মেটাভার্স : এক নতুন জগৎ
আইটি কর্নার নাদিম নওশাদ জুন ২০২৪
আসসালামুআলাইকুম বন্ধুরা কেমন আছো সবাই? আশা করি অনেক অনেক ভালো আছো। বর্তমান পৃথিবী প্রযুক্তিতে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে করে মানুষের কার্যসম্পাদন অনেক সহজ হচ্ছে। প্রযুক্তির এই প্রসারে মানুষের কাজগুলো সহজতর হলেও ব্যস্ততা কিন্তু মোটেও কমেনি। বরং বেড়েই চলেছে। মানুষ তাদের মূল্যবান সময়কে অন্যান্য কাজে ব্যয় করছে। যার ফলে মানুষ আরও বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
এই ব্যস্ত দুনিয়াতে যেখানে একে অপরের সাথে কথা বলার সময় পেতেই হিমসিম খেতে হয়, সেখানে দেখা করা, দোকানে গিয়ে কেনাকাটা করা কিংবা অনেক দূরের পথ পাড়ি দিয়ে কোনো ব্যবসায়িক আলোচনায় অংশগ্রহণ করা অনেক কষ্টসাধ্য বিষয়। এই সমস্ত সমস্যা দূর করতেই মেটাভার্সের উদ্ভাবন হয়েছে। মেটাভার্স হলো এমন একটা প্রযুক্তি যেটা ভার্চুয়াল রিয়েলিটি এবং অগমেন্টেড রিয়েলিটির মতো প্রযুক্তির মিশ্রণ। মেটাভার্স-এর সম্পর্কে প্রথম ধারণা পাওয়া যায় ১৯৯২ সালে। “ঝহড়ি ঈৎধংয” নামক একটা সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস থেকে। যার লেখক- নীল স্টিপেনসন। মেটাভার্স ব্যবহার করে মানুষ ভার্চুয়ালি নিজেকে অন্য একটা জগতে শারীরিক ও মানসিকভাবে কল্পনা করতে পারে।
আরো সহজ করে চলো বোঝার চেষ্টা করি। মনে করো তুমি তোমার বাড়িতে আছো। তোমাকে সকাল ৯ টায় স্কুলে যেতে হবে। তুমি তাহলে সকাল ৭টায় ঘুম থেকে উঠে ৮টার মধ্যে প্রস্তুত হবে। এরপর ৯টার আগেই স্কুলে হাজির হবে। কিন্তু মেটাভার্স প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাড়িতেই ভারচুয়ালি ক্লাসরুমে বসে ক্লাস করতে পারবে। ঠিক যেমন সত্যিকারের ক্লাসরুমে বসে ক্লাস করতে। মজার না বিষয়টা!
মেটাভার্সে ব্যবহৃত ডিভাইসসমূহ
মোবাইল : মোবাইলের নাম শুনে তোমরা নিশ্চয় অবাক হয়েছো! হ্যাঁ। মোবাইলের মাধ্যমে আমরা খুব সহজেই মেটাভার্সের দুনিয়ায় ডুব দিতে পারি। যদিও মোবাইলের সক্ষমতার ওপরেও মেটাভার্সের ব্যবহার নির্ভর করে, তবে অনেক বড়ো বড়ো ও জনপ্রিয় মেটাভার্স, যেমন : “The Sandbox” এবং “Axie Infinity”, মোবাইলে ব্যবহার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। এছাড়াও বর্তমানে মোবাইল কোম্পানিগুলোও মেটাভার্সের কথা মাথায় রেখে উন্নতমানের চিপ দিয়ে মোবাইল তৈরি করছে।
কম্পিউটার : কম্পিউটার ব্যবহারের মাধ্যমে মেটাভার্স প্রযুক্তির পূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জন করা সম্ভব। তবে এর জন্য কম্পিউটারে ভালো গ্রাফিক্স কার্ড, কম্পিউটিং সক্ষমতা, মেমোরি ও নেটওয়ার্ক অবকাঠামো প্রয়োজন।
অগমেন্টেড রিয়েলিটি চশমা : অগমেন্টেড রিয়েলিটি ইতোমধ্যেই বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। আমরা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের সহ বিভিন্ন অ্যাপস এ যে ফিলটারগুলো দেখি, সেগুলো অগমেন্টেড রিয়েলিটির কিছু উদাহরণ। অগমেন্টেড রিয়েলিটি চশমা এই ফিচারগুলোকে আরও উন্নতভাবে মেটাভার্সের দুনিয়ায় প্রবেশে সহায়তা করছে।
ভার্চুয়াল রিয়েলিটি হেডসেট : ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ভালোভাবে অনুভবের জন্যে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি হেডসেট অন্যতম প্রধান গ্যাজেট। এটা ব্যবহারের মাধ্যমে একজন মানুষ নিজেকে ভার্চুয়াল জগতের পুরোপুরি স্বাদ গ্রহণে সক্ষম। মোবাইল বা অগমেন্টেড রিয়েলিটির থেকে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি মানুষকে মেটাভার্সের সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতা প্রদান করে।
প্রাত্যহিক জীবনে মেটাভার্সের ব্যবহার
আমাদের প্রতিদিনকার জীবনে মেটাভার্স ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং মানুষের কাছে এর জনপ্রিয়তা দিনদিন বেড়েই চলেছে। বর্তমানে মেটাভার্স প্রযুক্তি শপিং করা, মানুষের সাথে কথোপকথন, গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক মিটিং, বিভিন্ন গেমস খেলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। মূলত মানুষের ব্যস্ততম জীবনে যোগাযোগ, বিনোদন, কেনাকাটার মতো কাজগুলোকে আরও মনপূত করার জন্য মেটাভার্স ব্যবহার হচ্ছে যা এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।
মেটাভার্সের বর্তমান অবস্থা
আধুনিক বিশ্বে প্রযুক্তির প্রতিযোগিতায় মেটাভার্স গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। বিশ্বের বড়ো বড়ো টেক কোম্পানিগুলো এখন মেটাভার্সের টেকনোলজি প্রতিষ্ঠার জন্যে অর্থ বিনিয়োগ করছে। মেটাভার্সের ফলে বিভিন্ন সেমিনার, বেচা-কেনা, বিভিন্ন ব্যবসায়িক আলোচনা এবং উপস্থাপনা ভার্চুয়ালি করা সম্ভব হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দেওযার জন্যও মেটাভার্স প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। ভার্চুয়াল এবং অগমেন্টেড রিয়েলিটির কার্যক্ষমতা বাড়াতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হচ্ছে যা মেটাভার্সের কার্যক্ষমতা আরও বাড়িয়ে দেবে। এছাড়াও নতুন নতুন প্রযুক্তি যেমন : “Eye Tracking” ভার্চুয়াল জগতকে আরও বাস্তবময় করে তুলেছে। গুগল ও নাসার মতো প্রতিষ্ঠানে মেটাভার্স প্রযুক্তির ব্যবহার দিনদিন বেড়ে চলেছে।
মেটাভার্স প্রযুক্তির সমস্যা
অনেক গবেষক মেটাভার্স প্রযুক্তিকে স্বাগত জানালেও অনেকে এই প্রযুক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যেহেতু মেটাভার্স বাস্তব জীবনের মতো একটা ভার্চুয়াল জগৎ, সেহেতু তথ্য, যেমন : ব্যাংকিং সংক্রান্ত তথ্য, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক তথ্য, ব্যবসা সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করা অনেক বেশি কষ্টকর হবে। এছাড়া সাইবার সিকিউরিটির সমস্যাও প্রকট হতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন। কিছু প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যে, মেটাভার্স প্রযুক্তি যেহেতু মানুষের বাস্তব জগতের কাছাকাছি, সেহেতু এটা মানুষের সামান্যতম গতিবিধিও সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এর ফলে একটা মানুষ কি ধরণের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে গ্রহণ করতে পারে তা নির্ভুলভাবে আন্দাজ করা সম্ভব হবে। মানে, তুমি কোনো বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারো তা সঠিকভাবে বলে দেওয়া সম্ভব হবে। ভাবতে পারো! এমনটা হলে এটা কতটা ভয়ংকর হতে পারে!
মেটাভার্স প্রযুক্তির ভালো এবং খারাপ দিকগুলো নিয়ে বর্তমানে বিশ্বের জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিবর্গরা অনেক আলোচনা ও সমালোচনা করছেন। মেটাভার্স বর্তমান বিশ্বের যুগান্তকারী আবিষ্কারগুলোর মধ্যে অন্যতম হলেও থেকে উদ্ভূত সমস্যাগুলোও গুরুতর। বিজ্ঞানীরা এই সমস্যাগুলোর সমাধানে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। হয়তো ভবিষ্যতে আমরা মেটাভার্সের একটা আলাদা নতুন জগৎ দেখতে পাবো।
আরও পড়ুন...