রাসূল আমার ভালোবাসা

প্রচ্ছদ রচনা মুহাম্মদ আবু সুফিয়ান সেপ্টেম্বর ২০২৫

৫৭০ সাল। আল্লাহর প্রিয় নবী ইবরাহিম (আ)-এর বংশধারায় জন্ম নিলেন শেষ নবী মুহাম্মাদ (সা)। আরবের মক্কা নগরী ছিল তাঁর জন্মভূমি। এখানেই তিনি বড়ো হয়েছেন। শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের দিনগুলো কাটিয়েছেন। 

ছোটকালে মুহাম্মাদ (সা) ছিলেন এতিম। তাঁর বাবা মারা গেছেন জন্মের কয়েক মাস আগে। আর মা-ও মারা গেছেন ছোটবেলায়। তারপর কিছুটা বড়ো হয়েছেন দাদার কাছে। আট বছর বয়সে দাদাও চলে গেলেন দুনিয়ার ওপারে। এরপর চাচা আবু তালিবের আশ্রয়ে কেটেছে তাঁর কৈশোর। শৈশব ও কৈশোরের এতিম অবস্থায় কাটানো দিনগুলো তাঁর মনকে করেছে নরম ও কোমল। করেছে শিশুদের প্রতি দরদি। কিশোরদের প্রতি ভালোবাসায় পূর্ণ। শিশু-কিশোরদের তিনি ভালোবাসতেন হৃদয় উজাড় করে। আর এতিমদের জন্য তো তিনি ছিলেন সবুজ বটগাছের মতো মাথার ছায়া। রাসূল (সা) ছিলেন এক পরশমণি। তাঁর সাহচর্যে যারাই এসেছেন, তাঁরাই হয়ে উঠেছিলেন সকল দিক দিয়ে অসাধারণ।

নবীজি যেমন শিশু-কিশোরদের ভালোবাসতেন, তেমনি শিশু-কিশোররাও তাঁকে ভালোবাসতেন। শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর সাথে কাজ করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তেন। তাইতো আমরা দেখি, নবীজি যখন আল্লাহর দীনের পথে মানুষকে ডাকা শুরু করলেন, তখন একেবারে শুরুর দিকে তাঁর সাথী হয়েছেন সত্যপ্রিয় কিশোর আলী। 

নবুয়তের দায়িত্ব পাওয়ার পর নবী (সা) তাঁর মিশন শুরু করলেন। আর বসে থাকার সুযোগ নেই। মানুষকে ডাকতে হবে আল্লাহর পথে। সত্যের পথে। সে ডাকে যারা সাড়া দেবে, তাদের শিক্ষা দিতে হবে আল কুরআন। তাদের গড়ে তুলতে হবে ফুলের মতো সুন্দর চরিত্রে। তাদের সংগঠিত করতে হবে। ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। আর সকলে মিলে পালটে দিতে হবে সমাজকে। অন্যায়কে রুখে দিতে হবে। ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অসহায়ের পাশে দাঁড়াতে হবে। জালিমের প্রতিরোধ করতে হবে। 

মহানবী মুহাম্মাদ (সা) ঠিক করলেন, প্রথমে তিনি তাঁর আত্মীয়-স্বজন ও কাছের মানুষদের ইসলামের দাওয়াত দেবেন। সবাইকে বলবেন আল্লাহর দীনের কথা। হয়তো তারা এই আহ্বানে সাড়া দেবে। যেই ভাবা সে-ই কাজ। তিনি আত্মীয়-স্বজনকে তাঁর বাড়িতে খাবারের দাওয়াত দিলেন। সকলেই এলো। মেহমানদের আগমনে পুরো বাড়ি গমগম করতে লাগল। পরিবেশন করা হলো সুস্বাদু খাবার। সকলে খুশিমনে খাওয়াদাওয়া করল। খোশগল্পও হলো অনেক। এরপর মুহাম্মাদ (সা) কথা বলার জন্য দাঁড়ালেন। তিনি দরদি মন নিয়ে বললেন-আমি তোমাদের ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। আমি যা নিয়ে এসেছি, তা দুনিয়ার জন্যও কল্যাণকর, আখিরাতের জন্যও কল্যাণকর। এ পথে তোমাদের মধ্যে কে কে আমার সঙ্গী হবে? 

এতক্ষণের কোলাহল যেন এক নিমিষেই থেমে গেল। নীরব হয়ে গেল সবাই। কেউ সাহস করল না। কেউ এগিয়ে এলো না। সমাজের অপকর্মের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে কে? সকলের শত্রু হবে কে? এমন সাহস কয়জনেরই-বা আছে। তাই সকলে নীরব হয়ে থাকল। কিন্তু একটু পরই দেখা গেল এক কিশোর এগিয়ে আসছে। কতই-বা বয়স হবে তার? নয়-দশ বছর হতে পারে। কিশোরের পাগুলো দুর্বল লিকলিকে। চোখের অসুখে চোখ দুটোও পিটপিট করছে। সেই কিশোরের নাম আলী। মুহাম্মাদ (সা)-এর চাচাতো ভাই। বনু হাশিমের নেতা আবু তালিবের ছেলে। কিশোর আলী সবার সামনে এসে দাঁড়াল। দৃঢ়কণ্ঠে সে বলতে লাগল-আমি এখানে সবার ছোট। আমার শরীরও দুর্বল। তারপরও আমি এ পথে আপনার সঙ্গী হব। আপনাকে আমি সাহায্য করব।

কী সাহসী উচ্চারণ আলীর! কী দৃপ্ত কণ্ঠ এই কিশোরের। কী এক সাহসের ঝিলিক তাঁর চেহারায়। 

আলী (রা) তাঁর এই ঘোষণা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন সারাজীবন। সারাজীবন তিনি নবীজির সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। একটি ইনসাফের সমাজ গড়ার কাজে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। দরদি শিক্ষক হিসেবে মানুষকে দিয়েছেন ইসলামের শিক্ষা। যুদ্ধের মাঠে সাহসী যোদ্ধা হিসেবে লড়েছেন। বিচারক হিসেবে ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করেছেন। আর সবশেষে ইসলামের চতুর্থ খলিফা হিসেবে পরিচালনা করেছেন রাষ্ট্রও।

মহানবী মুহাম্মাদ (সা) যখন মক্কায় নির্যাতিত হচ্ছিলেন, তখন তাঁর কিশোরী মেয়ে ফাতিমা ছিলেন তাঁর কষ্টের অংশীদার। নবীজি যখন তায়েফে রক্তাক্ত হলেন, তখন সঙ্গী ছিলেন তাঁরই ঘরে কৈশোর কাটানো জায়েদ। যখন প্রিয়নবী হিজরত করে মক্কা ছেড়ে মদিনায় এলেন, তখন কিশোর-কিশোরীরা তাঁকে স্বাগত জানালেন কোরাস সংগীত গেয়ে। এভাবে নবীজির জীবনের সব সময়ে বড়োদের সাথে সাথে কিশোর সাহাবীরাও ছিলেন। 

নবীজি বাড়িঘর, ধনসম্পদ সব ছেড়ে চলে এসেছেন মদিনায়। আল্লাহর দীনের জন্য তাঁকে নিঃস্ব হয়ে আসতে হয়েছে। তাই সকলে প্রিয়নবীর জন্য সাধ্যমতো বিভিন্ন উপহার নিয়ে আসতে লাগল। মদিনার প্রতিটি ঘর থেকেই এলো বিভিন্ন উপহার। কিন্তু বিধবা উম্মে সুলাইমের ঘরে যে উপহার দেওয়ার মতো কিছুই নেই। কী নিয়ে যাবেন তিনি? 

উম্মে সুলাইমের দশ বছরের কিশোর ছেলে আনাস বেশ চটপটে। আরবে তখনকার শিক্ষা ছিল মুখস্থনির্ভর। লেখার খুব বেশি প্রয়োজন পড়ে না। তাই লিখতে জানা মানুষের সংখ্যাও ছিল খুব কম। আনাস ছিল খুবই প্রতিভাবান। সে দশ বছর বয়সেই লেখা শিখে ফেলেছে।

উম্মে সুলাইম আনাসকে নিয়ে নবীজির কাছে এলেন। তিনি বললেন-হে আল্লাহর রাসূল, আপনাকে সবাই উপহার দিচ্ছে। আমি বিধবা নারী। উপহার দেওয়ার মতো কিছুই নেই। এই হলো আমার ছেলে আনাস। সে বুদ্ধিমান। লিখতেও জানে। তাকে উপহার হিসেবে আপনার কাছে রেখে যাচ্ছি। সে আপনার কাজকর্ম করে দেবে। 

প্রিয়নবী মুচকি হেসে এমন অভিনব উপহারটি বুঝে নিলেন। এরপর থেকে আনাস নবীজির কাছে থাকে। তাঁর অজুর পানি এগিয়ে দেয়। নবীজি কোথাও গেলে তাঁর ছোটখাটো জিনিসপত্র ব্যাগে বহন করে। তারপর যখন মায়ের কথা মনে পড়ে, তখন এক দৌড়ে বাড়ি গিয়ে মাকে দেখে আসে। 

নবীজীর মদিনায় আসার পর থেকে ইন্তিকাল পর্যন্ত পুরো ১০টি বছর আনাস ছিলেন তাঁর ছায়ার মতো। এজন্য আনাস (রা)-কে বলা হয় ‘খাদেমে রাসূল’ বা রাসূলের সেবক। প্রিয়নবীর সাথে থাকার কারণে আনাস অনেক কিছু শেখেন। নবী (সা)-এর কথা বেশি বেশি শোনার সুযোগ হয় তাঁর। নবী (সা)-এর নিত্যদিনের কাজ দেখেছেন খুব কাছ থেকে। তাই আনাস (রা) অনেক হাদিস বর্ণনা করতে পেরেছেন। তাঁর বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা ২২৮৬টি। তিনি বেশিসংখ্যক হাদিস বর্ণনাকারী সাত সাহাবীর একজন।

ইসলামী জ্ঞানের দুটি প্রধান উৎস আল কুরআন ও আল হাদিস। এই জ্ঞানচর্চায় আরও দুজন কিশোর সাহাবী বিরাট অবদান রেখেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা)। 

ইবনে আব্বাস (রা)-কে বলা হয় ‘রায়িসুল মুফাসসিরিন’ বা মুফাসসিরদের সরদার। কুরআন মাজিদের ব্যাখ্যার ওপর যারা বিশেষজ্ঞ, তাদেরকেই বলা হয় মুফাসসির। তিনি হাদিস বর্ণনাতেও ছিলেন প্রথম কাতারে। তাঁর বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা ১৬৬০। মহানবীর ইন্তিকালের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ১৩ বছর। 

আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) ছিলেন আরেকজন জ্ঞানী সাহাবী। হাদিস বর্ণনায় তাঁর সামনে আছেন মাত্র একজন-আবু হুরায়রা (রা)। ইবনে উমর (রা) বর্ণনা করেছেন ২৬৩০টি হাদিস। নবীজির মদিনায় হিজরতের সময় ইবনে উমর (রা)-এর বয়স ছিল ১৩ বছর। এই কিশোর বয়সেই তিনি পরের সব ঐতিহাসিক মুহূর্তে প্রিয়নবীর সঙ্গী ছিলেন।

কী দারুণ বিষয়! সবচেয়ে বেশি হাদিস বর্ণনাকারী সাত সাহাবীর মধ্যে তিনজনই কিশোর! কিশোর সাহাবীরা জ্ঞানচর্চায় কত বেশি অবদান রেখেছেন!

শুধু কী জ্ঞানচর্চায়? নাহ! ইসলামের সকল অঙ্গনে কিশোর সাহাবীরা উৎসাহের সাথে অংশ নিয়েছেন। এমনকি যুদ্ধের ময়দানে জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছেন। সাহসের ফুলকি হয়ে আঘাত হেনেছেন জালিমদের জুলুমের মসনদে। মহানবী যখন জালিমদের বিরুদ্ধে সত্যের পতাকা উত্তোলন করলেন, ডাক দিলেন জিহাদের, তখন কিশোর সাহাবীরাও জিহাদের মাঠে ছুটলেন। 

হিজরতের দ্বিতীয় বছর আবু জাহেলের নেতৃত্বে ইসলামের দুশমনরা এসেছে নবীর শহর মদিনা আক্রমণ করতে। মহানবী মুহাম্মাদ (সা) এই খবর পেয়ে বসে থাকলেন না। তিনি হানাদারদের মুকাবিলার জন্য ছুটলেন সামনের দিকে। ৩১৩ জন নির্ভীক যোদ্ধা ছুটছেন তাঁদের প্রিয় নেতা মুহাম্মাদ (সা)-এর সাথে। হানাদারদের রুখে দিতে। তাঁদের মধ্যে আছেন দু’জন কিশোর সাহাবী। দুজনের নামই মুআজ-মুআজ ইবনে আফরা এবং মুআজ ইবনে আমর। 

নামের যেমন তাঁদের মিল, তেমনি তাঁদের মনেরও রয়েছে দারুণ মিল। তাঁরা দুই বন্ধু ঠিক করলেন, যুদ্ধের মাঠে সবচেয়ে জরুরি কাজটি তাঁরা করবেন। কী সেই কাজ? হানাদার বাহিনীর সেনাপতি আবু জাহেলকেই শেষ করতে হবে। সে মক্কায় থাকতে আমাদের প্রিয়নবী (সা)-কে কষ্ট দিয়েছে। তাঁর সাথীদের ওপর নির্যাতন করেছে। এমনকি সুমাইয়া (রা)-কে বর্শার আঘাতে হত্যা করেছে! কী নিষ্ঠুর! কী পাষণ্ড সে! একজন নারীকে পর্যন্ত সে হত্যা করেছে! তাঁর স্বামী ও সন্তানের সামনে! তাকেই শেষ করতে হবে আজ। 

বদর প্রান্তরে শুরু হলো তুমুল যুদ্ধ। দুই কিশোর তাঁদের তলোয়ার নিয়ে শত্রুবাহিনীর ওপর তীক্ষè নজর রাখতে লাগলেন। তাঁদের পাশেই ছিলেন সাহাবী আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা)। দুই কিশোর তাঁকে বললেন-চাচা! আবু জাহেলকে আমাদের একটু দেখিয়ে দেবেন। 

একটু পরই আবু জাহেলকে দেখা গেল। সে একটি তেজি ঘোড়ায় চড়ে হম্বিতম্বি করছে। আবদুর রহমান (রা) তাঁর দিকে ইশারা করে দুই মুআজকে বললেন-ওই যে আবু জাহেল! তোমরা যাকে খুঁজছিলে।

ইশারা করামাত্রই দুই মুআজ ছুটল বিদ্যুতের বেগে। যেন চিতাবাঘও হার মানে তাঁদের দৌড়ের কাছে। দুই কিশোরের তীব্র আঘাতে ঘোড়া থেকে পড়ে গেল প্রবল প্রতাপশালী হানাদার-সেনাপতি আবু জাহেল। পতন হলো তার সকল অহংকারের। শেষ হলো তার সকল অপকর্ম। তাঁদের হাতে নিহত হলো সেই দাম্ভিক জালিম। দুই কিশোর সাহাবীর কীর্তি ইতিহাসের সোনালি পাতায় অক্ষয় হয়ে গেল সাথে সাথে।

কিশোর সাহাবীদের এসব কীর্তিগাথা আমাদের জন্য প্রেরণার। রাসূলের (সা)-এর সান্নিধ্যে তাঁরা কিশোর বয়সেই ইসলামের জন্য দারুণ সব অবদান রেখেছেন। ইসলামের প্রচার-প্রসারে, জ্ঞানচর্চায়, যুদ্ধের ময়দানে-সবখানে। সব জায়গায় তাঁরা রেখেছেন প্রতিভার স্বাক্ষর এবং ছড়িয়েছেন সাহসের দীপ্তি। আমরা তাঁদেরই উত্তরসূরি। এসো তাঁদের সেই উদ্দীপনা ও সাহস বুকে নিয়ে আমরাও পৃথিবীকে গড়ার কাজে যুক্ত হই। সবুজে সবুজে ছেয়ে দিই আল্লাহর জমিন। আর গড়ে তুলি একটি সোনালি সমাজ। একটি নতুন পৃথিবী। নিয়ে আসি একটি রাঙা প্রভাত।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ