রক্তাক্ত জলপ্রপাত
বিজ্ঞান শিশির আহমেদ অক্টোবর ২০২৪
চারিদিক বরফে আচ্ছাদিত। তার মাঝে ঝরে পড়ছে লাল রক্ত। গাঢ় লাল রঙের সেই রক্ত যেন বরফাবৃত পাহাড়ের বুক চিরে বের হচ্ছে। নাম ব্লাড ফলস। অর্থ রক্তের ঝরনা।
অ্যান্টার্কটিকার সাদা বরফের মাঝে অবস্থিত এই রক্তের ঝরনা! হঠাৎ করে দেখে যে কেউ ভয় পেতে পারে। বিশাল বরফে মোড়ানো পাহাড় থেকে ঝরনা দিয়ে পানির বদলে পড়ছে লাল রক্ত। অবাক করা বিষয় হলো হিমাঙ্কের নিচে যেখানে সবকিছু জমে যাওয়ার কথা সেখানে লাল রক্তের মতো পানির ধারা প্রবহমান! যুগ যুগ ধরে এখানে উপস্থিত টেলর হিমবাহ থেকে রক্তের ঝরনা বয়ে চলেছে।
পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার ভিক্টোরিয়া ল্যান্ডে অবস্থিত এই উপত্যকা প্রথম সামনে আসে ১৯১১ সালে। ১৯১১ সালে অস্ট্রেলিয়ান ভূতাত্ত্বিক গ্রিফিথ টেলর প্রথম খুঁজে পেয়েছিলেন এই রক্ত ঝরনাটি। এটি মূলত আয়রন অক্সাইড মিশ্রিত লবণাক্ত পানির উপত্যকা যা পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার টমাস গ্লেসিয়া থেকে প্রবাহিত হচ্ছে।
ব্রিটিশ অভিযাত্রী টমাস এবং তার সহকর্মীরা এই লাল রংটিকে শৈবাল হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন। কিন্তু পরে জানা যায় সেখানে এমন কোনো লাল শৈবাল ছিল না। বরং প্রচুর পরিমাণে লোহা জমেই এই গাঢ় লাল রং তৈরি হয়েছে। গবেষণা মতে এই লাল রঙের পানির উৎস মূলত অতিরিক্ত লবণ আর খনিজ লোহার মিশ্রণ যা বাতাসের সাথে বিক্রিয়া করে লাল রং ধারণ করে। লোহায় মরিচা ধরলে যেমন লাল রং হয়ে যায়, ঠিক একইভাবে এই পানি লাল রং ধারণ করে। আয়রনযুক্ত লোনা পানি যখন বাতাসের সাথে মিশে তখন বাতাসের অক্সিজেনের সাথে আয়রন বিক্রিয়া করে পানির রং লাল হয়ে যায়।
জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞানী কেন লেভি বলেছেন, “আমি মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে গবেষণা করে দেখেছি, এতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লোহার টুকরো রয়েছে। এমনকি এতে লোহা ছাড়াও বিভিন্ন উপাদান রয়েছে। এছাড়াও হিমবাহের নিচে রয়েছে ফেরিক হাইড্রোক্সাইড। তাদের সঙ্গে বসবাস করে অণুজীব। সেই সব কিছু বিক্রিয়ার কারণেই কারণে লাল রঙের ফোয়ারা তৈরি হয়েছে।”
বিজ্ঞানীদের মতে লাল রঙের মাধ্যমে বোঝা যায় যে এই হিমবাহের নিচে জীবনের বিকাশ ঘটছে। এই হিমবাহের পানি লবণাক্ত, যা একটি অতি প্রাচীন বাস্তুতন্ত্রের অংশ বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
এমন প্রতিকূল পরিবেশ যেখানে অক্সিজেন প্রায় নেই, সূর্যের আলো পৌঁছায় না, বরফে ঢাকা থাকায় তাপমাত্রা হিমাঙ্কের অনেক নিচে থাকে সবসময়, সেখানেও রয়েছে প্রাণের সন্ধান।
জায়গাটি বিরল সাবগ্লাসিয়াল ইকোসিস্টেমের ব্যাকটেরিয়ার আবাসস্থল। এই ব্যাকটেরিয়া এমন জায়গায় বেঁচে থাকে, যেখানে অক্সিজেন নেই। এ বিষয়ে বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, রক্তবর্ণের জলপ্রপাতে লোহার পাশাপাশি সিলিকন, ক্যালসিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম ও সোডিয়ামের কণা রয়েছে।
প্রায় ২০ লক্ষ বছর আগে ওই অঞ্চলে বিশালাকার একটি হ্রদ ছিল। পরবর্তীকালে যা হিমবাহের নিচে চাপা পড়ে যায়। আলাস্কা ফেয়ারব্যাংক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা আবিষ্কার করেছেন যে, এই রক্ত ঝরনা প্রবাহিত হচ্ছে প্রায় ১৫ লক্ষ বছর ধরে যা আসলেই বিস্ময়কর।
পর্যটক এবং বিজ্ঞানীরা এই রক্ত ঝরনা দেখার জন্য ভিড় জমান উপত্যকায়। যদিও উপত্যকায় পৌঁছানোর রাস্তা খুবই দুর্গম। তবুও অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়দের জন্য আকর্ষণীয় অ্যান্টার্কটিকার সাদা বরফে ঢাকা এই রহস্যঘেরা রক্তের ঝরনাটি।
আরও পড়ুন...