সোনার পিস্তল
উপন্যাস আহমেদ বায়েজীদ সেপ্টেম্বর ২০২৪
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
প্রচণ্ড গর্জনে চারপাশ কাঁপিয়ে নেমে এলো এমিরেটস এয়ারলাইন্সের বোয়িং ৭৪৭ উড়োজাহাজ। ধীরে ধীরে রানওয়ে স্পর্শ করলো বিমানটি। রানওয়ে ধরে কিছুক্ষণ ছোটার পর কমে এলো গতি। এক সময় দাঁড়িয়ে পড়লো দানবাকৃতির আকাশযানটি। কয়েক মিনিট পর খুলে গেল দরজা। ঘড়িতে তখন বেলা ১২টা। একে একে নামতে শুরু করলেন যাত্রীরা। দরজার কাছে এসেই ঘাড় ঘুড়িয়ে চারপাশটা দেখে নিলো মাহিম। এক সপ্তাহ পর প্রিয় দেশটাকে দেখলো ও; কিন্তু মনে হলো কতদিন যেন দেশ ছেড়ে দূরে পড়ে ছিল। বুক ভরে নিঃশ^াস নিলো বিমানের সিড়ির মুখে দাঁড়িয়ে। তারপর ধীরে ধীরে নামতে শুরু করলো।
সাথে সাথে প্রবাসীদের কথা মনে পড়লো ওর। মাত্র এক সপ্তাহ দেশ ছেড়ে থাকতেই এমন লাগছে, তাহলে যারা বছরের পর বছর সংসারের বোঝা বহনের জন্য, প্রিয়জনদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য বিদেশে পড়ে থাকেন তাদের কেমন লাগে। অথচ এই মানুষগুলো কত হাসিখুশি আর আন্তরিক। এই এক সপ্তাহে দুবাইতে অনেক প্রবাসীর সাথে ওর দেখা হয়েছে। অনেকেই ওকে দারুণ খাতির করেছেন। কেউ বাসায় দাওয়াত করেছেন, কেউ ঘুরতে নিয়ে গেছেন। মানুষগুলোর জন্য খারাপ লাগছে এখন।
ভাবতে ভাবতে টার্মিনাল ভবনের দিকে হাঁটতে শুরু করলো মাহিম। ওর আগে আগে হাঁটছেন জাকির স্যার। এই সফরে যিনি ছিলেন ওর অভিভাবক। রোবটিক্সের ওপর একটি প্রদর্শনীতে অংশ নিতে দুবাইয়ের কর্তৃপক্ষের আমন্ত্রণ পেয়েছিল মাহিম। ওর তৈরি করা একটি রোবট জাতীয় পর্যায়ে সেরা হওয়ার পর দুবাই ইন্টারন্যাশনাল রোবটিক্স এক্সিবিশনের আমন্ত্রণ আসে। যে সাতটি আমিরাত নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত দেশটি গঠিত হয়েছে তার একটি দুবাই। দুবাই আমিরাতের রাজধানী শহরের নামও দুবাই। বর্তমান বিশে^র উন্নত ও অভিজাত নগরীগুলোর একটি দুবাই। এক সপ্তাহ আগে জাকির স্যার ওকে নিয়ে উড়াল দেন দুবাইয়ের উদ্দেশ্যে।
চৌদ্দ বছরের জীবনে এর আগে কখনো এক সপ্তাহ বাড়ির বাইরে থাকেনি মাহিম। এবার বাড়িই শুধু নয়, দেশ থেকেই দূরে থাকতে হয়েছে। আত্মীয়স্বজন, পরিচিত মানুষ, স্কুলের বন্ধুরা সবাইকে ছাড়া এই একটা সপ্তাহ কাটাতে কষ্ট হয়েছে ওর। তবে প্রবাসী অনেকের সাথেই দেখা হয়েছে। অচেনা মানুষগুলো ওকে এতটাই আপন করে নিয়েছে, যেন মনে হয়েছে কতদিনের চেনা! যার কারণে সময়টা ভালোভাবেই কেটে গেছে।
অন্য যাত্রীদের সাথে টার্মিনাল ভবনে প্রবেশ করলো মাহিম। বিশাল বিমানের কয়েকশো যাত্রী টার্মিনাল ভবনে প্রবেশ করে নির্দেশনা দেখে দু’দিকে ভাগ হয়ে গেল। এবার ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করার পালা। নিদের্শনা মতো বাংলাদেশিরা এক দিকে আর বিদেশিরা অন্য দিকের কাউন্টারে চলে গেল। স্যারের পেছনে দাঁড়িয়ে লাইন ধরে ইমিগ্রেশন কাউন্টারের দিকে এগোতে থাকে মাহিম। ওর লাইনে সবাই বাংলাদেশি বলে খুব বেশি সময় লাগছে না। দ্রুত পাসপোর্ট চেক করে সিল মেরে দিচ্ছেন ইমিগ্রেশন অফিসার। অল্প সময়েই কাউন্টারের কাছাকাছি চলে এলো মাহিম। ওর পাসপোর্ট হাতে নিয়ে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে ভ্রমণ কেমন হলো জানতে চাইলেন অফিসার।
‘দারুণ’। এক কথায় জবাব দিলো মাহিম। তারপর সিল মেরে পাসপোর্টটা ওর হাতে দিলেন অফিসার।
এই সময় পাশেই কয়েকজন ইমিগ্রেশন পুলিশকে ছুটে আসতে দেখা গেল। কয়েক সেকেন্ড মাত্র, এর মধ্যে দৌড়ঝাপ শুরু হলে গেল কাউন্টারের কাছে। পুলিশ দেখেই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা এক যাত্রী বেড়া টপকে পালাতে চেষ্টা করলো। পুলিশ সদস্যদের কয়েকজন ছুটে গিয়ে তাকে ধরে ফেললো। দু’জন পুলিশ দু’পাশ থেকে ধরে লোকটিকে নিয়ে গেল একটি কক্ষে। কালো টি-শার্ট পরা লোকটির হাতে একটি ছোটো ব্যাগ।
লোকটিকে চিনতে পারলো মাহিম। বিমানে অপর পাশের সিটেই ছিল। দীর্ঘ সাড়ে ৫ ঘণ্টার যাত্রায় লোকটির সাথে অনেক আলাপ হয়েছে মাহিমের। মাহিম কেন দুবাই গিয়েছে সেসব খুব কৌতূহলের সাথে জানতে চেয়েছে লোকটা। শোনার পর খুব প্রশংসা করেছে। ‘ক্ষুদে বিজ্ঞানী’ বলেও ডেকেছে ওকে। দীর্ঘ আলাপচারিতায় মাহিম কোন স্কুলে পড়ে, কোথায় বাড়ি সব কিছু জেনেছে লোকটা। বাসার ঠিকানা নেওয়ার সময় বলেছে, বরিশাল যাওয়ার সুযোগ হলে ওর সাথে দেখা করবেন। নিজের পরিচয় দিয়েছেন ঢাকার বাসিন্দা হিসেবে। এক্সপোর্ট ইমপোর্টের ব্যবসা করেন।
একটু আগে পরিচয় আর গল্পগুজব করা লোকটিকে হঠাৎ পুলিশের হাতে বন্দি হতে দেখে একটা ধাক্কা খেল মাহিম। সেদিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। স্যার তাড়া দিলেন ওকে, ‘চলো তাড়াতাড়ি। বাড়ি ফিরতে হবে না!’
: লোকটাকে পুলিশ ধরলো কেন স্যার? উনি তো আমাদের পাশের সিটেই ছিল।
: কী জানি! হয়তো সন্দেহজনক কোনো বস্তু বহন করেছে, অথবা কোনো পুরোনো মামলার আসামী হবে। স্যার বললেন।
আর কথা না বাড়িয়ে ইমিগ্রেশন কাউন্টার ছেড়ে বেড়িয়ে এলো ওরা। বাইরে ওদের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন মাহিমের বাবা ও মা। মাহিমকে দেখেই জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন ওর মা। যেন কতদিন পর দেশে ফিরেছে ছেলে তার। মাহিমের হাত থেকে লাগেজটা নিলেন ওর বাবা। নিজেকে সামলে ছেলের কাধ থেকে ব্যাকপ্যাকটা নিজের হাতে নিলেন মা।
মাহিমকে বাবা-মায়ের হাতে তুলে দিয়ে এয়ারপোর্ট থেকেই বিদায় নিলেন জাকির স্যার। ঢাকায় তাঁর কিছু কাজ আছে সেগুলো সেরে তারপর বরিশালে ফিরবেন। আর এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সি নিয়ে সোজা সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে এসে বরিশালের বাসে উঠলো মাহিমরা। বরিশালের বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হলো।
সে রাতেই চুরি হলো মাহিমদের বাসায়।
রীতিমতো দুর্ধর্ষ এক চুরি। ওরা কিছুই টের পায়নি। সকালে বেশ দেরিতে ঘুম ভেঙেছে সবার। ঘুম ভেঙে দেখে মাহিমের রুমের সব কিছু এলোমেলো। অন্য ঘরগুলোতেও অনেক কিছু এলোমেলো হয়ে আছে। চোর সব কিছু উলটেপালটে হয়তো দামি জিনিসপত্র খুঁজেছে। মাহিমের রুমের জানালার গ্রিল এক জায়গায় কিছুটা কাটা দেখা যাচ্ছে। সেখান দিয়েই চোর ঢুকেছে। সম্ভবত একাধিক চোর ঢুকেছিল। সারা ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে। কিছু নগদ টাকা, সোনার গহনা চুরি হয়েছে; কিন্তু মনে হচ্ছে চোর আরো কিছু খুঁজেছে। মাহিমের রুমেই চুরির আলামত বেশি। ওর সুটকেস, ড্রয়ার, আলমারি, স্কুল ব্যাগ কিছুই খুঁজতে বাকি রাখেনি।
কাল রাতে বাসায় ফিরে ঘুমাতে ঘুমাতে বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল। বাসায় মাহিমের জন্য অপেক্ষায় ছিল ওর একমাত্র ভাগ্নী সুবা। চার বছরের মেয়েটা মামা বলতে পাগল। মাহিমের বাবা-মা মাহিমকে আনতে ঢাকায় গেলে মাহিমের বোন আর ভাগ্নি ছিল ওদের বাসায়। মামাকে পেয়ে সুবার সেকি আনন্দ! মামার সব জিনিসপত্র নিয়েই সুবার বেশ কৌতূহল। তবে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ মাহিমের ব্যাকপ্যাকটার বিষয়ে। কোথাও ভ্রমণে গেলে এই ব্যাগটায় টুকটাক জিনিসপত্র ভরে পিঠে ঝুলায় মাহিম; কিন্তু সুবা ওটাকে মনে করে স্কুল ব্যাগ। এখনো স্কুলে ভর্তি হয়নি; কিন্তু মামার ব্যাগটা পেলেই সে স্কুলে যাওয়ার অভিনয় শুরু করে। ব্যাগটা দেখলেই কাধে ঝোলায়। আর সবাইকে বলে বেড়ায়- আমি স্কুলে যাচ্ছি। কালরাতে যতক্ষণ বাসায় ছিল ওই ব্যাগটা সুবার কাধেই ছিল, রাত এগারোটার দিকে নিজেদের বাসায় ফেরার সময়ও ওটা নিয়ে গেছে সাথে করে। পাশের মহল্লাতেই সুবাদের বাসা। ব্যাগটায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু নেই, তাই মাহিমও নিয়ে যেতে বাধা দেয়নি।
রাতে এক সাথে খাওয়াদাওয়ার পর সুবারা বিদায় নিয়েছে। এরপর বিছানায় যেতে যেতে রাত ১২টা। দীর্ঘ জার্নির ধকল থাকায় গভীর ঘুম হয়েছে। আরেকটা ব্যাপার খেয়াল করলো মাহিম, সকালে স্বাভাবিকের চেয়ে দেরিতে ঘুম ভাঙার পরও বাসার তিনজনেরই মাথা ঝিমঝিম করছিল। তাই ধারণা করলো, চোরেরা হয়তো ঘুমের কোনো ঔষুধ ওদের ওপর প্রয়োগ করেছে। হয়তো ঘরে কোনো কিছু স্প্রে করা হয়েছে বা নাকের কাছে কিছু ধরা হয়েছে। যে কারণে ঘুম গভীর হয়েছে। তবে সেটা খুব বেশি ভোগালো না। ঘণ্টাখানের পরই মাথার ঝিমঝিম ভাবটা কেটে গেল।
বাসায় যে পরিমাণ ওলট-পালট হয়েছে তাতে চোর বেশ কয়েকজন ছিল বলেই মনে হয়েছে; কিন্তু কী খুঁজেছে চোরেরা সেটি বুঝতে পারছে না মাহিমরা কেউ। এমন নয় যে মাহিম দীর্ঘদিন পর বিদেশ থেকে ফিরেছে, অনেক টাকা-পয়সা, সোনা-দানা এনেছে। একজন স্কুল ছাত্র এক সপ্তার শিক্ষা সফর শেষে বিদেশ থেকে ফিরলে তার কাছে কী থাকতে পারে চুরি করার মতো! দুবাই এক্সিবিশন থেকে যে মেডেল ও ক্রেস্ট পেয়েছে সেগুলোও নেয়নি চোরেরা।
তাহলে কীসের লোভে চোর ঢুকেছিল বাসায়? অল্প কিছু নগদ টাকা আর মাহিমের মায়ের দু’একটা গহনার জন্য? বিশ^াস করতে কষ্ট হচ্ছে মাহিমের।
দুই.
অফিসে ঢুকেই নতুন ফাইলটা হাতে পেল এএসপি আসিফ মাহবুব। ডিবি পুলিশের তরুণ কিন্তু চৌকশ এক কর্মকর্তা তিনি। মাত্র কয়েক বছর চাকরির বয়স। এরই মধ্যে ঢাকা নর্থ জোন ডিবি কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এসেছে তার কাঁধে। এর আগে বেশ কয়েকটি মামলার তদন্তে দারুণ দক্ষতা দেখিয়েছে আসিফ। এবারের মামলাটি অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের।
ঢাকনা সরিয়ে পানির গ্লাসটা হাতে তুলে নিলো আসিফ মাহবুব। পানি খাওয়া শেষ করে বিসমিল্লাহ বলে ফাইলটা খুললো। কয়েক মিনিট সময় নিয়ে পুরোটা পড়লো। মামলাটা জটিল। একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সামগ্রী চোরাই পথে দেশে ঢুকেছে। সোনার তৈরি একটি পিস্তল। পিস্তল হলেও সেটি এখন অস্ত্র নয় বরং ঐতিহাসিক বস্তু হিসেবেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পিস্তলটির রয়েছে বিরাট ইতিহাস। ওটা এসেছে উত্তর আফ্রিকার লিবিয়া থেকে। ওটার মালিক ছিলেন লিবিয়ার সাবেক শাসক মুয়াম্মার আল গাদ্দাফি।
২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটোর সামরিক বাহিনী লিবিয়ায় সামরিক অভিযান চালিয়ে ক্ষমতাচ্যুত করে গাদ্দাফির সরকারকে। রাজধানী ত্রিপোলির পতনের পর গাদ্দাফি তার অনুগত সেনা ও কর্মকর্তাদের নিয়ে জন্মস্থান সিরতে শহরে চলে যান; কিন্তু সেখানেও তার গাড়ি বহরের ওপর হামলা চালায় ন্যাটোর যুদ্ধবিমান। এরপর একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন গাদ্দাফি। ওই বাড়িটিতে গোলা নিক্ষেপ করে স্থানীয় একটি বিদ্রোহী গ্রুপ। আহত অবস্থায় বিদ্রোহীদের হাতে বন্দি হন একটানা ৪২ বছর লিবিয়া শাসন করা গাদ্দাফি। সেদিনই তাকে হত্যা করে বিদ্রোহীরা।
মুয়াম্মার গাদ্দাফির ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য একটি পিস্তল ছিল। পিস্তলটির বাইরের অংশের বেশিরভাগই ছিল স্বর্ণের তৈরি। সেটার গায়ে লিবিয়ার সামরিক বাহিনীর একটি ইউনিটের নামসহ বেশ কিছু তথ্য ছিল খোদাই করা। গাদ্দাফির খুবই প্রিয় ছিল পিস্তলটি। যেদিন তিনি বিদ্রোহীদের হাতে ধরা পড়েন সেদিন অস্ত্রটি খুঁজে পায় বিদ্রোহী দলের এক সদস্য। বিজয় উদযাপন করার সময় অস্ত্রটি হাতে নিয়ে মিছিল করেছিল সেই যুবক। যে কারণে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় পিস্তলটির খবর ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরণের পিস্তল বিশে^ অল্প কয়েকটি তৈরি হয়েছে। যার একটি ছিল গাদ্দাফির কাছে।
গাদ্দাফির মৃত্যুর পর গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে লিবিয়ায়। কয়েকটি গ্রুপ ক্ষমতা দখলের জন্য নিজেদের মধ্যে লড়াই শুরু করে। এক যুগ পেড়িয়ে গেলেও দেশটিতে শৃঙ্খলা আসেনি, থামেনি লড়াই। দিনের পর দিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের ফল ভোগ করছে লিবিয়াবাসী। এসব গোলমালে এক সময় আড়ালে চলে যায় বিখ্যাত সেই পিস্তলটির কথা। রাষ্ট্রই যেখানে অস্থিরতার মধ্যে চলে গেছে, সেখানে পিস্তলের খবর কে রাখবে? অথচ জিনিসটি ছিল লিবিয়ার রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্য।
এক পর্যায়ে হারিয়ে যায় পিস্তলটি। গোপনে চলে যায় চোরাই মার্কেটে। অনেক দিন সেটার কোনো খোঁজ কেউ জানতো না। গাদ্দাফির মৃত্যুর বছর দশেক পর মিসরের গোয়েন্দারা জানতে পারে ঐতিহাসিক সেই পিস্তলটি তাদের দেশে এসেছে খুব গোপনে। বড়ো একটি চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের হাতে পড়েছে সেটি। তথ্যের সূত্র ধরে অনেক অনুসন্ধান করেও সেটি তারা উদ্ধার করতে পারেনি। এক পর্যায়ে পিস্তলটি মিসর থেকে আবার বের হয়ে যায়। কয়েক দফা হাতবদল হয়ে চলে আসে বাংলাদেশে।
মিসরসহ কয়েকটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তথ্য পেয়েছে এদেশের গোয়েন্দারা। শেষ মুহূর্তে তারা জানতে পারে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটের একজন যাত্রী সঙ্গে করে পিস্তলটি নিয়ে বাংলাদেশে আসছে। বেশিরভাগ অংশ সোনার তৈরি হওয়ার কারণে বিমানবন্দরের সিকিউরিটি চেকিংয়ে ফাঁকি দেওয়া সহজ হয়। তাই বিমান পথেই পিস্তলটি আনা হয়। সে অনুযায়ী বিমানবন্দরে একজনকে আটকও করেছিল পুলিশ; কিন্তু লাভ হয়নি কিছু। এরপর থেকে কোনো খোঁজ নেই পিস্তলটির। যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। গোয়েন্দারাও কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছে না।
বিমানবন্দরে থেকে দুবাই থেকে আসা যে যাত্রীকে আটক করেছিল ইমিগ্রেশন পুলিশ; তাকে জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশি করে কিছুই পাওয়া যায়নি। তবুও লোকটির ওপর সারাক্ষণ নজর রাখা হচ্ছে। তার বাড়িসহ সন্দেহজনক কয়েকটি জায়গায় তল্লাশি চালিয়েছে ডিবি পুলিশ; কিন্তু জিনিসটির হদিস মেলেনি।
মামলাটির ভার এসেছে আসিফ মাহবুবের ওপর। তদন্ত ও অনুসন্ধান করে সোনার পিস্তলটি উদ্ধারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাকে। টানা কয়েকদিন ফাইলটি নিয়ে পরিশ্রম করতে থাকে আসিফ মাহবুব। নানা জায়গা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। সোর্সের মাধ্যমে আন্ডারওয়ার্ল্ডের নানা তথ্য আসতে থাকে তার হাতে; কিন্তু সেসবে পিস্তলটির বিষয়ে কোনো কথা নেই। তবুও হাল ছাড়েনি আসিফ। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব বলে কথা। যে করেই হোক ফাইলটির কাজ শেষ করতেই হবে।
মামলার সব খুটিনাটি বারবার খতিয়ে দেখতে থাকে আসিফ। যদি কিছু পাওয়া যায় এই আশায় ফাইলের প্রতিটি পৃষ্ঠা অন্তত দশবার করে পড়েছে এই দুই দিনে। একটা তথ্য আসিফের বিশেষভাবে দৃষ্টি কাড়লো। এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট নম্বর ২৭২। একটু চিন্তা করতেই মনে পড়লো, একই ফ্লাইটে মাহিমের দেশে ফেরার কথা। আসিফের খালাতো ভাই মাহিম। মেঝ খালার একমাত্র ছেলে। মাহিমকে রিসিভ করতে এয়ারপোর্টে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল আসিফের; কিন্তু কাজের চাপে যাওয়া হয়নি। পরে ফোন করে খবর নেবে সেটাও ভুলে গেছে।
তখনই ফোন করলো মেঝ খালার নম্বরে। কুশলাদি বিনিময়ের পর জানলো বাড়িতে চুরির ঘটনা। এরপর মাহিমকে চেয়ে ওর সাথে কথা বললো আসিফ। মাহিমের বিদেশ সফরের সব খুটিনাটি জানলো। ওর মেডেল পাওয়ার খবর জেনে দারুণ খুশি হলো আসিফ। এক পর্যায়ে প্রশ্ন করলো, কিরে মাহিম শুনলাম তুই দেশের আসার দিনই নাকি তোদের বাড়িতে চুরি হয়েছে? তুই কি কাড়িকাড়ি সোনা এনেছিস নাকি দুবাই থেকে? প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই টেলিফোনের ওপাশ থেকে উচ্চস্বরে হাসির শব্দ পেল মাহিম। আসিফ বরাবরই এমন স্বভাবের। বিশেষ করে কাছের মানুষদের সাথে রসিকতা ছাড়া কথা বলতে পারে না।
: সেটাই তো বুঝতে পারছি না ভাইয়া। সন্ধ্যায় এসে বাসায় পৌঁছলাম। রাতেই দুর্ধর্ষ চুরি। চোর সারা বাড়ি এলোমেলো করে রেখেছে; কিন্তু আমার দুবাই থেকে পাওয়া মেডেলটা যে স্বর্ণের সেটা সম্ভবত বুঝতে পারেনি। তবে ওরা হয়তো ভেবেছিল আমি অনেক টাকা পয়সা পুরস্কার পেয়েছি এবং সেগুলো লাগেজে ভরে এনেছি। এক্সিবিশন থেকে পাওয়া অর্থের পুরোটাই তো ব্যাংকে এসেছে।
: হতে পারে তেমন কিছু। তোর সফর কেমন ছিল সেটা বল।
: এক কথায় চমৎকার, ভাইয়া। এই বয়সে আন্তর্জাতিক একটা ইভেন্টে অংশ নেওয়াটা আমার জন্য সত্যিই ছিল স্বপ্নের মতো। কোনোদিন যা আশা করিনি। বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগীদের সাথে মেশার অভিজ্ঞতাটা দারুণ ছিল। বিভিন্ন দেশের স্কুল ছাত্রদের বিজ্ঞান চর্চা সম্পর্কে জানতে পারাটাও বড়ো সুযোগ ছিল। বেশ কিছু দুর্দান্ত আইডিয়া পেয়েছি ওই অনুষ্ঠান থেকে। আশাকরি সেগুলো ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।
: আর বিমান যাত্রা! জীবনে প্রথম বিমানে চড়লি। ভয় পাসনি তো!
: সত্যি বলতে প্রথমে একটা ভয় লেগেছিল। অতবড়ো একটা জিনিস কীভাবে শূন্যে ভেসে থাকবে সেটা নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। সাগর, পাহাড়ের ওপর দিয়ে উড়ে যাবে সেটা ভেবে ভয়ও লাগছিল। তবে শেষ দিকে এসে একটা খারাপ ঘটনা ঘটেছে।
: কী ঘটনা? জানতে চাইলো আসিফ।
: ফেরার ফ্লাইটে আমার পাশে যে যাত্রী বসা ছিল, ঢাকা এয়ারপোর্টে নামার পরই সেই লোকটাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
: বলিস কী! আসিফের কণ্ঠ চড়া হয়ে উঠলো। লোকটার সাথে তোর কথা হয়েছে? তার নাম কি মনির?
: হ্যাঁ হ্যাঁ, তার নাম মনির। পুরো ফ্লাইটে তার সাথে ভালোই আড্ডা হয়েছে; কিন্তু তুমি তার নাম জানলে কেমন করে ভাইয়া?
: সব বলবো। আমি কাল সকালেই বরিশাল আসছি। তুই এসব বিষয় আর কারো সাথে শেয়ার করবি না। আমি এসে সব খুলে বলবো। শুধু শুনে রাখ, বিষয়টা খুবই জরুরি এবং স্পর্শকাতর।
কিছুই বুঝলো না মাহিম। হঠাৎ কী এমন হলো যে আসিফ ভাইয়া বরিশাল আসবেন। আবার বললো, বিষয়টা জরুরি। ওদিকে লাইন কেটে দিয়ে আরেকটি নম্বরে ডায়াল করলো আসিফ। বাস কাউন্টারে ফোন করে পরদিন ভোরে বরিশালে যাওয়ার একটা টিকিট বুকিং দিলো। চোরাচালানের সন্দেহভাজন লোকটা যদি বিমানে মাহিমের পাশের সিটে বসে থাকে তাহলে ওর কাছ থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যেতে পারে। পরদিন সকাল সাতটার বাসে উঠলো আসিফ। গন্তব্য বরিশাল।
তিন.
সকাল বেলাতেই হুমকি দেওয়া চিরকুটটা পেল মাহিম।
নাস্তার পর টেবিলটা গোছাতে গিয়ে দেখলো সেখানে ভাজ করা একটা কাগজ। দেশে ফেরার পর গত দুদিনে টেবিলে বসা হয়নি। আজ সকাল সকাল বইপত্র গোছাতে গিয়েই জিনিসটা চোখে পড়লো। কাগজটার মাঝখানে গোটা গোটা হাতের অক্ষরে লেখা, ‘আমাদের জিনিসটা দিয়ে দাও। ওটা তোমার কোনো কাজে লাগবে না। ফিরিয়ে দিলে পুরস্কার পাবে। না দিলে অনেক বড়ো ক্ষতি হয়ে যাবে। খবরদার পুলিশের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করো না। তাহলে বাঁচতে পারবে না।’
চিঠিটা পড়ে আগামাথা কিছুই বুঝতে পারলো না মাহিম। কে কার উদ্দেশ্যে লিখেছে সেটা বুঝতে চেষ্টা করলো। ওর টেবিলে কেন রাখা হয়েছে সেটাও বুঝতে পারলো না। টেবিলের পাশে একটা জানালা খোলাই ছিল রাতে। গরমের দিনে জানালা খোলা রেখে ঘুমানোর অভ্যাস মাহিমের। এলাকায় চোরের উৎপাত নেই। সে কারণে জানালা খোলা রাখার অভ্যাস হয়ে গেছে। খোলা জানালা দিয়েই হয়তো চিঠিটা ফেলা হয়েছে ওর টেবিলে। তাহলে কি ওর উদ্দেশ্যেই লেখা হয়েছে চিঠিটা? নিজেকে প্রশ্ন করলো মাহিম। উত্তর পেল না।
চিঠিতে যে হুমকি দেওয়া হয়েছে সেটা বুঝতে অসুবিধা হলো না মাহিমের। কিছু একটা ফেরত চাওয়া হয়েছে; কিন্তু ওর কাছে তো কারো কোনো জিনিস নেই। তাহলে কেনই বা ফেরত চাইবে, কেন হুমকি দেবে? ও তো কারো কোনো জিনিস আটকে রাখেনি। বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করতে করতে সময় কেটে চললো। আপাতত বাবা-মাকে কিছু বলতে চায় না। আগে বুঝতে চায় কে কাকে হুমকি দিয়েছে। অযথা বাবা-মাকে চিন্তায় ফেলতে চায় না। এমনও হতে পারে ভুল করে চিঠিটা ওর কাছে এসেছে, বিষয়টির সাথে ওর কোনো সম্পর্কই নেই।
পরবর্তী দুই ঘণ্টায় কোনো কাজে মন বসাতে পারলো না মাহিম। যতই বিষয়টা ভুলে থাকার চেষ্টা করলো; তত বেশি চিন্তা হতে থাকলে চিঠিটার বিষয়ে। তবে ওকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতেই হয়তো আসিফ ভাইয়া এসে হাজির হলো।
দুপুরের কিছু আগে বাসায় এসে হাজির আসিফ ভাইয়া। খালা-খালুর সাথে কুশলাদি বিনিময়ের পর মাহিমকে বললো, চল তোর রুমে গিয়ে ফ্রেশ হই। মাহিম এতক্ষণ আসিফ ভাইয়ার অপেক্ষাতেই ছিল। ভাইয়া বড়ো পুলিশ অফিসার। নিশ্চয়ই হুমকি দেওয়া চিঠিটার বিষয়ে কিছু বলতে পারবেন। সমাধানও তার কাছ থেকে পাওয়া যাবে।
রুমে এস ব্যাগটা রেখেই মাহিমের বিছানায় বসলেন আসিফ ভাইয়া। ‘কী খবর! বিমানে কী হয়েছিল সব কিছু খুলে বলতো আমাকে।’
: সে সব পরে শুনবে। এদিকে নতুন এক ঝামেলায় পড়েছি আমি। বললো মাহিম।
: বাসায় চুরি হয়েছে তাই তো! ওটা তো শুনলামই। খালুজান কি মামলা করেছেন?
: চুরির কথা নয় ভাইয়া। আজ সকালে অদ্ভুত একটা কাণ্ড ঘটেছে।
বলতে বলতে চিরকুটটা আসিফ ভাইয়ার হাতে দিলো মাহিম। কাগজটা হাতে নিয়ে পড়লো আসিফ। দুবার পড়ে মাহিমের দিকে চেয়ে বললো, কোথায় পেলি?
: সকালে উঠে পড়ার টেবিলে পেলাম। মনে হয় জানালা দিয়ে ফেলে রেখেছে কেউ।
: হুম, সেটাই হবে হয়তো। আর কোনো কিছু জানতে পারছিস এ সম্পর্কে, বা কোনো ধারণা? জানতে চাইলো আসিফ।
: না ভাইয়া, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। কে কাকে এই চিঠি লিখেছে বুঝলাম না। আমার টেবিলেই বা কেন এলো এটা। আমার কাছে তো কারো কোনো জিনিস নেই যে ফেরত চাইবে।
কয়েক মূহুর্ত ভাবলো আসিফ। চিঠিটা আরো দু’বার খুটিয়ে খুটিয়ে পড়লো। তারপর মাথা তুলে বললো, মনে হচ্ছে তোকে উদ্দেশ্য করেই এটা লেখা হয়েছে। যেহেতু তোর টেবিলেই রাখা হয়েছে। আবার যেভাবে চুরি হয়েছে বলছিস, চোরের হয়তো কিছু খুঁজেছে তোর রুমে। তোর কোনো অনুমান আছে কী হতে পারে?
মাহিম কিছুই আন্দাজ করতে পারলো না। এমন কোনো বিষয় ওর জানা নেই যেটার জন্য এই হুমকি দেওয়া চিঠি আসতে পারে। আসিফ আরো অনেক বিষয়ে খুটিয়ে খুটিয়ে প্রশ্ন করলো ওকে। ওর দুবাই সফর, বিমানযাত্রাসহ অনেক বিষয় বিস্তারিত শুনলো ওর কাছ থেকে। বন্ধু মহলে বিশেষ কোনো ঘটনা ঘটেছে কিনা সেসবও জেনে নিলো। খালাতো ভাই না হয়ে অন্য কোনো অচেনা পুলিশ অফিসার এতক্ষণ জেরা করলে ভয় পেয়ে যেত মাহিম। শেষে আসিফ বললো, যেহেতু কোনো ক্লুই পাওয়া যাচ্ছে না তাই বিষয়টা নিয়ে দুঃশ্চিতা করে লাভ নেই। স্থানীয় থানায় একটা সাধারণ ডাইরি করে রাখলে ভালো হবো।
বিকেলেই স্থানীয় থানায় গেল ওরা। সাথে ছিল মাহিমের বন্ধু রাতুল। দুপুরের পরই মাহিমদের বাসায় চলে আসে রাতুল। ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ায় ওর কাছে কিছুই গোপন করেনি মাহিম। আসিফ ভাইয়ার সাথেও পরিচয় করিয়ে দিলো রাতুলকে। আসরের পর বাসা থেকে বের হয়ে প্রথমে মাহিমের রুমের জানালার বাইরের জায়গাটায় গেল ওরা। আসিফ সতর্কতার সাথে জায়গাটা দেখলো। তবে সেখানে কয়েকটা পায়ের ছাপ ছাড়া বিশেষ কিছু পাওয়া গেল না। এরপর রিকশা ডেকে থানায় গেল ওরা। আসিফ ভাইয়ার পরিচয় পেয়ে ওসি সাহেব খুব খাতির করলেন ওদের। একজন পুলিশ সদস্যকে ডেকে ডায়রি লেখালেন। মাহিমের নিরাপত্তার দিকে খেয়াল রাখবেন বলে আশ^াস দিলেন। মাহিমকেও সাবধানে চলাফেরার বিষয়ে পরামর্শ দিলেন। চা-নাস্তা খাওয়া শেষে ওরা বিদায় নিলো থানা থেকে।
থানা থেকে বের হয়ে আসিফ ভাইয়া বললেন, সন্ধ্যা হতে তো আরো কিছু সময় বাকি। চলো কোথাও ঘুরে আসি। প্রস্তাবটা পছন্দ হলো দুই কিশোরের। নদীর পাড়ে গেল ওরা। চাঁদমারীর কাছে কীর্তনখোলা নদীর পাড়ে বিশাল চড় জুড়ে দোকানপাট বসেছে। বিকেলে প্রচুর মানুষ ঘুরতে আসে এখানে। শহরবাসী একটু খোলা বাতাসে দম নিতে দলবেধে চলে আসে নদীর পাড়ে। রেস্ট্রুরেন্ট, স্ট্রিট ফুড, হকার মিলে জায়গাটা বেশ জমজমাট। বাচ্চাদের জন্য বেশ কিছু রাইডও এসেছে। কিছুটা সময় নদীর পাড়ে হাঁটাহাঁটি করলো ওরা। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই মাথা নিচু করে জুতার ফিতা বাধলো আসিফ ভাইয়া। দ্বিতীয়বার একই কাজ করতে দেখে মাহিম বললো, ভাইয়া তোমার জুতার ফিতা তো খোলেনি, তাহলে কী ঠিক করছো বারবার?
উঠে হাঁটা শুরু করতে করতে আসিফ ভাইয়া বললো, পরে বলছি। হাঁটতে থাক আমার সাথে।
কিছুক্ষণ হাঁটাহাাঁটি করে একটা মোটা গাছের গোড়ায় বসলো ওরা। নদীর দিক থেকে আসা বাতাসে বুক ভরে দম নিতে দারুণ লাগছে। মাহিম আর রাতুল পরিবেশটা উপভোগ করলেও আসিফের সেদিকে খেয়াল ছিল না। তাকে কিছুটা অন্যমনস্ক দেখে রাতুল জিজ্ঞেস করলো, কী ভাইয়া, তোমার জায়গাটা ভালো লাগেনি? এত সুন্দর পরিবেশেও তুমি মনে হয় চিন্তায় ডুবে আছো।
: কালো টি-শার্ট পরা লোকটাকে চিনিস তোরা?
একসাথে ঘাড় ঘুরিয়ে আসিফের দিকে চাইলো মাহিম আর রাতুল। মাহিম জানতে চাইলো, কোন লোকটার কথা বলছো?
: ডান দিকে ফুচকার দোকানটার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। গায়ে কালো টি-শার্ট, মাথায় ক্রিকেটারদের মতো ক্যাপ পরা। চিনিস লোকটাকে? জানতে চাইলো আসিফ। সেই সাথে ওদের আবার সতর্ক করে দিলো ঘাড় ঘুড়িয়ে সেদিকে না তাকাতে।
ইশারায় লোকটাকে দেখার চেষ্টা করলো মাহিম আর রাতুল; কিন্তু চিনতে পারলো না। লোকটা বেশ লম্বা এটুকু বুঝতে পারতে পারলো দূর থেকে। আসিফ আবার বললো, অনেকক্ষণ ধরে লোকটা আমাদের ফলো করছে। থানা থেকে বের হওয়ার পরই খেয়াল করেছি। হয়তো আরো আগেই পিছু নিয়েছে।
: তাই নাকি! গলায় বিস্ময় নিয়ে বললো মাহিম। আমরা তো খেয়ালই করিনি। ওকে দেখার জন্যই তুমি বুঝি নিচু হয়ে জুতার ফিতার বাধার অভিনয় করছিলে?
: হ্যাঁ, কেউ ফলো করছে কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়ার এটা পুরোনো টেকনিক। নিচু হয়ে দুই পায়ের ফাঁকা দিয়ে পিছন দিকে চাইলেই দেখা যায় কারা কারা আসছে। যদি কেউ অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে আসে তাহলে সে এ ধরণের আচরণ দেখে থমকে দাড়াবে অথবা অপ্রস্তুত হয়ে পড়বে।
: দারুণ বুদ্ধি, ভাইয়া। অবশ্য তুমি যে পুলিশ অফিসার। তোমার কাছেই তো এ ধরণের বুদ্ধি থাকবে; কিন্তু লোকটা কেন আমাদের ফলো করছে সেটা বুঝতে পারলে? রাতুল বললো।
: না। এখনো কিছুই তো আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। তবে রহস্য যে একটা কিছু আছে সেটা বোঝা যাচ্ছে।
: লোকটাকে অ্যারেস্ট করে ফেলো। মাহিম বললো।
: তাতে লাভ নেই। ওপর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ তো নেই। তাছাড়া গ্রেফতার করলে ওর দলের লোকেরা সতর্ক হয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং দেখতে হবে ওরা কারা, কী চায়। আপাতত বাসায় যাই।
পরদিন ভোরের গাড়িতে ঢাকায় ফিরতে হলো আসিফ ভাইয়াকে। দু’একটা দিন থাকার ইচ্ছে থাকলেও অফিস থেকে জরুরি টেলিফোন পেয়ে পরদিন ফজরের পরই ঢাকার বাসে ওঠে আসিফ। যাওয়ার সময় মাহিমকে সাবধানে থাকাসহ বিভিন্ন বিষয়ে কিছু পরামর্শ দিয়ে সে মতো চলতে বললো।
আসিফ যেদিন ভোরো ঢাকায় গেল সেদিন সন্ধ্যায়ই কিডন্যাপ করা হলো মাহিমকে।
চার.
ধীরে ধীরে চোখ খুললো মাহিম। তবে কিছুই দেখতে পেল না। ঘরটা অন্ধকার। দেওয়ালের এক দিকে ছাদের কাছে একটা ভেন্টিলেটর দিয়ে সামান্য আলো আসছে। যেটা দেখে বুঝলো এখন দিনের বেলা; কিন্তু ভেন্টিলেটরের সামান্য আলো ঘরের অন্ধকার দূর করতে পারলো না। তাই ঘরের চারপাশটা ঝাপসা দেখলো ও। নিজেকে আবিষ্কার করলো মেঝেতে। পিঠের নিচে একটা তোশক জাতীয় কিছু আছে সেটাও বুঝতে পারলো। কতক্ষণ এভাবে শুয়ে আছে সেটা মনে করতে চেষ্টা করলো মাহিম। পারলো না।
ধীরে ধীরে উঠে বসলো। বসতেই মাথা ঘুরানি শুরু হলো। প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করলো মাথায়। সেই সাথে চোখ দুটোতেও ঘোলাটে অন্ধকার দেখলো। এমনিতেই রুমটা অন্ধকার, কিন্তু তার মধ্যেও দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে সেটা টের পেল মাহিম। মাথাটা ঘুরছে। দেওয়ালে হাত দিয়ে সোজা হয়ে বসে থাকতে চেষ্টা করলো। এভাবে কেটে গেল মিনিট দু’য়েক। এরপর ধীরে ধীরে কমলো ঘুরানিটা।
কোনোরকম দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসলো। মাথাটা ধীরে ধীরে কাজ করতে শুরু করলো। ভেন্টিলেটর দিয়ে আসা আলোটা দেখে বুঝলো এখন সকাল। তবে সঠিক সময়টা আন্দাজ করতে পারলো না। তার মানে সারাটা রাত ওর কীভাবে কেটেছে সেটা জানা নেই। হয়তো এই কক্ষেই অথবা অন্য কোথাও। সম্ভবত ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছিল। যে কারণে রাতটা কীভাবে কেটে গেছে ও জানে না।
আগের দিন সন্ধ্যার কথা মনে পড়লো মাহিমের। আপার বাসা থেকে ফিরছিল। পাশাপাশি মহল্লায় বাসা ওদের আর ওর আপার। সুবার সাথে সন্ধ্যায় অনেক মজা হয়েছে। মাগরিবের পর বাসায় ফিরছিল ও। আসিফ ভাইয়া সতর্ক করে যাওয়ার পরও একা বাসা থেকে বের হওয়া যে ঠিক হয়নি সেটা বুঝতে পারলো। আসলে সারা দিন বাইরে কোথাও যায়নি; কিন্তু পাশের মহল্লায় বোনের বাসা হওয়ায় বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিল। এইটুকু পথেও যে বিপদ আসতে পারে সেটা ভাবেনি মাহিম। এখন বুঝতে পারছে, অবহেলা করা মোটেই উচিত হয়নি।
সুবাদের বাসা থেকে ফেরার পথে গলির মুখে একটা মটরসাইকেল এসে থামে ওর কাছেই। জায়গটা নির্জন। পথের পাশ ধরে হাঁটছিল মাহিম। আশপাশে কিছু বাসাবাড়ি থাকলেও কোনো দোকানপাট ছিল না। রাস্তায় কোনো লোকও ছিল না। মটরসাইকেল থেকে নেমে একজন মাহিমকে জাপটে ধরে। এরপর আর কিছু মনে নেই ওর। কত সময় কেটেছে সেটাও বলতে পারছে না। রাতটা হয়তো এই ঘরেই বন্দি অবস্থাতেই কেটে গেছে।
বাবা-মায়ের কথা মনে পড়লো মাহিমের। রাতে বাসায় ফিরতে না দেখে তারা নিশ্চয়ই চিন্তা করছেন। পরিচিত কোথাও খোঁজ-খবর করতেও হয়তো বাদ রাখেননি। মা হয়তো কেঁদেই চলছেন। মায়ের কথা মনে হতে কান্না চলে এলো মাহিমের; কিন্তু কয়েক সেকেন্ডেই নিজেকে সামলে নিলো। এই বিপদের মুখে আবেগতাড়িত হয়ে পড়লে চলবে না। বিপদ থেকে উদ্ধারের রাস্তা খুঁজতে হবে; কিন্তু কীভাবে উদ্ধার পাবে ওর জানা নেই।
উঠে দাঁড়িয়ে দেওয়াল হাতরে ঘরটার পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা নিতে চেষ্টা করলো। ভেন্টিলেটরের আবছা আলোয় দেখলো রুমটা ছোটো। ১০ ফুট বাই ১০ ফুট হতে পারে। একটা জানালা আছে। এক পাশে একটা টেবিল আর একটা চেয়ার। আরেক পাশে বিছানো তোষকটার ওপরই ওকে রাখা হয়েছে। হাত-পা বাঁধা নেই সেটা মনে পড়ায় আল্লাহকে ধন্যবাদ দিলো মাহিম। এখন চেষ্টা করাটা সহজ হবে। হয়তো ওর দিক থেকে কোনো বিপদ হবে না বুঝতে পেরে অপহরণকারীরা ওকে বেঁধে রাখেনি। অথবা ঘরটার নিরাপত্তা ব্যবস্থা মজবুত, যে কারণে বেঁধে রাখার প্রয়োজন বোধ করেনি।
এ সময় বাইরে পায়ের শব্দ পেলো মাহিম। কেউ আসছে। তালা খোলার শব্দ পেয়ে তোষকের ওপর শুয়ে পড়লো। তালা দেওয়া তাই বুঝলো রুমের বাইরে পাহাড়া নেই। এটি একটি পজেটিভ দিক ওর জন্য। দরজা খুলে গেল। আলো এসে চোখ ধাধিয়ে দিলো ওর। শুয়ে শুয়েই মাহিম দেখলো দুটো লোক ঘরে ঢুকেছে। বাতি জ¦লে উঠলো। এই আলোতে চোখ ঘুড়িয়ে পুরো ঘরটা ভালোভাবে দেখে নিলো।
: কী ঘুম ভাঙছে তাহলে!
লোকটার দিকে চাইলো মাহিম। চিনতে পারলো। সেদিন বিকেলে কীর্তখোলার পাড়ে এই লোকটাই ওদের ফলো করছিল। সেই কালো টি-শার্ট এখনো গায়ে। মাথায় ক্রিকেটারদের মতো ক্যাপ। তার পাশে আরেকজন লোক। একটু মোটা। রঙিন শার্ট গায়ে। দুজনের মধ্যে মোটা লোকটাকেই নেতা হিসেবে মনে হলো মাহিমের। এবার সে কথা বললো, এই যে ক্ষুদে বিজ্ঞানী, উইঠা বসো তো বাবা! তোমার সাথে একটু আলাপ সালাপ করি।
উঠে দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসলো মাহিম। লোকটা আবার বললো, মনে হইতাছে তুমি খুবই মেধাবী ছাত্র। বুদ্ধিও আশা করি আছে। তোমাকে কেন ধইরা আনা হইছে বুঝতেই পারছো। তাই তাড়াতাড়ি জিনিসটা কোথায় আছে বইলা দাও। খুব মূল্যবান জিনিস ওইডা।
: আপনারা কোন জিনিসটার কথা বলছেন? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। সত্যি কথাটাই বললো মাহিম।
: ন্যাকামো করবা না। বিমানে আমাদের লোক ওইডা তোমার ব্যাগের মধ্যে রাখছে। তোমার পরিচয়, ঠিকানা, ছবি সব কিছুই আমাদের কাছে আছে। কোনো ভুল নাই।
কয়েক মূহুর্ত চুপ থাকলো মাহিম। তারপর বললো, দেখুন আমি সত্যি করে বলছি, বিমানে কেউ আমাকে কিছু দেয়নি। দিলে আপনাদের জিনিস আপনাদের ফিরিয়েই দিতাম। আমার কাছে কিছুই নেই।
দাঁড়ানো থেকে এবার নিচু হলো মোটা লোকটা। চেহারায় রাগ ফুটে উঠলো। মাহিমের চুলের মুঠি খামচে ধরে বললো, শোন বিচ্ছু! তাড়াতাড়ি সত্যি কথাটা বলে দে। নইলে তোরে মাইরা ফালামু, বুঝলি! বিমানে তোর পাশের সিটে যে লোকটা ছিল সে আমাগো লোক। ইমিগ্রেশন পুলিশ ঝামেলা করতে পারে সেই ভয়ে বহু মূল্যবান জিনিসটা তোর কালো ব্যাগে রাখছে গোপনে। ওইটা আমার চাই।
বিষয়টা বুঝতে কিছুটা সময় লাগলো মাহিমের। মনে পড়লো কালো ব্যাকপ্যাকটার কথা। বিমানে ওটাই ছিল মাহিমের কাছে। স্যুটকেস তো ফ্লাইটে ওঠার আগে এয়ারলাইন্সের লোকেরা জমা নিয়েছে। আবার ঢাকায় নামার পর বুঝিয়ে দিেিয়ছে। ওদের কথা যদি সত্যি হয় তাহলে পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে বিমানের ভেতরেই ওর ব্যাগে কোনো একটা বস্তু ঢুকিয়ে দিয়েছে মনির নামের ওই লোকটা। সে জন্যই মাহিমের সাথে আগ বাড়িয়ে খাতির করেছে। ওর বাসার ঠিকানা নিয়েছে। যাতে সে পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও তার দলের লোকেরা জিনিসটা মাহিমের কাছ থেকে নিতে পারে।
মাহিমের মনে পড়লো বাসায় আসার পর কালো ব্যাগটা খোলাই হয়নি। সেদিন রাতেই ভাগ্নি সুবা ওটাকে পিঠে ঝুলিয়ে নিজের বাসায় নিয়ে গেছে। এরপর বাসায় চুরি, হুমকি দেওয়া চিঠিসহ এতসব ঘটনা ঘটেছে যে, ব্যাগটার কথা মাহিম ভুলেই গিয়েছিল। এখন সব মনে পড়লো। তাহলে ওই ব্যাগটার মধ্যেই আছে ওদের সেই মূল্যবান জিনিসটা।
মাহিমের চুলের মুঠি তখনো সেই লোকটার আঙ্গুলের মধ্যে। ওকে চুপ থাকতে দেখে জোরে একটা ঝাঁকি দিলে চুল ধরে। জানতে চাইলো, ওদের সেই জিনিসটার কোথায় আছে। দাঁতে দাঁত চেপে যন্ত্রণাটা সহ্য করলো মাহিম। ওদেরকে কিছুতেই বলা যাবে না যে ব্যাগটা এখন ওর বোনের বাসায় আছে। তাহলে তাদের বিপদ হতে পারে। কথাটা যে করেই হোক ওদের কাছ থেকে গোপন রাখতে হবে। মাহিম বললো, বিশ^াস করুন আমি তেমন কিছুই পাইনি যা মূল্যবান কোনো বস্তু হতে পারে। আপনাদের লোক ভুল তথ্য দিয়েছে কি না সেটা যাচাই করুন।
মাহিমের এই কথায় লোকটা যেন কিছুটা দ্বিধায় পড়লো। হাত থেকে আলগা হয়ে গেল মাহিমের চুল। সুযোগটা কাজে লাগালো মাহিম। আবার বললো, বিশ^াস করুন, আমি ব্যাগে তেমন কিছুই পাইনি। পেলে কেন আপনাদের শত্রু হতে যাবো? অন্যের জিনিস দখল করার ইচ্ছে আমার নেই। আমার ধারণা আপনাদের কোথাও ভুল হচ্ছে।
লোকটি কী বুঝলো কে জানে। মাহিমকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। সঙ্গী লোকটার সাথে বিড়বিড় করে কিছু বললো। তারপর মাহিমের দিকে চেয়ে বললো, ঘটনা যাই হউক, আপাতত তোমার মুক্তি নাই। মূল্যবান জিনিসটা উদ্ধার করেই ছাড়–ম।
এরপর দরজায় তালা মেরে চলে গেল দু’জন।
পাঁচ.
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হওয়ার পথে। ধীরে পায়ে হেঁটে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের দিকে যাচ্ছে একটি লোক। গায়ে ঢিলেঢালা শার্ট, পরনে নীল জিন্স আর পায়ে কেডস। ডান কাঁধে ঝোলানো একটি ব্যাগ। মাথায় একটি হ্যাট। দেখলে মনে হবে অনেক দূর থেকে জার্নি করে আসা ক্লান্ত কোনো যাত্রী। হেঁটে গিয়ে রেলওয়ে স্টেশনের মূল ভবনের সামনে থামলো। একটি পিলারের গা ঘেঁষে দাঁড়ালো লোকটি। একটু দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক চাইলো। দেখলে মনে হবে টিকিট কাউন্টার বা চায়ের দোকান খুঁজছে।
মিনিটখানেক দাঁড়িয়েই থাকলো সে। এ সময় এক হকার এগিয়ে এলো তার দিকে। হাতে অনেকগুলো বই, ম্যাগাজিন ও দৈনিক পত্রিকা। হকারের কাছ থেকে একটি ম্যাগাজিন নিয়ে উলটে-পালটে দেখতো থাকলো লোকটি। কতক্ষণ সেটা দেখার পর মনে হলো পছন্দ হয়নি। সেটি ফিরিয়ে দিয়ে আরেকটি ম্যাগাজিন হাতে নিলো আগন্তুুক। খুব কাছ থেকে খেয়াল করলে দেখা যেত বই দেখার ছলে আসলে হকারের সাথে নিচু গলায় কথা বলছে আগন্তুক। নিচুস্বরে যতটা কম সম্ভব মুখ নাড়িয়ে কথা চলেছে দু’জনের।
কিছুক্ষণ পর স্টেশন থেকে বেরিয়ে গেল আগন্তুক। স্টেশনের গেইট দিয়ে রাস্তায় বের হয়ে বামে ঘুরে উঠলো ফুটওভার ব্রিজে। স্টেশন বিল্ডিংয়ের ওপর দিয়ে বিশাল যে ফুটওভার ব্রিজটি মুগদা এলকায় গিয়ে শেষ হয়েছে সেটিতে উঠলো। একটি দোকানে বই-ম্যাগজিনগুলো রেখে তার পিছু নিলো হকারটিও। কতক্ষণ এভাবে হাঁটলো দু’জন। ব্রিজ থেকে নামার সময় আগন্তুককে ওভারটেক করে এগিয়ে গেল হকার। তার পিছু পিছু হাঁটতে লাগলো আগন্তুক। মুগদা মেডিকেল কলেজের পাশ ঘেঁষে কিছুটা সামনে গিয়ে বায়ে বাক নিলো। এরপর দু’জনে হেঁটে চললো মান্ডা এলাকার দিকে।(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)
আরও পড়ুন...