সাগরতলে ঝরনা
বিজ্ঞান রিদয় হাসান এপ্রিল ২০২৫
নায়াগ্রা ফলস, বয়োমো ফলস, ইগুয়াজো ফলস মানেই অঝোর ধারায় ঝরতে থাকা অফুরন্ত জলরাশি। এগুলো বিশাল হলেও বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো জলপ্রপাত রয়েছে সমুদ্রের অতলে।
বিজ্ঞানীরা বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো জলপ্রপাতের খোঁজ পেয়েছেন সমুদ্র গভীরে। আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ডের মাঝখানে অবস্থিত ডেনমার্ক প্রণালির পানির নিচে বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো জলপ্রপাতের সন্ধান পাওয়া গেছে। সমুদ্রতলে এই জলপ্রপাতের উচ্চতা সাড়ে ১১ হাজার ফুট, যা ভেনেজুয়েলার বিখ্যাত অ্যাঞ্জেল জলপ্রপাতের চেয়ে বহুগুণ বেশি। সমুদ্রের নিচে থাকা জলপ্রপাতকে বলা হয় Underwater Waterfall।
১৮৭০ সালের আগে সমুদ্র তলে থাকা জলপ্রপাতের কথা অজানা ছিল। পরবর্তীতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির সাহায্যে এই জলপ্রপাতের খোঁজ পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীরা শুধু আটলান্টিক মহাসাগরেই এমন ৬টি ক্যাটারাক্টের খোঁজ পেয়েছেন।
বিশাল জলপ্রপাতটি ভূপৃষ্ঠ থেকে শনাক্ত করা যায় না। ধারণা করা হয় এটি প্রায় ১৭ হাজার ৫০০ থেকে ১১ হাজার ৫০০ বছর আগে শেষ বরফ যুগের সময় গঠিত হয়েছিল।
পানির নিচে থাকা এই বিশাল জলপ্রপাতের কার্যক্রম সমুদ্রের তাপমাত্রা ও লবণাক্ততায় স্পষ্ট প্রভাব ফেলে। স্পেনের বার্সেলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনা সানচেজ ভিদাল বলেন, ‘জলপ্রপাতের প্রভাব ভূপৃষ্ঠে অদৃশ্য হলেও সমুদ্রের তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার তথ্য এই জলপ্রপাতের কার্যকলাপের প্রমাণ দেয়। ডেনমার্ক প্রণালিতে এই জলপ্রপাত প্রায় ৩০০ মাইল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত।
সমুদ্রের নিচে জলস্রােত ও তাপমাত্রার পরিবর্তনের ফলে তৈরি হয় এই ঝরনা। যেমন- ভূমধ্যসাগরের পানি আটলান্টিক মহাসাগরের পানির তুলনায় বেশি গভীর। তাই ভূমধ্যসাগরের পানি আটলান্টিক মহাসাগরের নিচে চলে যায়।
এটি নরডিক সাগর থেকে ইরমিঙ্গার সাগরে ঠাণ্ডা পানি প্রবাহিত করে এবং সমুদ্রের স্রােত ও তাপ সঞ্চালনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শুধু তাই নয়, ডেনমার্ক প্রণালি দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হওয়ার কারণে মেরু পানির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করছে এই জলপ্রপাত।
যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটনের ন্যাশনাল ওশানোগ্রাফি সেন্টারের প্রতিবেদনের তথ্যমতে, এই জলপ্রপাতে প্রতি সেকেন্ডে ১ দশমিক ৬ ফুট বেগে পানি প্রবাহিত হচ্ছে, যেখানে নায়াগ্রা জলপ্রপাতে প্রতি সেকেন্ডে ১০০ ফুট পানির গতি দেখা যায়। এর কারণ তুলে ধরে বিজ্ঞানী মাইক ক্লেয়ার বলেন, ‘আপেক্ষিকভাবে কম মাত্রার ঢাল রয়েছে এই জলপ্রপাতে।’
জীববৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে এই জলপ্রপাতের। সমুদ্র তলে থাকা জলপ্রপাত সমুদ্রের নোনতা ভাব ও আবহাওয়া ঠিক রাখতে সাহায্য করে। সমুদ্রের নিচে উদ্ভিদ ও প্রাণীর বেঁচে থাকতে সাহায্য করে।
ইউনেস্কো natural sites for needed and natural value হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে সাগরতলের জলপ্রপাতকে।
ডেনমার্ক প্রণালির এই আবিষ্কার কেবল একটি প্রাকৃতিক বিস্ময় নয়, বরং এটি বৈশ্বিক সমুদ্রবিজ্ঞান এবং জলবায়ু গবেষণায় নতুন দৃষ্টিকোণ সৃষ্টি করেছে।
আরও পড়ুন...