ালে

ফুটলো আবার কেয়া যে।

গাঁয়ের নামটি হাটখোলা

বৃষ্টি-বাদল দেয় দোলা

রাখাল ছেলে মেঘ দেখে

যায় দাঁড়িয়ে পথ ভোলা।


মেঘের আঁধার মন টানে

যায় সে ছুটে কোনখানে

আউশ ধানের মাঠ ছেড়ে

আমন ধানের মাঠ পানে।

শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, ওমর আলী, নির্মলেন্দু গুণ, আসাদ চৌধুরীসহ বাংলাদেশের প্রায় সকল কবিদের কবিতায় বর্ষাবন্দনা ফুঠে উঠেছে অনবদ্যভাবে। এমন কোনো কবিকে খুঁজে পাওয়া যাবে না বর্ষার ঘনকালো মেঘ যার মনকে আচ্ছন্ন করেনি।

কবি সাজজাদ হোসাইন খান মেঘ থেকে বিষ্টি ঝরে পড়ার চিত্র এঁকেছেন উপমায়। সে মেঘ হয়ে উঠেছে মেঘপরী। এই যে মেঘপরীর উপমা আনলেন এটা তাঁর কিশোরসুলভ মনের পরিচয় বহন করে। কারণ আমরা যখন আকাশ দেখি তাতে নানা রকম ছবি ভেসে থাকতে দেখি। সেই দেখাটা আরো মজাদার শৈশবে। সেই শৈশব দেখা মেঘকে তুলে আনেন মেঘপরীতে। আর পরীর ডানাতে করে বৃষ্টি নিয়ে বেড়ায় এবং ঢেলে দেয়। সে দৃশ্য তুলে ধরেছেন-

মেঘপরীদের পাখায়

বিষ্টি ঝরে ঝাঁকায়

সেই ঝাঁকাটা করলো উপুড়

ধুলার শহর ঢাকায়।

সমকালীন সময়ে প্রায় প্রত্যেক কবিই বৃষ্টি নিয়ে সুন্দর সুন্দর ছড়া-কবিতা লিখেছেন ও লিখে যাচ্ছেন।

ঘন বর্ষার শ্রাবণের মেঘ যখন দলবেঁধে আকাশে উড়ে বেড়ায় সে মেঘের সাথেও কবি, অকবি সকল ভাবপ্রবণ মানুষের মনও কল্পনার জগতে উড়ে বেড়ায়। তখন মানুষের মনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনাগুলো যেন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে মেঘের শরীরে। দক্ষিণের আকাশে জমাট বাঁধা কালো মেঘ যখন বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে, তখন মনে হয় বৃষ্টি বুঝি তার কান্না হয়ে ঝরে পড়ছে। তাই সে তার জীবনের সব কষ্ট ও মনস্তাপকে বৃষ্টির সঙ্গে একাকার করে ফেলে। সেই মুহূর্তে বর্ষার বৃষ্টিকে বড়ো বেশি সমব্যথী মনে হয় একজন বিরহকাতর মানুষের কাছে, সে কবি হোক বা না-ই হোক।



আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ