সাদা চোখ

উপন্যাস জুবায়ের হুসাইন এপ্রিল ২০২৪

‘অ্যাই ভাইয়া, কী করছো তুমি?’

বিপ্লব বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে মাথার নিচে দু’হাত রেখে গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিল। তাই ও প্রথমটাতে ছোটোবোন জেসমিনের কথা কিছুই শুনতে পেল না।

জেসমিন এবার ভাইয়ের হাঁটুতে ডান হাত দিয়ে নাড়া দিয়ে আবার বললো, ‘অ্যাই ভাইয়া, করছো কী তুমি?’

বিপ্লব যেন এবার সংবিৎ ফিরে পেল। চোখ ঘুরিয়ে দেখলো, ওর সামনে আদরের ছোটো বোন জেসমিন দাঁড়িয়ে আছে। চোখে-মুখে একরাশ জিজ্ঞাসা। বিছানায় উঠে বসলো ও। বললো, ‘এসো আমার আদরের ছোট্ট বোনটি, আমার পাশে বসো।’

জেসমিন ভাইয়ের পাশে বসলো।

বিপ্লব জিজ্ঞেস করলো, ‘বলো সোনা বোনটি, আমাকে কী বলতে এসেছো।’

‘জানো বিপু ভাইয়া, আমি আজ কী করেছি?’ জেসমিনের মুখটা হাসিতে ঝলমল করে উঠলো। বিপ্লবকে কিছু বলতে না দিয়েই আবার বললো, ‘আগে বলো তুমি আম্মুকে কিছু বলবে না!’

‘আচ্ছা, ঠিক আছে, বলবো না।’ কথা দিলো বিপ্লব। ‘এখন বলো তুমি আজ কী করেছো।’

জেসমিন একবার দরজার দিকটা দেখে নিল। তারপর গলাটা একটু নামিয়ে বললো, ‘দুপুরে আম্মু আমাকে যে ভাত খেতে দিয়েছিল, তা কিন্তু আমি খাইনি।’

‘তার মানে...’ বিপ্লব যেন একটু অবাক হলো।

‘হ্যাঁ ভাইয়া, আমি আজ রোজা ভাঙিনি।’ সোজা বললো জেসমিন।

‘তাহলে ভাত কী করেছো তুমি? আম্মু কিছু বলেনি?’ জিজ্ঞেস করলো বিপ্লব, অনেকটা অবাক হয়ে।

‘এই জন্যই তো তোমার কাছ থেকে কথা নিয়েছি যে তুমি আম্মুকে কিছু বলবে না।’

পিচ্ছিটার চালাকি এবার বুঝতে পারলো বিপ্লব খান। মুচকি হেসে বললো, ‘আমার মিষ্টি বোনটি! এবার আসল ঘটনাটা বলো দেখি!’

জেসমিন বললো, ‘আমি আম্মুর দেওয়া ভাত-তরকারিগুলো একটি পলিথিন ব্যাগে ভরে ঘরের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছি। সন্ধ্যায় ইফতারির পর আম্মু যখন নামাজ পড়বেন তখন আমি প্রতিদিন যে বিড়ালটা আসে তাকে লুকিয়ে খেতে দেবো।’ একটু থেমে আবার বললো, ‘কেমন আইডিয়াটা করলাম ভাইয়া?’

বিপ্লব একটু চিন্তা করে তারপর বললো, ‘আইডিয়াটা ভালো, খুবই ভালো। তবে আম্মুকে জানানো উচিত ছিল। আম্মু-আব্বুর কথা অমান্য করা কোনো অবস্থাতেই ঠিক না। এ ব্যাপারে আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশেষভাবে তাগিদ দিয়েছেন।’ সুযোগ পেয়ে ছোটো বোনটিকে রাসূলের শিক্ষা জানাতে ভুললো না।

‘কিন্তু আমি তো...’

জেসমিনকে কথা শেষ করতে দিলো না বিপ্লব। বললো, ‘আপুমণি, তোমার উদ্দেশ্য ভালো। আর আম্মুও তোমার খারাপটি চান না। কিন্তু আম্মু বুঝতে পারেননি যে তুমি এখন বড়ো হয়ে গেছো, তুমি রোজা রাখতে পারো। আশা করি আজকের পর থেকে আম্মু আর তোমাকে রোজা রাখতে বারণ করবেন না।’

‘তাহলে তো আমার ভুলই হয়ে গেছে বিপু ভাইয়া। আমার অবশ্যই আম্মুকে সবটা বলা উচিত ছিল। কিন্তু এখন কী হবে?’ খুবই চিন্তিত দেখালো জেসমিনকে। যেন খুবই অনুশোচনা হচ্ছে।

‘এখন কিছুই হবে না।’ কথাটা বললেন অন্য কেউ।

এই কথাটা শুনে দু’জনই দরজার দিকে তাকালো। দেখলো, আম্মু হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন।

দু’জনেই একটু চমকে গেল। আম্মু বুঝি এইবারই বকাবকি শুরু করবেন।

কিন্তু আম্মু ওদেরকে অবাক করে দিয়ে বললেন, ‘আমি তোমাদের সব কথাই শুনেছি।’ বলতে বলতে ওদের পাশে এসে দাঁড়ালেন। মেয়েকে আদরে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। চুলে ও পিঠে হাত বুুলিয়ে বললেন, ‘আমি বুঝতেই পারিনি যে আমার ছোট্ট মেয়েটা রোজা রাখার মতো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। আল্লাহর শুকরিয়া। ঠিক আছে মা আমার, এখন থেকে তুমি রোজা রাখতে চাইলে আমি তোমাকে বাধা দেবো না। এখন চলো, ইফতারির সময় হয়ে যাচ্ছে, রেডি হয়ে নাও। আমাকে হাতে হাতে সহযোগিতা করো। আর শোনো, সন্ধ্যার মেহমানকে ভুলে যাবে না, মানে বিড়ালটার কথা বলছি। তাছাড়া তোমার অন্যান্য বান্ধবীদের কথা কখনও ভুলবে না, বিশেষ করে যারা দরিদ্র ও অসহায়। তাদের প্রতিও তোমার সহযোগিতার হাত সবসময় অবারিত রাখবে।’

আম্মু ওদের দুই ভাইবোনকে খুবই আদর করেন। ওদের কচি মনে কখনও এতটুকু আঘাত দেন না, চেষ্টা করেন ওদের আবদারগুলো পূরণের মধ্য দিয়েই ওদেরকে সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে। 

‘ঠিক আছে আম্মু, আমি তোমার কথা সবসময় মনে রাখবো।’ কথা দিলো জেসমিন। আম্মুকে জোরে জড়িয়ে ধরলো।

‘আমার মিষ্টি মেয়েটা!’ আম্মু আরও একবার আদর করলেন মেয়েকে।

‘আম্মু,’ বললো বিপ্লব। ‘তোমার মেয়ে কিন্তু সত্যিই বড়ো হয়ে যাচ্ছে।’

‘সেটা নিয়েই তো আমার বড়ো চিন্তা!’ স্বগতোক্তি করলেন আম্মু।

বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলো বিপ্লব, ‘তুমি কি কিছু বললে আম্মু?’

‘কই না তো!’ আম্মু যেন কিছু একটা লুকালেন। তারপর খোলা দরজার দিকে পা বাড়িয়ে বললেন, ‘এখন এসো তোমরা।’

‘ঠিক আছে, চলো তাহলে আম্মু,’ একসাথেই বললো দু’ভাইবোন।

তারপর আম্মুর সাথে সাথে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।


পরদিন দুপুর বেলা। বিপ্লব একটা কাজ সেরে বাইসাইকেল চালিয়ে মসজিদের দিকে যাচ্ছিলো জোহরের নামাজ আদায় করতে। কিছু দূর যেতেই একটা মোটর সাইকেল ওর বাইসাইকেলের পথরোধ করে দাঁড়ালো। আর একটু হলেই কড়া ব্রেক চাপার কারণে হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল বিপ্লব। একটুর জন্য রক্ষা পেল।

মোটর সাইকেলের আরোহী দু’জনের মাথাতেই হেলমেট পরা ছিল। হেলমেটের গ্লাস ছিল কালো। তাই ওদের মুখ দেখা গেল না। অবশ্য অতটা দেখার সুযোগ পেলও না। পেছনে বসা ছেলেটা বিপ্লবের দিকে একটা দলা পাকানো কাগজ ছুড়ে দিলো। তারপর যেমন এসেছিল, তেমনই উধাও হয়ে গেল মোটর সাইকেলটা, আরোহী দু’জনকে নিয়ে। বিপ্লব অবশ্য এটা খেয়াল করলো যে, ওটা একটা ডিসকভারি মোটর সাইকেল ছিল। আর একটা জিনিস খেয়াল করলো, মোটর সাইকেলের নম্বর প্লেটটা ডিজিটাল না এবং যশোর-ল দিয়ে শুরু।

বিপ্লব সাইকেলে বসেই নিচু হয়ে দলাপাকানো কাগজটা উঠিয়ে নিল। এদিক ওদিক একবার দেখে নিয়ে কাগজের ভাঁজ খুলে চোখের সামনে মেনে ধরলো। কিন্তু ওতে কী লেখা ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না। অবশ্য নামাজের সময় হয়ে যাচ্ছিল বলে ও কাগজটা শার্টের পকেটে রেখে মসজিদের দিকে দ্রুত প্যাডেল চালিয়ে এগিয়ে গেল।


দুই.


মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝলো না কিশোর গোয়েন্দা বিপ্লব খান ওরফে বিপু ভাইয়া।

মসজিদ থেকে জোহরের নামাজ পড়ে এসে নিজের ঘরে খাটের ওপরে মেলে দেখছে কাগজটা।

ভ্রু-জোড়া কুঞ্চিত হয়ে আছে বিপুর। কী এটা? কোনো মেসেজ? না কি কোনো আঁকিবুঁকি? নিছকই কি কোনো আঁকিবুঁকি? ওকে কেন দেওয়া হলো? না কি অন্য কাউকে দিতে গিয়ে ভুল করে ওকে দিয়ে দিযেছে?

তবে যা-ই হোক, সবুজ রঙের টুকরো কাগজের ওপর এই আঁকিবুঁকি (বা মেসেজ) বিপুকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করলো। রহস্যের গন্ধ পেল এর মধ্যে। আর রহস্যের গন্ধ মানে তো ওর পঞ্চেন্দ্রিয় সচল হয়ে পড়া, কম্পিউটারের বেগে মস্তিষ্ক কাজ করে চলা।

পড়ার টেবিল থেকে একেটা খাতা ও পেন্সিল টেনে নিল বিপ্লব। সবুজ কাগজের প্রত্যেকটা জিনিস আলাদা করে লিখলো খাতার একটা পৃষ্ঠায়। বুঝতেই পারছে, কিছু সিম্বলিক, সাথে দুটো বিস্ময় চিহ্ন। আর নিচে সাদা রঙের চোখের ছবি। কী বুঝাচ্ছে এসব দিয়ে?

বিপ্লব এগুলো নিয়ে এতটাই মগ্ন হয়ে গিয়েছিল যে, রাহাত কখন ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে ওকে ডাকতে ডাকতে তা খেয়াল করেনি। বুঝতে পারলো ওর ঘাড়ে গরম নিঃশ্বাসের ছোয়া পেয়ে।

রাহাত দেখতে পায় যে, বিপ্লব গভীর মগ্নতার সাথে খাতায় পেন্সিল দিয়ে কিছু লেখালেখি করছে। সে জন্য ওর ডাকে সাড়া দিতে পারেনি। তাই বিপ্লব কী করছে তা দেখার জন্য ওর গাড়ের ওপর দিয়ে ঝুঁকে পড়েছে। আর তার নাক দিয়ে বেরোনো গরম নিঃশ্বাস বিপ্লবের ঘাড়ে গিয়ে লেগেছে এবং তাতেই সংবিৎ ফিরে পেল বিপু ভাইয়া।

পেছনে রাহাতেেক দেখে বিপু একটু মুচকি হেসে বললো, ‘ও তুমি? তা কখন এলে? এসো, বসো।’

‘এত মগ্ন হয়ে কী করছিলে তুমি?’ বিপ্লবের পাশে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করলো রাহাত।

‘আসলে আমি, মানে এই কাগজটা,...’ কথা শেষ না করে রাহাতকে সবুজ কাগজটা দেখালো বিপ্লব।

রাহাত পাক্কা দেড় মিনিট ওটার দিকে তাকিয়ে রইলো। ক্রমে ওর চোখজোড়া বড়ো বড়ো হয়ে উঠলো। কিছুই বুঝলো না। বললো, ‘কী এটা? তুমি এঁকেছো?’

বিপ্লব বললো, ‘না, আমি আঁকিনি।’ তারপর সংক্ষেপে ওটা পাওয়ার বিষয়টা জানালো রাহাতকে।

সব শুনে রাহাত বললো, ‘যেহেতু তোমাকে উদ্দেশ্য করেই কাগজটা দেওয়া হয়েছে, তার মানে গুরুত্বপূর্ণ কিছুই হবে।’

‘তার মানে কোনো রহস্যে জড়াতে যাচ্ছি আমি?’ বিস্ময়টা চাপা রেখেই বললো বিপ্লব। ‘এটা আমাকে কোনো রহস্যের জগতে নিয়ে যাবে, এটাই বলতে চাচ্ছো তো তুমি?’

‘আমি অতশত বুঝিনে।’ সাফ জানিয়ে দিলো রাহাত। ‘আমার মনে হলো, তাই বললোাম। এমন আঁকিবুঁকি আমি জীবনেও দেখিনি। কী উলটো-পালটা লেখা! সাথে আবার সাদা চোখ!’

চোখজোড়া যেন কপালে উঠে যাবে রাহাতের। আবার বললো, ‘সে যাই হোক, রাতুলের ব্যাপারে কিছু বুঝতে পারলে কি না, সেটাই জানতে এসেছিলাম আমি।’

বিপ্লব এবার পুরোপুরি রাহাতের দিকে মনোযোগ দিলো। বললো, ‘বিষয়টা হয়তো আর বেশি দূর এগোবে না। আমার বিশ্বাস, এখন থেকে আবার আগের রাতুলকে দেখতে পাবে তোমরা। ও আবার মন দিয়ে লেখাপড়া করবে, হারানো পজিশন ফিরিয়ে আনবে, আমাকে কথা দিযেছে।’

‘তাই যেন হয়।’ রাহাত এখনও পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না বিপ্লবের কথা। তবে এটা জানে, বিপ্লব যেহেতু বলছে সব আগের মতো হয়ে যাবে, তাহলে সেটাই হবে। এই বন্ধুকে ও ভালোভাবেই চেনে ও জানে। মিছেমিছি কাউকে সান্ত¡না দেওয়ার ছেলে ও নয়। বললো, ‘আমাকে বাঁচালে বিপু ভাইয়া। মুখে এবার হাসি ফুটে উঠলো রাহাতের।

‘রাহাত, তুমি তো এখন বাড়িতে যাবে?’ জিজ্ঞেস করলো বিপ্লব।

রাহাত মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, ‘হ্যাঁ, আমি এখন বাড়িতেই যাবো। মা-বাবাকে খবরটা জানাতে হবে। কেন, তুমি কিছু বলবে আমাকে? কিছু করতে হবে? আমাকে নির্দ্বিধায় বলতে পারো।’

বিপ্লব বললো, ‘তেমন কিছু করতে হবে না, তুমি বাড়ি গিয়ে রাতুলকে বলবে আমি ওকে আজ আমার সাথে ইফতার করতে বলেছি, ব্যস।’

‘ব্যাস?’

বিপ্লব হেসে বললো, ‘তুমি তো আমার বন্ধু, কাজেই এই বিষয়টা তুমি বুঝতে পারবে তা আমি জানি। হ্যাঁ রাহাত, এই কেসটাতে রাতুলই হবে আমার সহকারী।’

রাহাত কিছুক্ষণ বিপ্লবের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো। বুঝলো, বিপ্লব একবিন্দু মিথ্যে বলছে না এবং খুশিও হলো অনেক, বিপ্লবের সঙ্গ রাতুলের জন্য ভালোই হবে। বিপ্লবের মতো চরিত্রবান ছেলের সান্নিধ্য যে-কোনো কিশোরের জন্যই উত্তম ফল বয়ে আনবে। যাক, রাতুলকে নিয়ে ভাবনার বিষয়টা আপাতত বিপু ভাইয়ার ওপরেই থাকুক।

‘ওকে বিপু ভাইয়া, আমি খুশির খবরটা এক্ষুনি গিয়ে রাতুলকে দিচ্ছি।’ বলে আর দাঁড়ালো না রাহাত। এক প্রকার ছুটে বেরিয়ে গেল দরজা দিয়ে।

বিপ্লব মুচকি হাসলো। ইফতারের সময় হয়ে আসছে। আম্মুকে সহযোগিতা করতে হবে। তাছাড়া রাতুলের ইফতারের বিষয়টাও জানাতে হবে। আম্মু এতে খুশিই হবেন।


তিন.


ইফতার ও মাগরিবের নামাজ সেরে আবার নিজের ঘরে এসে বসেছে বিপ্লব। এবার সঙ্গে অবশ্যই রাতুলও আছে। রাতুলকে নিয়েই সবুজ কাগজের আঁকিবুঁ কির অর্থ বের করতে চায়।

রাতুলও রাহাতের মতো কিছুই বুঝলো না ওটা দেখে।

বিপ্লব বললো, ‘আমি নিজেই কিছু বুঝতে পারছি না, তোমাকে আর কী বলবো?’

এরপর বিভিন্ন ভাবে কাগজে পেন্সিল দিয়ে সবুজ কাগজের সিম্বলিকগুলো আঁকতে লাগলো। রাতুল মনোযোগ দিয়ে সেগুলো দেখতে লাগলো।

বিপ্লবের মস্তিষ্ক আঁকিবুঁকির কাছে কাজও করে চলেছে। বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করে চলেছে।

পথমে দুইটি টিক চিহ্ন। এরপর ন চিহ্নটা। এটার উচ্চারণ বেটা। প্রাচীন গ্রিক ভাষায় ২ বোঝাতে এরূপ ছোটো হাতের ইংরেজি বি লোখা হতো। এটি বীজগণিত, আবহবিদ্যা, পর্বতারোহণ, পদার্থ বিজ্ঞান ইত্যাদিতে ব্যবহৃত হয়। এর ঠিক গায়ে গায়ে লাগানো ৎ এবং স। ইংরেজি পি অক্ষরটিকে ছোটো হাতে লিখলে ৎ-এর মতো দেখায়। এটিকে রো বলে গ্রিক বর্ণমালার ১৭তম অক্ষর যার মান ১০০। এটাও গণিত, পদার্থবিদ্যা ইত্যাদিতে ব্যবহার করা হয়। স এই চিহ্নটিকে মিউ নামে চিহ্নিত করা হয়। মিউ হলো গ্রিক বর্ণমালার ১২তম বর্ণ। গ্রিক সংখ্যা সিস্টেমে এর মান ৪০। স-এরও রয়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার। এটি মাপা, গণিত, পদার্থবিদ্যা, প্রকৌশল, কম্পিউটার বিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিদ্যা, ফার্মাকোলজি, সংগীত, ক্যামেরা, ভাষাবিদ্যা প্রভৃতি মাধ্যমে বিভিন্ন অর্থ প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। 

অর্থাৎ, এই তিনটি গ্রিক বর্ণকে একত্রে যোগ করলে কোনো শব্দ তৈরি হবে সেটাই কি বোঝাতে চেয়েছেন চিরকুট লেখক? না কি অন্য কিছু?

স-এর পর আবার ন (বেটা) বা ইংরেজি ছোটো হাতের বি অক্ষর এবং তার গায়ে গায়ে পাই-এর চিহ্ন (ঢ়)। বিপ্লব গুগলে সার্চ দিলো। সেখান থেকে পাই নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারলো। এটা প্রাচীন গ্রিক ভাষায় ব্যবহৃত হতো। বৃত্তের পরিধি ও ব্যাসের অনুপাতকে পাই দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এটি একটি গাণিতিক ধ্রুবক। মোটামুটিভাবে এর মান প্রায় ৩.১৪১৫৯। গণিত, বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিদ্যার অনেক সূত্রে এটি ব্যবহার করা হয়।

বিপ্লব বুঝতে পারলো না এই গাণিতিক ধ্রুবকটি দ্বারাই বা কী বোঝানো হচ্ছে? এই পাইয়ের পাশেই একটা ডট চিহ্ন। তবে বিন্দু বা ডট চিহ্নটা স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বড়োই। এর পাশে আবার দু’টি আশ্চর্যবোধক চিহ্ন।

নাহ্, কিছুই মাথায় ঢুকছে না। অদ্ভুত আঁকিবুঁকির নিচে আবার সাদা রঙের চোখের চিত্র। তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে বিপ্লবের মাথার মধ্যে।

‘কিছু বুঝলে?’ রাতুলকে জিজ্ঞেস করলো বিপু।

রাতুল বললো, ‘আমি? ধুর ছাই, আমার মাথা কি তোমার মতো অমন শার্প নাকি! আমি তো ওগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখে শর্ষেফুল দেখছি।’

বিপ্লব বললো, ‘আমার অবস্থাও তোমার মতোই।’

হাত দুটো পেছনে নিয়ে গিয়ে তার ওপর শরীরের ভর দিয়ে ওভাবেই রইলো প্রায় ত্রিশ সেকেন্ড। তারপর সোজা হয়ে বললো, ‘তুমি কি এশা ও তারাবির নামাজ শেষ করে খাবে না আগেই খাবে?’

রাতুল বললো, ‘আমি তো আগে খেয়ে নিই। তারপর নামাজ পড়তে মসজিদে যাই।’

‘তাহলে এখন যাও, খেয়েদেয়ে মসজিদে এসো। আর হ্যাঁ, কাল সকাল নয়টার দিকে চলে আসবে। তখন আমরা এটা নিয়ে আবার বসবো। আমি রাতেও এটা নিয়ে ভাববো। দেখি, কিছু বের করতে পারি কি না।’ উঠে দাঁড়ালো বিপ্লব। রাতুলকে এগিয়ে দিলো।


এশা ও তারাবির নামাজ শেষে বাড়ি ফিরে অল্প খেয়েই নিজের রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো বিপু। মন দিয়ে নামাজ পড়তে পারলেও খাওয়ার সময় কেবলই ওই সবুজ কাগজের বিষয়টা ওকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। তাই খেতেও পারেনি বেশি। অবশ্য ও যে বেশি খায়, তা নয়। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত মেনে পেটটাকে তিন অংশে ভাগ করেই ও খাবার গ্রহণ করে। তিন ভাগের এক অংশ পরিমাণ খাবার খাওয়া, এক অংশ পরিমাণ পানি পান করা ও এ অংশ খালি রাখা সুন্নাত। এতে বাতাস থাকবে এবং আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করতে সুবিধা হবে। কত বৈজ্ঞানিক প্রিয় নবীর শেখানো পদ্ধতি!

বিপ্লব বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে দু’হাতের তালুতে মাথা রেখে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। তবে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেও ওর দৃষ্টি কাগজের আঁকিবুঁকিগুলোই যেন দেখছে। ওর মাথার মধ্যে একটার পর একটা সিম্বল ঘুরপাক খাচ্ছে। সাথে যেন ওর মাথাটাও ঘুরছে পোঁ পোঁ করে।

এভাবে পাকা প্রায় দশ মিনিট কাটলো। হঠাৎ ওর মাথাটা স্থির হয়ে গেল। উঠে বসলো দ্রুত। চোখজোড়া চকচক করে উঠলো। কিছু হয়তো উদ্ধার করতে পেরেছে।

খাতা ও পেন্সিল পাশেই ছিল। টেনে নিল। তারপর খস খস করে কী সব লিখলো।

দুইটা টিক চিহ্নের পর ইংরেজি বি (ন) অক্ষর। তারপাশে যদি পি (ৎ) এবং ইউ (স) হয়, তবে পুরোটা মিলে কী দাঁড়ালো? ইংরেজি বি অক্ষরের উচ্চারণ যদি বাংলায় বি হয়, এবং পি-ইউ অর্থাৎ বাংলায় পু উচ্চারণ হয়, তাহলে কি একটি অর্থবোধক শব্দ হয় না! হ্যাঁ, একটা অর্থবোধক শব্দই তো বোঝাচ্ছে, আর সেটাই বিপ্লবকে আশ্চর্য করছে। “বিপু”- এটা তো ওর নামেরই সংক্ষিপ্ত রূপ! তার মানে...

এরপর আবার ইংরেজি বি (ন) অক্ষর এবং তার গায়ে গায়ে পাই (ঢ়)-এর চিহ্ন। এই পাই (ঢ়)-কে যদি ইংরেজি ছোটো হাতের আর ধরা হয়...

আচ্ছা, বিপু নামের সাথে তো ভাইয়া শব্দটা জড়িত। ছোটো-বড়ো যারাই ওকে চেনে-জানে- সবাই তো ওকে বিপু ভাইয়া বলেই ডাকে। তাহলে তো..., তাহলে তো...।

হ্যাঁ, এটাই হবে- ইংরেজি বি (ন) অক্ষর এবং তার গায়ে গায়ে পাই (ঢ়)-এর চিহ্ন অর্থাৎ ইংরেজি ছোটো হাতের আর এবং এই আর-এর পাশেই একটা ডট চিহ্ন। তবে বিন্দু বা ডট চিহ্নটা স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বড়োই। এই ডট (-) চিহ্নকে ইংরেজির ও লেটার ধরলে একটা অর্থবোধক শব্দ তৈরি হয়- বি-আর-ও (ইৎড়) মানে ব্রাদার (ইৎড়ঃযবৎ) এর সংক্ষিপ্ত রূপ। ব্রাদার বা ভাই বোঝাতে এই ইৎড় শব্দটা বহুল প্রচলিত।

চোখজোড়া চকচক করে উঠলো বিপ্লবের। দুটো শব্দ সম্ভবত উদ্ধার করা গেল- ইঢ়ঁ (বিপু) ইৎড় (ব্রাদার) মানে “বিপু ভাইয়া”। আর তার পাশে দুটো আশ্চর্য বা বিস্ময় চিহ্ন। কিন্তু সবার প্রথমের দুটো টিক চিহ্ন এবং নিচের সাদা রঙের চোখের অর্থ ও বের করতে পারলো না অনেক চেষ্টা করেও।

আপাতত আর ভাবতে চাইলো না বিপ্লব। এখনই ঘুমিয়ে পড়তে হবে, নইলে সাহরিতে উঠতে সমস্যা হতে পারে। তাই খাতা ও পেন্সিল মাথার পাশে রেখেই ও বেড সুইচ টিপে লাইট বন্ধ করে দিলো। বিছানায় পিঠ লাগাবে, ঠিক এই সময় একটা মোটরসাইকেলের ভটভট আওয়াজ ওর কানে এলো। মনে হলো ওর মাথার কাছের জানালার ওপাশেই এসে থামলো মোটরসাইকেলটা।

শুতে গিয়েও জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো কিশোর গোয়েন্দা। জানালার পর্দা ভেদ করে আলো এসে প্রবেশ করছে রুমটাতে। জানালার পর্দা সরালো ও। আলোটা আরও স্পষ্ট হলো।

হ্যাঁ, একটা মোটরসাইকেল স্টার্ট দেওয়া অবস্থা দাঁড়িয়ে আছে। তাতে দু’জন আরোহী আছে এটা বোঝা যাচ্ছে। এই জানালাটার দিকেই যেন তাকিয়ে আছে।

বিপ্লবের চোখে চোখাচোখি হলো কি না বোঝা গেল না লোকগুলোর, তবে মোটরসাইকেলটা আর থামলো না, চলতে শুরু করলো। অন্ধকারে যতক্ষণ দেখা যায়, সেদিকে তাকিয়ে রইলো বিপ্লব।

ওভাবেই প্রায় আধা মিনিট তাকিয়ে রইলো বিপ্লব। তারপর জানালার পর্দা সরিয়ে এসে বিছানায় উঠে বসলো। বিছানার ছোঁয়া পিঠে লাগা মাত্রই চোখজোড়া বুজে আসতে চাইলো। এবং “আল্লাহুম্মা বিসমিকা আমুতু ওয়া আহ্ ইয়া” ঘুমের দোয়া পড়ে নিল। অল্পপরই তলিয়ে গেল গভীর ঘুমে।


চার.


সাহরি ও ফজরের নামাজ শেষে আর না ঘুমিয়ে বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে আকাশ-পাতাল ভাবতে লাগলো বিপ্লব। সবুজ চিরকুটের আংশিক অর্থ ও সম্ভবত উদ্ধার করতে পেরেছে। কিন্তু সবটা এখনও জানা যায়নি। আর তাছাড়া কাল রাতে ঘুমানোর ঠিক আগ মুহূর্তে জানালার ওপাশে রাস্তায় আলো জ্বেলে দাঁড়িয়ে থাকা মোটরসাইকেলটার রহস্যই বা কী! ওটা কি সত্যিই বিপ্লবের ঘরের দিকে নজর রাখছিল? রাখলে কেন রাখছিল? না কি কোনো কাকতালীয় ঘটনা? রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে হয়তো কোনো কারণে ও জায়গাটায় দাঁড়িয়েছিল। হতে পারে না? হ্যাঁ, হতে পারে।

বিপ্লব নিজেকে প্রশ্ন করে চললো আর জবাবও নিজে নিজে দিতে লাগলো, সবই মনে মনে।

বিপ্লব এবার মাথার কাছ থেকে মোবাইল সেটটা উঠিয়ে নিল। ইন্টারনেট ডাটা অন করে গুগলে চোখ লিখে সার্চ দিলো। নানান তথ্য বেরিয়ে এলো চোখ সম্পর্কে। বিভিন্ন রঙের চোখের বর্ণনা এলো একে একে। চিরকুটের চোখের ছবিটা যেহেতু সাদা, তাই ও বিভিন্ন ভাবে সাদা চোখ সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করলো। একটা লিঙ্কে বিভিন্ন রঙের চোখওয়ালা মানুষের বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে সাদা চোখের মানুষের সম্পর্কে লেখা আছে- কোমল, শান্তিপ্রিয় ও অহিংসুক স্বভাবের হন সাদা চোখের মানুষরা।

চোখ সম্পর্কে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বিপ্লব জানতে পারলো-

মানবদেহ পরিচালনা করে মস্তিষ্ক। মস্তিষ্কে তথ্য সরবরাহ করে অনেক সেন্টার। এর মধ্যে চোখ অন্যতম। চোখ দেখে বহুদূর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে মস্তিষ্কের কাছে তথ্য পৌঁছায়। চারপাশের দৃশ্যাবলি চোখের সহায়তায় মস্তিষ্কে দৃশ্যকরণ করে তথ্য পাঠায়। মস্তিষ্কের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে চোখের বিশাল ভূমিকা রয়েছে।

একবার কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমাদের চোখ দু’টিকে বুজে রাখলে দেখবো, সবই অন্ধকার! লাল, নীল, সবুজ, হলুদ, সাদা, বেগুনি, গোলাপি, যুবক-বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ, তরুলতা, জীবজন্তু, পশু-পক্ষী সবই মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। সবই এক রূপ ধারণ করেছে এবং সে রূপ ভয়াবহ অন্ধকার। এর মধ্যে ধনী-গরিবের কোনো পার্থক্য নেই। এর মধ্যে সাধু, অসাধু, বীর, কাপুরুষের ভেদাভেদ নেই। সবই এক স্থানে রূপ নিয়েছে।

সবার আস্ফালন, সবার হিম্মত, সবার ধন-দৌলত একাকার হয়ে মিলেছে ওই অন্ধকারে। কঠিন! জটিল ওই অন্ধকার। সবাইকে এক ছাঁচে মিলিয়েছে। হার মানি ওই অন্ধকারের কাছে। মায়ের পেটেও ছিলাম সেই অন্ধকারে। আবার চলে যাবো সেই মহা অন্ধকার ঘরে। ওহ! সেই মহা অন্ধকারের ¯্রষ্টা কে? জানাই তাঁকে অসীম কৃতজ্ঞতা। জানাই তাঁকে লাখো শোকর, যিনি চোখ দিয়ে এই মহা অন্ধকার হতে রক্ষা করেছেন ও আলোর পথ দেখিয়েছেন।

বৈজ্ঞানিকদের মতে, চোখের ঝিল্লিতে মোট নয়টি স্তর আছে। এদের সমষ্টি সূক্ষ্ম কাগজের চাইতেও পাতলা। সকলের অভ্যন্তরস্থ ঝিল্লি স্তরটি ৩ কোটি দণ্ড ও ৩০ লক্ষ ঘনক্ষেত্র দিয়ে প্রস্তুত। এই স্তরগুলো পরস্পরের সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে। চোখের কাচ পুটকগুলো ঘনত্বের দিক দিয়ে পরস্পর বিচ্ছিন্ন, তার ফলে চোখের জ্যোতি একই ক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত হয়। চোখের মধ্যে যেসব ক্ষুদ্র দর্পণ বা প্রতিফলক রয়েছে সেগুলোর সঙ্গে লক্ষ লক্ষ শিরা, উপশিরা ও সূক্ষ্ম স্নায়ুমণ্ডলীর মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রয়েছে। দেহের প্রত্যেকটি ইন্দ্রিয় স্বয়ংসম্পূর্ণতা লাভ না করা পর্যন্ত দৃষ্টিশক্তি লাভ করা একরূপ অসম্ভব।

দর্শন-যন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে চোখ, যা নিজে ১৩ কোটি আলো বিকিরণকারী যন্ত্রের সমষ্টি এবং এই সকল যন্ত্র হচ্ছে স্নায়ুর কেন্দ্রবিন্দু। আচ্ছাদিত চোখের পাতায়, চোখের দিনরাত রক্ষণাবেক্ষণ করে এবং এই পাতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নড়াচড়া করে। এটি নাড়াতে কোনো ইচ্ছার দরকার হয় না। ধুলাবালি, মাটি, কঙ্কর প্রভৃতি যাবতীয় ক্ষতিকর বহিরাগত জিনিস থেকে এই পাতাই চোখকে রক্ষা করে। অনুরূপভাবে ভ্রুর ছায়া তাকে সূর্যের উত্তাপের প্রখরতা থেকেও রক্ষা করে। চোখের পাতার ক্রমাগত উত্থানপতন চোখকে বহিরাগত ক্ষতিকর জিনিস থেকে রক্ষা করা ছাড়াও চোখের শুষ্কতা প্রতিরোধ করে। চোখের পানি, যাকে অশ্রু বলা হয়ে থাকে, তা হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী নিষ্কাশক।

এই চোখের গঠন আল্লাহ তাআলা এমনভাবে করেছেন যে, চোখের ওপরে কপালের সাথের হাড়টিকে একটু উঁচু করেছেন যেন কোনো জিনিস এসে হঠাৎ করে চোখে আঘাত করতে না পারে। কোনো জিনিস এসে চোখে আঘাত করতে গেলেই তা চক্ষু কোটরের হাড় বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং এভাবে চোখ আঘাত থেকে রক্ষা পায়। কোনো ক্ষুদ্র বস্তু চোখে পড়তে গেলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে চোখের পাতা বন্ধ হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা চোখের ভ্রুর ব্যবস্থা করেছেন যেন এই চোখ সূর্যের প্রখর আলো থেকে হেফাজতে থাকে। চোখে পানির ব্যবস্থা করেছেন যেন এই পানি চোখকে ধুয়ে প্রতি মুহূর্তে পরিষ্কার করে দেয় এবং মানুষ স্বচ্ছভাবে দেখতে পায়।

আমাদের চোখ প্রতি সেকেন্ডে ১০টি করে ছবি তুলতে পারে। কাজেই একজন মানুষ যদি প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে ঘুমায় আর বাকি সময় জেগে থাকে তাহলে সে ৫ লক্ষ ৭৬ হাজার ছবি তুলতে সক্ষম। যা দুনিয়ার কোনো ক্যামেরা ব্যাটারি বা ইলেকট্রিক চার্জ ছাড়া বছরের পর বছর চোখের মতো ছবি তুলতে পারবে না।

তাছাড়াও একটি চোখ প্রতি মিনিটে গড়ে ১২ বার পিটপিট করে বা চোখের পাতা ফেলে। আট ঘণ্টা ঘুম আর বাকি সময় জেগে থাকা কোনো মানুষ প্রতিদিন গড়ে ১১ হাজার ৫২০ বার চোখ পিটপিট করে বা চোখের পাতা ফেলে। কিছু রোগ-জীবাণু রয়েছে যেগুলো চোখের পাতা ফেলতে বাধার সৃষ্টি করে। চোখের পাতা যদি সঠিকভাবে খোলে আর বন্ধ হয় তবে সেই রোগ-জীবাণুগুলো আমাদেরকে আক্রমণ করতে পারে না। আর মানুষ তখনই চোখের পাতা পিটপিট করার মূল্য বুঝতে পারে যখন সে এই ধরনের কোনো রোগে আক্রান্ত হয়। আমরা সবাই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি, যিনি আমাদেরকে প্রতিদিন ১০ হাজারেরও বেশি বার চোখের পাতা পিটপিট করার ক্ষমতা দিয়েছেন, আর এজন্য তিনি কোনো মূল্য গ্রহণ করেন না। 

চোখই হচ্ছে প্রাণ সৃষ্টির অন্যতম সুস্পষ্ট প্রমাণ। চোখ মানুষেরই হোক বা অন্য কোনো প্রাণীরই হোক, শ্রেষ্ঠতম ডিজাইনে তৈরির অন্যতম উদাহরণ। এই দুনিয়ায় মানুষের তৈরি যত রকম জটিল জিনিস রয়েছে তার চেয়ে চোখের গঠন অনেক বেশি জটিল এবং অভিভূতকারী। চোখকে ব্যতিক্রম ধরনের অঙ্গ হিসেবে ধরা হয়।

চোখ ও পাখার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা শুধু তখনই কাজ করতে সক্ষম যখন তারা সম্পূর্ণভাবে তৈরি হয়। অর্থাৎ একটি অর্ধ-বিকশিত চোখ দেখতে পারে না। তেমনি একটি অর্ধ-গঠিত পাখা নিয়েও পাখি উড়তে পারে না। এই মুহূর্তে আমরা আবার সেই খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি হই, কে চোখের সমস্ত উপাদান একত্র করে সৃষ্টি করলেন? এক্ষেত্রে আমরা এমন একজন মহাজ্ঞানীর অস্তিত্বের কথা স্বীকার করতে বাধ্য, যিনি সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন। প্রাণীদের জন্য দেখার ক্ষমতা, চলার ক্ষমতা, শোনার ক্ষমতা ইত্যাদিও দান করেছেন। সূরা আল মুলক-এর ২৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, “আপনি বলে দিন! তিনিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদেরকে দিয়েছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি এবং অন্তঃকরণ। তোমরা খুব সামান্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।”

কিছু চোখ আল্লাহকে চেনার জন্য দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। আল্লাহর নিখুঁত সৃষ্টি অবলোকন করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এমন চোখ সম্পর্কে আল্লাহপাক একই সূরার ৩ ও ৪ নম্বর আয়াতে বলেন, “যিনি স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন সপ্তাকাশ। দয়াময় আল্লাহর সৃষ্টিতে তুমি কোনো খুঁত দেখতে পাবে না। তুমি আবার তাকিয়ে দেখো, কোনো ত্রুটি দেখতে পাও কি? অতঃপর তুমি বারবার দৃষ্টি ফেরাও, সে দৃষ্টি ব্যর্থ ও ক্লান্ত হয়ে তোমার দিকেই ফিরে আসবে।”

যে চোখ আল্লাহকে চেনে না, সে চোখ হতভাগা। যে চোখ আল্লাহকে মানে না, সে চোখ অভিশপ্ত। যে চোখ অহির জ্ঞান থেকে বঞ্চিত, সে চোখ অবাঞ্ছিত। যে চোখে মানুষের জন্য অশ্রু নেই, মানবতার জন্য শিশির নেই, সেটি মরুচোখ। এমন চোখ থেকে আল্লাহর নিকট পানাহ চাওয়া উচিত।

মানুষ যখন আলোর মধ্যে যায় তখন তার চোখের মণি বিস্তৃত হয় আর যখন অন্ধকারে আসে তখন চোখের মণির স্নায়ুসমূহ সঙ্কুচিত হয়। কারণ অন্ধকারের মধ্যে ঠিকভাবে দেখার জন্য তা সঙ্কুচিত হওয়া জরুরি। এই বিস্তৃত হওয়া ও সঙ্কুচিত হওয়ার কাজে মানুষের চোখের শিরা-উপশিরা সাত মাইল দূরত্ব অতিক্রম করে। এ কাজটি নিজে নিজে হয়ে যায়। এই কাজ যদি মানুষের হাতে ন্যস্ত করা হতো আর বলা হতো যে, যখন তুমি অন্ধকারের মধ্যে যাবে, তখন এই বোতামটি চাপবে আর যখন আলোর মধ্যে যাবে তখন এই দ্বিতীয় বোতামটি চাপবে তাহলে চোখ ঠিকভাবে কাজ করবে, তবে দেখা যেত ভুল সময়ে অথবা প্রয়োজনের অধিক বোতাম চেপে বসতো। কিন্তু আল্লাহ তাআলা একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা চোখে বসিয়ে দিয়েছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী চোখের মণি বিস্তৃত ও সঙ্কুচিত হয়।

চোখের পাপড়ি ও তাতে বিদ্যমান সূক্ষ্ম পালকগুলোর দিকে লক্ষ করলে বোঝা যায়, চোখের মতো স্পর্শকাতর অঙ্গের হেফাযতের জন্য এগুলো একান্ত প্রয়োজন। এগুলোকে আল্লাহ তাআলা সক্রিয়তা ও দ্রুত ওঠানামার শক্তি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, যেন এগুলো বাতাসে উড়ন্ত ধুলাবালি ও ময়লা থেকে চোখকে রক্ষা করতে পারে। চোখের ওপর কোনো ধুলাবালি পড়ার উপক্রম হলেই পাপড়িগুলো তা প্রতিরোধ করে এবং চোখকে সেগুলোর অনিষ্টতা হতে রক্ষা করে। 

আল্লাহ তাআলা চোখের পলককে এমন এক বিশেষ ক্ষমতা ও ব্যবস্থা হিসেবে সৃষ্টি করেছেন যে, প্রয়োজনের সময় তা সক্রিয় হয়ে ওঠে, প্রয়োজনে বন্ধ হয়ে যায় আবার খুলে যায় এবং চোখকে বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করে। চোখকে নানা বিপর্যয় থেকে রক্ষা কারা ছাড়াও পলক চোখের ও চেহারার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। শোভা বৃদ্ধির জন্যই চোখের পাপড়িগুলোকে পরিমাণ অনুযায়ী লম্বা করে সৃষ্টি করা হয়েছে। যদি এর চেয়ে বেশি লম্বা করা হতো, তবে চোখের জন্য তা হতো যন্ত্রণাদায়ক। আবার বেশি খাটো হলেও সমস্যা দেখা দিতো।

চোখের পানি সাধারণ কিছু নয়। এটি শ্লেষ্মা, পানি, তেল ও ইলেকট্রোলাইটের একটি জটিল মিশ্রণ। আল্লাহ তাআলা অনেক উপকারী হিসেবে এটি সৃষ্টি করেছেন। এটি ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী, যা চোখের ইনফেকশন থেকে রক্ষা করে, এটি কর্নিয়াকে মসৃণ করে, পরিষ্কার দৃষ্টির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এটি কর্নিয়াকে যথেষ্ট আর্দ্র রাখে এবং অক্সিজেন সরবরাহ করে, এটি চোখের জন্য ওয়াইপার হিসেবেও কাজ করে।

মোটামুটি চোখ সম্পর্কে এ কথাগুলোই মনে রাখতে পারলো বিপ্লব।

ইন্টারনেটে এসব বিষয় দেখতে দেখতেই একসময় ঘুমিয়ে পড়েছিল ও। ঘুম ভাঙল রাতুলের ডাক শুনে। তখন বেলা এগারোটার কাছাকাছি। আর রাতুল ওকে যে বিষয়টা জানাল, সেটাতে চরম একটা ধাক্কা খেল কিশোর গোয়েন্দা বিপ্লব খান ওরফে বিপু ভাইয়া।


পাঁচ.


রাতুলদের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে, বড়ো রাস্তার তে-মাথায় ঘটে ঘটনাটা।

গতকাল রাতে একটা মোটরসাইকেল অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে ওখানে। অবশ্য কোনো হাতাহতের খবর জানা যায়নি। পুলিশ খবর পেয়ে যখন ভাঙাচোরা মোটরসাইকেলটা নিয়ে যায়, তখন সেখানে আহত বা নিহত কোনো কাউকে দেখা যায়নি। তাই ওখানে আসলে কী ঘটেছিল, অর্থাৎ কীসের সাথে মোটরসাইকেলের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে, তা কেউ বলতে পারে না। জায়গাটা জনশূন্য হওয়ায় ওদিকটায় রাতে সাধারণত কেউ যায় না। ফজরের নামাজ আদায় করে আবু জহির মিয়া যাচ্ছিলেন ওপাড়ায় তার আত্মীয় আইনাল শেখের বাড়িতে, জরুরি প্রয়োজনে। তিনিই প্রথমে মোটরসাইকেলটাকে রাস্তার একপাশে পড়ে থাকতে দেখেন। সেখান একজন দু’জন করতে করতে এলাকার অন্যরা জেনে যায়। সকাল সাড়ে নয়টার পর আসে পুলিশ। এলাকার লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানে করে মোটরসাইকেলটা নিয়ে যায়।

খবর শুনে রাতুলও পৌঁছায় সেখানে। লোকমুখে জানতে পারে ঘটনাটা। অনুভব করে এটা বিপ্লবকে জানানো উচিত। তাই ছুটে এসেছে।

রাতুলের কাছে খবরটা জানতে পেরে ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসে বিপ্লব। বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রাতুলের মুখের দিকে। চোখে জিজ্ঞাসা, ‘কী হয়েছে? অমন দৌড়ে কোত্থেকে এলে?’

রাতুল হাঁপাতে হাঁপাতেই বললো ঘটনাটা, সংক্ষেপে।

বিপ্লব জিজ্ঞেস করলো, ‘আমাকে তো ফোন করতে পারতে।’

‘তা করেছিলাম তো, রাহাত ভাইয়ার মোবাইল থেকে। কিন্তু তুমি ধরোনি।’ বললো রাতুল।

বিপ্লব মাথার কাছ থেকে মোবাইলটা উঠিয়ে চোখের সামনে ধরে স্ক্রিন অন করলো- হ্যাঁ, বেশ কয়েকটা মিস্ড কল উঠে আছে, রাহাতের নম্বর থেকে এসেছে।

‘স্যরি,’ বললো বিপ্লব। ‘আসলে ফজরের নামাজ পড়ে একটু দেরি করেই ঘুমিয়েছিলাম তো, তাই হয়তো গভীর ঘুমের মধ্যে ছিলাম। রাহাতের কল শুনতে পারিনি।’

বিছানা থেকে নামলো বিপ্লব। বললো, ‘একটু দাঁড়াও, আমি মুখ-হাত ধুয়ে আসছি। একসাথে বেরোনো যাবে।’

রাতুল গিয়ে চেয়ারে বসলো। বুকের ধুকপুকানি কমে এসেছে। তেষ্টা পেয়েছে ভীষণ, পানির জন্য গলা-বুক হাঁসফাঁস করছে। কিন্তু পরক্ষণই মনে পড়লো, ও তো রোজা রেখেছে। কাজেই, নো পানি।

দুই মিনিটের মধ্যেই ফিরে এলো বিপ্লব খান।

‘চলো,’ বলে রাতুলকে নিয়ে ঘর থেকে বের হলো। গ্যারেজ থেকে বাইসাইকেলটা নিতে নিতে আম্মুকে বললো, ‘আম্মু, আমি একটু বের হচ্ছি।’

‘আচ্ছা যাও, সাবধানে থেকে।’ গলা চড়িয়ে বললেন বিপ্লবের মা।


এখানে এখন কেউ নেই। সেজন্য বিপ্লবের সুবিধেই হলো। নিরিবিলিতে তদন্ত করা যাবে।

অবশ্য এখানে তদন্তের কিছু আছে কি না, তা কিন্তু ও জানে না। ওর অবচেতন মন এটা বললো ওকে।

‘রাতুল,’ বললো বিপ্লব। ‘খুঁজতে থাকো।’

‘কী খুঁজবো আমরা?’ বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলো রাতুল।

‘কী খুঁজবে তা তো আমিও জানি না। তবে খুঁজতে থাক। হয়তো এমন কিছু আমরা পেয়ে যাবো, যা থেকে অনেক কিছু জানা যাবে।’ জবাব দিলো বিপ্লব।

‘ও,’ মুখ দিয়ে শুধু এটুকুই বললো রাতুল। বিপ্লবের দেখাদেখি ওর মতো করেই খুঁজতে লাগলো।

জায়গায় জায়গায় রক্তের ছোপ। ছেঁড়া কাপড়ের কিছু অংশ, আর মোটরসাইকেলের বিভিন্ন ভাঙা টুকরোও পড়ে আছে অ্যাক্সিডেন্ট হওয়া জায়গাটার আশপাশ জুড়ে।

পাকা রাস্তার ওপর থেকে রাস্তার পাশের বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে কিছু হেঁচড়ে যাওয়ার দাগ দেখা যাচ্ছে। অনেকটা অস্পষ্ট হয়ে গেছে সে সব দাগ। অনেক লোকের পায়ের ঘষায় হয়েছে এটা।

হেঁচড়ানো দাগ ধরে এগিয়ে গেল বিপ্লব। এখানে সবুজ ঘাসগুলো দুমড়ে-মুচড়ে আছে। ধূসর বর্ণ ধারণ করেছে। কিছুটা লালচে আভা এখনও বোঝা যায়, রক্তের দাগ।


খুঁজে চলেছে ছেলেরা।

সেই সাথে খোলা রেখেছে চোখ-কান।

যে-কোনো সন্দেহজনক কিছু পেলেই বিপ্লবকে জানাবে রাতুল।

দু’জন দু’দিকে খুঁজছে। বিপ্লব খুঁজছে ওই দুমড়ানো ঘাসের দিকে। রাতুল ঠিক তার বিপরীত দিকে।

বিপ্লব দেখলো, এখান থেকে কোনো কিছু যেন টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সাধারণত কাউকে চিত করে বোগলের নিচে হাত দিয়ে টেনে নিয়ে গেলে পা জোড়া মাটিতে যেরূপ দাগ ফেলে যায়, সেরকম দাগ। একটু খেয়াল করে দেখলো, এক জোড়া না, দুই জোড়া পায়ের ছাপ এভাবে ঘেষটাতে ঘেষটাতে গেছে। মাঝে মাঝে অন্য আরও কয়েক জোড়া পায়ের ছাপ অস্পষ্টভাবে মাটিত বসে আছে। এই দাগগুলো দেখতে হলে তীক্ষ্ম দৃষ্টি ছাড়া সম্ভব নয়।

ভ্রু-জোড়া কুঞ্চিত হয়ে উঠলো বিপ্লবের।

তার মানে মোটারসাইকেলে দু’জন আরোহী ছিল এবং তারা হয় আহত হয়েছিল, নতুবা মারা গিয়েছিল। তৃতীয় কোনো পক্ষ তাদেরকে হেঁচড়ে নিয়ে গেছে।

আসলেই কি তৃতীয় পক্ষ কেউ নিয়ে গেছে, না কি নিজেদেরই কেউ করেছে এটা?

ভাবছে বিপ্লব। ভাবছে, আর খুঁজছে।

এবার চোখজোড়া চকচক করে উঠলো ওর। সামনে, বা-পাশে কাঁটাওয়ালা একটা লতানো গাছের ডালে কাপড়ের একটা ছেঁড়া অংশ বিঁধে আছে। হাতে নিল কাপড়ের টুকরোটা। চোখের সামনে ভালো করে মেলে ধরলো, এমন ধড়াক করে উঠলো বুকের খাঁচার মধ্যে হৃৎপিণ্ডটা। ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো একবার রাতুলের দিকে। রাতুল খুঁজে চলেছে।

কাপড়ের টুকরোটা আবারও চোখের সামনে উঠিয়ে নিল। বুকের ধুকপুকানি কমে এলেও তা একেবারে থামলো না।

শার্টের কলারের ছেঁড়া অংশ এটা। তবে বিপ্লবের অবাক হওয়ার বিষয় হচ্ছে- কলারের গায়ে আঁকা চিহ্নটা। এই চিহ্নটা এখন ওর পরিচিত।

একটা ঢোক গিললো ও। সাদা রঙের চোখের চিহ্ন, অমোছনীয় রং দিয়ে অঙ্কন করা।

‘অ্যাই বিপু ভাইয়া!’ ডাকলো রাতুল, চাপার স্বরে।

‘কিছু পেলে?’ জানতে চাইলো বিপ্লব।

‘একটা টিনের টুকরো।’ ওটা নিয়ে এলো বিপ্লবের দিকে রাতুল।

সাদা রঙের চোখের চিহ্নওয়ালা শার্টের কলারের টুকরো অংশটা আগেই প্যান্টের ডান পকেটে রেখেছে বিপ্লব। এবার রাতুলের হাত থেকে কালো রঙের টিনের টুকরোটা নিজের হাতে নিল।

উল্টো পাল্টে দেখলো বিপ্লব টিনের টুকরোটা। হ্যাঁ, সাদা রং দিয়ে বাংলা ‘ল’ অক্ষরটা লেখা আছে। তার মানে...

চোখজোড়া জ্বলজ্বল করছে ওর। ‘অনেক অনেক মোবারকবাদ তোমাকে রাতুল।’ রাতুলকে বুকে জড়িয়ে ধরলো।

রাতুল বুঝতে পারলো না টিনের একটা ভাঙা টুকরো কী করে এতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো গোয়েন্দার কাছে। তাই ওকে যখন ছেড়ে দিয়ে টিনের টুকরোটা আবারও দেখতে লাগলো কিশোর গোয়েন্দা, তখনও ফ্যালফ্যাল করে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো রাতুল।

‘তুমি এত আনন্দ পেয়েছ টিনের টুকরোটা নিয়ে, যেন তুমি কোনো গুপ্তধন পয়েছ!’ কথাটা আর চেপে রাখতে পারলো না রাতুল।

বিপ্লব বললো, ‘গুপ্তধনই তো! তুমি জানো না যে তুমি কী খুঁজে পেয়েছো।’

‘একট খুলে বলবে আমাকে?’

‘হ্যাঁ, অবশ্যই খুলে বলবো। তার আগে আমাদেরকে এক্ষুনি একটু পুলিশ ফাঁড়িতে যেতে হবে।’

বলে আর দাঁড়ালো না বিপ্লব। টিনের টুকরোটা সাবধানে প্যান্টের পকেটে রেখে যেখানে বাইসাইকেলটা রাখা আছে, সেদিকে এগিয়ে গেল।

রাতুল এটা জানে যে, এখন হাজারটা প্রশ্ন করেও কিশোর গোয়েন্দা বিপ্লব খানের কাছ থেকে কোনো কথা আদায় করা যাবে না, পেটে হাজারটা বোম মারলেও না। তাই আর কোনো কথা না বলে চললো বিপ্লবের দিকে।


ছয়.


ইন্সপেক্টর শেখ মাঈনুল আরেফীন, ফাঁড়ির নতুন ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জ । বিপ্লবের সাথে আগে পরিচয় হয়নি।

এর আগের ইন্সপেক্টর ওর পরিচিত ছিলেন। বেশ কয়েকটি কেসের সমাধান করেছে ও যার কূলকিনারা পুলিশও করতে পারেনি। তাই কোনো জটিল কেস এলে ওর ডাক পড়তো ফাঁড়িতে।

অবশ্য আগের ইন্সপেক্টর ওকে জানিয়েছিলেন যে, তিনি আর বেশিদিন এই ফাঁড়ির দায়িত্বে থাকছেন না। শীঘ্রই অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। হয়তো কোনো কারণে যাওয়ার সময় ওকে জানিয়ে যেতে পারেননি।

ইন্সপেক্টর শেখ মাঈনুল আরেফীনকে বেশ রাশভারী মানুষ মনে হলো বিপ্লবের কাছে। একেবারেই মিশুক না, বিপ্লবের অন্তত তাই মনে হলো।

শুভেচ্ছা বিনিময়ের পালা শেষ হলো।

ইন্সপেক্টর জিজ্ঞেস করলেন, ‘তো, খুদে গোয়েন্দা, বলো তোমাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি?’

বিপ্লব বললো, ‘তেমন কিছু না,..’ কী বলবে ভেবে নিল বিপ্লব মনে মনে। আবার বললো, ‘আজ সকালের ঘটনাটার ব্যাপারে জানতে এসেছিলাম আর কি।’

‘আজ সকালের ঘটনা?’ যেন অবাক হলেন ইন্সপেক্টর। ‘ঠিক কোন্ ঘটনাটার কথা বলছো তুমি?’

বিপ্লব বুঝলো, এভাবে হবে না, কিছু বের করা সহজ হবে না এই পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে। বললো, ‘না মানে,... ওই মোটরসাইকেল অ্যাক্সিডেন্টের ব্যাপারে জানতে চাইছিলাম।’

‘ও তাই বলো।’ কিন্তু উৎসুক হলেন যেন ইন্সপেক্টর। চেয়ারে পুরোপুরি হেলান দিলেন। বললেন, ‘হ্যাঁ, অ্যাক্সিডেন্ট একটা হয়েছে বোধ হয়। তবে...’ থেমে গেলেন তিনি। হয়তো বিপ্লবকে সব বলবেন কি না তা চিন্তা করে নিচ্ছেন।

বিপ্লব কিছু বললো না। আগ বাড়িয়ে কিছু বলতেও চায় না ও।

পুলিশ ইন্সপেক্টর আবার শুরু করলেন, ‘ওটা ঠিক অ্যাক্সিডেন্ট কি না তা কিন্তু বোঝার উপায় নেই। শুধুমাত্র ভাঙাচোরা একটা মোটরসাইকেল পাওয়া গেছে। ওখানে আসলে কী ঘটেছে গত রাতে, তা এখনও পরিষ্কার নয়। এলাকার লোকজন কেউ কিছু বলতেও পারেনি।’

‘ও।’ মুখ দিয়ে শুধু এ কথাটাই বের করলো বিপ্লব।

রহস্য নিশ্চয়ই কিছু একটা আছে এই অ্যাক্সিডেন্টের পেছনে। তবে যেহেতু ইন্সপেক্টর ওকে কোনো তথ্য দিতে চান না, কাজেই আগ বাড়িয়ে তাকে বিপ্লবও কিছু জানাবে না, সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে। তার মানে, এই কেসটাতে পুলিশের কোনো সহযোগিতা ও পাচ্ছে না। সবকিছু নিজেকেই করতে হবে।

এই সময় একজন কনস্টেবল ভেতরে এলো। ওর বুকে নেমপ্লেটে নাম লেখা দেখলো- আনোয়ার।

‘হ্যাঁ, বলো আনোয়ার।’ আনোয়ারের দিকে তাকিয়ে বললেন ইন্সপেক্টর।

কনস্টেবল আনোয়ার কিছু বলতে যাচ্ছিলো, ইন্সপেক্টর শেখ মাঈনুল আরেফীন তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই চেয়ারে সোজা হয়ে বললেন, ‘তো বিপ্লব, তোমরা এখন আসতে পারো। আর হ্যাঁ, কোনো কিছু জানতে পারলে আমাকে জানাতে ভুলবে না, কেমন?’

বিপ্লব উঠে দাঁড়ালো। রাতুলও।

বিপ্লব বললো, ‘ওকে স্যার, আপনার সাথে পরিচিত হতে পেরে বেশ ভালোই লাগলো। তবে আপনার মোবাইল নম্বরটা যদি দিতেন...’

‘হ্যাঁ, আমি তো সেটা ভুলেই গেছিলাম।’

তারপর বিপ্লব ও পুলিশ ইন্সপেক্টর মোবাইল নম্বর বিনিময় করলো।

বাইরে বেরিয়ে এলো বিপ্লব ও রাতুল। বিপ্লব ভেবে পাচ্ছে না, পুলিশ অফিসারের শেষের বলা কথাটার অর্থ। তিনি বললেন অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে কি না তা বলা যাচ্ছে না, আবার কিছু জানতে পারলে তাকে জানানোর কথা বললেন। বিষয়টা কেমন বিপরীতমুখী হয় গেল না?

ছোট্ট ফাঁড়িটা পেরিয়ে বাইরে আসার মুহূর্তে ভাঙাচোরা মোটরসাইকেলটা ওদের নজরে পড়লো। পাচিলের এক কোনায় হেলান দিয়ে রাখা হয়েছে। দুমড়ে-মুচড়ে একাকার হয়ে গেছে।

ভাঙা মোটারসাইকেলটার দিকে ত্রিশ সেকেন্ড মতো তাকিয়ে রইলো বিপ্লব। কিছু একটা মেলাতে চাইছে, বোঝাই যায়।

ইতোমধ্যে মসজিদের মিনার হতে জোহরের আজানের সুললিত কণ্ঠ বাতাসে ভাসতে শুরু করেছে। মুমিন মুসলমান প্রতিটি মানুষকে নামাজের জন্য মসজিদের দিকে আহ্বান জানাচ্ছেন মুয়াজ্জিনেরা।

বিপ্লব ও রাতুল বাইসাইকেলে চড়ে মসজিদের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।

বিপ্লবদের মসজিদের ইমাম বেশ জ্ঞানী মানুষ। একজন প্রকৃত আল্লাহওয়ালা লোক তিনি। মসজিদের জায়গাটা ইমাম সাহেবেরই ওয়াকফ্ করা। আর তিনি ইমামতি করেন একেবারে বিনা পারিশ্রমিকে।

বিপ্লবরা যেমন ইমাম সাহেবকে হৃদয় দিয়ে শ্রদ্ধা করে, তেমনি তিনিও ছেলেদেরকে মন-প্রাণ দিয়ে ¯েœহ করেন। সুযোগ পেলেই বিভিন্ন নীতি-নৈতিকতা শিক্ষা দেন। সে জন্য এ এলাকার ছেলেরা আশপাশের অঞ্চলের শিশু-কিশোরদের চেয়ে আচার-আচরণ, চলাফেরা, কথাবার্তা- সবকিছুতেই আলাদা।

ইমাম সাহেবের নাম মাওলানা মুহাম্মদ সাইদুজ্জমান। একেবারে নিরহংকারী একজন সাদাসিধে মানুষ।

এই রোজায় ইমাম সাহেবকে দিয়ে একটা কাজ করিয়ে নিচ্ছে বিপ্লব। এতে অবশ্য ইমাম সাহেবও বেশ খুশি। একদিন পর একদিন জোহরের নামাজের পর তিনি ছেলেদের নিয়ে বসেন। একেক দিন একেক বিষয়ে আলোচনা করেন। কোনো দিন হয়তো কিশোর কোনো বীরের ঘটনা তুলে ধরেন। কোনো দিন বলেন মুসলিম মনীষীদের কর্মকাণ্ড, সমাজ ও সমাজের মানুষের কল্যাণে তাঁদের অবদান। আবার কোনো দিন বর্ণনা করেন কিশোর সাহাবিদের বীরত্বের কাহিনি। ইমাম সাহেব এসবের ফাঁকে ফাঁকে কুরআন ও হাদিসের বিভিন্ন বাণী ওদের অন্তরে প্রোথিত করে দেন।

আজ পবিত্র কুরআনের সূরা ক্বদর নিয়ে আলোচনা করলেন ইমাম সাহেব। এই সূরাটা নিয়ে আলোচনা করার বিশেষ কারণ হচ্ছে, আজ ২৭ রমজানের রাত। বেশির ভাগ গ্রহণযোগ্য মত অনুযায়ী আজ রাতেই আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছিল। এই রাতটি তাই হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এ রাতের অনন্য বৈশিষ্ট্যের কথা স্বয়ং নবী বর্ণনা করেছেন। আর সূরা আল ক্বদর সেই বিষয়টাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

গত ১৭ রোজার দিন তিনি কিশোর সাহাবি মুয়াজ ও মুয়াওয়াজের সাহসিকতার ঘটনা শুনিয়েছিলেন ওদেরকে। এই রোজার মাসের ১৭ রমজান সংঘটিত হয়েছিল ইসলামের ইতিহাসের কঠিনতম বদরের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে অত্যন্ত বীরত্ব ও সাহসিকতা প্রদর্শন করেছিলেন এই কিশোর দুই সাহাবি, দুই ভাই। ঈমানের বলে তারা ছিলেন বলীয়ান, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভালোবাসায় তাদের হৃদয় ছিল পরিপূর্ণ।

কিশোর সাহাবি হযরত মুয়াজ ও হযরত মুয়াওয়াজের এই ঘটনা জেনে ছেলেদের অন্তরেও বেশ সাহসের সঞ্চার হলো। শপথ নিল ওদের মতো জীবন গঠনের।

ইমাম মাওলানা মুহাম্মদ সাইদুজ্জামান এরপর পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারা ২৮৩ নম্বর আয়াতের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা তুলে ধরলেন। এখানে রমজান মাসের রোজা ফরজ করার বিধান আলোচনা করা হয়েছে।

রাতুলকে ওর বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে বিপ্লব নিজের বাড়িতে এলো।

ওকে কেমন অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে। আসলে মোটরসাইকেল অ্যাক্সিডেন্টটা ওকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। স্পষ্টই বুঝতে পারছে এটাতে একটা রহস্য আছেই। অন্তত অ্যাক্সিডেন্টের জায়গা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া শার্টের কলারের নিচে অমোছনীয় কালি দিয়ে আঁকা সাদা রঙের চোখের চিহ্নটা সেটাই বলছে। আর কালো রঙের টিনের টুকরোটাও।

বিপ্লব নিজের রুমে গিয়ে বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে পড়লো। আকাশ পাতাল ভাবতে লাগলো ও। যেন ঘটনাগুলোকে একটার সাথে আরেকটা মেলাতে চেষ্টা করছে। কিন্তু বারবারই ছিঁড়ে যাচ্ছে। জোড়া লাগাতে পারছে না।

অন্য সময় ও ছাদের দিকে খোলা চোখে তাকিয়ে ভাবে। এক্ষণে চোখজোড়া একটু বন্ধ করলো ও। ঠিক এই সময়ই ‘টিক টিক’ শব্দটা ওর কানে ঢুকলো।

মুহূর্তে চোখজোড়া খুলে গেল। কে করলো অমন শব্দ?

হ্যাঁ, ছাদের যে জায়গাটায় সিলিং ফ্যান ঝুলছে, তার পাশেই বেশ বড়ো সাইজের একটা টিকটিকি। ওটাই ডেকেছে, বুঝলো ও। কিন্তু ওর অবাক হওয়ার ব্যাপারটা ভিন্ন।

আবারও দু’বার ডাকলো টিকটিকিটা।

ওর ঘরে টিকটিকি থাকার কথা নয়। এর আগে দেখেনি ও। আজ কোত্থেকে উদয় হলো খুদে প্রাণীটা?

অবশ্য মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো বিপ্লবের। খুশি হলো।

বিছানায় উঠে বসলো ও। মনে মনে টিকটিকিটাকে একটা ধন্যবাদ দিলো। ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলো।

মিলে গেছে বিষয়টা! সবুজ চিরকুটের রহস্য অনেকটাই আবিষ্কার করতে পেরেছে ও।

সাদা রঙের চোখের চিহ্নের ওপরের লাইনে শুরুতে দুইটা টিক চিহ্ন দেওয়া আছে। টিক চিহ্ন দু’টিকে দুইবার উচ্চারণ করলে হয় “টিকটিক”। আর বাকিটা যদি হয় “বিপু ভাইয়া”, তাহলে প্রথম লাইনের অর্থ দাঁড়াচ্ছে- “টিকটিক বিপু ভাইয়া” বা “টিকটিকি বিপু ভাইয়া”। যার সরল অর্থ দাঁড়ায় গোয়েন্দা বিপু ভাইয়া।

ইশ্! নিজেকেই ধমকালো বিপ্লব। এই বিষয়টা আগেই ওর মাথায় আসা উচিত ছিল, বিপু ভাইয়া’র আগে তো অবশ্যই গোয়েন্দা শব্দটা বসবে।

তার মানে সবুজ চিরকুটটা ওকে উদ্দেশ্য করেই লেখা হয়েছে। কিন্তু কে লিখলো চিরকুটটা? সাদা চোখের ইঙ্গিতটাই বা কীসের? মোটরসাইকেল অ্যাক্সিডেন্টের ওখানে শার্টের কলারের ছেঁড়া অংশটিতেও এই সাদা চোখের চিহ্ন আঁকা। তার মানে এই দুটো বিষয়ের মধ্যে কোনো যোগসাজশ আছে। না কি কাকতালীয়? কিন্তু এতটাও কাকতালীয় ঘটনা হওয়া কি সম্ভব?

বিষয়টা প্রথম থেকেই ভাবতে চাইলো ও। প্রথমে মোটরসাইকেল আরোহী দু’জন লোক ওকে উদ্দেশ্য করে সবুজ চিরকুটটা দিলো। ওদেরকে চিনতে না পারলেও মোটরসাইকেলটার কিছু পরিচিতি ও নিতে পেরেছে। নম্বর প্লেট অ্যানালগ এবং শুরু হয়েছে ‘ল’ দিয়ে। আর ওই অ্যাক্সিডেন্টের স্থল থেকে (যদি আদৌ ওখানে কোনো অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে থাকে) পেয়েছে একটা কালো রঙের টিনের ভাঙা অংশ- যেখানে সাদা রং দিয়ে ‘ল’ অক্ষরটি লেখা আছে।

মোটরসাইকেল আরোহী দু’জনকে ওর কাছে কিশোর বয়সিই মনে হয়েছে। তাহলে কী ঘটেছে ওই দুই কিশোরের কপালে?


সাত.


আজ ২৭ রোজার রাত হওয়ায় বিপ্লব আর কেসটা নিয়ে ভাবতে চাইলো না। কারণ এই রাতটাত ও বরাবরই আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগিতে কাটিতে দিতে অভ্যস্ত। আর আজ রাতে তেমন কিছু ঘটলোও না।

এদিকে ঈদ একেবারে মাথার ওপর কড়া নাড়ছে। ঈদুল ফিতরকে নিয়ে প্রতিবারের মতো এবারও ওর বিশেষ একটা প্ল্যান আছে। অবশ্য তার জোগাড়-বন্দোবস্ত আগেই সেরে রাখা আছে। তাই আপাতত ওসব নিয়ে না ভাবলেও চলবে। এখন শুধু সাদা চোখের বিষয়টা সমাধান করতে পারলেই জমজমাট একটা ঈদ কাটবে এবার, এ ব্যাপারে ও বেশ আশাবাদী।

পরদিন সকালে রাতুলকে নিয়ে বের হলো বিপ্লব। আজ বাইসাইকেলটা নেয়নি ইচ্ছা করেই। ঘটনার পূর্ণ তদন্ত আজই শেষ করতে চায়। সে জন্য কোথায় কোথায় যেতে হতে পারে তার ঠিক নেই।

ওরা প্রথমে চললো রাস্তার তে-মাথায়, যেখানে মোটরসাইকেলের অ্যাক্সিডেন্টটা ঘটেছিল।

এই জায়গাটা নতুন করে ভালোভাবে দেখলো বিপ্লব।

গতকাল যেখানটায় কাপড়ের টুকরোটা পেয়েছিল বিপ্লব, সেদিকে এগিয়ে চললো রাতুলকে নিয়ে। যেহেতু ওর সন্দেহ অনুযায়ী দু’টো লোককে (সম্ভবত দুই কিশোর) ওদিকেই টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাই কিছু পাওয়া গেলে ওদিকেই পাওয়া যাবে।

ছোট্ট একটা ঝোপ মতো আছে এদিকে। অবশ্য এখন আর সেই টানা-হেঁচড়ার দাগ অতটা স্পষ্ট নয়। প্রায় মিলিয়ে গেছে। তারপরও বিপ্লবের অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি ওটা অনুসরণ করেই এগিয়ে চললো।

একটু এগোতেই পায়ে চলা একটা পথ পাওয়া গেল। তবে তার ওপরে শুকনো পাতা পড়ে থাকাতে বুঝলো- এদিকে লোকজনের যাতায়াত খুব একটা নেই। অর্থাৎ এদিকটা বেশ নিরিবিলি।

পায়ে চলা পথটা এঁকেবেঁকে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু বিপ্লবের দৃষ্টি অন্য দিকে বদ্ধ হয়ে রইলো। এতক্ষণে হেঁচড়ানোর দাগটা এই পথটা ধরে এগিয়ে চললেও এই জায়গায় এসে ডানে মোড় নিয়েছে। বড়ো একটা ছাতিম গাছের ওপাশে হালকা জঙ্গল। ওর ভেতরেই এগিয়ে গেছে চিহ্নটা।

রাতুলকে ওকে অনুসরণ করতে বলে জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে পড়লো বিপ্লব।

ছোটো আগাছা, লতাপাতা দুমড়ে মুচড়ে আছে। অর্থাৎ এদিক দিয়েই নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

অল্প চলার পরই হালকা জঙ্গলটা শেষ হয়ে গেছে। এবং ওপাশে দৃষ্টি যেতেই ভীষণভাবে চমকালো। সামনে একটা বিশাল ফাঁকা জায়গা। তার ওপাশে আবারও জঙ্গল শুরু হয়েছে। বড়ো বড়ো গাছপালাও আছে।

বিপ্লব আগে কখনও এদিকটায় আসেনি। আসার প্রয়োজন পড়েনি। আর চমকানোর কারণটা অন্যখানে। হেঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার চিহ্নটা হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেছে। তার মানে..


আর ভাবতে পারলো না বিপ্লব। যেন মাটি ফুঁড়েই উদয় হলো লোকটা। বেশ লম্বা, মাথায় পাটের আঁশের মতো সাদা এবং ততটাই হালকা চুল, ভাঁজপড়া কপাল, কোঁচকানো ভ্রƒ, কোঠরে বসা কুঁতকুঁতে একজোড়া চোখ, বকের ঠোঁটের মতো লম্বা নাক, তার নিচে সরু ঠোঁট। কান দুটোও বেশ লম্বা। লম্বাটে লোকটা একেবারেই লিকলিকে। গায়ে ঢোলা সাদার ওপর কালো ডোরাকাটা একটা ফুলহাটা শার্ট। পরনে ততটাই ঢোলা একটা রংচটা ফুলপ্যান্ট। পায়ে অনেক পুরোনো একটা চামড়ার স্যান্ডেল।

লোকটা এগিয়ে এলেন ছেলেদের দিকে, যেন বাতাসে ভাসতে ভাসতে ওদের সামনে এসে থামলো।

‘আমি মাস্টার তারেকুল।’ বলে ডান হাতটা বিপ্লবের দিকে বাড়িয়ে দিলেন লোকটা। তবে কণ্ঠটা বেশ পুরু, এবং রাশভারী, চেহারা বা শরীরের সাথে একেবারেই বেমানান।

বিপ্লব নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো, ‘আমি বি...’

কিন্তু ওকে কথা শেষ করতে দিলেন না লোকটা। তার আগেই বললেন, ‘বিপ্লব খান ওরফে বিপু ভাইয়া, বিখ্যাত কিশোর গোয়েন্দা!’

একরাশ হাসি ছড়িয়ে পড়লো মাস্টার তারেকুলের চোখে-মুখে। এতে লোকটাকে দেখতে আরও অদ্ভুত দেখালেও একেবারে দৃষ্টিকটু লাগলো না।

বিপ্লব এবং রাতুল দু’জনেই অবাক হলো লোকটাকে বিপ্লবের নাম বলতে শুনে। এটা বুঝতে পেরেই সম্ভবত মাস্টার তারেকুল আবার বললেন, ‘এসো, আমরা ভেতরে গিয়ে কথা বলি।’ বলে ঘুরে দাঁড়ালেন।

বিপ্লবের এবার আরও বেশি অবাক হওয়ার পালা। ভেতরে মানে? কোণে ভেতরের কথা বলছে লোকটা? এখানে তো কোনো ঘর বা অন্য কিছুই নেই!

লোকটা দু’কদম এগিয়েও দাঁড়িয়ে গেলেন এবং ওদের দিকে পুনরায় ঘুরে বললেন, ‘তোমাদেরই বা দোষ দিই কী করে? এখানে তো আসলেই কোনো ঘর নেই। তবে ভেতর আছে। আমার সাথে গেলেই জানতে ও দেখতে পারবে।’ বলে আবার হাঁটা শুরু করলেন।

বিপ্লবের অবাক হওয়ার পালা এবার মাত্রা ছাড়ালো। সে যেন বিপ্লবের মনের কথাও পড়তে জানে! লোকটা কীভাবে বুঝলো যে ও এসব নিয়েই ভাবছে?

ওসব পরে ভাবা যাবে, আপাতত লোকটাকে অনুসরণ করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।

রাতুলকে ইশারা করে লোকটার পিছু নিল বিপ্লব।

বেশি দূর যেতে হলো না, লোকটা যেখান থেকে মাটি ফুঁড়ে উদয় হয়েছিল মনে হয়েছিল, সেখানে গিয়ে থামলেন। এখানে দুটো তালগাছ আছে। গোড়া এক জায়গায় হলেও দু’দিক দিয়ে বেঁকিয়ে ওপরে উঠে গেছে। অনেকটা ইংরেজি ইউ অক্ষরের মতো করে।

‘এসো,’ ছেলেদের বলে তালগাছের ওপাশে চলে গেলেন তারেকুল।

বিপ্লব ও রাতুল একে অন্যের মুখের দিকে তাকালো। বিপ্লব বুঝতে পারলো, রাতুল খুব ভয় পাচ্ছে। ইশারায় ওকে ভয় পেতে নিষেধ করলো বিপ্লব।

ইউ আকৃতির তালগাছ দুটোর ওপাশে ছোট্ট ঝোপঝাড়ের জঙ্গল। তালগাছের ওপাশ থেকে বোঝা যায় না।

জঙ্গলের এক জায়গা থেকে টান দিয়ে ফাঁক করলেন মাস্টার তারেকুল। একটা গোপন পথ যেন বেরিয়ে এলো। ছেলেদেরকে ইশারা করে প্রবেশ করতে বললেন।

একটু দ্বিধা করলো বিপ্লব। তারপর বিসমিল্লাহ বলে ভেতরে পা বাড়ালো। পেছনে গোপন পথের দরজাটা টেনে লাগিয়ে দিলেন মাস্টার তারেকুল।

প্রথমটায় চোখে কিছু দেখতে না পেলেও একটু পর হালকা পরিষ্কার হয়ে গেল সামনেটা। নিচে নামার জন্য একটা কাঠের সিঁড়ি। কুড়ি ফুট মতো নিচে নেমে গেছে সিঁড়িটা।

সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলে একটু খোলা জায়গা। মাটির গায়ে তক্তা বসিয়ে দেওয়াল তৈরি করা হয়েছে। ডান পাশে একটা কাঠের দরজা আছে মনে হলো। দরজার গায়ে একটা চার্জার হারিকেন জ্বলছে।

এবার ওদের পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে গেলেন মাথায় পাটের আঁশসদৃশ চুলওয়ালা লোকটা। দরজাটা টেনে খুলতে হালকা ক্যাঁচকোচ শব্দ করলো।

ওপাশে আরও একটা রুম। ওখানেই একটা চার্জার হারিকেন জ্বলছে।

ভেতরে প্রবেশ করলো ছেলেরা লোকটার সাথে।

এই রুমটা বেশ বড়ো। একপাশে পাশাপাশি দুটো বিছানা। এবং আশ্চর্যের বিষয়, বিছানা দুটোয় দুটো ছেলে শুয়ে আছে উপুড় হয়ে। পা হতে গলা অবধি পাতলা চাদর দিয়ে ঢাকা। ঘুমাচ্ছে।

এছাড়া রুমের এখানে ওখানে আরও কিছু জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা। এই যেমন- দুটো শাবল, একটা কোদাল, একটা বেলচা, কিছু দড়ি, ডায়েরি, খাতা, কলম, পানির জগ, গেলাস, একটা ল্যাপটপ, কয়েকটা পাওয়ার ব্যাংক, একটা দুরবিন- ইত্যাদি। পাশে একটা কাগজের কার্টনও আছে।

‘এখানে বসো তোমরা।’ মাটিতে পেতে রাখা পাটিতে নিজে বসতে বসতে ছেলেদেরও বসতে বললেন মাস্টার তারেকুল।

বসলো বিপ্লব ও রাতুল।

এবার ওদের মনের ভেতরে উঁকি দেওয়া প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার দিকে মনোযোগ দিলেন লোকটা। বললেন, ‘একে একে সব বলছি তোমাদের’ বলে একটু রেস্ট নিলেন তিনি।

মাস্টার তারেকুল বললেন, শুয়ে থাকা ছেলেদের দেখিয়ে, ‘ওরা আমারই ছেলে। ওদের মা মারা গেছেন বেশ কয়েক বছর আগে। রাস্তার তে-মাথায় যে অ্যাক্সিডেন্টটা হয়েছে, ওই মোটরসাইকেলেই ছিল ওরা। গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ করছি আমরা। অবশ্য সবার কাছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ না হলেও, বিপু ভাইয়া, আমি বিশ্বাস করি, এটা তোমার কাছে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ হবে। আমরা যে কাজটা করছি তার সাথে তোমরাও একমত হবে।’

বলে একটু থামলেন। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, ‘আমি জানি তুমি “সাদা চোখ”-এর বিষয়টা নিয়ে বেশ আগ্রহী। হ্যাঁ, তুমি যা ভাবছো, তাই, আমিই ওই সবুজ চিরকুটটা তোমার কাছে পাঠিয়েছি। আশা করি উপরের লেখাটা সম্পর্কে পরিষ্কার হয়েছ। আর সাদা চোখের ব্যাপারটা জানতেই তুমি তোমার এই সঙ্গীকে নিয়ে এতদূর অগ্রসর হয়েছো। আমি সেটাই চেয়েছিলাম যে, তুমি সাদা চোখটা নিয়ে অনুসন্ধান করো এবং আমাদের সম্পর্কে সবকিছু জানো। বিপু ভাইয়া,’ বলে বিপ্লবের দিকে একটু ঝুঁকে এলেন লোকটা। ‘আমি চাই তুমি আমাদেরকে সহযোগিতা করো। কারণ তোমার সহযোগিতা আমাদের খুবই দরকার। তবে তার আগে অন্য একটা বিষয় তোমাকে জানানো জরুরি মনে করছি।’

এতক্ষণ একটি কথাও না বললেও এবার আর চুপ থাকতে পারলো না বিপ্লব। বললো, ‘আপনারা আসলে করছেনটা কী? এই মাটির নিচে আস্তানা গাড়ার কারণটাই বা কী? আমি কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না!’

মাস্টার তারেকুলের মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। বললেন, ‘তোমার উদ্দেশ্য আর আমাদের উদ্দেশ্য প্রায় একই ধরনের। তুমি যেমন চাও সমাজের কিশোররা সবাই সঠিকভাবে বেড়ে উঠুক, যথার্থ শিক্ষা পাক, মানুষ সৃষ্টির লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানুক এবং সেভাবে জীবন পরিচালনা করুক, আমরাও সেটাই চাই। তবে তোমার পদ্ধতি আর আমাদের পদক্ষেপের মধ্যে সামান্য পার্থক্য আছে। আমি বলছি না আমাদেরটা তোমাকে মেনে নিতে, তবে তোমার সাহায্য আমাদের চাই।’

একটু থেমে আবারও বললেন, ‘আমার আরও একটা ছেলে ছিল, বেঁচে থাকলে সে হয়তো তোমারই বয়সি হতো।’

‘কী হয়েছে তার?’ জিজ্ঞেস করলো বিপ্লব।

অনেক কষ্টে যেন চোখের অশ্রু সংবরণ করলেন লোকটা। বললেন, ‘ওর নাম ছিল ফরিদুল। কিন্তু নিজেকে ও মেহেরউল্লাহ নামে ডাকতে বলতো। এমনকি, স্কুলেও ওর নাম ছিল মেহেরউল্লাহ। ওকে ওরা মেরে ফেলেছে। খুন করেছে আমার ছেলেটাকে। জানো, ও খুবই মেধাবী ছিল। ওর স্বপ্ন ছিল, বড়ো হয়ে কর্মবীর মুনসী মেহেরউল্লাহর মতো বাগ্মী হবে। মুনসী মেহেরউল্লাহ সম্পর্কে তোমার অজানা থাকার কথা না। মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছরের জীবনে তিনি সমাজ সংস্কারে বড়ো ভূমিকা রেখে গেছেন। সত্য ধর্ম প্রচারে নিরলস পরিশ্রম করেছেন। আর তা করতে গিয়েই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অল্প বয়সেই ইন্তেকাল করেছেন।’

বিপ্লব এই মহামানব সম্পর্কে জানে। গত ডিসেম্বরে ছিল তাঁর জন্মবার্ষিকী। তাই পড়াশোনা করেছে তাঁর বিষয়ে। এক্ষণে ফরিদুলের বিষয়টা জেনে ওর খুব খারাপ লাগছে। ছেলেটার উদ্দেশ্য সত্যিই মহৎ ছিল।

তারেকুল আবার বললেন, ‘যাই হোক, ফরিদুল ছোটোবেলা থেকেই খুব ভালো স্বভাবের ছিল। সবসময় ন¤্রভাবে চলাফেরা করতো। কাউকে কষ্ট দিতো না। বাবা-মায়ের কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলত। ওর কয়েকজন বন্ধু ছিল। ওরাও ছিল ফরিদুলের মতো। বেশ কয়েকদিন ধরে ফরিদুলকে একট চুপচাপ দেখতাম। অনেক জিজ্ঞেস করার পরও ও আমাদেরকে কিছুই বলেনি। ঘটনাটা যে রাতে ঘটলো, সেদিন ও বেশ রাত হওয়ার পরও বাড়ি ফিরলো না। আমি এবং ওর আম্মু সারা রাত ধরে অপেক্ষা করলাম, কিন্তু ফরিদুল ফিরলো না। রাত পেরিয়ে ভোর হলো, নতুন একটি দিনের শুরু হলো, কিন্তু ফিরে এলো না আমার কলিজার টুকরো।’ এবার আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না তারেকুল।

বিপ্লব জিজ্ঞেস করলো, ‘তারপর কী হলো? কী হয়েছিল ফরিদুলের?’

‘বলছি সে কথা।’ হাতের তালু দিয়ে চোখের পানি মুছলেন মাস্টার তারেকুল। বললেন, ‘একদিন দুইদিন করে পাঁচ দিন কেটে গেলেও আমরা ছেলের সন্ধান পেলাম না।’

‘পুলিশের কাছে যাননি?’ প্রশ্নটা রাতুলের।

‘গিয়েছিলাম। কিন্তু পুলিশ কিছু করতে পারেনি। প্রথমে আমাদেরকে আশ্বস্ত করেছিল যে, ভোবেই হোক, ফরিদুলকে তারা খুঁজে বের করবে। কিন্তু সাত দিনের মাথায় জানালো যে এ ব্যাপারে তাদের আর কিছুই করার নেই। আমার নয়নের মণি নাকি নিজের ইচ্ছায় কোথাও আত্মগোপন করে আছে।’

‘আপনি বিশ্বাস করেছিলেন সে কথা?’ বিপ্লব জানতে চাইলো।

মাস্টার তারেকুল বললেন, ‘প্রথম প্রথম করেছিলাম। কিন্তু এটাও ভেবে পাচ্ছিলাম না যে, ছেলেটা তো অমন না, বাবা-মাকে কিছু না জানিয়ে কিছুই করে না সে। অথচ আত্মগোপনে যাওয়ার মতো এত বড়ো একটা সিদ্ধান্ত ও নিজে নিজেই নেবে? না, এটা ও কিছুতেই করতে পারে না। আমার বিশ্বাসটাকে পাকাপোক্ত করতেই যেন একদিন ঘটে গেল ব্যাপারটা।’ একবার মুখ তুলে ছেলেদের দিকে তাকালেন তিনি। তারপর আবার বললেন, ‘ফরিদুলের সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল আহসানুল হক। এক বিকেলে ছুটতে ছুটতে আমার কাছে এলো এবং আমাকে যা জানালো, তাতে আমি সবটা বুঝে নিলাম।’ থামলেন তারেকুল।

বিপ্লব বা রাতুল কিছু না বলে মাস্টার তারেকুলের পরবর্তী কথার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।

প্রায় মিনিট খানেক নীরব থাকার পর আবার বললেন মাস্টার তারেকুল, ‘কে বা কারা নাকি আহসানুল হকের মোবাইলে ফোন দিয়ে বলেছে যে, ফরিদুল আর ফিরে আসবে না। ওর বাবা-মা কিংবা ওর বন্ধুরা যেন আর ওর অপেক্ষায় না থাকে। আসলে ফিরবে কী করে? ও তো আর পৃথিবীতেই নেই। ও ওর কৃতকর্মের পুরস্কার পেয়েছে। এরপর যদি ওর বন্ধুরা বেশি বাড়াবাড়ি করে, বা ওরা যেটা করতে চাচ্ছে, সেটা থেকে বিরত না হয়- তাহলে ওদের ভাগ্যেও একই ফল জুটবে।’

লোকটা থামতেই বিপ্লব জিজ্ঞেস করলো, ‘পুলিশকে জানিয়েছিলেন এ কথা?’

এ পাশ ও পাশ মাথা নাড়লেন তারেকুল। বললেন, ‘পুলিশকে জানাতে ইচ্ছে হয়নি। কারণ ওদেরকে জানিয়ে কোনো কাজ হবে আশা ছিল না আমার।’

‘যে নম্বর থেকে আহসানুল হককে জানানো হয়েছিল ফরিদুলের ব্যাপারটা, সে নম্বরে ফোন করেননি?’

‘করেছিলাম, অনেকবার, কিন্তু আর কখনও খোলা পাওয়া যায়নি ও নম্বর।’

লোকটা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো বিপ্লবও।


আট.


তারেকুল ইসলাম হাইস্কুলের শিক্ষক ছিলেন। এ জন্যই তিনি মাস্টার তারেকুল নামে পরিচিত। আর অন্যের কাছে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি নামের সাথে মাস্টার শব্দটা যোগ করে দেন।

মাস্টার তারেকুল ইসলামের তিন ছেলে, আম্মারুল, রাশেদুল ও ফরিদুল। ফরিদুলের ইতিহাস তো ইতোমধ্যেই বর্ণিত হয়েছে। আর এই মুহূর্তে যারা এই মাত্র ঘুম থেকে জেগে উঠলো, মানে যারা পাশে চাদর গায়ে দিয়ে শুয়ে ছিল, অর্থাৎ আম্মারুল ও রাশেদুল, তার অন্য দুই সন্তান।

বিপ্লবকে ওরা আগে থেকেই চেনে। কিন্তু বিপ্লবের কাছে ওরা অপরিচিত।

বিপ্লব জানতে পারলো, সেদিন রাতে ওরা কাছ সেরে ফিরে আসছিল। তে-মাথার ওখানে আসতেই পেছন থেকে ইচ্ছে করেই ওদেরকে ধাক্কা দেয় মাইক্রোটা। অনেকক্ষণ ধরেই ওদেরকে ফলো করছিল ক্রিম কালারের মাইক্রোটা।

আম্মারুল ও রাশেদুল রাস্তার পাশে ছিটকে পড়ে। আম্মারুল তো মাথার পেছনে তীব্র আঘাত পাওয়ায় সঙ্গে সঙ্গেই জ্ঞান হারায়। আর রাশেদুল জ্ঞান হারাবার ঠিক আগ মুহূর্তে দেখতে পাই মাইক্রোটা ওখানে আর না দাঁড়িয়ে চলে যাচ্ছে।

মাস্টার তারেকুল ইসলামের সহকারীর নাম দিদারুজ্জামান। তিনিই প্রথমে দেখতে পান অ্যাক্সিডেন্টটা। তারপর মাস্টার তারেকুল ইসলামের সহযোগিতায় ছেলে দুটোকে উদ্ধার করে এখানে নিয়ে আসেন।

আম্মারুল ও রাশেদুল বেশ আহত। নড়াচড়া করতে গেলেই শরীরের এখানে ওখানে ব্যথা শুরু হয়ে যায়।

দিদারুজ্জামানের অল্পবিস্তর ডাক্তারি বিদ্যা জানা আছে। সে-ই চিকিৎসা করছে ওদেরকে। একটু আগে তিনি ঔষধ ও আরও কিছু দরকারি জিনিসপত্র নিয়ে এসেছেন।

মাস্টার তারেকুল ইসলাম এবং দিদারুজ্জামানের সাথে কথা বলে বিপ্লব জানতে পারলো যে, এদের কাজ হচ্ছে বিভিন্ন সময়ে হারিয়ে যাওয়া মানুষের সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করা। কী ঘটেছে তাদের কপালে, বেঁচে থাকলে কোন অবস্থায় আছে, কারা কারা এই গুমের পেছনে যুক্ত- ইত্যাদি বিষয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলছেন তারা। সুযোগ পেলে সেগুলো নিয়ে কাজ করতে চান। অর্থাৎ জীবিতদের উদ্ধার এবং মৃতদের সঠিক বিচার পাইয়ে দেওয়ায় হচ্ছে তাদের মিশন। এই মিশনের নাম দেওয়া হয়েছে “সাদা চোখ”। সাদা চোখের মানুষেরা যেমন অহিংসুক ও শান্তিপ্রিয় হয়- তেমনি ওদের নীতিও অহিংস ও শান্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে। বিশেষ করে সন্তান হারানো পরিবারে শান্তি ফিরিয়ে আনাই তাদের মূল উদ্দেশ্য।

বিপ্লবরা আরও জানতে পারলো যে, আম্মারুলদের মা গত বছরই ইন্তেকাল করেছেন। এক প্রকার ছেলের পথের দিকে তাকিয়ে থেকেই কেটেছে তার শেষ সময়গুলো। আর আহসানুল হকের কথা জানতে চাইলে ওদেরকে জানানো হয়েছে যে, সে-ও গুমের শিকার হয়েছে। তবে সে এখনও বেঁচে আছে কি না, এ ব্যাপারে কিছু জানাতে পারলেন না।

মূলত এই ব্যাপারেই বিপ্লবের সহযোগিতা চান মাস্টার তারেকুল ইসলাম। তিনি বললেন, ‘আমি জানি, আমার এই বিষয়টাকে তুমি পাগলামি হিসেবে ভাবছো। কিন্তু এছাড়া আমার আর করার কিছু ছিল না। একদিকে পুত্রশোকে মায়ের ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া, অন্যদিকে এলাকার কিশোর-যুবকদের একের পর এক হারিয়ে যাওয়া, পাশাপাশি প্রশাসনের নির্লিপ্ততা, আমাকে বাধ্য করেছে এই পথে আসতে। একে যদি তোমরা পাগলামি বলো, তাতে আমি কিছু বলবো না। তবে বিপু ভাইয়া, তোমার কাছে আমার চাওয়া, তুমি আমাকে নিরাশ করবে না। আমি জানি কিশোররা তোমার কত প্রিয়। ওদের কোনো অকল্যাণ তুমি মেনে নিতে পারো না। তোমার সম্পর্কে আমি যাবতীয় তথ্য জোগাড় করেছি। এবং তোমার ওপর আস্থা রেখেই আমি এই এলাকায় এসেছি। এই মাটির নিচে আস্তানা গেড়েছি। এটা করতে আমার অনেক দিন লেগেছে। লোকচক্ষুর অন্তরালে আমি আমার এই আস্তানা গড়ে তুলেছি।’

এক দৃষ্টিতে বিপ্লবের দিকে তাকিয়ে রইলেন মাস্টার তারেকুল ইসলাম। সে চোখে-মুখে একরাশ আকুতি। বিপ্লব যদি সায় না দেয়, তাহলে যেন তিনি মরেই যাবেন।

বিপ্লব এই মুহূর্তে কী করবে বা বলবে, তা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। আসলে কী বলা উচিত এখন ওর?

মাথার ভেতর দ্রুত ভাবনা চলছে। মাস্টার তারেকুল ইসলামের মিশনটাকে একেবারে হেলায় উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তার উদ্দেশ্যটা যে মহৎ, তা তো বোঝা-ই যাচ্ছে। হয়তো পদ্ধতিগত একটু ত্রুটি আছে। তাছাড়া তিনি যে মনোকষ্টে আছেন, তাকে অস্বীকার করা যাবে কীভাবে? নিজের ছেলে হারিয়েছেন তিনি। আদরের ছেলের ভাগ্যে কী হয়েছে, তা তিনি জানেন না। একজন বাবা হয়ে ছেলের এই অকাল প্রস্থানকে মেনে নেওয়া সত্যিই বেশ কঠিন।

‘আমি জানি না আপনাকে কীভাবে সহযোগিতা করবো।’ অবশেষে বললো বিপ্লব খান। ‘তবে আপনার কাজের প্রতি আমার সমর্থন আছে। এখন আমাকে বলুন, এই মুহূর্তে আপনি কী করতে যাচ্ছেন? আমাকে কেন চিরকুটটা লিখলেন?’

একটু যেন ভেবে নিলেন তারেকুল ইসলাম। তারপর বললেন, ‘আমি বেশ কয়েকদিন ধরে লক্ষ্য করছি যে, কয়েকটা লোক আমাদেরকে ফলো করছে। আর আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আম্মারুল ও রাশেদুলের অ্যাক্সিডেন্টের পেছনে তাদেরই হাত আছে।’

‘অর্থাৎ আপনি চাচ্ছেন আমি যেন তাদেরকে খুঁজে বের করি।’ তারেকুল ইলামের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললো বিপ্লব খান।

‘তোমার মেধা এবং বুদ্ধির ওপরে আমার কোনো সন্দেহ নেই।’ বললেন তারেকুল ইসলাম।

‘ঠিক আছে, বলুন আমরা কীভাবে কাজটা শুরু করবো?’

‘তার মানে তুমি আমাদেরকে সহযোগিতা করবে?’ কথাটা বললো আম্মারুল।

আম্মারুলকে সান্ত¡না দেওয়ার ভঙ্গিতে বললো বিপ্লব, ‘আমি তো ইতোমধ্যেই তোমাদের সাথে এই কেসটায় জড়িয়ে গেছি। কাজেই তোমরা না বললেও এটার সমাধান আমাকে বের করতে হবে।’

রাতুলের চোয়াল জোড়া বেশ শক্ত হয়ে উঠলো এই কথায়। এতদিন ধরে ও শুনে এসেছে, বিপ্লব খান ওরফে বিপু ভাইয়া একবার কোনো কেসের দায়িত্ব নিলে তা সমাধান না করে ছাড়ে না। কাজেই এটার বেলায়ও যে সেটাই ঘটবে- এ ব্যাপারে ও নিশ্চিত।

জোহরের নামাজের সময় হয়ে গিয়েছিল। অল্প অল্প পানি ব্যবহার করে ওজু সেরে নিল সবাই। তারপর বিপ্লবের ইমমতিতে নামাজ আদায় করলো।

নামাজ শেষে রাহাত ও আম্মুকে ফোন করে বিপ্লব জানিয়ে দিলো ওদের ফিরতে দেরি হবে। কোনো চিন্তা যেন না করে।

রাহাত ও আম্মুর সাথে কথা শেষ হতেই বিপ্লবের মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো। ইন্সপেক্টর শেখ মাঈনুল আরেফীনের কল। একটু অবাক হলেও রিসিভ করলো কলটা। তারপর ওপাশের কথা শুনলো মনোযোগ দিয়ে। ও শুধু জি জি উচ্চারণ করলো কয়েকবার।

মোবাইলে কথা শেষ করে অন্য সবার দিকে তাকালো ও। বললো, ‘রাতুল এবং আমাকে এখন যেতে হবে। একটা জরুরি কাজ আছে।’

মনে অনেক জিজ্ঞাসা থাকলেও বিপ্লবকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না কেউ।

বিপ্লব ও রাতুলকে তে-মাথা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন মাস্টার তারেকুল ইসলাম।

‘মাস্টার তারেকুল ইসলামের মাথায় গণ্ডগোল আছে কিছু একটা!’ লোকটা দৃষ্টির আড়াল হতেই বললো রাতুল।

মুচকি হাসলো বিপ্লব। এর মাধ্যমে কী বুঝাতে চাইলো তা ও-ই জানে।

বিপ্লবের এই রহস্যময় হাসিতে আরও আশ্চর্য হয়ে গেল রাতুল। গোয়েন্দাগিরিতে যে এতো রহস্য লুকিয়ে থাকে, তা আগে জানতো না। না জানি আরও কী কী অপেক্ষা করছে ওর জন্য।


নয়.


ফাঁড়ির পুলিশ ইন্সপেক্টর শেখ মাঈনুল আরেফীন ফোনে তখন কী বলেছিলেন তা রাতুলকে জানালো বিপ্লব। ফাঁড়ি থেকে মোটরসাইকেলের মালিক এসে কাগজপত্র দেখিয়ে ওটা নিয়ে গেছে। কাজেই এ নিয়ে আর বেশিদূর না এগোলেও চলবে।

‘তুমি বিশ্বাস করেছো?’ বিপ্লব থামতেই জিজ্ঞেস করলো রাতুল।

‘তোমার কী মনে হয়?’ পালটা প্রশ্ন বিপ্লবের।

‘আমার তো মনে হয় ইন্সপেক্টরের এ কথা তুমি মোটেও বিশ্বাস করোনি। সে কারণেই ওখান থেকে দ্রুত চলে এলে।’

‘ভেরি গুড, দারুণ উন্নতি হচ্ছে তোমার।’ বললো বিপ্লব রাতুলের পিঠ চাপড়ে দিয়ে। ‘যোগ্য সহকারী হয়ে উঠছো তুমি আস্তে আস্তে।’

‘এখন তাহলে কী করবে?’

এ কথার কোনো জবাব না দিয়ে কাকে যেন ফোন দিলো কিশোর গোয়েন্দা। কথা শেষ করে বললো, ‘ঠিক আছে মিজান ভাই, আমি আসছি।’

রাতুলকে ঘোরের মধ্যে রেখেই ওকে নিয়ে চললো বিপ্লব।

ইন্সপেক্টর মাঈনুল আরেফীন এই মুহূর্তে ফাঁড়িতে নেই। সেজন্যই এই সুযোগটা নিল বিপ্লব।

কনস্টেবল মিজান ওর পূর্ব পরিচিত। আগেও অনেক তথ্য দিয়ে ওকে সাহায্য করেছেন। তিনি তার মোবাইল ফোনের যে ভিডিওটা বিপ্লবকে দেখালো, তাতে যেন ভীষণ জোরে একটা হোঁচট খেলো বিপ্লব। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, একটা ছেলে ভাঙাচোরা মোটরসাইকেলটা ফাঁড়ির প্রাচীরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ভ্যানগাড়িতে উঠাচ্ছে। ওকে সহযোগিতা করছে আরও কয়েকজন লোক। ছেলেটা ছাড়া অন্য লোকগুলোকে দিনমজুর বলে মনে হচ্ছে। তবে আরও বেশি অবাক হলো ভ্যানগাড়ির একটু সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ক্রিম মাইক্রোটা দেখে।

মাস্টার তারেকুল ইসলাম কি এই মাইক্রোটার কথাই বলছিলেন?

কনস্টেবল মিজানকে ধন্যবাদ জানয়ে দ্রুত পুলিশ ফাঁড়ি থেকে বেরিয়ে এলো বিপ্লব রাতুলকে নিয়ে।

নাইমুল বিপ্লবদের এলাকারই ছেলে। ওদেরই সমবয়সি। তবে বেশ বেয়াড়া টাইপের। অনেক চেষ্টা করেছে বিপ্লব ওকে পথে আনার জন্য। কিন্তু কাজ হয়নি। তবে কয়েকদিন আগে মিজান কথা দিয়েছে বিপ্লবকে যে, ঈদের পরই ও ভালো হয়ে যাবে। বিপ্লবদের সাথে সময় দেবে।

নাইমুলের কথা মনে আসার কারণ- একটু আগে কনস্টেবল মিজান যে ভিডিওটা দেখিয়েছেন, তাতে যে ছেলেটা মোটরসাইকেলটা নিয়ে যাচ্ছে, সে আর কেউ নয়, নাইমুল।

নাইমুলের নম্বরে ফোন দিলো বিপ্লব। দু’বার রিং দিলো এবং দু’বারই কেটে দিলো নাইমুল।

কপালে দুটো ভাবনার ভাঁজ পড়লো বিপ্লবের। নাইমুল কি কোনোভাবে রহস্যটার সাথে জড়িত? না কি ওকে কেউ ব্যবহার করছে? ব্যবহার করলে কে ব্যবহার করছে? কী তার উদ্দেশ্য?

জানতে হলে নাইমুলের সাথে সরাসরি কথা বলতে হবে।

‘কুইক, আমরা ফিরে যাচ্ছি,’ বলে দ্রুত হাঁটা ধরলো বিপ্লব। ওর পেছন পেছন যেতে রাতুলকে রীতিমতো দৌড়াতে হচ্ছে।

বিপ্লবের উপস্থিতি টের পেয়েই বাড়ি থেকে দৌড়ে পালালো নাইমুল। কিছু দূর তার পেছন পেছন দৌড়ালো বিপ্লব ও রাতুল। কিন্তু তাকে ধরতে পারলো না। অবশেষে ক্ষান্ত দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। দু’হাঁটুতে দু’হাত রেখে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিতে লাগলো।

একটু পর উঠে দাঁড়িয়ে নাইমুলের নম্বরে ফোন দিলো বিপ্লব। না, সুইচড্ অফ দেখাচ্ছে।

আজ আর কোনো ঘটনা ঘটলো না। তবে ওর বন্ধু এবং ওকে যারা ভালোবাসে- সকল কিশোরকে জানিয়ে দেওয়া হলো ক্রিম কালারের মাইক্রোবাসটা খুঁজে বের করতে। এ কাজে রাহাতও সাহায্য করবে। অর্থাৎ, ক্রিম কালারের কোনো মাইক্রোবাসের দেখা পেলেই যেন বিপ্লব বা রাহাতকে জানানো হয়।

বাকি সময়টা নিজের রুমেই কাটিয়ে দিলো বিপ্লব।

সারাদিনে বেশ ধকল গেছে শরীরের ওপর দিয়ে। তাই বাড়ি ফিরেই আগে ভালো করে গোসল করে নিয়েছে।

প্রচণ্ড তেষ্টায় বুকের ছাতি ফেটে যেতে চাইছে। গলার ভেতরটা শিরীষ কাগজের মতো খসখসে হয়ে গেছে। কিন্তু তা হলেই তো হবে না, ও তো রোজা রেখেছে।

সে রাত এবং পরের দিন, নতুন কিছুই ঘটলো না। অন্য আর পাঁচটা দিনের মতো স্বাভাবিকই কাটলো। তবে এর মধ্যে মাস্টার তারেকুলকে একবার ফোন করেছে বিপ্লব। খোঁজ নিয়েছে আম্মারুল ও রাশেদুলের। ওরা এখন আগের চেয়ে বেশ ভালো আছে। দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছে ওরা।

বিপ্লব ইচ্ছে করেই পুলিশ ফাঁড়ি থেকে মোটরসাইকেলটা নিয়ে যাওয়ার বিষয়টা গোপন রাখলো।

আটাশ রোজার দিনটা যেন কাটতেই চায় না। আসলে কোনো কাজের মধ্যে না থাকলে এমনই হয়। সময় যেন এক জায়গায় থমকে দাঁড়ায়। অবশ্য সময় যে কখনও থেমে থাকে না, এ কথা ও ভালো করেই জানে।

যাই হোক, ঊনত্রিশ রোজার সাহরি খাওয়ার পর মসজিদ থেকে ফজরের নামাজ পড়ে এসে ও রুমে ঢুকতেই রাহাতের ফোন পেল। আর রাহাতের ফোন পেতেই ওই অন্ধকারেই ছুটলো ঘটনাস্থলে। অবশ্য রাতুল ও রাহাতকেও আসতে বললো ওখানে।


দশ.


ক্রিম কালারের মাইক্রোবাসটা তিন রাস্তার মোড়ে ভেঙেচুরে দলা হয়ে পড়ে আছে রাস্তার বাঁ-পাশে।

বিস্ময়ের পর বিস্ময়ের ধাক্কা খেতে লাগলো বিপ্লব। এ কেমন গোলমেলে কেস নিয়ে পড়লো ও? এমন তো এর আগে কখনও হয়নি!

যেটা নিয়ে এগোতে চাচ্ছে, সেখানেই বাধা পড়ছে। সাদা চোখের রহস্যের সমাধান করতে পারলেও তার সাথে জড়িত ছিল এই ক্রিম কালারের মাইক্রোবাসটা। কিন্তু সেটাও এখন অ্যাক্সিডেন্টের কবলে পড়েছে বিপ্লবের বেশি আশ্চর্যের বিষয়টা হচ্ছে, মাইক্রোবাসটার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে ওই একই জায়গায়, যেখান থেকে তার উপস্থিতির রহস্য শুরু হয়েছিল।

এটা কি কোনো কাকতালীয় ঘটনা? না এর পেছনেও কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে? থাকলে, কী সেই রহস্য? বিপ্লব কি বের করতে পারবে সেই রহস্য? না কি হেরে যাবে?

না, এভাবে ও হারতে পারে না। তার মানে কিছু একটা করতে হবে ওকে।

কিছুক্ষণের মধ্যে জায়গাটা পরিষ্কার হয়ে গেল। ইন্সপেক্টর মাঈনুল আরেফীনের সাথে টুকটাক কিছু কথা হলো। কিন্তু কোনো তথ্য দিতে পারলেন না তিনি। কীভাবে অ্যাক্সিডেন্টটা ঘটলো, সেটা অজানাই রয়ে গেল।

বিপ্লবরা ফিরে চললো বাড়ির দিকে।

সবাইকে বিদায় দিয়ে ও নিজের বাড়িতে পৌঁছালো। এমন বিমর্ষ ওকে এর আগে দেখা যায়নি। খুবই ভেঙে পড়েছে ও। আসলে এই হারটা ওর জন্য বেশ লজ্জাজনক। তাই এটা মেনে নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কিন্তু হার মেনে না নিয়েই বা কী করবে? কী করার আছে আর?

নিজের রুমে গিয়ে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে পড়লো। মাথার নিচে হাতের তালু রেখে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে মাথাটাকে হালকা করতে চাইলো।

প্রায় মিনিট খানেক ওভাবে রইলো বিপ্লব। এই সময় ডাকতে ডাকতে এলো জেসমিন। ভেজা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে এসে দাঁড়ালো ভাইয়ের পাশে। বললো, ‘এই নাও ভাইয়া, এটা তোমার।’

‘কী ওটা?’ বলে উঠে বসে ছোটো বোনের হাত থেকে চার ভাঁজ করা কাগজ নিজের হাতে নিল।

‘আমি কী জানি!’ বললো জেসমিন। ‘তোমার চিঠি, আমি কেন খুলে দেখবো?’

‘কোথায় পেলে এটা?’ বিপ্লবের পুনরায় জিজ্ঞাসা।

নাইমুল ভাইয়া দিয়ে গেছে। বলে গেছে, ইফতারের পর তার মোবাইল খোলা থাকবে। সে সময় যদি তুমি মনে করো তাকে ফোন করবে, তাহলে করতে পারো। কী যে করো না ভাইয়া তোমরা? তোমাদের এই রহস্য আমার মাথায় একটুও ঢোকে না।’ বলে হনহন করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল জেসমিন। তবে যাবার আগে দরজাটা অবশ্যই ভেজিয়ে দিয়ে গেল।


বিপ্লবকে উদ্দেশ্য করে লেখা একটা চিঠি, নাইমুল লিখেছে। পড়লো বিপ্লব-

প্রিয় বিপু ভাইয়া,

আসসালামু আলাইকুম। আমি প্রথমেই দুঃখ প্রকাশ করছি গত পরশু দিনের ওই আচরণের কারণে। আসলে তোমাদের হাতে তখন ধরা দিলে আমি কাজটা করতে পারতাম না। সবটা জানলে তুমি আমাকে ভুল বুঝবে না, এটা আমার বিশ্বাস।

বিপু ভাইয়া, আমি আসলে একটা চক্রে আটকে পড়েছিলাম। সেখান থেকে আমি কোনোভাবেই বের হতে পারছিলাম না। আবার তোমাকে কিছু বলতেও পারছিলাম না। বললে আমার জীবনের রিস্ক ছিল। সে যাই হোক, এখন আমি মুক্ত। তবে দেশে আর থাকবো না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পাসপোর্ট আগেই করা ছিল। গতকালই ভিসা হাতে পেয়েছি। তোমাদেরকে, এই এলাকাকে ছেড়ে যেতে আমার খুবই কষ্ট হবে। কিন্তু এটা করা ছাড়া আমার উপায় নেই।

এবার আসল কথায় আসি। ওরা খুব দুর্ধর্ষ লোক। হেন কোনো খারাপ কাজ নেই যা করা ওদের জন্য অসম্ভব। সব কিছুই করতে পারে ওরা। ওরা একটা মিশন নিয়ে নেমেছে। খুবই ভয়ংকর এবং সমাজ বিধ্বংসী সেই মিশন। ওদের টার্গেট সমাজের কিশোরশ্রেণী, বিশেষ করে তোমার মতো মেধাবীরা। হ্যাঁ, ওদের মিশন সাকসেস করার কৌশলগুলো বেশ আকর্ষণীয়। লোভনীয়। লোভ ও লাভের স্বপ্ন দেখিয়ে ওদের দলে ভেড়ায় মানুষকে। স্বপ্ন দেখায় সুন্দর জীবনের, জাঁকজমকপূর্ণ, আয়েশে ভরা চলাফেরার। অল্প কষ্টে অনেক অনেক অর্থ উপার্জনের পথ বাতলে দেয়। সেই জীবনে যখন যা মন চায়, তা-ই করা যায়।

তুমি আমার জন্য অনেক কষ্টা পেয়েছো বিপু ভাইয়া। আমি তোমার কোনো কথাই শুনিনি। পরে বুঝেছি, তোমার কথাই ঠিক। তোমার কথা না শুনে আমি ভুল করেছি। কিন্তু বিশ্বাস করো, তোমাকে আমি খুউব ভালোবাসি। রাহাত, রাতুল, সৈকত, আনিস, রাজিবুল, জিল্লুর- তোমাদের সবাইকে আমি অনেক ভালোবাসি।

তবে তোমাকে বলে রাখি, আমাকে দিয়ে কোনো অন্যায় কাজ ওরা করাতে পারেনি। কোনো না কোনো ভাবে আমি এড়িয়ে গেছি।

বিপু ভাইয়া, আমি জানি তুমি “সাদা চোখ”কে সহযোগিতা করবে। মাস্টার তারেকুল ইসলাম সত্যিই একজন ভালো মানুষ। তার উদ্দেশ্যও সৎ। তিনি তার ছোটো ছেলেকে হারিয়েছেন। জানো, কার কারণে ছেলেটা হারিয়ে গেছে? আমি জানি, আমি যদি না-ও বলি, তুমি অবশ্যই বুঝতে পারছো ওটা কাদের কাজ ছিল। এ রকম আরও অসংখ্য যুবক-কিশোরকে ওরা গুম করেছে, হত্যা করেছে নির্মমভাবে। তুমি ওদেরকে সমূলে ধ্বংস করবে। আর আমি জানি, সেটা তুমি পারবেই।

বিপু ভাইয়া, এবার আসল কথা বলি। ক্রিম কালারের মাইক্রোটা আমিই ধ্বংস করেছি। একটা ট্রাক আমি আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম। কাল মাঝ রাতে মাইক্রোটা যখন ও পথ দিয়ে যাচ্ছিল, তখন আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা চৌদ্দ চাকার ট্রাকটা সামনে থেকে সজোরে ধাক্কা দেয়। মাইক্রোর মধ্যে ড্রাইভারসহ মোট চারজন মানুষ ছিল। সবার অবস্থা-ই খুবই খারাপ, আশঙ্কাজনক। যদিও একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তি আছে, তবে মনে হয় আজ রাতটাও টিকবে না।

বিপু ভাইয়া, পারলে আমাকে মাফ করে দিও। তোমার সামনে এসে দাঁড়ানোর সাহস আমার নেই। তাই এই চিঠি লিখে সবটা জানালাম। চিঠিটা পড়ে যদি মনে হয় সমাজের কিছুটা উপকার করতে পেরেছি, তাহলে যেন, সেটা তোমার জন্যই সম্ভব হয়েছে। তোমার আদর্শই এটা করতে আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে।

আর একটা কথা, আমি জানি মাত্র চারজনকে শেষ করতে পারলেও ওদেরকে ধ্বংস করা অত সহজে সম্ভব হবে না। কিন্তু মনে করো, চারজনকে দিয়েই ধ্বংসের কাজটা শুরু হলো।

পরিশেষে, আমার আব্বাকে তুমি দেখে রেখো। মাকে তো সেই কবেই হারিয়েছি। তিনি বেঁচে থাকলে আমি বাইরে যেতে পারতাম কি না জানি না। আজ ইফতারের পর দশ মিনিটের জন্য আমার মোবাইলটা খোলা রাখবো। মন চাইলে কথা বলতে পারো।

তোমার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করছি বন্ধু। ভালো থেকো। তোমার কাজ থেকে কখনও পিছু হটো না।

ইতি,

তোমার হতভাগা বন্ধু ও ভাই

নাইমুল।


চিঠিটা পড়া শেষ করে পাক্কা দুই মিনিট ‘থ’ হয়ে রইলো বিপ্লব।

বিপ্লবের অন্তরটা আনন্দে ভরে যাচ্ছে। নাইমুলটা তাহলে সত্যিই বখে যায়নি।

যদিও মোবাইলটা খোলা পাবে না জানে, তারপরও কয়েকবার কল দিলো বিপ্লব। হ্যাঁ, যথারীতি বন্ধই আছে নাইমুলের মোবাইল।

সময় যেন ফুরাতেই চাচ্ছে না। ইফতারের সময় কখন হবে সেই অপেক্ষায় রইলো।

মনের মধ্যে একটা খুশির ঢেউ খেলে যাচ্ছে ওর। নিজে না পারলেও মাইক্রোবাসটার একটা ব্যবস্থা করা গেছে। অবশ্য নাইমুলের কথা অনুযায়ী সবাইকে ধ্বংস করা যায়নি, মাত্র চারজনকে শিক্ষা দেওয়া গেছে। যদিও পদ্ধতিটা সঠিক হয়নি। তারপরও নাইমুল যেটা বুঝেছে সেটা করেছে। এখন পুরো চক্রটাকে শিকড় সুদ্ধ উপড়ে ফেলার কাজ শুরু করতে হবে।

ইফতারের পর আজ একটু দ্রুতই মাগরিবের নামাজ শেষ করলো বিপ্লব। তারপর নাইমুলের মোবাইলে ফোন দিলো। বেশ আনন্দ পেল প্রিয় বন্ধুর সাথে কথা বলতে পেরে।

ও যখন নাইমুলের সাথে কথা বলা শেষ করলো, ঠিক সেই সময় মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা এলো- “ঈদ মুবারক, ঈদ মুবারক, ঈদ মুবারক। পবিত্র শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেছে। আগামীকাল পবিত্র ঈদুল ফিতর। ঈদুল ফিতরের ঈদের জামাত ...”

আনন্দে উড়তে ইচ্ছে করলো বিপ্লবের। তার মানে এবার ঊনত্রিশটা রোজা হলো।


ছোটো বোন জেসমিনকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো ও। এলাকার ছেলেমেয়েদের সাথে ঈদের আনন্দে যোগ দিলো।

আপনার মন্তাব্য লিখুন
অনলাইনে কিশোরকন্ঠ অর্ডার করুন
লেখকের আরও লেখা

সর্বাধিক পঠিত

আর্কাইভ

আরও পড়ুন...

CART 0

আপনার প্রোডাক্ট সমূহ