সাইবার দুনিয়ায় আমাদের নিরাপত্তা

আইটি কর্নার নাদিম নওশাদ নভেম্বর ২০২৪

আসসালামু আলাইকুম। বন্ধুরা, কেমন আছো সবাই? আশা করি অনেক অনেক ভালো আছো। আজকে আমরা সাইবার দুনিয়ায় আমাদের নিরাপত্তার বিষয়ে কথা বলবো। বর্তমান পৃথিবীতে সবাই নিজেদের জীবনে সাইবার দুনিয়াকে এমন একটা স্থান দিয়েছে যে, সাইবার দুনিয়া ছাড়া আমাদের দৈনন্দিন জীবন কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। যার কারণে সাইবার জগতের নিরাপত্তা অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের সর্বোচ্চ সতর্কতাই পারে আমাদের সাইবার জগতের নিরাপত্তার ঝুঁকি কমাতে।

সাইবার দুনিয়ার একটা বিখ্যাত উক্তি হলো, “There is no place like 127.0.0.1” যার বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায় 127.0.0.1-এর মতো কোনো স্থান সাইবার দুনিয়ায় নেই। 127.0.0.1 হচ্ছে মূলতো একটা Internet Protocol Address বা IP Address, যা সাধারণত কম্পিউটারের নিজস্ব ঠিকানা। বলতে পারো, কম্পিউটারের নিজের বাড়ি। চলো একটু সহজ করে বুঝি। যদি তোমাকে প্রশ্ন করি, তোমার কাছে সবচেয়ে নিরাপদ স্থান কোনটি? তোমার উত্তর কী হবে! হ্যাঁ। তোমাদের বেশির ভাগেরই উত্তর হবে নিজের বাড়ি। নিজের বাড়িকে আমরা যেমন সবচেয়ে নিরাপদ মনে করি, তেমনই কম্পিউটারের কাছে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হলো তার বাড়ি অর্থাৎ 127.0.0.1 IP Address।

কিন্তু, মজার বিষয় কি জানো! ইন্টারনেটে নিরাপদ বলে কিছু নেই। তবে ইন্টারনেট ব্যবহারে আমাদের সচেতনতা ও সাবধানতাই আমাদের অনেকটাই নিরাপদ রাখতে পারে ইন্টারনেট দুনিয়ায়। নিম্নোক্ত কিছু বহুল পরিচিত ও ব্যবহৃত সাইবার হুমকি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।


সাইবার হুমকিসমূহ

১. ম্যালওয়্যার : ম্যালওয়ার-এর পূর্ণরূপ হচ্ছে ম্যালিশিয়াস সফটওয়্যার। নাম থেকেই বোঝা যায়, এটা এক ধরনের ক্ষতিকর সফটওয়্যার, যা কম্পিউটার বা মোবাইলের স্বাভাবিক কাজকে বাধাগ্রস্ত করে। গোপন তথ্য চুরি বা কম্পিউটার নেটওয়ার্কে অবৈধ অনুপ্রবেশ-এর মতো ভয়ংকর কাজ ম্যালওয়ার ব্যবহার করে করা হয়। 

২. র‌্যানসমওয়্যার : র‌্যানসমওয়্যার হচ্ছে এক ধরনের ম্যালওয়্যার, যা কম্পিউটারে আক্রমণ করে হার্ডড্রাইভের সমস্ত তথ্যকে এনক্রিপ্ট করে দেয়। এনক্রিপশন কি শুধুমাত্র হ্যাকারের কাছেই থাকে। হ্যাকার নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে ডিক্রিপশন কি কম্পিউটার ব্যবহারকারীকে দিয়ে দেয়।

৩. ফিশিং : ফিশিং হচ্ছে এক ধরনের প্রতারণা। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছো। বাস্তব জগতে যেমন অনেক মানুষ অন্য জনকে বিভিন্ন রকম প্রতারণা করে, ঠিক তেমনই ভার্চুয়াল জগতেও প্রচুর পরিমাণ প্রতারণার ঘটনা ঘটে থাকে। ভার্চুয়াল জগতের এই প্রতারণাগুলোকে ফিশিং বলে। মাছ ধরার জন্য আমরা যেমন বড়শি ফেলি, তেমনইভাবে অনলাইনেও তথ্য চুরি করতে বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ তৈরি করা হয়। ফিশিং-এর মাধ্যমে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরি করা হয়। যেমন : ব্যবহারকারীর নাম, পাসওয়ার্ড, ক্রেডিটকার্ড-এর তথ্য ইত্যাদি।

৪. আইডেন্টিটি থেফট : আইডেন্টিটি থেফট হচ্ছে ক্রেডিট কার্ড বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জালিয়াতির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির অ্যাকাউন্ট নম্বর, পাসওয়ার্ড, জন্ম তারিখ ইত্যাদি তথ্য চুরি করা। এই তথ্য কাজে লাগিয়ে কোনো ব্যবহারকারীর ছদ্মবেশ ধারণ করে হ্যাকার অর্থ হাতিয়ে নেয়। ভাবতে পারো! কতটা ভয়ংকর ব্যাপারটা!

সাইবার জগতে পুরোপুরি নিরাপত্তা অর্জন করা সম্ভব না হলেও ব্যক্তিগত সচেতনতা সাইবার হামলার সম্ভাবনা অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। সেই জন্য আমাদের ইন্টারনেট ব্যবহারে অনেক বেশি সতর্ক থাকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা নিশ্চয়ই তোমরা আন্দাজ করতে পারছো। চলো তবে, এখন আমরা সাইবার জগতে সর্বোচ্চ নিরাপদ থাকার জন্য আমাদের করণীয় সম্পর্কে জেনে নিই।


সাইবার জগতের নিরাপত্তায় আমাদের করণীয়

১. শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার : যে-কোনো অনলাইন ভিত্তিক প্লাটফর্মে, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অর্থনৈতিক লেনদেনের সাইটগুলোতে, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা খুবই জরুরি। পাসওয়ার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে পাসওয়ার্ডটি যেন একদম ছোট না হয়। পাসওয়ার্ড ৮-১৪টি অক্ষরের হলে ভালো হয়। পাসওয়ার্ডে ছোট হাতের, বড়ো হাতের ও বিশেষ চিহ্নে ব্যবহার পাসওয়ার্ডকে আরও শক্তিশালী করে। এছাড়াও, একই পাসওয়ার্ড একাধিক অ্যাকাউন্টের জন্য ব্যবহার, পাসওয়ার্ডে নিজের নাম, জন্ম তারিখ ব্যবহার পাসওয়ার্ডকে অনেক দুর্বল করে দেয়। তাই এগুলো আমাদের পরিহার করা উচিত।

২. সফটওয়্যার ও অপারেটিং সিস্টেম আপডেট রাখা : নিয়মিত আমাদের কম্পিউটার, মোবাইলসহ সকল ডিভাইসের সফটওয়্যার আপডেট রাখা গুরুত্বপূর্ণ। হ্যাকাররা ক্রমাগত চেষ্টা করে সফটওয়্যারের নতুন নতুন দুর্বলতা খুঁজে বের করার জন্য। সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলো সেই দুর্বলতা খুঁজে বের করে প্রতিনিয়ত সিস্টেম আপডেট রাখে। এতে হ্যাকিং-এর ঝুঁকি কম থাকে। আমাদেরও উচিত সর্বদা আপডেটেড সফটওয়্যার ব্যবহার করা।

৩. পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন : পাবলিক ওয়াই-ফাই-এর সিকিউরিটি ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল থাকে। ফলে খুব সহজে হ্যাকার পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহারকারী কোনো ব্যক্তির ডিভাইস হ্যাক করে ফেলতে পারে। তাই পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহারের সময় ব্যক্তিগত তথ্য যেমন ইমেল, পাসওয়ার্ড বা সোশ্যাল মিডিয়া সম্পর্কিত তথ্য চুরি হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। আমাদের উচিত পাবলিক নেটওয়ার্ক ব্যবহারে অতিসতর্ক হওয়া।

৪. সন্দেহজনক ইমেল ও লিংক পরিহার : যদি কোনো অজানা ব্যক্তি থেকে সন্দেহজনক কোনো ই-মেইল আসে, তবে তা যাচাই-বাছাই ছাড়া খোলা উচিত নয়। এছাড়াও ভুয়া ই-মেইল অ্যাড্রেস, যেমন : facebook.com এর পরিবর্তে acebo0k.com, ব্যবহার করে হ্যাকাররা হ্যাকিং কোড পাঠিয়ে থাকে। ইমেল দু’টি দেখতে একইরকম মনে হলেও ..c0m-G “o” এর পরিবর্তে শূন্য (০) ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়াও লোভনীয় কোনো অফার সম্পর্কিত কোনো লিংকে ক্লিক করা উচিত নয়।

৫. অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার করা : অনেক সময় আমাদের অজান্তেই অনেক ভাইরাস ও ম্যালওয়্যার মোবাইল বা কম্পিউটারে ঢুকে যেতে পারে। অ্যান্টিভাইরাস এ সমস্ত অযাচিত কোনো ভাইরাস বা ম্যালওয়্যার মোবাইল বা কম্পিউটারে ঢুকে পড়া রোধ করে। এছাড়া ফিশিং থেকে বাঁচতে অ্যান্টিভাইরাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই আমাদের সবারই উচিত অ্যান্টিভাইরাস ও অ্যান্টিম্যালওয়্যার ব্যবহার করা।

ইন্টারনেট ব্যবহারে আমাদের অধিক সচেতন হওয়া খুবই প্রয়োজন। বর্তমানে যেভাবে অনলাইনভিত্তিক মানুষের নির্ভরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, এতে করে সাইবার নিরাপত্তা অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে আমাদের সামনে আবির্ভূত হয়েছে। সাইবার সচেতনতা ও সতর্কতা ছাড়া আমাদের সাইবার জগৎ হুমকির মুখে পড়তে পারে। এজন্য আমাদের ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতাও বৃদ্ধি করতে হবে।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ