মহাকাশযান পার্কার
বিজ্ঞান ফারদিন সাদিক জানুয়ারি ২০২৫
মানব তৈরি সবচেয়ে দ্রুতগামী যন্ত্র নাসার মহাকাশযান পার্কার। নাসার পার্কার সোলার প্রোব তৈরির একমাত্র লক্ষ্য সূর্যের কাছাকাছি পৌঁছানো। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তৈরি পার্কার সোলার প্রোব গতির দিক থেকে সব রেকর্ড ভেঙে এগিয়ে। এর আগে মানুষের তৈরি কোনো বস্তুর গতি এত বেশি হয়নি।
সোলারপ্রোব ১১ বার সূর্যের একদম কাছাকাছি গিয়েছে। সম্প্রতি সূর্যের কাছাকাছি গিয়ে সৌরকণার গনগনে আঁচ অনুভব করেছে পার্কার মহাকাশযান। সৌরকণার উত্তাপ অনুভব করে এই মহাকাশযানের মাধ্যমে জানা গেছে, সূর্যের এই উষ্ণতা প্রায় ৭৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সমান।
সূর্য কীভাবে গঠন হয়েছে, আমাদের সৌরমণ্ডলের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র কীভাবে কাজ করে তা গভীরভাবে বোঝার জন্যই এই পার্কার। সূর্যের এভাবে কাছাকাছি যাওয়াকে বলা হয় পেরিহিলিয়ন।
শুক্রের মহাকর্ষকে কাজে লাগিয়ে সূর্যের জ্বলন্ত পৃষ্ঠের কাছ দিয়ে ছুটে গেছে নভোযানটি। শুক্র গ্রহের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় ঘণ্টায় ছয় লাখ ৩৫ হাজার ২৬৬ কিলোমিটার গতিবেগ অর্জন করে পার্কার সোলার প্রোব। এরপর নভোযানটি সৌরপৃষ্ঠের মাত্র সাড়ে ৭২.৬ লাখ কিলোমিটারের কাছে পৌঁছায়। এই প্রথম সূর্যের এত কাছে পৌঁছাতে পেরেছে যন্ত্রটি।
পার্কার প্রকল্পের বিজ্ঞানী ড. নুর রাওফি বলেন, ‘আমরা বলতে গেলে একটি নক্ষত্রের ওপর অবতরণ করছি।’ জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লায়েড ফিজিক্স ল্যাবরেটরির এই বিজ্ঞানী বলেন, ‘এটি মানব ইতিহাসের একটি স্মরণীয় অর্জন হবে। এটি ১৯৬৯ সালের চাঁদে অবতরণের সমতুল্য।’
পার্কারের গতি সূর্যের বিশাল মহাকর্ষীয় টানের কারণে বৃদ্ধি পাবে। এই গতি হবে ৩০ সেকেন্ডের কম সময়ের মধ্যে নিউ ইয়র্ক থেকে লন্ডনে উড়ে যাওয়ার মতো।
নাসার পার্কার সোলার প্রোব এখন পর্যন্ত করা সবচেয়ে সাহসী মিশনগুলোর একটি। ২০১৮ সাল থেকে চালু করা এই মিশনের লক্ষ্য হচ্ছে, ক্রমাগত সূর্যের পাশ দিয়ে যাওয়া এবং প্রতিবার আগের বারের থেকে আরও কাছ দিয়ে যাওয়া।
তবে কাজটি করার জন্য পার্কারকে বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রোবটি সূর্যের কাছাকাছি যে কক্ষপথে অবস্থান করবে, সেখানে এর সামনের তাপমাত্রা ১ হাজার ৪০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে গিয়ে দাঁড়াবে। তাই পার্কারের পরিকল্পনা হচ্ছে, দ্রুত কক্ষপথে প্রবেশ করে দ্রুত বেরিয়ে আসা।
মেরিল্যান্ডের গ্রিনবেল্টে অবস্থিত নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের পার্কার সোলার প্রোব প্রকল্পের বিজ্ঞানী অ্যাডাম সাবো এই মিশনকে প্রকৌশলের বড় ধরনের অর্জন বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি মনে করেন, এই মিশনের মাধ্যমে সূর্য সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের পরিধি আরও বিস্তৃত হবে। সৌরজগতের গঠন ও বিবর্তন সম্পর্কে আমাদের বোঝার ক্ষমতা বাড়বে।
পার্কার সোলার প্রোবের এই অভিযান সৌর পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এই মিশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা সূর্যের অভ্যন্তরীণ কার্যকলাপ, সৌরঝড়ের উৎপত্তি ও এর প্রভাব সম্পর্কে আরও জানতে পারবেন। এই তথ্য পৃথিবীকে সৌরঝড়ের প্রভাব থেকে রক্ষায় নতুন প্রযুক্তি বিকাশে সাহায্য করবে।
এর আগে, ২০২১ সালে নভোযানটি সূর্যের পাশ দিয়ে উড়ে গিয়েছিল ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৮৬৩ কিলোমিটার বেগে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ২০২৪ সালে নভেম্বরে শেষবারের মতো শুক্র গ্রহের পাশ দিয়ে উড়বে পার্কার। ফলে, এর বর্তমান সর্বোচ্চ গতির রেকর্ডও ভেঙে যেতে পারে। সেসময় নভোযানটি সৌরপৃষ্ঠের ৬১.৬ লাখ কিলোমিটারের মধ্যে চলে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সূর্যের বাইরের অঞ্চল অর্থাৎ করোনা অঞ্চল সম্পর্কে বিশদভাবে জানার জন্য নাসা এ অভিযান পরিচালনা করছে। সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডল ‘করোনা’ নামে পরিচিত। এই প্রোবের সাহায্যে করোনার কার্যকারিতা আমাদের কাছে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
মনে হতে পারে যে, নক্ষত্রের পারমাণবিক কেন্দ্র থেকে দূরত্বের সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা হ্রাস পায়। কিন্তু করোনায় একটি অদ্ভুত বিষয় ঘটে। যেখানে সূর্যের আলোকমণ্ডল বা পৃষ্ঠের তাপমাত্রা মোটামুটি ৬ হাজার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। সেখানে করোনার তাপমাত্রা মিলিয়ন ডিগ্রি কিংবা তারও বেশি হতে পারে।
করোনা অঞ্চলে চার্জযুক্ত ইলেকট্রন, প্রোটন এবং ভারী আয়নের কণাগুলোর বহির্মুখী প্রবাহ প্রতি সেকেন্ডে ৪০০ কিলোমিটার বা ঘণ্টায় ১০ লাখ মাইল বেগে গতিশীল একটি সুপারসনিক বাতাসে ত্বরান্বিত হয়। বিজ্ঞানীরা এখনো এর কারণ পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারেননি।
সূর্যের এই কণা এবং চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তিশালী অগ্ন্যুৎপাত পৃথিবীতেও প্রভাব ফেলতে পারে। এটি পৃথিবীর যোগাযোগ অবকাঠামোর অবনতি ঘটাতে পারে এবং এমনকি পাওয়ার গ্রিডগুলোকেও নষ্ট করে দিতে পারে। এছাড়া, বিকিরণ মহাকাশচারীদের স্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে। তাই সৌর বিষয়ক পূর্বাভাস এবং মহাকাশের আবহাওয়া বোঝার জন্য এই বিষয়ে জানা জরুরি।
এই অভিযানটির মেয়াদকাল ৭ বছর। বিগত পাঁচ বছর ধরে পার্কার সোলার প্রোব সূর্যকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকবার ঘুরেছে। পাঠিয়েছে নানা তথ্য। সূর্যের করোনার মধ্যে দিয়ে কীভাবে তাপ চলাচল করে, সৌরপৃষ্ঠের প্লাজমা এবং চৌম্বকক্ষেত্রগুলো কীভাবে পরিবর্তিত হয় এবং সৌরবায়ুর ওপর এসব কিছুর প্রভাব কেমন- তা জানা যাবে পার্কারের পাঠানো তথ্য থেকে। গবেষকরা আশা করছেন, এটি আমাদের সৌর প্রক্রিয়া সম্পর্কে যুগান্তকারী কিছু মৌলিক জ্ঞান দেবে।
আরও পড়ুন...