মিতুল ও কচুরিপানা ফুল
তোমাদের গল্প সাঈদুর রহমান লিটন অক্টোবর ২০২৪
মিতুলদের বাড়ি গ্রামে। ওদের বাড়ি থেকে কয়েকশো মিটার দূরে বয়ে গেছে একটি নদী। নদীর নাম কুমার নদী। নদীটি এখন মরা নদী নামে পরিচিত। নদীটিতে বর্ষা মৌসুমেই শুধু পানি থাকে। বছরের বেশির ভাগ সময়ে পানি থাকে না। শুধুমাত্র কোথাও কোথাও পানি জমে থাকে। পানি ও একটা দেখা যায় না। কচুরিপানায় ভর্তি থাকে। বড়ো বড়ো কচুরিপানা পানা। দেখতে ভালোই লাগে। সবুজের গালিচা মনে হয়। শীতের শেষের দিকে পানি একেবারেই থাকে না। শুকিয়ে যায়। তখন কচুরিপানার ফুল ফুটতে থাকে। দেখতে দারুণ সুন্দর লাগে। উজ্জ্বল ছাই বর্ণের সাথে মাঝে গাঢ় নীলে বিভিন্ন শাখা প্রশাখার সাথে পাপড়িগুলো আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। তখন মানুষের মন কেড়ে নেয়। কচুরিপানা ফুলের কোনো ঘ্রাণ নেই। সুগন্ধ বা দুর্গন্ধ কিছুই নেই। তবে রূপ লাবণ্যে যে-কোনো ফুলের সাথে টেক্কা দিতে পারে।
মিতুলের এই ফুল দেখতে সব অপেক্ষা সুন্দর মনে হয়।
মিতুল স্কুলের ক্লাস বাদ দিয়ে মরা কুমার নদীর পাড়ে বসে থাকে। এখন অবশ্য সেই নদীর পাড় নেই। প্রায় জমির আইলের মতো হয়ে গেছে। নদীর পাড়ের জমির মালিকেরা জমির আইল কাটতে কাটতে নদীর পাড় এখন নদীর আইল হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিতুল ওখানেই বসে থাকে। নদীটি একটি ফাঁকা মাঠের মধ্যে আঁকাবাঁকা হয়ে সাপের মতো বয়ে গেছে। সেখানে একটা ছোট বটগাছ আছে। সেই বটগাছের শিকড়ের ওপর মাঝে মধ্যে বসে থাকে। বটগাছের ছায়ায় বসে বসে কচুরিপানা ফুলের রূপ রস গন্ধ অবলোকন করে।
ফুলের মোহ মিতুলকে বিদ্যুৎ বেগে টানে।
স্কুল ছুটি হয়ে যায় তবুও সে ফেরে না। তার কোনো বন্ধুকে দিয়ে বই খাতা কলম বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। স্কুল মিতুলের বাড়ির কাছেই। মিতুলের মাকে এ নিয়ে স্কুলে অনেক কথা শুনতে হয়েছে।
মিতুলের বাবা শহরে থাকে। একটা কোম্পানিতে চাকুরি করে। তাই মিতুলের মা-ই মিতুলের অভিভাবক। মিতুলের দেখাশোনা তারই করতে হয়।
মিতুল তো মাকে বলে, আর নদীর পাড়ে যাবে না। আবার পরক্ষণেই চলে যায়। কচুরি ফুল তাকে টানে।
ঘরে থাকতে পারে না।
কার্টুন, ছবি আঁকা ভালো লাগে না। শুধু তার ভালো লাগে কুমার নদীর পাড়, সেই বটগাছের ছায়া, কচুরিপানা ফুল। নিজের মনের অজান্তেই হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় কচুরি ফুলের কাছে।
সেদিন মিতুল মুখ কালো করে বাড়ি শুয়ে আছে। কোথাও যায়নি। স্কুলেও না। চোখে পানি। সারাদিন কেটে গেল শুয়ে থেকে। মিতুলের মা মিতুলের কাছে গিয়ে মিতুলের মাথায় হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কী হয়েছে বাবা?
মিতুল হাউমাউ করে কেঁদে দিলো। এভাবে অনেকক্ষণ কাঁদলো। কিছু বলতে পারলো না। ওর মা ওকে বারবার কান্না থামাতে চেষ্টা করলো। কিন্তু মিতুল কান্না করেই যাচ্ছে।
মিতুলের কী হয়েছে ওর মা বুঝে ওঠে না। একবার মিতুল শান্ত হয়। তবুও মিতুল কিছু বলে না।
মিতুল তার মাকে হাত ধরে নদীর পাড়ে নদীর ওখানে নিয়ে যায়। মিতুল পাগলের মতো হাঁফাতে থাকে। মিতুলের অবুঝ চোখ দিয়ে গরম পানির স্রোত বেরিয়ে যাচ্ছে। মিতুল বলে, দেখো মা দেখো।
মিতুলের মা দেখলো, নদীর মাঝের সমস্ত ফুল নেতিয়ে পড়েছে, কচুরিপানার ফুল ও পাতায় কে যেন ঔষধ ছিটিয়ে দিয়েছে। কচুরিপানা মরে যাচ্ছে। একটা গাছও জীবিত নেই। একটা ফুলও হাসছে না। শুধুই ফুলের ডাঁটা দাঁড়িয়ে আছে।
মিতুল উচ্চ স্বরে কাঁদতে থাকে। গগন বিদারি কান্না।
আরও পড়ুন...