সাগরের মাঝে গ্রাম

চিত্র-বিচিত্র মনির আহমেদ নভেম্বর ২০২৪

মাছের মতো মানুষও পানির নিচে বিচরণ করতে পারে। পানির নিচে কয়েক মিনিট শ্বাস ধরে রাখা সাধারণ মানুষের জন্য কষ্টসাধ্য হলেও পানির নিচে টানা ১০-১৩ মিনিট সাঁতার কাটতে পারে বাজাউ নামক এক উপজাতি। ক্ষেত্র বিশেষে তারা কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টাও পানিতে শ্বাস ধরে রাখতে পারে।

সম্পূর্ণভাবে সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল বাজাউ-লাউটদের পুরো জীবন কাটে সমুদ্রে। প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরের মাঝে অবস্থিত ব্রুনেই, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়াকে ঘিরে বেশ কয়েকটি উপসাগর রয়েছে। যাদের নাম সুলু, সেলেবিস, বান্দা, মালুকু, জাভা, ফ্লোরেস এবং সাভু। এই উপসাগরগুলোতে ঘুরে বেড়ায় বাজাউরা। তাদের বিশেষ আকৃতির নৌকা লেপা-লেপাতে চড়ে। নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা নেই এদের। তাই এদের বলা হয় ‘সি জিপসি’। তারা সাঁতরে বেড়াতে পারে পানির প্রায় ৭০ মিটার গভীরে। দিনে ৫-৮ ঘণ্টা নীল পানিতে মাছ শিকার করে। সুদীর্ঘ ১ হাজার বছর ধরে চলছে তাদের এই চর্চা।

সমুদ্র তীর থেকে আধা কিলোমিটার সমুদ্রের ভেতরে বাজাউরা তৈরি করে তাদের অস্থায়ী গ্রাম। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি করা বাড়িগুলো কয়েক ঘণ্টার মধ্যে খুলে ফেলা যায়। বাড়িগুলোর নিচ দিয়ে সমুদ্রের ঢেউ বয়ে যায়। পানির ওপরে বানানো হলেও ঘরগুলো বেশ মজবুত। ২০০৪ সালের সুনামিতে বাজাউদের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। সুনামি ঠিক তাদের ঘরের নিচ দিয়ে গিয়েছিল।

এই উপজাতির অনেক মানুষ আছে যারা মাটিতে কোনোদিন পা রাখেনি। বাজাউরা নিজেদের বয়স বলতে পারে না। সময় কিংবা তারিখ সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই। তারা জানে না বিদ্যুৎ কী ও কেন লাগে। সামুদ্রিক মাছের তেলের মশাল আজও তাদের রাতের অন্ধকার কাটায়।

সমুদ্র তীরবর্তী কিছু সুহৃদয় গ্রাম এদের জ্বালানি কাঠ, পানি এবং জামা কাপড় দেয়। বিনিময়ে বাজাউরা দেয় মাছ।

ছোট বাজাউ শিশুরাও  সাগরতলে মাছের মতোই সাঁতার কেটে বেড়ায়। তাদের প্রধান খাদ্য বিভিন্ন মাছ, স্টিং রে, স্কুইড, অক্টোপাস। এরা সমুদ্রে নামার সময় ভারী বস্তু শরীরে বেঁধে নামে। উঠে আসার সময়  শরীরে বাঁধা  ওজন খুলে ফেলে শরীরকে হালকা করে নেয়।

ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষক মেলিসা ইলার্ডো ও রাসমুস নিয়েলসেন বাজাউদের নিয়ে একটি গবেষণা করেছিলেন। গবেষকরা জানিয়েছেন, বাজাউদের জিনে থাকা কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্যই তাদের প্রাকৃতিক ডুবুরি করেছে।

বাজাউরা যখন শ্বাস চেপে পানিতে ডুব দেয় তখন তাদের দেহে বিভিন্ন পরিবর্তন দেখা দেয়। হৃৎপিণ্ড তার কাজ কমিয়ে দেয় অক্সিজেন বাঁচিয়ে রাখার জন্য। পালস রেট নেমে দাঁড়ায় প্রতি মিনিটে মাত্র ৩০ বার। শরীরের বাইরের দিকের কলাকোষ থেকে রক্তপ্রবাহের অভিমুখ ঘুরে যায় শরীরের ভেতরের দিকে। রক্ত যায় মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসে।

সাধারণ মানুষের প্লিহার চেয়ে এদের প্লিহা ৫০ শতাংশ বড়ো। ফলে রক্তে অস্বাভাবিক মাত্রার অক্সিজেন ধরে রাখতে পারে তাদের দেহ। আর এমন প্লিহার জন্য দায়ী এক ধরনের বিশেষ জিন। এই জিনের নাম পিডিই১০এ।

এই প্রজাতির ৮৫ বছর বয়সি এক ব্যক্তি দাবি করেছেন, তিনি পানির নিচে একসঙ্গে ১০ মিনিট নিজের শ্বাস ধরে রাখতে পারতেন।

বাজাউদের ডিএনএ বিশ্লেষণে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য পেয়েছিলেন মেলিসা। দেখা গিয়েছিল, বাজাউদের ডিএনএ-তে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিনটি জিনের পরিবর্তন বা মিউটেশন হয়েছে। যে পরিবর্তন ডাঙায় থাকা মোরো উপজাতিদের ওই জিনগুলিতে হয়নি।

একটি জিনে পরিবর্তন রয়েছে যেটা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে। যা প্রয়োজন অনুসারে রক্তস্রোতকে পাঠিয়ে দেয় সেই অঙ্গগুলোতে, যেখানে সবচেয়ে বেশি অক্সিজেন দরকার। যে অঙ্গগুলোতে অক্সিজেন কিছুক্ষণ না গেলে ততটা ক্ষতি হবে না, সেদিকে রক্তস্রােত কমে যায়।

পরিবর্তন দেখা গেছে বাজাউদের আরেকটি জিনে। যেটি কার্বনিক অ্যানহাইড্রেজ নামে একটি এনজাইম তৈরি করে। যে এনজাইমটি রক্তস্রােতে খুবই ধীরে কার্বন-ডাই অক্সাইড পাঠায়। ফলে এই পরিবর্তনটিও বাজাউদের শ্বাস ধরে রাখতে সাহায্য করে। 

প্লিহা সংলগ্ন পেশির সংকোচন ঘটায় যে জিন তারও পরিবর্তন হয়েছে। যে জিনটি প্লিহার সংকোচন ঘটিয়ে রক্তে অক্সিজেন মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে।

সামুদ্রিক পরিবেশে টিকে থাকার জন্য, শত শত বছর ধরে খাদ্য সংগ্রহের জন্য সমুদ্রের গভীরে যাওয়ার অভ্যাস, বাজাউদের বিভিন্ন অঙ্গ, শ্বসনতন্ত্র এবং রক্ত সংবহনতন্ত্রে স্থায়ী পরিবর্তন ঘটিয়েছে। তাই, বাজাউরা সমুদ্রের পানিতে মাছের মতোই সাবলীল। 

বাজাউ উপজাতি তাদের এই ভিন্ন জীবনযাত্রা অব্যাহত রেখেছে পূর্ববংশকে অনুসরণ করে। বাজাউ উপজাতির এক ব্যক্তি বলেন, আমার পূর্বপুরুষরা মাছ ধরতে যেতেন। সে সময় আমরাও তাদের সাথে সেখানে যেতাম। তাদের কাছ থেকেই ধীরে ধীরে আমরা এই পদ্ধতি রপ্ত করি। এটা আমাদের পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য।

স্থানীয় এক শিশু জানায়, তার বাবা তাকে দীর্ঘক্ষণ পানির নিচে শ্বাস আটকে রাখার পদ্ধতি শিখিয়েছে। শত কষ্ট হলেও তাদের শ্বাস আটকে রাখার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। 

বাজাউ জাতি অসুস্থ হলেও তীরে যেতে পারে না। নাগরিক না হওয়ায় ডাঙায় এলে বিভিন্ন দেশের হাসপাতাল চিকিৎসা করে না। পুলিশ গ্রেফতার করে। তাই জন্মের মতো বাজাউদের মৃত্যুও হয় সমুদ্রে। নৌকা করে দূর সমুদ্রে নিয়ে গিয়ে ভাসিয়ে দেওয়া হয় মৃতদেহ।

বাজাউদের দাবি, সময়ের সাথে সাথে তাদের ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। তারা জানান, পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবে এখানকার মানুষেরা তাদের জীবনযাত্রা পালটাচ্ছে। অনেকেই এ রকম জীবনযাপন ছেড়ে দিচ্ছেন। পাশাপাশি প্লাস্টিকের দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের শিকারও হচ্ছেন তারা।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ